ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৫ জুন ২০২১,   আষাঢ় ১ ১৪২৮

ব্রেকিং:
পরীমণির অভিযোগ গ্রহণ করেছে পুলিশ করোনায় রাজশাহী মেডিকেলে আরও ১২ জনের মৃত্যু রাঙামাটিতে বাড়িতে ঢুকে গ্রামপ্রধানকে গুলি করে হত্যা
সর্বশেষ:
নেইমারময় জয় দিয়েই কোপা শুরু ব্রাজিলের দিনাজপুরে ৭ দিনের লকডাউন টেস্ট র‍্যাংকিংয়ে ভারতকে টপকে শীর্ষে নিউজিল্যান্ড

উপাচার্যের স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ: অনিয়ম-দুর্নীতিতে ডুবছে বশেমুরকৃবি

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১২ মে ২০২১  

 

উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণায় সুনাম কুড়ালেও উপাচার্যের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেটের স্বেচ্ছাচারিতায় ডুবতে বসেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বশেমুরকৃবি) সামগ্রিক অর্জন এমনটি অভিযোগ উঠেছে ।

 

শিক্ষক নিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে সম্ভাবনা জাগিয়েও কাঙ্খিত লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়টি পৌছাতে পারছে না বলে হতাশা জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির অনেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী।

 

সম্প্রতি নিবিড় অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে প্রতিষ্ঠানটির অনিয়ম-দুর্নীতির আরও নানা চিত্র। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন দাবি করেছে, অভিযোগ সত্য নয়। নিয়ম মেনেই সব হচ্ছে।

 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গেল বছরের (২০২০) ১২ নভেম্বরে অনুষ্ঠিত শিক্ষক নিয়োগে (প্রভাষক পদে) লিখিত পরীক্ষার ফল পরদিনই প্রকাশে অফিসিয়াল নোটিশ থাকলেও তা হয়নি। অনেক বিলম্বে যে ফল প্রকাশিত হয় তাতে দেখা গেছে-বাদ পড়েছেন প্রায় সকল বিভাগে একাডেমিক ফলাফলে শীর্ষস্থান অর্জন করা প্রার্থীরা।  

 

আরও পড়ুন...চীনা ভ্যাকসিনের কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

 

শিক্ষাজীবনের সবস্তরে কৃতিত্ব অর্জন করে এসে শিক্ষক নিয়োগে অনুত্তীর্ণ প্রার্থীরা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা লিখিত পরীক্ষা অনেক ভাল দিয়েছি। উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য নূন্যতম ৫০% নম্বর পাবো না এমনটি কোনভাবেই হতে পারে না।’ সংক্ষুব্ধদের অভিযোগ, এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় চিরায়ত রীতি ও নৈতিকার তোয়াক্কা না করে ‘প্রশ্ন প্রণয়নে কাজটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. গিয়াসউদ্দীন মিয়া এককভাবে সম্পন্ন করেছেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশষজ্ঞ না হয়েও কিভাবে সকল বিষয়ে উপাচার্য প্রশ্ন করতে পারেন তা নিয়ে বিস্মিত খোদ বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দ ও জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরাও।  


তারা এটিকে স্বৈরাচারী আচরণ উল্লেখ করে বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ মর্যদাপূর্ণ স্থানে থেকে তিনি (উপাচার্য) যে কাজটি করেছেন তা উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণায় পরবর্তী সময়গুলোতে সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে বাধ্য। শিক্ষক নিয়োগে এমন অপসংস্কৃতি বন্ধের দাবি জানিয়ে শিক্ষকরা বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে যেসব ভয়াবহ নৈরাজ্য চলছে বশেমুরকৃবি’র মতো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের এই খবর আমাদের জন্য ভালো উদাহরণ তৈরি করে না। যে জনগণের অর্থে বশেমুরকৃবি’র মতো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ পরিচালিত হয়, এই ধরণের দুর্নীতিপরায়ান প্রবণতা শিক্ষক সমাজের সম্মানকে খাটো করে।

 

অনুত্তীর্ণ প্রার্থীরা অভিযোগ করে বলেন, ‘আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করেছি-পরীক্ষার আগের দিন লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের উপাচার্য বলয়ের শিক্ষকদের সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা বৈঠক করতে। যা সুপরিকল্পিত নিয়োগ দুর্নীতির অংশ বলেই আমরা মনে করছি।’


অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, শিক্ষক নিয়োগে ইতিপূর্বে মৌখিক পরীক্ষার জন্য প্রতিটি পদের বিপরীতে নূন্যতম ৫ জন অথবা ৩ জন প্রাথীকে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করানো হলেও এবার অধিকাংশ বিভাগে ১টি পদের বিপরীতে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ১ জন প্রার্থীকেই রাখা হয়। যে কয়েকটি বিভাগে একাধিক প্রার্থী রাখা হয়েছ, মৌখিক পরীক্ষায় সেক্ষেত্রে একাডেমিক রেজাল্টে শীর্ষে থাকা প্রার্থীকেই বাদ দেওয়া হয়েছে।


সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েটদের মধ্যে সিজিপিএ ৪.০০ পাওয়া ও প্রধানমন্ত্রী গোল্ড মেডেল প্রাপ্ত প্রার্থীকেও ভাইভা বোর্ডে ২-১ মিনিট কথা বলেই বাদ দেওয়া হয়েছে। স্পষ্ট বলে দেওয়া হয়েছে তাদের জন্য কোন সুপারিশ নেই। এভাবে বিভিন্ন বিভাগে অপ্রাসঙ্গিক অজুহাত দেখিয়ে বাদ দেওয়া হয়েছে আরও কয়েকজনকে।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী জানান, নিয়োগের প্রতিটি ধাপই প্রশ্নবিদ্ধ। মেধাবী শীর্ষ শিক্ষার্থীরা প্রচন্ড হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। ক্যাম্পাসে জনশ্রুতি রয়েছে উপাচার্যের ভাতিজা ইকবাল যিনি কিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি শিক্ষার্থী এবং করোনাকালীন সময়ে হল বন্ধ থাকা সত্ত্বেও নিয়োগকে কেন্দ্র করে অবৈধভাবে হলে অবস্থান করছেন, তিনি এবং প্রক্টর ড. আরিফুর রহমান খান এই দুই জনে অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে অযোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগ তদবিরে মূল ভূমিকা পালন করেছেন।

 

শুধুমাত্র ছাত্রলীগ করার অপরাধে বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু মেধাবী শিক্ষার্থী নিগৃহীত হওয়ার অভিযোগ এনেছেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে। তাদের অভিযোগ, যোগ্য সব মানদণ্ডে এগিয়ে থাকলেও শিক্ষক নিয়োগসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে তাদের অব্যাহতভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে।


বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি এস এম ফজলে রাব্বী বাঁধন এবিষয়ে বলেন, ‘এখানে ছাত্রলীগের প্রথম কর্মী ছিলাম আমি। আমাদের শিক্ষার্থী তুলনামুলক কম। এখানে যাঁরা শিক্ষক হয়েছেন, তাঁরা প্রথমে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেননি। এটি পূর্বে ইনস্টিটিউট ছিল, উনারা মূলত বাংলাদেশ কৃষি ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ছিলেন। সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারাই হঠাৎ শিক্ষক হয়ে যান। তখন তাদের মনোভাব ছিল, এটি আমাদের হাতে তৈরি এবং এটি আমাদেরই।’

 

ছাত্রলীগ সভাপতির অভিযোগ ‘তাঁরা এখনো এটাকে ইউনিভার্সিটি মনে করে না। ইপসার প্রতিষ্ঠাকালীন যারা ছিলেন, বর্তমান উপাচার্য, সাবেক উপাচার্যগণ এবং জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের একটি বড় অংশ সেই আমলের। এ কারণেই তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কথা ভাবেন না। তখন যাঁরা বিএনপি করেছেন, আওয়ামীলীগ করেছেন, জামায়াত করেছেন কিন্তু ভেতরে তাঁরা সবাই এক। তাই ক্ষমতাই যেই থাকুক না কেন উনারা …তাদের ভাগভাটোয়ারা বৃত্তটি ভাঙা যায়নি‘ফজলে রাব্বী বাঁধন বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হওয়ার সুবাধে ইসলামী ছাত্র শিবির এখানে কৌশলে ঘাঁটি তৈরি করে। ওদের তো মিটিং-মিছিল করা লাগতো না। প্রকাশ্যে রাজনীতি করা লাগতো না। আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই ২০১০ সালে, তখন দেখলাম হিন্দু ছেলেরাও ছাত্র শিবির করে। আমাকে চাপ দেওয়া হল শিবির করতে। কিন্তু আমি যখন ইংলিশ ক্লাব করতে গেলাম আমাকে সাময়িক বহিস্কার করা হল। কোনভাবেই দু’চারজন এক হওয়া নিষেধ। অথচ অবাধে সবাই শিবির করছে, টাকা আসছে। পাশ করে বেরিয়েও চলে যাচ্ছে। আমরা যখন বললাম, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবির করছে। আমরা যদি ক্লাব করি, আলোচনা করি সমস্যা কোথায়? কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, ‘তোমরা তো ঝামেলা করবে, শিবির তো ঝামেলা করে না।’


তিনি আরও বলেন, ‘সব বাধা ডিঙিয়ে আমি যখন এখানে ছাত্রলীগের মুভমেন্ট শুরু করলাম, আমাকে পানিশমেন্টের শিকার হতে হল। আমাকে অসংখ্য শোকজ, কয়েকবার বহিষ্কার করা হয়েছে। পরে স্থায়ী বহিষ্কার করা হয়। স্থায়ী বহিষ্কারের পর আমি ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হই। কারণ আমার হাইকোর্টের রায় ছিল। ২০১৩ সালে ছাত্রশিবিরের ৩৩জনকে ধরিয়ে দিলাম জঙ্গি বইসহ। আমোদের চাপে তদন্ত কমিটি করলো অধ্যাপক রুহুল আমিনের নেতৃত্বে। প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও আফজাল হোসেন আলম নামে মাত্র একজনকে বহিষ্কার করা হল। বাকী সবাইকে খালাশ দেওয়া হল। আলম যখন কোর্টে গিয়েছে, কোর্টের রায়ে পরে তাকে ছাত্রত্ব ফিরিয়ে দেওয়া হয় কিন্তু আমাকে কিন্তু হাইকোর্টের রায় সত্ত্বেও নেয়নি। এখানে বিবেচ্য ওই ছেলে জঙ্গিশিবির করে তাকে নিয়েছে, আমি ছাত্রলীগ করি, কোর্টের রায় আছে-তা সত্ত্বেও আমাকে নেয়নি। সেই ধারাটা এখনো চলে আসছে। এখনো এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির করা কোন সমস্যা না। আমাদের আটকে রেখে ওদের সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে ‘শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের কথা উল্লেখ করে বাঁধন বলেন, ‘‘দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ছাত্র প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয় তাকে শিক্ষক হিসেবে নিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন অবধি অধিকাংশ ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট শিক্ষক হতে পারেননি। আমরা এনিয়ে প্রতিবাদ করেছি। পূর্বে রাজনৈতিক চাপ দেখিয়ে আমাদের নিবৃত্ত করা হতো। এখন আমরা যখন রাজনীতিটা শুরু করলাম তখন সেই চাপটা আর দেখাতে পারছে না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নতুন নিয়ম চালু করলো নিয়োগের ক্ষেত্রে। তিনি একাই শিক্ষক নিয়োগে সকল বিষয়ে প্রশ্ন করছেন!

এই ছাত্রনেতা আরও বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেক শিক্ষকই কোন নির্দিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞ। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যও কিন্তু একটি বিষয়ের বিশেষজ্ঞ। অন্য বিষয়ে কিন্তু তিনি বিশেষজ্ঞ নন। যে অন্য একটি বিষয়ে পিএইচডি করেছেন, সেক্ষেত্রে তিনি ভিসির চেয়ে বেশি জানবেন। এবারের শিক্ষক নিয়োগে অনেক পিএইচডি করা শিক্ষার্থী ছিলেন। উপাচার্য নির্দিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞ না হয়ে প্রশ্ন করায় বশেমুরকৃবি’র কৃতি দুইজন ছাত্রী যাঁরা চাইনিজ একাডেমি অব সাইন্সেস থেকে পিএইচডি করা তারাও লিখিত পরীক্ষায় ফেল করলেন।’

কেবলমাত্র ছাত্রলীগ করার অপরাধে যোগ্যতার সব মানদণ্ডে এগিয়ে থাকলেও আমাদের একজনকেও নিয়োগ দেওয়া হয়নি-এমন অভিযোগ এনে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ সভাপতি বলেন, ‘এটাও উল্লেখ্য, আজ অবধি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গ্রাজুয়েটকেও কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট শিক্ষক হতে পারেন, তাহলে কর্মকর্তা হতে পারবেন না কেন? শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা আছে, কর্মকর্তা হওয়ার কী যোগ্যতা নাই?’ 

 
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষার্থীর অভিযোগ, ‘বর্তমান প্রশাসন মাস্টার্স এ খুব অল্প শিক্ষার্থী ভর্তি নিয়েছেন, ‘সিট কম’ এরকম নানা মিথ্যা কথা বলে। শিক্ষক নিয়োগে যে একটা বড় দুর্নীতি হয়েছে তা এখন স্পষ্ট। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ এবং প্রক্টর ড. আরিফুর রহমান নিয়োগের এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত বলে আমরা জানতে পারছি। পূর্বে বিভাগের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের কাছে যেতেন প্রার্থীরা পরামর্শ বা সহযোগিতা নিতে। আর এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি, যাঁরা শিক্ষক নিয়োগ পেয়েছেন তাদের প্রত্যেককে প্রক্টর ড. আরিফুর রহমানের কক্ষে হাজিরা দিতে হয়েছে। নিয়োগ পাওয়ার পর নবীন শিক্ষকরা উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ এবং প্রক্টরকে ফুলের তোড়া দিয়ে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে।’

 

সংক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিক্ষক নিয়োগে আর্থিক লেনদেনের ইতিমধ্যেই অভিযোগ তুলেছেন সচেতন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। ছুটি থাকলেও এই নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আগামীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হলে বড় ধরনের ছাত্র আন্দোলনের আভাস মিলেছে শিক্ষার্থীদের কথায়।

 

শিক্ষক নিয়োগ ছাড়াও কৃষির উচ্চ শিক্ষা ও উচ্চতর গবেষণায় নিবেদিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ কিছু বিষয়ে অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বলছেন, অবিলম্বে বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষার্থীবান্ধব করে এখানে সুশাসন আনতে হবে। নইলে দুই দশক পার করা এই স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানটি বিরাট ভাবমূর্তি সংকটে পড়বে।  

 

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিক্ষক নিয়োগের মতোই প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা নিয়োগও প্রশ্নবিদ্ধ। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব গ্রাজুয়েটদের একজনও উত্তীর্ণ হতে পারি নি বিগতদিনে, যেটা বিস্ময়কর! এ বিষয়ে চাকুরি প্রার্থী গ্রাজুয়েট বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর আজ অবধি কোন গ্রাজুয়েট কর্মকর্তা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান কি এত খারাপ? না কি কোন নিয়মমাফিক দুর্নীতি চলছে?’


জানা গেছে, বশেমুরকৃবি’র একাডেমিক বিষয়ে এসেছে চমকপ্রদ পরিবর্তন। মাস্টার্স ও পিএইচডি’র মত উচ্চ শিক্ষায় অতুলনীয় এই বিশ্ববিদ্যালয়ে গত চার বছরে ক্যাপাসিটি থাকা সত্বেও খুব সীমিত শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে। নিয়মিত শিক্ষার্থীদের পিএইচডি’তে ভর্তি নেওয়ার ক্ষেত্রে জুড়ে দেওয়া হয়েছে অযৌক্তিক সব শর্ত। তাদের প্রশ্ন- চাকুরিজীবী ছাড়া কেউ পিএইচডি করতে পারবে না? এমন অদ্ভুত শর্ত বিশ্বের কোন ক্যাম্পাসে আছে? ফলশ্রুতিতে বর্তমান উপাচার্য’র মেয়াদকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা শতকরা ৮০ ভাগ হ্রাস পেয়েছে।


অভিযোগ উঠেছে, বর্তমান উপাচার্য দায়িত্ব গ্রহণের পরেই বিশ্ববিদ্যালয় উন্নয়নের জন্য আসা প্রায় সোয়া চারশ’ কোটি টাকার কাজ বরাদ্দ দেওয়া হয় গুটি কয়েক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও কোন গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণ কাজই সম্পন্ন হয় নি। এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, নির্মাণ কাজের মালমালগুলোও অতি নিম্নমানের। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঠিকাদারি কাজগুলো বরাদ্দকালীন সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদ প্লানিং ডিরেক্টর ছিলেন। একাই দুই দায়িত্বে থেকে উপাচার্য’র পৃষ্ঠপোষকতায় সবাইকে অন্ধকারে রেখে দুজনে মিলে গুটিকয়েক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাঝে কাজের বন্টন করেন।

 

বশেমুরকৃবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মীর ওবায়দুর রহমান শাওন জানান, ২০২০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস ও পরীক্ষা কার্যক্রম করেন জামায়াতপন্থী তিন জন শিক্ষক ড. মো. এনামুল হক, অধ্যাপক শেখ শামীম হোসেন ও বেগম ফারহানা ইয়াসমিন। সেটি নিয়ে সকল স্তর থেকে তীব্র প্রতিবাদ ও সংবাদমাধ্যম সোচ্চার হলে তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার অঙ্গীকার করেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. গিয়াসউদ্দীন মিয়া। তবে সবশেষ জানা যাচ্ছে, প্রায় একটি বছর হয়ে গেলেও তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নিয়ে বরং তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করার অভিযোগও উঠছে।

 

এদিকে, একাডেমিক কারিকুলামে সিলেবাস প্রণয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতপন্থী শিক্ষক অধ্যাপক গোলাম রসুল ১২ মার্চ ২০২০ ১৩০তম সভায় একাডেমিক কাউন্সিলে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নামের বানান ভুল এবং শাসন কাল নিয়ে মিথ্যা তথ্য দেওয়ায় প্রতিবাদের ঝড় তোলেন আওয়ামী পন্থী শিক্ষকেরা। তবে ঐ শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তি দেওয়ার আশ্বাস দিলেও অধ্যাবধি কোন পদক্ষেপ নেন নি উপাচার্য।

 

এই ঘটনার প্রায় ৫ মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও উপাচার্য কোন পদক্ষেপ না নিলে শিক্ষকরা জোরাল প্রতিবাদ জানান। জানা গেছে, আগামী ২০২১ সালের ১০ জুন পর্যন্ত মেয়াদ রয়েছে বর্তমান উপাচার্য ড. গিয়াসউদ্দীন মিয়ার। পরবর্তীতে আবার উপাচার্য হওয়ার আশায় নিজের পছন্দের প্রার্থী নিয়োগের পাশাপাশি জামায়াত বিএনপি পন্থী শিক্ষকদেরকে সাথে নিয়ে নিজের দল ভারী করার চেষ্টায় রয়েছেন-বলে জানাচ্ছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।


কী বলছেন শিক্ষকরা সাম্প্রতিক সময়ে নিয়োগ দুর্নীতিসহ অন্যান্য নানা ইস্যুতে বশেমুরকৃবি প্রশাসনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ এনে প্রতিবাদে সরব রয়েছেন শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দসহ প্রতিষ্ঠানটির অনেক শিক্ষক। নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয় ছাড়াও প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীবান্ধব নয়-এমন অসংখ্য পশ্চাতপদ সিদ্ধান্তেও তারা প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আসছেন।

 

এছাড়া বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ, পিএইচডি কোর্সে শিক্ষার্থী ভর্তি না নেয়া, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিরোধীদের প্রশ্রয় ও গোপনে সহযোগিতা, বঙ্গবন্ধুর চর্চায় শিক্ষার্থীদের সুকৌশলে নিরুৎসাহিত করা-ক্ষেত্রবিশেষে বাধাপ্রদান; গবেষণায় নিবেদিত শিক্ষকদের অব্যাহত অবমূল্যায়ন এবং যথাযোগ্য স্থানে কৃতিত্বের স্বীকৃতি না দেওয়ার মতো অভিযোগ আনছেন তারা। উল্লেখ্য, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল এবং শিক্ষকদের গবেষণায় অসামান্য সাফল্যের পুরস্কার প্রদানের কোন প্রচলন নেই। সামগ্রিক বিষয়ে তাদের বক্তব্য, ইপসা থেকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পূর্ণ নামে প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রথম কোন বিদ্যাপীঠের প্রকৃত বিশ্ববিদ্যালয়চরিত্র অর্জনে ও স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠাতায় সেকেলে ধ্যান-ধারণার সমাপ্তি ঘটিয়ে প্রয়োজন যুগোপযোগী পদক্ষেপ বাস্তবায়ন এবং নিবেদিত গবেষকদেরকে প্রশাসনসহ সবক্ষেত্রে নেতৃত্বে সুযোগ করে দেওয়া।  

 

শিক্ষক নিয়োগসহ অন্যান্য বিষয়ে সাম্প্রতিক অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অধ্যাপক বলেন, ‘‘এগুলো আমাদের কানেও এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মানবসম্পদ উন্নয়নে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ করে মেধা, গবেষণার ক্ষেত্রে সবার আগে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।’

 

‘..বলতে চাই, যেহেতু আমরাই ছাত্রদেরকে চার বছর পড়াই, সেহেতু আমার শিক্ষার্থীকে সবচেয়ে ভালো আমিই চিনব অন্তত যোগ্যতার প্রশ্নে। একজন শিক্ষার্থী ভালো সিজিপিএ পেল, চার বছর ধরে মূল্যায়ন করি, নিয়োগে সেই বিষয়টাকে তো বিবেচনায় রাখাই উচিত। মেধাবী শিক্ষার্থীরা শিক্ষক হিসেবে জয়েন করলে মানবসম্পদ উন্নয়নে অবশ্যই সহায়ক হবে। আর যদি কম মেধাসম্পন্ন কেউ শিক্ষক হন তাহলে তারা যা প্রডিউস করবেন তা তো কোয়ালিটি  এতোটা ভালো হওয়ার কথা নয়। মেধাবীদেরই শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া উচিত’-যোগ করেন ওই অধ্যাপক। একইসঙ্গে তিনি বশেমুরকৃবি’তে সম্প্রতি শিক্ষক নিয়োগে নিয়মের ব্যতয় হয়েছে বলেও স্বীকার করেন।

 

শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিশেষজ্ঞ মতামত নেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই বিশেষজ্ঞ মতামত নেওয়া উচিত। যে যেই বিষয়ে এক্সপার্ট উনি ওই বিষয়েই কথা বলবেন, এটাই নিয়ম। আমি যদি একজন কৃষি অর্থনীতির বিশেষজ্ঞ, আমি যদি ফিশারিজ নিয়ে কথা বলি সেটা ঠিক হবে না। সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞদেরই রাখা উচিত‘পিএইচডি কোর্সে কর্মজীবী ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সুযোগ নেই কেন-এমন প্রশ্নে এই কৃষি অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘হ্যা, এই নিয়মটা এখনো আছে। যারা ২ বছরের চাকুরির অভিজ্ঞতা লাগে। বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা সম্প্রসারণের নীতিতে বিশ্বাসী, সংকোচনের নীতিতে নয়। আমাদের শিক্ষার সম্প্রসারণ নীতিটাই থাকা উচিত।’

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অনুষদীয় ডিন এবং ডেইরি ও পোল্ট্রি সাইন্স বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মোঃ মোরশেদুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে উঠা এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে বলেন, ‘সিমাগো র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মাঝে প্রথম হয়েছে বশেমুরকৃবি, এটি আমাদেন জন্য আনন্দের কথা। বিশ্বে তিনটি খুব গ্রহণযোগ্য র্যাঙ্কিং নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান-টাইমস হায়ার এডুকেশন, কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিং এবং সাংহাই র্যাঙ্কিং। আরও অনেক প্রতিষ্ঠান আছে। সিমাগো তারমধ্যে অন্যতম। এখানে বলতে হয়, দেশের সবচেয়ে সম্মানজনক প্রধানমন্ত্রী ফেলোশিপ আবেদনে আপনি দেখবেন, আপনি কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চান তা টাইমস হায়ারে কত র্যাঙ্কিং, ১-৩০০ মধ্যে আছে কিনা? ‘‘সোসাইটিতে যারা কাজ করেন তারা এসব জানেন। আপনি যদি বঙ্গবন্ধু ফেলোশিপের আবেদন করতে চান, তাহলে কিউএস র্যাংকিংয়ে কত নম্বরে আছে তা চায়। সম্প্রতি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় সিমাগো র্যাঙ্কিংয়ে দেশে প্রথম হয়েছে। গণমাধ্যমে খবর এসেছে। এটা আমার গর্ব। আমার প্রশ্ন, বিশ্ববিদ্যালয় যখন ইপসা ছিল, বিভিন্ন ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন, তারপর বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে। ইসস্টিটিউট আর বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু ভিন্ন। ফলে ছাত্ররা যে অভিযোগগুলো করেছেন তা একদমই আমলে নেয়া যাবে না, বিষয়টা কিন্তু এমন না। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে, এবং ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি তাই আমি কিন্তু দেখেছি। বিশ্ববিদ্যালয় হবে জ্ঞানচর্চার আধার। এটা কেবল পুঁথিগত জ্ঞান নয়‘-বলেন অধ্যাপক রহমান।

 

নিয়োগ প্রক্রিয়ায় হওয়া অনিয়ম প্রসঙ্গে প্রাক্তন এই ডিন বলেন, ‘কিন্তু সাদা চোখে যদি আমরা দেখি তাহলে কী দেখব, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র সিজিপিএ এসেছে ৩.৯৬ আরেক জনের এসেছে ৩.৫৬। যখন ৩.৯৬ সিজিপিএ-ধারী চাকুরি না পেয়ে নীচের জন পেয়ে যাবেন তখন কিন্তু স্বভাবতোই প্রশ্ন আসবে। যখন দেখা যাবে এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রশ্ন করা থেকে শুরু করে সব কিছুতে নির্বাচিত কিছু লোকজন যুক্ত তখনও প্রশ্ন আসবে।’


অধ্যাপক মোরশেদুর রহমান উল্লেখ করেন, ‘উদাহরণস্বরূপ আমি আমার ফ্যাকাল্টিতে ডিন ছিলাম দু বছর আগে। আমি কখনো এমন প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলাম না। যখন একটি মেধাবী গ্রাজুয়েট চাকুরিটা পেল না তার প্রশ্ন জাগবে কেন সে পেল না, তাঁর মাঝে একটি হতাশা ও হীনমন্যতা তৈরি হবে। কাকতালীয়ভাবে দু একটি ঘটতে পারে, কিন্তু আমরা বারংবারই দেখতে পাচ্ছি যে এ ধরণের ঘটনা ঘটছে’শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের সঙ্গে একাত্মতা জানিয়ে এই শিক্ষক বলেন, ‘একজন ছাত্র বা মেয়ে ৪ এর মাঝে ৪ পেয়েছেন, শিক্ষকরাই কিন্তু তাকে পড়িয়েছেন। এখানে উল্লেখ করতে হয় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ছাত্রসংগঠন করার কারণেই তারা বাদ পড়ছেন। এরকম যদি দেখা যায় তাহলে তো মানুষ প্রশ্ন তুলবেই। মনে খটকা লাগবেই। সিজিপিএ ভালো, সে কেন পাবে না? এ জিনিসটা পরিষ্কার থাকা উচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে। বাইরের দেশে কোন আবেদন গৃহীত না হলে কারণটা জানায়, যে এই কারণে তোমার আবেদনটা গৃহীত হল না।’

 

‘আমার প্রতিষ্ঠানগুলো কিছু জানাচ্ছে না, যার ফলে প্রশ্নটা উঠছে। একটা ছেলে বা মেয়ে চার-পাঁচ বছরে উঠে আসে, একটা বিশ্ববিদালয়ে থেকে স্বপ্নকে লালন করে। অন্য বন্ধুদের থেকে মনোযোগী হয়ে ভালো রেজাল্ট করে। তারপরও যদি তার রেজাল্টের মূল্যায়ন না হয়, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়’-যোগ করেন অধ্যাপক মোরশেদ।

 

গবেষকদের প্রকৃত মূল্যায়ন বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন করছে না-এমন অভিযোগ তুলে তিনি আরও বলেন, ‘সম্প্রতি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সিমাগো র্যাঙ্কিংয়ে দেশে প্রথম হওয়া নিয়ে মিডিয়াতে কারা কথা বলেছেন? দেখে থাকবেন যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর, ট্রেজারার এবিষয়ে কথা বলছেন। কিন্তু আমি বলতে চাই-ভাইস-চ্যান্সেলর তো কথা বলবেনই, তিনি চিফ এক্সিকিউটিভ। কিন্তু এই অ্যাচিভমেন্টের সঙ্গে যদি সম্পর্ক থেকে থাকে সেটা শিক্ষকদের, যারা গবেষণায় যুক্ত। আর সংশ্লিষ্ট গবেষককে যদি আপনি কেবলই প্রতিনিধি ভাবেন তাহলে তিনি শিক্ষক সমিতির সভাপতি কোথায়? তাদের কারও বক্তব্য তো আমরা দেখলাম না। এটা খুবই ক্ষোভের কারণ।’

 

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানিয়ে মোরশেদুর রহমান বলেন, ‘যে শিক্ষকের কোন গবেষণা নিবন্ধের ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর-৬, তাকে সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগি অধ্যাপক করতে বছর লাগছে, আবার আপনি বাহবা কুড়াচ্ছেন যে আমরা বড় অর্জন করেছি; অথচ যার কারণে আপনি এটা অর্জন করেছেন তাকে এক বছর মানসিক যন্ত্রণা দিয়েছেন! একজন শিক্ষক আজকে এক বছর..বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনেই বলা আছে-আপনি যদি আবেদন করেন কোটা পূর্ণ হলে তাকে তবে এক মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। কিন্তু আপনি করেননি কারণ ব্যক্তিগতভাবে তাকে পছন্দ করেন না। এটা কী আপনি করতে পারেন? আপনি কিসের সিমাগো র্যাঙ্কিং নিয়ে কথা বলেন? এখন আমরা তো ভাই ছাপোষা শিক্ষক। সিমাগো র্যাঙ্কিং নিয়ে প্রক্টর-ট্রেজারের কী বক্তব্য থাকতে পারে আমার বোধগম্য নয়!‘বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিকৃতিতে জড়িতদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সহযোগিতা করছে জানিয়ে মোরশেদুর রহমান আরও বলেন, ‘আমি প্রতিবাদকারী। কিন্তু ভিসি যেটা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকা খরচ করে সেই খবরের প্রতিবাদ ছেপেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উচিত ছিল তদন্ত কমিটি করে প্রকৃত সত্য উন্মোচন করা।‘বলছেন উপাচার্য সামগ্রিক অভিযোগের বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. গিয়াসউদ্দীন মিয়া বলেন, ‘আপনি তো জানেন চরিত্রহননের জন্য বিভিন্ন রকম চেষ্টা হয়। আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন। দেখিয়ে দেব কিভাবে আমি সবকিছু পরিচালনা করছি।

 

শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য কোনো সদুত্তর না দিয়ে তিনি বলেন, ‘একটা গ্রুপ বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছে, আপনি আসেন কথা বলব এনিয়ে। শুধু বললে তো হবে না, এখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট রয়েছে। এমপি মহোদয়রা আছেন, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা রয়েছেন।’

 

শিক্ষক নিয়োগে লিখিত পরীক্ষায় সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞ ছিল কিনা-এমন প্রশ্নে উপাচার্য বলেন, ‘প্রত্যেকটিতেই ছিল।’ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েটরা কেন কর্মকর্তা-কর্মচারী হতে পারেননি-এমন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনি এলে আমি দেখিয়ে দেব কারা কারা আছেন।’


যদিও নর্থ আমেরিকার সকল বিশ্ববিদ্যালয় সদ্য পাশ করা গ্রাজুয়েটদের পিএইচডি কোর্সে ভর্তি করা হয়-তাহলে কেন বশেমুরকৃবি’তে শুধুমাত্র কর্মজীবীরাই সুযোগ পান-এমন প্রশ্নে উপাচার্য বলেন, ‘প্রথমত কাউকে যদি পিএইচডি কোর্সে নেবেন, এটা কিন্তু লং টার্ম। কোন প্রার্থী যদি চাকুরি না করেন তাহলে তিনি মাঝখানে রেখে চলে যাবেন। আর পিএইচডি টাও তো তার কাজে লাগাতে হবে। সেজন্য আমরা যেটা চেয়েছি, যদি পেশাজীবী না হন তবে তিনি বুঝতে পারবেন না তিনি কী কোর্সে ভর্তি হয়েছেন। নর্থ আমেরিকায় কী করে, সেখানে অনার্স করে মাস্টার্সও করে না। কেউ ব্যাংকার হলেন, কেউ পুলিশে গেলেন, ওই রিসোর্সটা কাজে লাগলো না। একটা রিসার্চে ৪০-৫০ লক্ষ টাকা খরচ হয়। তারও কিন্তু একটা স্কলারশিপ লাগবে। যদি কেউ স্কলারশিপ নিয়ে আসতে পারে, তাকে আমরা নিচ্ছি। যদি তা না পারে তাহলে টাকাটা কিভাবে আসবে বলেন? অর্ধকোটি টাকা কে দেবে? আমরা স্কলারশিপ এনকারেজ করছি।
   

 

এই বিভাগের আরো খবর