ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ মে ২০২১,   জ্যৈষ্ঠ ৪ ১৪২৮

ব্রেকিং:
ইসরায়েলে ৩ হাজার রকেট ছুড়ল হামাস pmশেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস আজ
সর্বশেষ:
ভারতে একদিনে আরও ৪ হাজারের বেশি মৃত্যু গাজায় ইসরায়েলি হামলায় আরও ১০ শিশুসহ নিহত ৪২

করোনার দুর্ভোগে যাকাতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

মো: জিল্লুর রহমান

প্রকাশিত: ২১ এপ্রিল ২০২১  

ছবি- প্রতিদিনের চিত্র।

ছবি- প্রতিদিনের চিত্র।


পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘ধন-সম্পদ যেন শুধু তোমাদের ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়।’ (সূরা আল-হাশর, আয়াত-৭) এবং ‘আর তাদের (ধনী লোকদের) সম্পদে অবশ্যই প্রার্থী (দরিদ্র) ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে।’ (সূরা আল-যারিআত, আয়াত-১৯)।

 

ইসলাম দুস্থ মানবতা, নিঃস্ব-গরিবের স্বার্থ সংরক্ষণের ন্যায়সংগত অধিকার বা হকগুলো ফরয করে দিয়েছে। ইসলামী অর্থনীতিতে সর্বপ্রকার ধন-সম্পদ বণ্টনের মূলনীতি সম্পর্কে যাকাতের নির্দেশনা রয়েছে এবং যাকাতের মাধ্যমে  মানবসমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য বিশেষভাবে দিকনির্দেশনা রয়েছে। এক শ্রেণির বিত্তবান লোক ধন সম্পদ ও টাকার পাহাড় গড়বে, আর অপর শ্রেণির গরিব মানুষ চরম ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের নিষ্ঠুর কশাঘাতে জর্জরিত হবে, এ ধরনের জঘন্য প্রথা ইসলাম কখনোই সমর্থন করে না। ইসলাম ধন দৌলত, অর্থ সম্পদের উদারতা ও ইনসাফের দ্বারা গরিবের ন্যায্য প্রাপ্য, হতদরিদ্রের হক বা অধিকার ব্যাপকভাবে সংরক্ষিত করেছে। ধনীদের অর্থ-সম্পদের ওপর গরিবের যে হক রয়েছে, পবিত্র কোরআনে তা বারবারই উচ্চারিত হয়েছে।

 

দানশীলতা’ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেই একটি মহৎ গুণ। কুরআন এবং হাদিসে দান-সদকার বহু ফজিলত বর্ননা করা হয়েছে। হাদিস বলা হয়েছে, “দানশীলতা জান্নাতের একটি বৃক্ষ। যা তাকে জান্নাতে পৌঁছে দিবে” (মিশকাত শরীফ)। এই ফজিলত হচ্ছে যেকোন সময়ের জন্য কিন্তু রমযানে দান-সদকার জন্য রয়েছে বিশেষ ফজিলত। যা ধর্মপ্রাণ এবং আর্থিক সামর্থ্যবান সকল মুসলমানদের জন্য সুখকর সংবাদ।

 

যাকাত ইসলামের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রোকন বা ইবাদত। ঈমানের পর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য ইবাদত হল সালাত ও যাকাত। কুরআন মজীদে বহু স্থানে সালাত ও যাকাতের আদেশ করা হয়েছে এবং আল্লাহর অনুগত বান্দাদের জন্য অশেষ ছওয়াব, রহমত ও মাগফিরাতের পাশাপাশি আত্মশুদ্ধিরও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

 

যাকাতের আবিধানিক অর্থ পরিশুদ্ধ হওয়া, বৃদ্ধি পাওয়া। যাকাতের পারিভাষায়, কোন দরিদ্র মুসলমানকে শরীয়ত কর্তৃক মালের নির্ধারিত অংশের মালিক বানিয়ে দেয়া। এ শর্তে যে উক্ত দরিদ্র মুসলমান রাসুল (সা.) এর বংশধর বা তাদের আজাদকৃত গোলাম হতে পারবে না এবং উক্ত মাল থেকে যাকাতদাতার মালিকানা পূর্ণরূপে মুক্ত হতে হবে ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করতে হবে।

 

অনেকের মনে খটকা লাগে বা সন্দেহ জাগে, যাকাত দিলে দৃশ্যত সম্পদ কমে, তাহলে কিভাবে সম্পদ বৃদ্ধি পায়। আসলে যাকাত দিলে সম্পদ যেমন পবিত্র হয়, ঠিক তেমনিভাবে আল্লাহ উক্ত সম্পদের জিম্মাদার হয়ে যান, উক্ত সম্পদের কেউ ক্ষতি বা বিনষ্ট করতে পারে না। যদি সঠিক নিয়মে যথাযথভাবে যাকাত প্রদান করা হয়, তবে সে সম্পদ চুরি হয় না, আগুনে পুড়ে না, পচে না, নষ্ট হয় না, কেউ আত্মসাৎ করতে পারে না। যেমন দুইভাই একই ব্যবসা বা চাকুরী করে সমান আয় করেন। একজন প্রতারণা ও ভেজালের সাথে জড়িত, কোন যাকাত প্রদান করে না এবং খুব জাঁকজমকপূর্ণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত কিন্তু অন্যজন যাকাত প্রদান করে, সৎ, কোন অন্যায় কাজে জড়িত নয় এবং সাধারণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত। প্রথমজন রাতে পোলাও রোস্ট খেয়ে ঘুমিয়েছেন, আর দ্বিতীয় জন স্বাভাবিক ডাল ভাত খেয়ে ঘুমিয়েছেন। দেখাগেল সকালে প্রথমজন পেটের সমস্যায় এমন অসুস্থ তাকে হাসপাতালে নিতে হলো, তার অসুস্থতা বেশ জটিল আকার ধারণ করলো এবং কযেকদিনে এর পিছনে কয়েক লক্ষ টাকা খরচ হলো, অথচ যিনি সাধারণ ডাল ভাত খেলেন তার কিছুই হলো না এবং দিব্যি সুস্থ আছেন, তার ব্যবসায় এ কয়দিনে বেশ মুনাফা হলো। একটু ভাল খাবার খেয়ে একজনের কয়েক লক্ষ টাকা কমে গেল আর যিনি যাকাত দিলেন তার কোন খরচই হলো না অর্থ্যাৎ তাকে হেফাজত করে তার সম্পদে আল্লাহ বরকত দিলেন। আসলে যাকাতের মাধ্যমে আল্লাহ সম্পদ কিভাবে বৃদ্ধি করে দেন তা আমরা দেখিনা কিন্তু অনুভব করি। আরেকটি উদাহরণ বলি, আপনি যাকাত দেন, আপনার স্ত্রী বাচ্চা প্রসব করবে, হাসপাতালে নিয়ে গেলেন, পকেটে পঞ্চাশ হাজার টাকা নিয়ে গেলেন, কিন্তু হাসপাতালে নেওয়ার পর সিজারের পরিবর্তে স্বাভাবিকভাবে বাচ্চা প্রসব হলো, সর্বসাকুল্যে পাঁচ হাজার টাকা খরচ হলো। আল্লাহ আপনাকে চল্লিশ হাজার টাকার খরচ কমিয়ে বরকত দান করলেন। এরকম হাজারও উদাহরণ আছে, আল্লাহ মানুষকে সম্পদ দিলে কোন কিছুই বাঁধা হতে পারে না এবং যাকাত প্রদান করলে এভাবেই সম্পদ বৃদ্ধি করেন।

 

দৈহিক ইবাদতের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নামাজ, ঠিক তেমনিভাবে আর্থিক ইবাদতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো যাকাত। সীমাহীন গুরুত্বের কারণে এই দুইটি ইবাদতের কথা আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে পাশাপাশি বর্ণনা করেছেন। ইসলামে যাকাতের গুরুত্ব অপরিসীম। আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে ৮২ স্থানে নামাজের সাথে সাথে যাকাতের কথা উল্লেখ করেছেন এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, দৈহিক ইবাদত হিসেবে নামাজ যেমন খুবই জরুরি, তেমনি আর্থিক ইবাদত হিসেবে যাকাতও খুবই জরুরি। এছাড়া নামাজ এবং যাকাত একটি অপরটির সাথে খুবই ঘনিষ্ঠ ও ওতপ্রোতভাবে জরিত। আমরা অনেকে হিসাব নিকাশ না করে কিছু অংশ যাকাত মনে করে দান করি, আসলে এধরনের দান যাকাত হিসাবে পরিগণিত হয় না, সাধারণ দান হতে পারে। যাকাত প্রদানের সময় যথাযথভাবে নিসাব পরিমাণ হিসাব করে দান করতে হয় এবং তখনই যাকাতের হক আদায় হয়।

 

যাকাত ফরয হওয়ার শর্তসমূহ-১. নেসাব পরিমাণ মালের মালিক হওয়া। অর্থাৎ সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ, বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা, কিংবা সমপরিমাণ মূল্যের নগদ টাকা বা ব্যবসার মালের মালিক হওয়া; ২. মুসলমান হওয়া। কাফেরের উপর যাকাত ফরয নয়; ৩. বালেগ হওয়া। নাবালেগের উপর যাকাত ফরয নয়; ৪. জ্ঞানী ও বিবেক সম্পন্ন হওয়া। সর্বদা যে পাগল থাকে তার নেসাব পরিমাণ মাল থাকলেও তার উপর যাকাত ফরয নয়; ৫. স্বাধীন বা মুক্ত হওয়া। দাস-দাসীর উপর যাকাত ফরয নয়; ৬. মালের উপর পূর্ণ মালিকানা থাকা। অসম্পূর্ণ মালিকানার উপর যাকাত ফরয হয় না; ৭. নেসাব পরিমাণ মাল নিত্য প্রয়োজনীয় সম্পদের অতিরিক্ত হওয়া; ৮. নেসাব পরিমাণ মালের উপর এক বছর অতিবাহিত হওয়া; ৯. মাল বর্ধনশীল হওয়া। যাকাতের ফজিলত, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তোমরা যা কিছু (আল্লাহর রাস্তায়) ব্যয় কর তিনি তার বিনিময় দান করবেন। আর তিনিই উত্তম রিজিকদাতা। (সুরা সাবা,আয়াত:৩৯)

 

যে যাকাত প্রদান করে না। কিয়ামতের দিন সে জাহান্নামে যাবে’। (তাবারানী)। অন্য এক হাদিসে আছে, আল্লাহ তাআলা যাকে ধন-সম্পদ দান করেছেন সে যদি ঐ সম্পদের যাকাত আদায় না করে, তাহলে তার সম্পদকে কিয়ামতের দিন টাকপড়া বিষধর সাপের রূপ দান করা হবে। যার চোখের উপর দুটি কালো দাগ থাকবে যা কিয়ামতের দিন তার গলায় বেড়ির মত পেঁচিয়ে দেয়া হবে। অতপর সে সাপটি তার চোয়ালে দংশন করে বলতে থাকবে আমিই তোমার সম্পদ,আমিই তোমার কুক্ষিগত মাল’। (বুখারী শরীফ,১/১৮৮)

 

সুরা তওবার ৬০ নং আয়াতে যাকাতের ৮ টি খাত উল্লেখ করা হয়েছে। যথা-১. ফকির। ঐ গরিব ব্যক্তি যার নিকট এক বেলা বা দুই বেলার বেশি খাবারের ব্যবস্থা নেই; ২. মিসকিন। যার আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। যেমন কোন ব্যক্তির আয় আছে ‘বিশ হাজার’ টাকা কিন্তু তার নিজের বা পরিবারের কারও অসুস্থার পেছনে ব্যয় আছে ‘চল্লিশ হাজার’ টাকা। তাকে দেয়া; ৩. যাকাত আদায় ও বিতরণের কর্মচারীদের; ৪. নওমুসলিম অর্থাৎ যারা অন্য ধর্ম ছাড়ার কারণে পারিবারিক, সামাজিক ও আর্থিকভাবে বঞ্চিত হয়েছে, তাদেরকে দেয়া; ৫. দাসমুক্তির জন্য। (বর্তমানে যদি কোন লোক এমন পাওয়া যায় যে, যে র্নিদোষভাবে জেলে আছে তাকে); ৬. ঋণ মুক্তির জন্য। জীবনের মৌলিক বা প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরনের জন্য সংগত কারণে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিদের ঋণ মুক্তির জন্য যাকাত প্রদান করা যাবে; ৭. ফী সাবিলিল্লাহ বা জিহাদ। অর্থাৎ ইসলামকে বোল-বালা বা বিজয়ী করার লক্ষে যারা কাফির বা বিধর্মীদের সাথে জিহাদে রত সে সকল মুজাহিদদের প্রয়োজনে যাকাত দেয়া যাবে; ৮. মুসাফির। মুসাফির অবস্থায় কোনো ব্যক্তি বিশেষ কারণে অভাব গ্রস্ত হলে ঐ ব্যক্তির বাড়িতে যতই ধন-সম্পদ থাকুক না কেন তাকে যাকাত প্রদান করা যাবে।

 

এ কারণেই অসহায় দরিদ্রের স্বাভাবিক জীবন ধারণের জন্য ধনীদের প্রতি তাদের অধিকারকে নির্দিষ্ট করেছে। ইসলামী অর্থনীতিতে যাকাত ফেতরা, সদকা ও দান খয়রাত কেবল গরিবদের বেলায় প্রাপ্য, আসলে এগুলো হলো দরিদ্রদের মৌলিক অধিকার। যাকাতের মাধ্যমে অভাবী, দুর্দশাগ্রস্ত, অসহায়, ক্ষুধার্ত, নিঃস্ব, দরিদ্র লোকজনের অভাব অনটন দূর করা এবং অর্থনৈতিকভাবে পুনর্বাসন করা সম্ভব। ইসলামে যাকাত ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্যই হলো মানবসেবা তথা হতদরিদ্র মুসলমানদের আর্থসামাজিক জীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা বিধান করা।

 

যাকাতের মাধ্যমে সমাজে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা হয়। ধনীরা তাদের উদ্বৃত্ত সম্পদের সাধারণত ৪০ ভাগের এক ভাগ বছর শেষে যাকাত প্রদান করে মানবসেবায় উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। ইসলামী বণ্টন ব্যবস্থায় ধনীরা তাদের ধন-সম্পদের কিছু অংশ দরিদ্রদের যাকাত দিলে গরিবদের সম্পদ কিছুটা বেড়ে যায় এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীভূত হয়। এভাবে ধনীর আয়-রোজগার থেকে নির্ধারিত কিছু অংশ কমিয়ে এবং সেই কমানো অংশ হতদরিদ্রদের আয়ের সঙ্গে যোগ করে ইসলামের বিধান অনুযায়ী যাকাত বণ্টনের ফলে সমাজের অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা পায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বাণী প্রদান করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা তাদের (সম্পদশালীদের) ওপর সদকা (যাকাত) অপরিহার্য করেছেন, যা তাদের ধনীদের কাছ থেকে আদায় করে দরিদ্রদের মধ্যে বণ্টন করা হবে।’ (বোখারি ও মুসলিম)। 

 

পবিত্র কোরআনে অসংখ্য আয়াতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যাকাত, সদকা, ফেতরা আর ধন সম্পদ এবং তা ব্যয়ের বিষয়ে আলোচনা এসেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক হকদারকে তার ন্যায্য অধিকার দিয়ে দাও।’ (বোখারি)। সমাজে দরিদ্রদের মৌলিক অধিকার যেমন ইসলাম স্বীকার করেছে, পাশাপাশি অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে তাদের সম্মানজনক মর্যাদাও দিয়েছে। নবী করিম (সা.) ফরমান, ‘আমির ও ধনী লোকের ৪০ বছর আগে দরিদ্র বা গরিব লোকেরা জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ কেয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালা ফেরেশতাদের জিজ্ঞাসা করবেন, ‘তোমরা দেখ তো, আমার প্রিয় বান্দাকুল কোথায়?’ ফেরেশতারা নিবেদন করবেন, ‘হে রাব্বুল আলামিন! কারা আপনার প্রিয় বান্দা?’ আল্লাহর পক্ষ থেকে উত্তর আসবে, ‘তারা হবে মুসলমান গরিব-দরিদ্র লোক, আমার দানে ও নেয়ামতে তারা পরিতৃপ্ত এবং সন্তুষ্ট ছিল তাদের জান্নাতে নিয়ে যাও।’ 

 

হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত এবং ব্যবসায়ের পথ ধরে উপার্জিত বিপুল সম্পদ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কল্যাণে, ইসলামের প্রয়োজনে উজাড় করে দিয়েছিলেন। নিজের আগামী দিনের প্রয়োজন আর পরিবার ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ চিন্তা কখনো তাঁর দানের হাতকে সংকুচিত করতে পারেনি। তাবুক অভিযানের সময় আল্লাহর রাসুলের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সাহাবায়ে কেরাম (রা.) যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে প্রতিযোগিতামূলক দান করতে লাগলেন। সবার আগে তিনি তাঁর সমুদয় সম্পদ আল্লাহর রাসুলের সামনে পেশ করলেন। হজরত উসমান (রা.) দিলেন ৯০০ উট, ১০০ ঘোড়া এবং বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ও সোনা। হজরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) দিলেন সাড়ে ২৯ কিলো রৌপ্য মুদ্রা। হজরত আস ইবনে আদি (রা.) দিলেন সোয়া ১৩ টন খেজুর। হজরত ওমর, তালহা, সাদ ইবনে উবাদা, মোহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা.) গোটা সম্পদের অর্ধেক দান করলেন। সবশেষে রাসুলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, হে আবু বকর! ঘরে কী রেখে এসেছেন? উত্তরে তিনি বললেন, ‘আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলকে রেখে এসেছি।’ তাঁদের প্রত্যেকের দান ইসলামের ইতিহাসে সমুজ্জ্বল ও এক একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। 

 

এবছর করোনা ভাইরাসের কারণে বহু অসহায় মানুষ বিশেষকরে গরীব ও দুস্থ লোকজন খাদ্যের অভাবে না খেয়ে আছে। বহু কষ্টে দিনাতিপাত করছে। অনেকে স্বচ্ছল কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারণে আয় রোজগার বন্ধ এবং এ কারণে লোকলজ্জার ভয়ে কারও কাছে সাহায্য চাইতে পারছে না। বাসা ভাড়া পরিশোধ করতে পারছে না। অনেকে খাবারের অভাবে ঠিকঠাকভাবে রোজা পালন করতে পারছে না। যাকাত বছরের যে কোন সময় প্রদান করা যায় কিন্তু বেশি সওয়াব ও ফজিলাতের আশায় আমরা রমযান মাসকেই উত্তম সময হিসেবে বেছে নেই। যারা যাকাত প্রদান করে, তারা অবশ্যই স্বচ্চল ও স্বামর্থবান। তারা ইচ্ছে করলে যাকাতের অতিরিক্তও দান করতে পারি। দরকার শুধু সদিচ্ছা। ইসলামে দানের কোন সীমা নেই। যেকোন দানে সম্পদ কমে না, বরং বাড়ে ও বরকতময় হয়। যদি এবছর যাকাত প্রদানের পর একটু বেশি দান করে গরীব ও দুস্থদের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেই, তবে ভুক্তভোগীরা যেভাবে উপকৃত হবে, ঠিক তেমনিভাবে দানকারীও রমযান মাস উপলক্ষ্যে অনেক সাওয়াবের মালিক হবে। তাই আসুন! আল্লাহ ও তাঁর রসুল (সা.) কে খুশি করি। আমরা অসহায় মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াই, আমার আপনার যাকাত-ফেতরার পয়সায় যেন হাসি ফুটে ভাগ্যাহত মানুষের মুখে। আমিন।

 

লেখক: ব্যাংকার ও মুক্তমনা কলাম লেখক, সতিশ সরকার রোড, গেন্ডারিয়া, ঢাকা।

এই বিভাগের আরো খবর