Berger Paint

ঢাকা, শনিবার   ০৬ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ২৩ ১৪২৭

ব্রেকিং:
দেশে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৩৫ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ২,৬৩৫ যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যু ১ লাখ ১০ হাজার ছুঁই ছুঁই করোনায় শীর্ষ ২০ দেশের তালিকায় বাংলাদেশ বিশ্বে করোনায় মৃত্যু প্রায় ৪ লাখ, আক্রান্ত ৬৮ লাখ ৪৪ হাজারের বেশি
সর্বশেষ:
হাসপাতালে ভর্তি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন শুধু ঢাকাতেই করোনায় আক্রান্ত সাড়ে ৭ লাখ: দাবি ইকোনমিস্টের বিশ্বে প্রাণঘাতি করোনায় ৬ নম্বরে ভারত করোনায় মাফিয়া ডন দাউদ ইব্রাহিমের মৃত্যু দাবী! বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে ব্রাজিল ছাড়া করার হুমকি প্রেসিডেন্ট বোলসোনারোর সিলেটে বিভাগে একদিনে আরও ৯১ জন করোনায় আক্রান্ত বঙ্গোপসাগরে ফের নিম্নচাপের সম্ভাবনা

এইডস; সচেতনতার অভাব

রহিমা আক্তার মৌ

প্রকাশিত: ১ ডিসেম্বর ২০১৯  

পঠিত: ৬৮০

'ফয়সালের কি হবে জানিনা, তিনটা বাচ্চা আর বউটাকে কে দেখবে? এদিক ওদিক হাত পেতে আর কয়দিন চলবে? আমি তো যার কাছেই পাই ওর বাচ্চাদের জন্যে কিছু নিই, ওদের দিই। বড় বাচ্চা দুটি স্কুলে পড়ে। বউটার দুইকূলেও কেউ নেই ফয়সাল ছাড়া। মা, বাবা, ভাই, বোন সব থেকেও কেউ নেই। হিন্দুর মেয়ে হয়ে মুসলমান ছেলেকে বিয়ে করেছে বলে ওদের সাথে আর যোগাযোগ নেই'। এভাবেই কথাগুলো বলছে ফয়সালের দূরসম্পর্কের এক চাচী। কি হয়েছে জানতে চাইলে বলেন-
'প্রায় ষোল/সতের বছর আগে ফয়সাল বিদেশে যায়, তিনবছর পর আসে দেশে। বেড়াতে গিয়ে এক হিন্দু মেয়েকে পছন্দ করে বিয়ে করে। বউকে বাড়ি রেখে আবার বিদেশ যায়। ছয় বছর আগে দেশে আসে অসুস্থ হয়ে, এর মাঝে আরো দুইবার আসলেও ফিরে যায়। শেষবার আসার পর ছোট বাচ্চার জন্ম হয়। অনেক ডাক্তার দেখিয়েছে, চিকিৎসা ও নিচ্ছে। ডাক্তার বলেছে এই রোগ ভালো হবে না, যতদিন বাঁচে এই ভাবেই বাঁচবে'।
কথাগুলো বলতে বলতে কানের কানে এসে ফিসফিস করে বলেন- 'শুনেছি ওর নাকি এইডস হয়েছে। এই রোগ ভালো হবার নয়। এই রোগ হইলে নাকি বাচ্চা হওয়া যায় না, বউয়ের সাথে মেলামেশা করা যায় না। ছোট বাচ্চাটা তো এবার বাড়ি আসার পরেই হয়েছে। আর রোগ যে কতদিনে শরীরে বাসা বাঁধছে কে জানি। বউ বাচ্চা-----------'
আর কিছু শুনা যাচ্ছে না উনার মুখের। পরে কি বলবেন বা বলতে পারেন তা ধরে নিতে পারি আমরা।

এইডস একটি ভয়ানক ব্যাধি। এইচআইভি ভাইরাসের আক্রমণে এইডস হয়ে থাকে।এইচআইভি ভাইরাসটি সম্ভবত ১৯শ শতকের শেষভাগে বা ২০শ শতকের শুরুর দিকে পশ্চিম-মধ্য আফ্রিকাতে উৎপত্তিলাভ করে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার অফ ডিসেস কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনশন বা সি ডি সি ১৯৮১ সালে প্রথম এই রোগ প্রথম সনাক্ত করে। পরবর্তীতে ১৯৮৪ সালে ফ্রান্স এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীরা এই মহামারী রোগের ভাইরাস (HIV) শনাক্ত করেন।

এইচআইভি সংক্রমণের সঙ্গে সঙ্গেই সর্বদা এইডস হয়না। শুরুতে সাধারণত ইনফ্লুয়েঞ্জা জাতীয় উপসর্গ দেখা দেয়। কখনো কখনো এই ভাইরাসে আক্রান্ত হবার ৬ সপ্তাহ পরে কিছু অনির্দিষ্ট লক্ষন দেখা দিতে পারে যেমন- জ্বর, গলা ব্যাথা, মাথা ব্যথা ইত্যাদি। এইসব লক্ষন কোনরকম চিকিৎসা ছাড়াই আবার সেরেও যায়, সে কারণে রোগী এ ভাইরাস সম্পর্কে কোন ধারনা পায় না। HIV কোনরকম লক্ষন প্রকাশ ছাড়াই ৫ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত মানুষের শরীরে নিরবে অবস্থান করতে পারে বলে অনেকেই তার রোগ সম্পর্কে জানতেই পারেনা।

এইডস এর সূনির্দিষ্ট কোন লক্ষণ নেই। আবার এইডস আক্রান্ত ব্যাক্তি অন্য কোন রোগে আক্রান্ত হলে সে রোগের লক্ষণ দেখা যাবে। আবার কারো কারো কিছু লক্ষনের কারণে বুঝতে পারে, যেমন- শরীরের ওজন দ্রুত কমে যেতে পারে। ২ মাসেরও বেশি সময় ধরে পাতলা পায়খানা হতে পারে। ঘন ঘন জ্বর অথবা রাতে শরীরে অতিরিক্ত ঘাম হওয়া। শুকনা কাশি হওয়া। কারো মধ্যে উপরের এক বা একাধিক লক্ষণ দেখা দিলেই নিশ্চিত হওয়া যাবে না যে তার এইডস হয়েছে। তবে কোন ব্যক্তির এসব লক্ষণ দেখা দিলে অবশ্যই দেরি না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া দরকার।

যেহেতু একবার সংক্রামক এইচআইভি ভাইরাস শরীরে ঢুকলে তাকে পুরোপুরি দূর করা এখন পর্যন্ত সম্ভব হয়নি, তাই এইচআইভি সংক্রমণ হলে এইডস প্রায় অনিবার্য। আর এইডসে আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যুও অনিবার্য। বিনা চিকিৎসায় এইডস পর্যায়ে পৌঁছতে যদি লাগে গড়ে দশ বছর, সেই ক্ষেত্রে চিকিৎসার দ্বারা তাকে আরো কিছু বছর পিছিয়ে দেওয়া যায়।

যৌনরোগে আক্রান্ত কোন ব্যক্তির এইচআইভি দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা একজন সুস্থ্য মানুষের চেয়ে অনেকগুণ বেশি। সাধারণত অনিরাপদ যৌনমিলনের মাধ্যমে এর জীবাণু বিস্তার লাভ করে। আবার কিছু কিছু যৌনরোগ যৌনমিলন ছাড়া অন্য উপয়েও সংক্রমিত হতে পারে। যৌনরোগসমূহ ভাইরাস অথবা ব্যকটেরিয়া ঘটিত হতে পারে, যেমন- গনোরিয়া, সিফিলিস, এইচআইভি, হেপাটাইটিস বি, জননেন্দ্রিয়ের চর্মরোগ, ফোঁড়া ইত্যাদি। যৌনানাঙ্গ বা এর আশেপাশে ঘা বা চুলকানি হলে, প্রসাবের সময় ব্যথা ও জ্বালা করলে, যৌনাঙ্গ থেকে পুঁজ পড়লে ইত্যাদি ক্ষেত্রে অবশ্যই দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া দরকার।

দেহজাত অধিকাংশ তরল ক্ষরণে এইচআইভি নিষ্কৃত হয়। তবে স্নেহপদার্থের আবরণ থাকায় এইচআইভি অত্যন্ত ভঙ্গুর। এ কারণে এইচআইভি শরীরের বাইরে বেশীক্ষণ বাঁচেনা। সরাসরি রক্ত বা যৌন নিঃসরণ শরীরে প্রবেশ না করলে এইচআইভি সংক্রমণের সম্ভাবনা খুব কম। এইচআইভি ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত  গ্রহণ করলে, বা তার ব্যবহৃত ইনজেকশনের সিরিঞ্জ  বা সূঁচ ব্যবহার করলে ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে। আবার এইচআইভি ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত গর্ভবতী মায়ের শিশুরও আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা গর্ভধারণের  শেষদিকে বা প্রসবের সময় হতে পারে।

অনেকের ধারণা এমন ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে চললে ফিরলে সেও আক্রান্ত হতে পারে। আসল কথা,
বাতাস, পানি, খাবার এবং স্পর্শের মাধ্যমে এইচআইভি ছড়ায় না। আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে একই প্লেটে খাবার খেলে এইচআইভি ছড়ায় না। আক্রান্ত ব্যক্তির সেবা করলে এইচআইভি ছড়ায় না। একই বিছানা ব্যবহার কিংবা একই পোশাক পরিধান করলেও এইচআইভি ছড়ায় না। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি থেকে এইচআইভি ছড়ায় না। একই পুকুরে গোসল করলে এইডস ছড়ায় না। মশা কিংবা অন্য কোনো পোকা-মাকড়ের কামড়ের মাধ্যমেও এইডস ছড়ায় না।
এইডস এখন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। বেশির ভাগ এইডস আক্রান্ত রোগীই সাহারা-নিম্ন আফ্রিকাতে বাস করে। ২০০৭ সালের গণনা অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী আনুমানিক ৩ কোটি ৩২ লক্ষ মানুষ এইডস-এ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে যাদের মধ্যে ৩ লক্ষ ৩০ হাজার ছিলো শিশু। এর তিন-চতুর্থাংশেরই মৃত্যু ঘটেছে আফ্রিকার সাহারা-নিম্ন ও অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর অঞ্চলে। ২০১৬ সালের হিসাব অনুযায়ী বিশ্বে প্রায় ৩ কোটি ৬৭ লক্ষ লোক এইচআইভি (মানব অনাক্রম্য অভাবসৃষ্টিকারী ভাইরাস) দ্বারা আক্রান্ত ছিল এবং ঐ বছর এইডসের কারণে ১০ লক্ষ লোকের মৃত্যু হয়। তবে ২০১৬ সালে ২০১৫ সালের তুলনায় নতুন এইচআইভি সংক্রমণের সংখ্যা ৩ লক্ষ কম ছিল।  ১৯৮০-র দশকের শুরুতে রোগটি চিহ্নিত করার পর থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সারা বিশ্বব্যাপী এইডস রোগে মোট আনুমানিক ৩ কোটি ৫০ লক্ষ লোক মারা গেছে। এইডসকে বর্তমানে একটি মহামারী ব্যাধি হিসেবে গণ্য করা হয়, যা বিশ্বের বিশাল এক আয়তন জুড়ে বিদ্যমান এবং যা সক্রিয়ভাবে ছড়িয়ে পড়ছে।

এইডস যেহেতু একটি মরণব্যাধি আবার একজন এইডস আক্রান্ত ব্যক্তি অতি সহজেই অন্যকে সংক্রমিত করে না। তাই, এইডসে আক্রান্ত ব্যক্তিকে আমাদের সমাজ থেকে যেন বিচ্ছিন্ন না করে তাকে স্বাভাবিক জীবন-যাপনে সাহায্য করতে হবে আমাদের। অন্যদিকে তার কারণে অন্য কেউ যেন আক্রান্ত না হয় তাও তাকে বুঝাতে হবে। বিয়ে করতে পারে তবে মেলামেশায় তাদের কনডম ব্যবহার করতে হবে, মনে রাখতে হবে সন্তান নেয়া যাবে না। আর এই রোগীকে খারাপ নজরেও দেখার কোন প্রয়োজন নেই।

লেখক-- সাহিত্যিক, কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক।

এই বিভাগের আরো খবর