Berger Paint

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১১ আগস্ট ২০২০,   শ্রাবণ ২৭ ১৪২৭

ব্রেকিং:
আজ শুভ জন্মাষ্টমী হোয়াইট হাউসের কাছে গুলিবর্ষণ, সংবাদ সম্মেলন ছাড়লেন ট্রাম্প প্রণব মুখোপাধ্যায়ের অবস্থা সংকটজনক, মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার বাতিল হচ্ছে পিইসি-জেএসসি পরীক্ষা
সর্বশেষ:
চাপের মুখে লেবাননের প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ যুক্তরাষ্ট্রে বিস্ফোরণে উড়ে গেল বাড়ি, হতাহত অনেক বিশ্বে নতুন শনাক্ত ২ লাখ, মারা গেছে ৪ হাজারের বেশি মানুষ

এজেন্ট ব্যাংকিংঃ দ্রুত বিকাশমান ব্যাংকিং সেবা

মো: জিল্লুর রহমান

প্রকাশিত: ২৮ জুলাই ২০২০  

পঠিত: ১৮৫
মো: জিল্লুর রহমান। ছবি- প্রতিদিনের চিত্র

মো: জিল্লুর রহমান। ছবি- প্রতিদিনের চিত্র


করোনাভাইরাসের মধ্যে ব্যাংকসেবা সীমিত হয়েছে, প্রণোদনা ভাতা পেয়েছেন ব্যাংকাররা। তবে এই সময়ে এক দিনের জন্য বন্ধ ছিল না এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা, কোনো ভাতাও পাননি এজেন্ট কর্মীরা। এরপরও করোনার সময়ে বেশ ভালো করেছেন এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা। এজেন্ট ব্যাংকিং এর কারণে শাখাগুলোয় গ্রাহক ভীড় ছিল তুলনামূলক কম এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

এই করোনাকালেও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আওতায় বেড়েছে প্রবাসী রেমিট্যান্স আয়, হিসাব খোলা, আমানত ও ঋণ—সবই। এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম নিয়ে করা বাংলাদেশ ব্যাংকের মার্চভিত্তিক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য ফুটে উঠেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবার ৪৫ শতাংশ গ্রাহকই নারী।

এজেন্ট ব্যাংকিং এ প্রতিনিয়ত বাড়ছে গ্রাহক ও লেনদেনের পরিমাণ। ফলে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এজেন্ট ব্যাংকিং। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকসহ বেসরকারি ব্যাংকগুলো যেখানে তাদের শাখা চালাতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে জনপ্রিয় হচ্ছে এজেন্ট ব্যাংকিং। কারণ এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে ব্যাংকগুলোর তেমন খরচ নেই। সে ক্ষেত্রে ব্যাংকের এজেন্টকেই সব খরচ বহন করতে হয়। এজেন্টরা শুধু ব্যাংক নির্ধারিত কমিশন পায। এ জন্য এজেন্ট ব্যাংকিং দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। ২০২০ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত ২২টি তফসিলি ব্যাংককে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২২টি ব্যাংক মাঠপর্যায়ে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এজেন্ট ব্যাংকিং শুরুর পর অল্প সময়েই এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে গ্রাহকসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৫ লাখের কাছাকাছি। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের বেশি প্রভাব পড়ছে গ্রামীণ জীবনে। এটা আর্থিক অন্তর্ভুক্তির একটা সোনালী সোপান। দেশের সব প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনও অনেক ব্যাংকের শাখা নেই। এসব অঞ্চলের মানুষ ব্যাংকিং সেবার আওতার বাইরে রয়ে গেছে। সে সব অঞ্চলে ব্যাংকের আউটলেট খুলে মানুষকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু করার জন্য ২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর এজেন্ট ব্যাংকিং নীতিমালা জারি করে ২০১৪ সালে ব্যাংক এশিয়া প্রথমে সেবাটি চালু করে। কোনো ধরনের বাড়তি চার্জ ছাড়া এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেবা দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, মহানগর ও সিটি করপোরেশন ছাড়া যেখানে ব্যাংকের শাখা নেই এমন পৌর ও শহর অঞ্চলেও এজেন্ট নিয়োগ দেওয়া যায়।

কেন্দ্রিয় ব্যাংকের নীতিমালা অনুসারে, তফসিলি ব্যাংক কর্তৃক এজেন্ট নিয়োগের মাধ্যমে জনগণকে ব্যয়সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর ব্যাংকিং সেবা প্রদানের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র বিমোচন ও আন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু করা হয়। এজেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে বর্তমানে চেকের মাধ্যমে নগদ টাকা উত্তোলন ছাড়া যাবতীয় ব্যাংকিং কার্যক্রম করা যাচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য মতে, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সংগৃহীত আমানত আগের তিন মাসের তুলনায় মার্চ ২০২০ শেষে ১৩.৫৪ শতাংশ বেড়ে ৮,৫৩৫ কোটি ৪ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে। আমানত সংগ্রহের ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আমানতের সর্বোচ্চ শেয়ার ২৫ শতাংশ। এরপর রয়েছে ডাচ-বাংলা ব্যাংক ২০.৫৩ শতাংশ, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক ১৮.৭৯ শতাংশ, ব্যাংক এশিয়া ১৭.৯৯ শতাংশ এবং রাষ্ট্রায়ত্ব অগ্রণী ব্যাংকের ৩.৫১ শতাংশ।

বর্তমানে ২২টি বাণিজ্যিক ব্যাংক  ৮,২৬০টি মাস্টার এজেন্টের আওতায় ১১,৮৭৫টি আউটলেটের মাধ্যমে এই সেবা দিচ্ছে। চলতি ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত এই তিন মাসে নতুন এজেন্ট বেড়েছে ৪০৪ জন, আউটলেট বেড়েছে ৫৫৫টি। একই সময়ে গ্রাহক বেড়েছে ১২ লাখের বেশি এবং আমানত বেড়েছে হাজার কোটি টাকারও বেশি। এছাড়াও এই সময়ে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বিতরণ বেড়েছে ২৬ শতাংশ এবং ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৫১ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি ২০২০ সালের মার্চ পর্যন্ত এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আওতায় ৬৪ লাখ ৯৭ হাজার ৪৫১ জন গ্রাহক হিসাব খুলেছেন। এসব হিসাবে জমাকৃত অর্থের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৮,৫৩৫ কোটি টাকা। ডিসেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত গ্রাহক ছিল ৫২ লাখ ৬৪ হাজার ৪৯৬ জন এবং আমানত স্থিতি ছিল ৭,৫১৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ সর্বশেষ তিন মাসে গ্রাহক বেড়েছে ১২ লাখ ২৮ হাজার ৯৫৫ জন এবং আমানত স্থিতি বেড়েছে প্রায় ১,০১৮ কোটি টাকা।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে-এই এজেন্ট ব্যাংকিং চালু করার জন্য বৃহৎ কোনো অবকাঠামোর দরকার হয় না। বৈধ চুক্তি এই কার্যক্রমের অন্যতম শর্ত। ফলে দেশের কোথাও ই্উনিয়ন পরিষদের অফিস, কোথাও ওষুধের ফার্মেসী কিংবা ছোট-খাট আকারের দোকানেও চালু হচ্ছে এজেন্ট ব্যাংকিং। বিষয়টি এখন এতোটাই সহজ যে, ঘর থেকে বের হয়ে দোকানে গিয়ে মোবাইলে রিচার্জ করার মতোই ব্যাংকের সেবা নিচ্ছে গ্রামের মানুষগুলো। যদিও এখন শহরেও এজেন্ট ব্যাংকিং চালু হয়েছে।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ব্যাংকিং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে সহজে এবং স্বল্প খরচে ব্যাংকিং সেবা প্রদান করা যাচ্ছে। যেমন- একজন গ্রাহক সহজেই খুব সামান্য পরিমান চার্জ প্রদান করেই নিকটস্থ এজেন্ট সেন্টারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিল প্রদান করতে পারছেন। এছাড়া খুব সহজে অন্যান্য ইউটিলিটি সেবা প্রদানকারীর বিলও প্রদান করতে পারছেন। সামান্য পরিমান চার্জ প্রদান করে বিইএফটিএন, আরটিজিএস এবং এনপিএসবি -এর মাধ্যমে সহজেই ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ স্থানান্তর করতে পারছেন এবং বৈদেশিক রেমিট্যান্সের অর্থ উত্তোলন করতে পারছেন। গ্রাহককে এজন্য অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে ব্যাংকের শাখায় যেতে হচ্ছে না।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে ব্যাংকিং সুবিধা বঞ্চিতদের সেবা দিতে ২০১৪ সালে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু করা হয়। গ্রামাঞ্চলের মানুষকে সেবা দেওয়া এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মূল লক্ষ্য। ব্যাংকের শাখা নেই এসব এলাকায় নিজস্ব বিক্রয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে, এমন ব্যক্তি ব্যাংকের এজেন্ট হতে পারেন। কোনো ধরনের বাড়তি চার্জ ছাড়া এ সেবা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে কোনোভাবেই গ্রাহক যেন প্রতারিত না হন, সে জন্য ব্যাংকের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি নিয়োগের আগে অবশ্যই তার ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, বিশ্বস্ততা ও সততার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার কথা রয়েছে। প্রথমে শুধু পল্লী এলাকায় এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের অনুমোদন দেওয়া হলেও, পরে পৌর ও শহরাঞ্চলেও এজেন্ট ব্যাংকিং করার অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ব্যাংকিং সেবা বাড়াতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে এজেন্ট ব্যাংকিং। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য করা হয় এজেন্ট ব্যাংকিং, বিশেষ করে স্কুল, পথশিশু, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, তৃতীয় লিঙ্গের নাগরিক, চর এলাকা ও দ্বীপবাসীর কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)-এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে ছোট ব্যবসায়ীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এজেন্ট ব্যাংকিং। এই ব্যাংকিংয়ের সর্বোচ্চ ২৯ শতাংশ গ্রাহক ছোট ব্যবসায়ী এবং এর পরেই দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে গৃহিণীরা, যার পরিমাণ ১৮ শতাংশ। এছাড়া, মোট গ্রাহকের ৩ শতাংশ দিনমজুর, ২৯ শতাংশ গ্রাহক ছোট ব্যবসায়ী, ৭ শতাংশ কৃষক, ১৫ শতাংশ সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী ও ৭ শতাংশ গ্রাহক শিক্ষার্থী।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে হিসাব খোলা, টাকা জমা ও উত্তোলন, ক্লিয়ারিং চেক ও ঋণের আবেদন গ্রহণ, বিতরণ ও কিস্তি সংগ্রহ, রেমিট্যান্স অর্থ প্রদান, বিদ্যুৎ বিল জমা, ভাতা বিতরণ, অ্যাকাউন্ট ব্যাল্যান্স জানা ও সংক্ষিপ্ত বিবরণী প্রদান, ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবা, চেক বই, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড সুবিধা, বীমা প্রিমিয়াম সংগ্রহ, দৈনিক লেনদেনে ব্যাংক ও এজেন্টের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক সৃষ্টি এবং সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা প্রোগ্রামের অধীনে নগদ অর্থ প্রদান করা ছাড়াও যে কোনো ব্যাংকের হিসাবে টাকা পাঠানো যায় এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনুমোদিত যে কোনো ধরনের ব্যাংকিং সেবা নেওয়া যায়।

এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রমকে গ্রামের কিছু কিছু স্বল্প শিক্ষিত লোকজন এনজিও বা কোন বহুমুখী সমিতির শাখা মনে করে। এসব ভ্রান্ত ধারণা পরিহার করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন বা সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো উচিত।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, জামানত তুলনামূলকভাবে কম লাগে। অল্প জায়গায় এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়। লোকবলও কম লাগে। এ কারণে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম দ্রুত বিস্তার লাভ করছে এবং দিনকে দিন ব্যাপক জনপ্রিয় হচ্ছে।


ব্যাংকার ও কলাম লেখক,
সতিশ সরকার রোড,
গেণ্ডারিয়া, ঢাকা
[email protected]

এই বিভাগের আরো খবর