Berger Paint

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৬ মে ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ১১ ১৪২৭

ব্রেকিং:
বিশ্বে করোনায় মৃত ৩ লাখ ৪১ হাজার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী
সর্বশেষ:
চাঁদপুরের ৪০ গ্রামে আজ ঈদ নিম্ন আদালতের ২ বিচারকের করোনা শনাক্ত : আইনমন্ত্রী সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে ঈদ আজ করোনায় সশস্ত্র বাহিনীর ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে

করোনাকালে উপকারে আসতে পারে ভেষজ ‘স্টেভিয়া’

ড. মো. হুমায়ুন কবীর

প্রকাশিত: ৬ মে ২০২০  

পঠিত: ৩৩৬
ড. মো. হুমায়ুন কবীর। ছবি- প্রতিদিনের চিত্র

ড. মো. হুমায়ুন কবীর। ছবি- প্রতিদিনের চিত্র


সারাবিশ্ব আজ করোনা ভাইরাসের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত। ওলট-পালট হয়ে গেছে সকল কিছু। দিশেহারা মানবজাতি। বিপর্যস্ত বিশ্ব মানবতা। চারিদিকে শুধু হতাশা আর হতাশা- কবে মুক্তি পাওয়া যাবে এ মহাদুর্যোগ ও মহামারি থেকে। অদৃশ্য-অজানা এক আণুবীক্ষণিক জীবাণুর বিরুদ্ধে এক বিরামহীন যুদ্ধে লিপ্ত আমরা। ভয় ও আতঙ্ক আরো বেশি মাত্রায় ছড়িয়ে যাচ্ছে কারণ করোনা একটি নতুন আবিষ্কৃত ছোঁয়াছে ভাইরাস। এর কোন প্রতিরোধ হিসেবে টীকা এবং প্রতিকার হিসেবে কোন ঔষধ স্থির হয়নি এখনো। আমরা জানি, ‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ ভালো (Prevention is better than cure যেহেতু কোভিড-১৯ এর কোন প্রতিরোধ ও প্রতিকার নেই, সেজন্য নিজের শরীরের মধ্যেই প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টির কথা বলে আসছে দেশ বিদেশের চিকিৎসক, বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞগণ।

 

আর সেকারণে কোভিড-১৯ রোগ থেকে কীভাবে নিজেকে প্রতিরোধ করা যায় এবং আক্রান্ত হয়ে গেলে কীভাবে সেটার বিরুদ্ধে লড়াই করে বেঁচে উঠার চেষ্টা করতে হবে- সেসব বিষয়ে গণমাধ্যমে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা জনের নানা মত প্রকাশিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। তবে দেখা যাচ্ছে সেগুলোর মধ্যে যতটুকু না রাসায়নিক বা অ্যালোপ্যাথিক তার চেয়ে অনেক বেশি ভেষজ। মানুষের শরীর এমন একটি কারখানা যেখানে দীর্ঘকালীন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া সরাসরি কোন ওষুধ প্রয়োগ করা কঠিন। কারণ যেকোন ঔষধেরই কোন না কোন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া থাকে। সেজন্য নতুন এ ভাইরাসের জন্য কোন ওষুধ আবিষ্কার করার ক্ষেত্রে এখনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা পর্যায়েই রয়েছে। আর ভেষজ চিকিৎসায় তেমন কোন পাশর্^ প্রতিক্রিয়া নেই। সেজন্য করোনার ক্ষেত্রে ভেষজ চিকিৎসার অনেকটা সফলতাও পাওয়া যাচ্ছে।

 

কেউ বলছেন বারবার আদা-গরম পানি পান করা, গলায় গড়গড়া করা, কালোজিরার ভর্তা খাওয়া, জিরা, লবঙ্গ, এলাচি, দারুচিনি, তেজপাতা, গোলমরিচ ইত্যাদিও মসলা একত্রে কিংবা আলাদাভাবে সিদ্ধ করে গরম পানির ভ্যাঁপ নেওয়া, চায়ের বিকল্প হিসেবে পান করা ও গড়গড়া করা ইত্যাদি ইত্যাদি। সাধারণ কফ, সর্দি-জ¦রেও এগুলো ভেষজ থেরাপি হিসেবে অনাদি অনন্তকাল ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কেউ কেউ আবার পুদিনা পাতা, নিমপাতা, ধনিয়া পাতা ইত্যদি গরম পানিতে সিদ্ধ করে নাক দিয়ে উক্ত গরম পানির ফাঁপ ও ভ্যাপ নেওয়ার কথা বলছেন। এগুলোর কোনটিই ফেলনা নয় কিংবা অমূলকও নয়। আগেই বলেছি সাধারণ মৌসুমী ফ্লুতেও গ্রামে-গঞ্জে এভাবেই মানুষের রোগমুক্তির বিষয়টি চিরায়ত। স্টেভিয়া নামের ঔষধি গাছের পাতা ব্যবহার করেও একইভাবে ফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কেন সম্ভব এবং কীভাবে সম্ভব সেটাই কিছুটা বর্ণনা করার চেষ্টা করবো এখানে।
এখন আমি বলবো আমার প্রবন্ধের শিরোনামে উল্লেখিত ঔষধি গাছ স্টেভিয়ার কথা। স্টেভিয়া প্রকৃতিতে আশ্চর্যজনক একটি ঔষধি গাছ। এর বৈজ্ঞানিক নাম হলো ÔStevia rebaudianaÕ । স্টেভিয়া গাছ নিয়ে ময়মনসিংহস্থ বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ের কৃষিতত্ব বিভাগে এমএস ও পিএইচডি’র ছাত্র থাকাকালীন আমি একটি গবেষণার সাথে বেশ কিছুদিন যুক্ত ছিলাম। তা নিয়ে যৌথভাবে আমার ৩টি বৈজ্ঞানিক নিবন্ধও রয়েছে। আমার গবেষণা দলের তত্ত¡াবধায়ক ছিলেন উক্ত বিভাগের তৎকালীন সিনিয়র অধ্যাপক একেএম সাঈদুল হক চৌধুরী। গবেষণা দলে অন্যান্যদের মধ্যে ছিলেন অপর এমএস ছাত্রদ্বয় সর্বজনাব মো. হাফিজ হাসান ও মো. আরিফুর রহমান খান। মো. হাফিজ হাসান বর্তমানে উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশে অধ্যয়নরত এবং মো. আরিফুর রহমান খান পরে স্টেভিয়া নিয়েই পিএইচডি করে বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক এবং প্রক্টরের দায়িত্বপ্রাপ্ত। আমাদের গবেষণায় ময়মনসিংহের মাটিতে সারাবছরই স্টেভিয়া উৎপাদনে সক্ষম হয়েছি। তবে বেশি বৃষ্টিতে পানি আটকে স্টেভিয়া গাছ মারা যায় এবং পাতা উৎপাদন কমে যায়।

 

স্টেভিয়া গাছের পাতা মিষ্টি। সবচেয়ে মিষ্টি এর নির্যাস যা শুধু মিষ্টিই নয়, চিনি থেকে ২৫০ থেকে ৩০০ গুণ পর্যন্ত বেশি মিষ্টি। ১৮৮৭ সালে সুইজারল্যান্ডের উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ড. এমএস বার্টনি প্রথম স্টেভিয়াকে বিশ^বাসীর কাছে পরিচয় করিয়ে দেন। ১৯৬৪ সালে এটি প্যারাগুয়েতে প্রথম বাণিজ্যিক চাষাবাদ শুরু হয়। ১৯৬৮ সালে জাপানে এবং পরে বিশে^র বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে গবেষণা ও চাষাবাদ হতে থাকে। বাংলাদেশেও এটি নিয়ে সর্বপ্রথম গবেষণা শুরু করে ২০০১ সালে বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএসআরআই)। বর্তমানে এ গবেষণাটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. কুয়াশা মাহমুদ। বাংলাদেশের আবহাওয়ায় দেশের সর্বত্রই স্টেভিয়া সহজেই ফলানো সম্ভব। স্টেভিয়ার সম্ভাবনার কথা চিন্তা করে বাংলাদেশ রুরাল এডভান্সমেন্ট কমিটি (ব্র্যাক) তাদের গাজীপুর নার্সারিতে এর বাণিজ্যিকভাবে টিস্যু কালচারের মাধ্যমে চারা উৎপাদন করছে। যতœ সহকারে আবাদ করলে একটি গাছ তিন-চার বছর সতেজ পাতা দিতে পারে। পূর্ণ বয়স্ক একটি স্টেভিয়া গাছ ৬০-৭৫ সেমি পর্যন্ত লম্বা হয়।

 

স্টেভিয়া একটি গুল্মজাতীয় হার্ব। স্টেভিয়ার পাতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশ। এটি বাড়ির ছাদে কিংবা টবেও চাষ করা সম্ভব। যেকোন বয়সের স্টেভিয়া গাছের পাতা সংগ্রহ করে সেটি ৮-১০ ঘন্টা কড়া রোদে শুকিয়ে গুড়া করে পাউডার হিসেবে প্লাস্টিক বা কাঁচের বৈয়ামে সংরক্ষণ করা যায়। সেই পাউডার চা, কফি, মিষ্টি, দই, আইসক্রিম, বেকড ফুড, কোমল পানীয়সহ অন্যান্য মিষ্টিজাতীয় খাবার তৈরীতে ব্যবহৃত হয়। তাছাড়া স্টেভিয়া পাউডার দিয়ে গ্রিন টি আকারে সেবন করা যায় যাতে আর বাড়তি কোন চিনি লাগেনা। সরাসরি সবুজ সতেজ পাতাও চিবিয়ে খাওয়া যায়। কারণ স্টেভিয়া চিনির চেয়ে অনেক গুণ মিষ্টি হলেও এতে কোলেস্টেরল নেই। এ মিষ্টি ডায়াবেটিস রোগীরাও নির্ভয়ে খেতে পারে। অগ্নাশয়কে ইনসুলিন উৎপাদনে উদ্দীপ্ত করে বলে রক্তের গøুকোজও নিয়ন্ত্ররণ থাকে। কারণ এটি রক্ষে গøুকোজের পরিমাণের কোন পরির্তন ঘটায় না। আমাদের গবেষণার অংশ হিসেবে স্টেভিয়া পাতার সংরক্ষিত পাউডার দিয়ে আমরা সেমাই, পায়েস করে খেয়ে দেখেছি যা খুবই সুমিষ্ট ও সুস্বাদু। স্টেভিয়া গরম পানিতে দিলে একধরনের সুমিষ্ট সুগন্ধ বের হয় যা খুবই উপভোগ্য। স্টেভিয়ার পাতা চিনি অপেক্ষা ৩-৪০ গুণ এবং এর পাতার রস বা নির্যাস (স্টেভিওসাইড) চিনি থেকে ৩০০ গুণ মিষ্টি। এত মিষ্টতার জন্য একে মধু গাছও বলা হয়ে থাকে।

 

এটি ঔষধি হিসেবে যেসব রোগের নিরাময়ে ব্যবহার করা হয়ে থাকে তার মধ্যে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে, দাঁতের ক্ষয়রোধ করে, ব্যাকটেরিয়া সাইডাল হিসেবে কাজ করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো এটি ভাইরাসের বিরুদ্ধেও কাজ করে এবং দীর্ঘদিন ব্যবহারে ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। স্টেভিয়া এখন ব্র্যাকসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করে উপরোক্ত বিভিন্ন ফরমে বাজারজাত করছে। গলায় খুশ-খুশি কাশি করলে যেমন আদা চা, তুলসী পাতার চা, লবঙ্গ চা, চারুচিনি চা, মধু চা পান করা হয়। তেমনি না হয় আরেক আইটেম হিসেবে স্টেভিয়া পাতার গুড়া বা এর নির্যাস দিয়ে উপরে বর্ণিত যেকোন ফরমে নিয়মিত সেবন করা যেতে পারে। আগেই বলেছি, আমরা জানি বর্তমানে করোনা মহামারির কোন কার্যকরি চিকিৎসা নেই। দেখা যাচ্ছে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ যে রোগগুলো থাকলে করোনার ঝুঁকি বেশি থাকে, স্টেভিয়া সেগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখতেই সহায়তা করে।

 

তাছাড়া স্টেভিয়ায় কোন ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান নেই এবং দীর্ঘদিন ব্যবহারেও এর কোন পাশর্^ প্রতিক্রিয়া নেই যা প্রমাণীত। কাজেই করোনার চিকিৎসা হিসেবে দেশ বিদেশের যিনি যে পরামর্শই দিন না কেন তার সাথে চলুন আমরা সবাই স্টেভিয়া ব্যবহার করি। বাজারে অবশ্যই যেকোন ফার্মেসি অথবা ব্র্যাক বা ঈশ^র্দীতে অবস্থিত বিএসআরআইতে যোগাযোগ করলে কোথায় পাওয়া যেতে পারে তার নির্দেশনা জানা যাবে। অপরদিকে স্টেভিয়া গাছ রোপনের ২-৩ মাসের মধ্যেই উত্তোলনযোগ্য পাতা হারভেস্ট করা যায়। সেজন্য প্রত্যেকে নিজের বাড়িতে যেকোন উঁচু জায়গায় অথবা বাড়ির ছাদের টবে আজই চারা লাগিয়ে দিন। চারা অবশ্যই ব্র্যাকের সাথে যোগাযোগ করলে পাওয়া যাবে আশা করি। তাহলে আমরা শুধু করোনা কেন যেকোন ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসজনিত রোগ থেকে প্রতিরোধ ও প্রতিকার পেতে পারি।                 
        

লেখক: কৃষিবিদ ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

 

এই বিভাগের আরো খবর