Berger Paint

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১১ আগস্ট ২০২০,   শ্রাবণ ২৭ ১৪২৭

ব্রেকিং:
‘এসপির ত্রিমুখী নিশ্ছিদ্র ছকেই মেজর সিনহার নৃশংস হত্যাকাণ্ড’ ৯৪ বছরের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনায় ভারতে করোনা শনাক্ত ২২ লাখ ছাড়াল, ৪৪ হাজারের বেশি মানুষ করোনা রোগী শনাক্তের সংখ্যা ২ কোটি ছাড়াল, মৃত ৭ লাখ ৩৪ হাজার
সর্বশেষ:
কসবায় ব্যবসায়ী জনি ও অন্ধ ভিক্ষুক হত্যার প্রধান আসামীসহ আট খুনি রামগড়ে ইউএনডিপি`র অসহায়দের মাঝে ত্রাণ বিতরণ অনিরাপদ মাস্ক কেনার দায়ে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে মামলা ৩০ কোটি ডলারের ক্ষতিতে চামড়া শিল্প ভারতে ৪ মাস জেল খেটে দেশে ফিরলো তাবলিগ জামাতের ১৭ সদস্য

করোনা এবং ঈদ ভাবনা

-আ. রহমান দেওয়ান

প্রকাশিত: ২৭ জুলাই ২০২০  

পঠিত: ১২৪
-আ. রহমান দেওয়ান। ছবি- প্রতিদিনের চিত্র

-আ. রহমান দেওয়ান। ছবি- প্রতিদিনের চিত্র


দেশে করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে নেই। সংক্রমণ ঠেকাতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ এখনো চোখে পড়ার মতো নয়। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে হু হু করে বাড়ছে করোনার বিস্তার। চলতি বছরের মার্চ মাসে দেশে প্রথম করোনা রুগী শনাক্ত হয়। তারপর থেকে লাগামহীন ভাবে ছুটতে ছুটতে আক্রান্তের সংখ্যাটি এসে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২লাখে । মৃত্যু হয়েছে প্রায় ২৫শত জনের।বিশ্ব জুড়ে করোনা তান্ডব শুরু হয়েছিলো মার্চের ও মাস কয়েক আগে। পর্যাপ্ত  সময় হাতে পেয়েও বাংলাদেশের করোনা প্রস্তুতিপর্ব ছিলো শূন্যের কোটায়। যা থেকে আমরা দেউলিয়া স্বাস্থ্যখাতের দৈন্যদশা লক্ষ্য করি। সরকারি হিসেবমতে,দৈনিক গড়ে তিনহাজার করে বাড়ছে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। অদূর ভবিষ্যতে এই সংখ্যাটি যে ভয়ানক আকার ধারণ করবে, তা নিঃসন্দেহে অনুমেয়। জনসাধারণের অসচেতনতা ও নিয়ন্ত্রণ স্থানীয় ব্যক্তিদের অদূরদর্শীতাকে করোনা বিস্ফোরণের প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী করা হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে অবস্থা উত্তোরণের বিশেষ কোনো পন্থা আদৌ গ্রহণ করা হবে কিনা সে ব্যাপারে আমরা এখনো সন্দিহান!

কয়েকসপ্তাহ ব্যবধানে পালিত হচ্ছে যাচ্ছে মুসলমানদের দ্বিতীয় প্রধান ধর্মোৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা।বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন,সময়োপযোগী ব্যবস্থা না নিলে করোনার ভয়াবহ বিস্ফোরণটি ঈদকেন্দ্রীক অর্থব্যবস্থায় ঘটতে যাচ্ছে! একদিকে মানুষ জনের বাড়ি যাওয়া, অন্যদিকে কোরবানির পশু কেনা থেকে শুরু করে সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার কারণে সংক্রমণ তুমুল আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। একটু অসাবধান হলেই আশঙ্কা যে বাস্তব রূপ নিবে এ ব্যাপারে আমরা পুরোপুরি নিশ্চিত।

ঈদুল আজহার সময় সরকার, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সাধারণ মানুষের করণীয় বিষয়ে গত পয়লা জুলাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাবলিক হেলথ এডভাইজ্যার কমিটির সদস্যদের নিয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। সভায় বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোর ঈদভাবনা পর্যালোচনা করে সরকারের জন্য একটি পরামর্শমূলক সিদ্ধান্ত প্রস্তুত করা হয়। দেশের অভ্যন্তরীণ যেকোনো সমস্যার সমাধান বাহির থেকে আমদানি করার অভ্যাস আমাদের জন্য নতুন কিছু নয়। উপযুক্ত সময়ে দেশের বড় বড় বুদ্ধিজীবীদের মাথা গুটিয়ে রাখা দেশের জন্য  চরম হতাশার ও লজ্জার!যাইহোক,আমরা গত ঈদেও এই কমিটির পক্ষ থেকে বেশকিছু পরামর্শমূলক বিবৃতি দেখেছিলাম।কিন্তু ফলপ্রসূ কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ার মতো ছিলো না। এই ঈদে পরামর্শ সমূহ কতটুকু কার্যকর দেখবো আমরা, তা জানা কেবলই সময়সাপেক্ষ ব্যাপার ; অপেক্ষা করতে হবে ঈদ পরবর্তী সময় পর্যন্ত।

দেশের করোনা সংক্রমণের হার বা ইফেক্টিভ রিপ্রোডাক্টিভ রো এখন ১ দশমিক শূন্য ১!বিশ্লেষকদের তথ্যানুযায়ী সংক্রমণ হার একের বেশী হওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক।ধারণা করা হচ্ছে,বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা ৩ লাখ ৮০ হাজার ছাড়াবে।আর ঈদের সময় পারতপক্ষে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ৫ লাখ ছাড়াবে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা!আর এই পরিসংখ্যানটি বাস্তবে রূপ নিলে দেশীয় অর্থনীতি, রাষ্ট্রব্যবস্থাকে চরম ঝুঁকির সম্মুখীন হতে হবে। উক্ত ক্ষতি পুষিয়ে পুনরায় মাথা তুলে দাঁড়ানো বাংলাদেশের জন্য একপ্রকার অসম্ভবই।

অবস্থা ভয়াবহতার দিকে টার্ণ নেওয়ার আগেই ফলপ্রসূ ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবী।আমরা অতীতেও দেখেছি পর্যাপ্ত স্টার্কচার থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কারণে অনেক বড়-বড় উদ্যোগ সফল করা সম্ভব হয়নি।দায়িত্ব স্থানীয়দের কাছে যথেষ্ট সুযোগ এখনো হাতে আছে। সময় ও সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।সিরিয়াসনেস বলে যে শব্দটি আমাদের মাঝে এখন প্রচলিত তা রাষ্ট্রযন্ত্রে বসে থাকা লোকদের ভেতরে একেবারেই দেখা যাচ্ছে না।দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থকে সামনে রেখে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার এর চেয়ে ভালো সুযোগ আর নেই।

পরিস্থিতি বিবেচনায় কোরবানির হাট,পশু ব্যবস্থাপনা ও মানুষের যাতায়াতের বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে পর্য়ালোচনা করা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নৈতিক দায়িত্ব। মানুষকে সচেতন করা,সচেতনতার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি  করা ঈদকেন্দ্রীক ব্যবস্থাপনার প্রাথমিক কাজ।কোরবানির হাটগুলোয় যারা পশু কিনতে যাবেন কিংবা যারা পশু বিক্রি করবেন তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।এক্ষেত্রে হাটগুলোতে স্প্রে,সাবান,হ্যান্ড স্যানিটাইজার সহ যাবতীয় সুরক্ষামূলক দ্রব্যাদি সরবরাহ করতে হবে।স্থানীয় সরকার সংশ্লিষ্টদের সক্রিয় থেকে বিষয়টি তদারকি করতে হবে। বিশেষত হাটগুলো যেন সীমিত পরিসরে চলমান থাকে সে বিষয়টি আমলে নিতে হবে।সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হবে অনলাইন মাধ্যমে কেনাকাটা। প্রশাসনের সহায়তায় এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা যেতে পারে।কোরবানির পশুর প্রোপাইলে সঠিক তথ্যাদি নিশ্চিত করার জন্য ও প্রশাসনের সহায়তা প্রয়োজন। পশু কিনে আনা থেকে শুরু করে কোরবানি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সময়কাল পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সবার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।জনসমাগম সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ঘোষনা করতে হবে।

আগের ঈদের ন্যায় এবারও পরিবারের সাথে ঈদ পালন করতে অনেকেই গ্রামমুখী হবেন।আগের ঈদে যানবাহনে জনসাধারণের উপচে পড়া ভীড় আমরা লক্ষ্য করেছিলাম। করোনা বিস্ফোরণে এটিও ছিলো অন্যতম প্রধান একটি কারণ।তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা না নিলে সামনের ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবেলা করার কোনো সুযোগ নেই।গণযোগাযোগ ও যানবাহন চলাচলে সর্বোচ্চ কঠিন অবস্থানে থাকতে হবে।ঘরমুখো লোকজন সুরক্ষা মানছে কিনা;বিধি নিষেধ পালন করছে কিনা তা দেখার দায়িত্ব প্রশাসনের।প্রয়োজনে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করতে হবে।ভুল রিপোর্ট ও ভুয়া সনদের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোরতা অবলম্বন করতে হবে।করোনাভাইরাস কে কেন্দ্র করে যারা দূর্নীতি, অনিয়মের মাধ্যনে অর্থ উপার্জন করছে তাদের বিরুদ্ধে সবাইকেই সোচ্চার হতে হবে।

লকডাউনের শুরু থেকেই আমরা দেখেছি প্রতিরক্ষার পেছনে অঢেল টাকা খরচ করা হচ্ছে।পিটিয়ে-ধমকিয়ে লকডাউন মানতে বাধ্য করার ব্যর্থ একটি প্রচেষ্টা ও আমাদের চোখে পড়েছে।এটিও প্রমাণ হয়ে গেছে যে,অপরিকল্পিত লকডাউন কোনো সমাধান নয়।ক্ষুধায় যারা মরতে চায় না,সেই সব হতদরিদ্রের কাছে করোনা কোনো ফ্যাক্টই নয়।তারা লকডাউন যেভাবেই হোক অমান্য করে রাস্তায় নামবে।এটা তাদের জীবিকার দাবি,পরিবারের আহারের দাবী।তাই এবার আর অপরিকল্পিত কিছু চাই না আমরা।হতদরিদ্রদের জীবিকা নিশ্চিত করে সময়োচিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক। সরকারকে বলবো প্রতিরক্ষার পেছনে যে পরিমাণ অর্থ ঢেলেছেন তার সমপরিমাণ অর্থ স্বাস্থ্যখাতে ঢালুন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে রদবদল করুন, যোগ্য লোক আনুন। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি ঔষধ কোম্পানির সফলতা বিশ্বজুড়ে আলোচিত। সরকারের নিজস্ব উদ্যোগে তাদের সহায়তার আওতায় আনতে হবে।বিশেষ করে যে বা যারা ভ্যাক্সিন তৈরীতে প্রাণপণ লড়াই করে যাচ্ছেন তাদের সর্বোচ্চ সমর্থন ও সহায়তা করতে হবে।ঈদপ্রকিয়া সমাপ্ত হওয়ার আগেই স্বাস্থ্যখাত ও চিকিৎসা বিভাগকে শক্তিশালী করে তুলতে হবে।বাংলায় একটা প্রবাদ আছে 'সাবধানের মার নেই'।এই প্রবাদকে অনুসরণ করে চতুর্মুখী ব্যবস্থাগ্রহণ করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

মানুষের ধর্মবিশ্বাসের সাথে উৎসবের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে।ঈদুল আজহা মুসলমানদের প্রাণের ও অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব।এই উৎসবটি যথোচিত সময়োপযোগী   নিয়মে পালন করতে হবে।আপাত পরিস্থিতি অনুযায়ী সীমিত পরিসরে ঈদুল আজহা পালন করা দেশ ও জাতির জন্য মঙ্গলজনক। বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণগুলো মাথায় রেখে পরামর্শগুলো প্র্যাকটিক্যালি প্রয়োগ করতে হবে।প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগ্রহণে ন্যূনতম বিচ্যুতি হতে পারে বিরাট ক্ষতির কারণ।সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান সমূহ সরকার কীভাবে দেখছে,কী পরিকল্পনা গ্রহণ করছে,কী ধরণের ব্যবস্থা নিচ্ছে এখন শুধু সেটাই দেখার বিষয়।করোনাভান্ডব যে কতোটা ভয়াবহ হতে পারে তা উন্নত দেশগুলোর শোচনীয় অবস্থা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেছে।বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অবস্থা কি হতে পারে তা আর বলার বলার অপেক্ষা রাখে না। এমতাবস্থায়, রাষ্ট্র ও জনগণ উভয়ের সমন্বিত সচেতনতা প্রয়োজন ;অন্যথায় ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের জন্য অপেক্ষা করছে ভয়াবহ দুর্ভোগ!


লেখক : কবি ও সাংবাদিক।

এই বিভাগের আরো খবর