ঢাকা, শুক্রবার   ২৩ এপ্রিল ২০২১,   বৈশাখ ১০ ১৪২৮

ব্রেকিং:
মহারাষ্ট্রে হাসপাতালে আগুন, ১৩ করোনা রোগীর মৃত্যু নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় একটি ভবনে গ্যাস লাইনের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ, নারী ও শিশুসহ ১১ জন দগ্ধ
সর্বশেষ:
মেসির জোড়া গোলে বার্সার বড় জয় বিক্ষোভে উত্তাল রাশিয়া, একরাতে আটক ১৭০০ বিশ্বজুড়ে করোনায় প্রাণ গেল আরও ১৩ হাজারের বেশি মানুষের

আত্মহত্যা : কারণ ও করণীয়

কবির কাঞ্চন

প্রকাশিত: ৪ ডিসেম্বর ২০২০  

কবির কাঞ্চন, ছবি- প্রতিদিনের চিত্র।

কবির কাঞ্চন, ছবি- প্রতিদিনের চিত্র।

 

"রাগের মাথায় যেসব মানুষ
আত্মহত্যা করে
সেসব মানুষ সবই হারায়
পাপের পথটি ধরে।"

আত্মহত্যা শব্দটি ভাবতেই বুকের ভেতর এক ভয়ানক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। বিস্তৃত খোলা আকাশও মুহূর্তে অতি ক্ষুদ্র পরিসরে কালো মেঘে ঢেকে যায়। চারিদিকে যেন প্রচণ্ড ঝোড়ো হাওয়া বইতে শুরু করে। টুকরো টুকরো কাগজ, ধুলাবালি উড়ছে।মেঝেতে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ লেগে আছে। সাথে ব্যক্তির নিথর দেহটাও। চোখ মেলে তাকানো মুশকিল। মনে কোন এক অজানা ভয় ভর করে।


ইংরেজি Suicide শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ আত্মহত্যা বা আত্মহনন। কোন ব্যক্তি কর্তৃক ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের জীবন বিসর্জন দেয়া বা স্বেচ্ছায় নিজের প্রাণনাশ করা হলো আত্মহত্যা। ল্যাটিন ভাষায় 'সুই সেইডেয়ার' থেকেই 'আত্মহত্যা' শব্দটি এসেছে। যার অর্থ হচ্ছে নিজেকে হত্যা করা।

 

আত্মহত্যার কারণ :

মানুষ নানান কারণে আত্মহত্যা করে থাকে। তবে এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হলো:
ডিপ্রেশন বা বিষন্নতা, ধর্মীয় জ্ঞানের অভাব, ব্যক্তিত্বে সমস্যা, গুরুতর মানসিক রোগ, মাদকাসক্তি, অপরাধবোধ, আত্মহত্যায় প্ররোচনা,অশিক্ষা, দারিদ্র্য, দাম্পত্য কলহ, পরকীয়া, প্রেম কলহ,অভাব-অনটন, দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক কষ্টদায়ক রোগে ভোগা, যৌন নির্যাতন, মা-বাবার ওপর অভিমান,প্রেমে ব্যর্থ হওয়া , প্রতারণার শিকার হওয়া, ইভটিজিং,

ধর্ষণ, যৌতুক, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীরা বাড়তি চাপ ও রিগিং- এ দিশাহারা হয়ে, উচ্চাঙ্খা ও সন্তোষজনক ফল না মেলা, অপমান,অবৈধ সম্পত্তির জন্য, ঋণে জর্জরিত হওয়া, বেকার সমস্যায় হতাশ হওয়া, সাম্প্রতিককালে প্রাণঘাতী ব্লু হোয়েলের মতো অনেক অনলাইন গেম যা বয়ঃসন্ধির কিশোর-কিশোরীদের আত্মঘাতী হতে বাধ্য করে। এমন আরো অনেক কারণে আবেগের ফাঁদে পড়ে মানুষ পাপের পথে পা বাড়ায়।

পৃথিবীর সব মানুষই মানুষের মতো করে বাঁচতে চায়।   নিজের জীবনকে আশ্রয় করে জিততে চায়। আরোহন করতে চায় সফলতার সর্বোচ্চ চূড়ায়। কেউ পারে। আবার কেউ তা পারে না। যারা জীবনযুদ্ধে হেরে যায় তারাই ডিপ্রেশনে ভোগে। তাদের বুকের ভেতর কষ্টের নদী বয়ে যায়।

 

"দুঃসময়ে ধেয়ে আসে
ঝঞ্ঝা বুকের ভেতর
চারিদিকের কষ্টগুলো
মনে গাঁথে শেকড়।"

 

আত্মহত্যা প্রতিরোধে করণীয়:

# মানসিক রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
# আত্মহত্যা প্রবন ব্যক্তিকে সাবধানে রাখতে হবে। কোনভাবেই তাকে একা রাখা যাবে না।
# পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন বৃদ্ধি করতে হবে।
#ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা।
# আত্মহত্যায় ব্যবহৃত জিনিসপত্র সহজলভ্য না করা।
# আত্মহত্যার বিষয়ে শিক্ষা কার্যক্রম বাড়ানো উচিত।
# মিডিয়ার যথাযথ ভূমিকা পালনের মাধ্যমে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।
#মোটিভেশনাল বিভিন্ন বই পড়তে হবে।
# কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
# মনের কষ্ট মনে চেপে না রেখে তা আপনজনদের মধ্যে নির্ভরযোগ্যদের কাছে শেয়ার করতে হবে।

"চলার পথে থাকতে পারে
পাহাড় সমান কষ্ট
তাই বলে কী হারতে হবে
জীবন করে নষ্ট।"

 

আমরা জানি, দুনিয়া পুষ্পশয্যা নয়। এখানে সুখের পাশাপাশি দুঃখ আছে। তবে প্রতিটি দুঃখের কারণও আছে। আবার সেই দুঃখ নিবারণের জন্য উপায়ও আছে। অনেকেই সামান্য কষ্ট পেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। তারা একমুহূর্তে ভুলে যায়, একটা জীবন তৈরি হতে কতো সময় লাগে। আর তার জন্য সুন্দর একটা সময় অপেক্ষা করছে। হয়তো যে সমস্যার জন্য সে আত্মহত্যা করছে পরবর্তীকালে তার চেয়ে অনেক বেশি আনন্দ তার জন্য অপেক্ষা করে আছে। কেননা কোন দুঃখ বা সমস্যাই চিরন্তন নয়। একদিন না দিন তা মিটে যাবেই। কিন্তু জীবন চলে গেলে জীবনকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না। এখানেও সবকিছুর শেষ নয়। মৃত্যুর পর বিচারদিনেও আত্মহত্যাকারীকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।

 

"ক্ষণিক দুঃখে সাধের জীবন
শেষ করে দেয় যারা
অভিশাপে যায় চলে যায়
জাহান্নামে তারা।"

 

আত্মহত্যা কখনও কোন সমস্যার সমাধান হয় না। বরং একটি আত্মহত্যা অনেকগুলো সমস্যার সৃষ্টি করে। যে ব্যক্তি আত্মহত্যা করে তাকে একদিকে যেমন দুনিয়ার জীবনে অসহনীয় কষ্ট ভোগ করতে হয় অন্যদিকে সৃষ্টিকর্তার কাছেও অপরাধী হয়ে থাকতে হয়। এছাড়াও আমাদের প্রত্যেকের জীবনই পারিবারিক সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ।  আমাদের জীবনের সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে আমাদের পিতামাতা, স্ত্রী, সন্তানসন্তুতিসহ আত্মীয় স্বজনের জীবন। আমার এহেন কর্মের জন্যে তাদের জীবনও অসম্মানের মধ্যে পড়তে হয়। অতএব এমন কোন কাজ করা যাবে না যা নিজের কিংবা একান্ত আপনজনদের স্বাভাবিক জীবনযাপনে বাঁধার কারণ হয়।

 

কারো মনে কখনও যদি জীবন সম্পর্কে বিরূপ উপলব্ধি জাগ্রত হয় তবে তাকে প্রথমত ধৈর্যশীল হতে হবে। নিজের সারাজীবনের অর্জনের কথা ভাবতে হবে। প্রিয়জনদের কথা ভাবতে হবে। পৃথিবীর অপার সৌন্দর্যের কথা ভাবতে হবে। সর্বোপুরি বিচারদিনের কঠিন পরিস্থিতির কথা ভাবতে হবে।

 

অনেক দূর্বলচিত্তের মানুষ আছেন যারা একটু সমস্যায় পড়লে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। অথচ তারা জানেন না। কোন সমস্যা থেকে পালিয়ে বাঁচা বীরের কাজ নয়। বরং সমস্যার মুখোমুখি হয়ে তা মোকাবিলা করাই বীরের কাজ।


অতি উচ্চ এভারেস্টের চেয়ে মানুষ কিন্তু বেশি উঁচু। ঠিক তেমনি সমস্যার চেয়েও মানুষ অনেক বড়।সমস্যা থেকে না পালিয়ে তাকে মোকাবিলা করতে হবে। হয়তো একটু কষ্ট হবে। কিন্তু একেবার তা অসম্ভব হবে না।
আমাদেরকে ভাবতে হবে, জীবনে যেমন দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণা আছে তেমনি অনাবিল আনন্দও আছে। জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও পাল্টাতে হবে।

"সুখের পরে দুঃখ আসে
এই তো নিয়মনীতি
চিরদিনই গাইতে হবে
দুঃখ-সুখের গীতি।"

 

প্রতিবছর ১০ই সেপ্টেম্বরকে 'বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস' হিসেবে পালন করা হয়। এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষজনকে আত্মহত্যার মতো জঘন্য পাপের পথ থেকে বেরিয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ করা।

 

আমাদের এ পৃথিবী অনিন্দ্য সুন্দর। পৃথিবীর রূপ-সুধা বড়ই চমৎকার। অথচ এমন অপরূপ সৌন্দর্যও আত্মহত্যার মুখোমুখি ব্যক্তিকে কাছে টানে না। সে নিজেকে গুটিয়ে নেয়ার পথ খুঁজে। কিন্তু গুটিয়ে নেয়ার পথ কখনও পথ হতে পারে না। জীবনের সন্ধানে খুঁজে নিতে হয় কোন নিরাপদ স্থান। সুতরাং আত্মহত্যা নয়, জীবনের সন্ধানই হোক আমাদের মুক্তির পথ।

 

লেখক: কবি, গল্পকার, গীতিকার ও প্রাবন্ধিক
সহকারী শিক্ষক, বেপজা পাবলিক স্কুল ও কলেজ চট্টগ্রাম,  সিইপিজেড, ইপিজেড, চট্টগ্রাম।