Berger Paint

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০,   আশ্বিন ১৩ ১৪২৭

ব্রেকিং:
১৫ বছরের মধ্যে ১০ বছরই আয়কর দেননি ট্রাম্প! চির নিদ্রায় শায়িত অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম অস্ত্র মামলায় সাহেদ করিমের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ২৪ বলে ৮২, ৯ বলে ৭ ছক্কা, নতুন রেকর্ড আইপিএলে এমসি কলেজে স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে গণধর্ষণ: ছাত্রলীগ নেতা রাজনও গ্রেফতার এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গণধর্ষণ : রনি ও রবিউল গ্রেফতার ৭৪-এ পা রাখলেন শেখ হাসিনা
সর্বশেষ:
সৌদিতে শিডিউল ফ্লাইটের অনুমতি পেয়েছে বিমান ড. কামাল ও আসিফ নজরুল ঢাবি এলাকায় অবা‌ঞ্ছিত : সন‌জিত সাহেদের বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলার রায় আজ কাশ্মীর সীমান্তে পাক-ভারত উত্তেজনা, এক সেনা নিহত

কিশোর গ্যাং নির্মূলে পরিবার ও প্রশাসনের দ্বৈত ভূমিকা আবশ্যক

মাজহারুল ইসলাম লালন

প্রকাশিত: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০  

পঠিত: ২৩৯
মাজহারুল ইসলাম লালন। ছবি- প্রতিদিনের চিত্র

মাজহারুল ইসলাম লালন। ছবি- প্রতিদিনের চিত্র

 

২০১৭ সালে উত্তরায় আদনান হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে দেশে গ্যাং কালচারের পরিচিতি ঘটে। এরপর যদিও আশাবাদ ব্যক্ত করা হয় কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণের,তথাপি আজ অব্দি সম্ভবপর হয়ে উঠেনি কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ কিংবা নির্মূল করা।বরং প্রযুক্তির নানা দিকগুলো ব্যবহার করে আরো বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে এসব উঠতি তরুনদের গ্যাং কালচার।

কিশোরদের যে সময় নিজের জীবন গড়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত করার কথা, সেই বয়সে তারা জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধের সঙ্গে। এ অপরাধের মাত্রাও আবার ক্ষুদ্র নয়, বরং খুনের মতো অপরাধের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ছে তারা। এমন অপরাধীর সংখ্যাও ভেবে দেখার মতো।

গত তিন বছরে কিশোর গ্যাংয়ের প্রায় ৪শ’ সদস্যকে আটক করেছে র‌্যাব। এর মধ্যে চলতি বছর ১৭৪ জন এবং গত দুই বছরে ১৯০ জন কিশোর গ্যাং সদস্যকে আটক করে তারা।

গত কয়েক বছরে কিশোর গ্যাং কালচারের অপরাধগুলো কয়েকটি উপস্থাপন করছি যা পুরো দেশকে আতঙ্কিত করেছিলো:

১. কিশোর গ্যাংয়ের দুই গ্রুপের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মোহাম্মদপুর চান মিয়া হাউজিং সোসাইটিতে খুন হয় স্কুলছাত্র মহসিন।

২. গাজীপুরে কিশোর গ্যাং চক্রের হাতে নূরুল ইসলাম (১৫) নামে এক কিশোর খুন হয়। সিনিয়র এক কিশোর গ্যাং সদস্যকে ‘তুই’ বলে সম্বোধন করার জেরে নূরুল ইসলামকে কুপিয়ে ওই চক্রের সদস্যরা হত্যা করে বলে অভিযোগ।

৩. বান্ধবীর সঙ্গে ছবি তোলার জেরে দুই গ্যাং গ্রুপের দ্বন্দ্বে শুভ আহমেদ(১৬) নামের নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়।

এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, কেন ক্রমেই ভ্রাতৃঘাতী হয়ে উঠছে কিশোর প্রজন্ম?
এ বিষয়ে র‌্যাবের এক কর্মকর্তার বিবৃতি: মূলত কিশোর বয়সে একটা হিরোইজম চিন্তাভাবনা থেকেই গ্যাং কালচারটা গড়ে ওঠে। এরপর তারা কার বা বাইক রেস করে, মাদকে ঝুঁকে পড়ে, ছিনতাই, ইভটিজিং, বিভিন্ন সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ, দেয়াল লিখনে নিজেদের জানান দেয়।

কিশোর গ্যাং পর্যালোচনা করলে স্বাভাবিক যা ওঠে আসে:

১. শুরুতে মূলতঃ অন্যদের হামলা থেকে নিজেদের প্রটেক্ট করার জন্য সমমনা বন্ধুরা একত্রিত হয়,পরে বেশ বড় একটা গ্যাং তৈরি হয় এদের।
২. এদের চলাফেরায় একটা সময় ফিল্মি স্টাইল চলে আসে।নিজেদের ব্যক্তিত্বে হিরোইজম ভাব তাদের এধরনের অপকর্মে মানসিকভাবে উৎসাহিত করে।
৩. গুন্ডামি করা, দেয়ালে দেয়ালে স্প্রে দিয়ে গ্যাংয়ের নাম লিখা, ৫/৬ টা গাড়ি নিয়ে একসঙ্গে মুভ করা এভাবে একসময় বেশ বড় একটা গ্যাং তৈরি হয় তাদের।
৪. অনেক সময় তুচ্ছ কারণে মারামারির ঘটনা,এক এলাকার ছেলে অন্য এলাকায় গেলে মারধরের ঘটনা ঘটে।
৫. কাউকে গালি দিলে, 'যথাযথ সম্মান' না দেখালে, এমনকি বাঁকা চোখে তাকানোর কারণেও মারামারির ঘটনা ঘটে।
৬. মেয়েলি বিষয় এবং সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব থেকেও অসংখ্য মারামারি হয়ে থাকে।

গ্যাংয়ের সদস্যরা একসময় অস্ত্র বহণ করা শুরু করে। অস্ত্র আসার কিছুদিনের মধ্যেই গ্রুপে মাদকও ঢুকে পড়ে। এরপর গ্রুপটাকে কাজে লাগিয়ে টাকা আদায়ের ধান্দা শুরু করে কেউ কেউ।ছিনতাই শুরু হয়। আর মাদক নেয়া তো ভয়াবহ পর্যায়ে চলে যায়"।

মূলতঃ দেখা যাচ্ছে স্কুলে পড়তে গিয়ে কিংবা এলাকায় আড্ডা দিতে গিয়ে শুরুতে মজার ছলে এসব গ্রুপ তৈরি হলেও পরে একসময় মাদক, অস্ত্র এমনকি খুনোখুনিতেও জড়িয়ে পড়ে।

কিশোর গ্যাং কেন তৈরি হচ্ছে?

বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন মূলতঃ দুটি কারণে কিশোররা এসব গ্যাং সংস্কৃতিতে ঢুকে পড়ছে।

১. মাদক, অস্ত্রের দাপটসহ বিভিন্ন অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে।
২. এখনকার শিশু-কিশোররা পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যথেষ্ট মনোযোগ পাচ্ছে না।

ফলে কিশোরদের কেউ যখন বন্ধুদের মাধ্যমে কিশোর গ্যাংগুলোতে ঢুকছে এবং মাদক ও অস্ত্রের যোগান সহজেই পেয়ে যাচ্ছে তখন তার প্রলুব্ধ হওয়া এবং অপরাধপ্রবণ হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। আরেকটা বিষয়কে চিহ্নিত না করলেই নয় সেটা হচ্ছে রাজনীতির বড় ভাইদের প্রভাব।

মূলত বর্তমান কলুষিত রাজনীতির অনৈতিক স্বার্থ সিদ্ধির জন্যে একশ্রেণীর কথিত রাজনীতিবিদরা এসব শিশু কিশোরদের অপরাধমূলক কর্মকান্ডে মদদ দিয়ে থাকেন।

অস্ত্র মদ সহ নানা ধ্বংসাত্মক উপকরণ তুলে দেয়,শেলটার দিয়ে এসব কিশোরদের উগ্রতা আরোও বাড়িয়ে দেয়। ফলে গ্যাং কালচারের’ নামে সারা দেশে কিশোরদের এই অংশটি ভয়ঙ্কর থেকে আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। তারা পাড়া মহল্লার প্রভাবশালী, মাস্তান বা বড় ভাইদের হয়ে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড করে থাকে। দলবেঁধে মাদক সেবন করার পাশাপাশি পাড়া-মহল্লায় নারীদের উত্ত্যক্ত করে। ঝুঁকিপূর্ণ বাইক ও কার রেসিং তাদের ‘ফ্যাশন’।

এদের উপর মহলের আশকারায় তুচ্ছ ঘটনায় মারামারি ও ঝগড়া ফ্যাসাদে জড়িয়ে পড়ছে এসব কিশোর। এতে করে খুনোখুনির ঘটনা ঘটাতেো পিছপা হচ্ছে না এসব কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা।
ভার্চুয়াল জগতে ‘সিক্রেট গ্রুপ’ তৈরি করে এরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করছে।

শিশু কিশোরদের এইসব গ্যাং কালচার এখনই নির্মূল করতে না পারলে জাতিগতভাবে মেধাহীন হতে বসবে বাংলাদেশ।

কিশোর গ্যাং নির্মূলে প্রশাসন ও অভিভাবক উভয়ের সমান ভূমিকা রাখতে হবে।
আর প্রশাসনকে দায়িত্ব পালনের পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে সরকারকে।কারন কিছু পর্যালোচনায় দেখা যায় ক্ষমতাসীন সরকারের বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ কিংবা তাদের নিকটতম লোকজন কর্তৃক এসব কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করা হয়।ফলে প্রশাসনও অনেক সময় ব্যর্থ হয়ে পড়েন দায়িত্ব পালনে।

সরকারকে এ বিষয়ে জিরো টলারেন্সে যেতে হবে।চিহ্নত করতে হবে সেইসব রাজনীতিবিদদের যাদের মদদে বেড়ে উঠছে অপরাধমূলক কর্মকান্ড।প্রয়োজনে দল থেকে বহিষ্কার করে কলঙ্কমুক্ত করতে হবে রাজনৈতিক অঙ্গন।

আর প্রশাসনকে এসব কিশোর গ্যাং রোধে অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে।সমূলে উচ্ছেদ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিটা গ্যাং কে শক্তহাতে দমনের নিমিত্তে কাজ করে যেতে হবে।

গত কিছুদিন আগে কিশোর গ্যাং-কেন্দ্রীক বেশ কয়েকটি অপরাধ এবং খুনের ঘটনার পর থেকেই আইন-শৃংখলা বাহিনীর বাড়তি পদক্ষেপ দেখা গেছে।
শুরু হয়েছিলো কিশোর গ্যাং-বিরোধী অভিযান।যদিও পরে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে থমকে যায় কিশোর গ্যাং নির্মূল অভিযান।

সেসময় একদিনে অভিযান চালিয়েই আটক করা হয় শতাধিক কিশোরকে।
এর মধ্যে শুধু হাতিরঝিল থানাতেই আটক করা হয় ৮৮ জনকে।
যদিও পরে  ৮০ জনকেই ছেড়ে দেয়া হয় অপরাধ প্রমাণ করতে না পারায়।

তাহলে পুলিশের এটি একটি ব্যর্থ অভিযান বলে ধরে নিবো।
কিশোর গ্যাং-বিরোধী এ ধরণের অভিযানে ঢালাওভাবে কিশোরদের আটকের ঘটনার সমালোচনা করতেই হয়।
যে কোন কিশোরকে আটক করে থানা হাজতে আনার আগে সে অপরাধী কিনা, সে বিষয়ে যথেষ্ট তথ্য সংগ্রহ করা উচিত পুলিশের।

কোন নিরপরাধ কিশোর কিংবা তার পরিবার যেন ভোগান্তির মধ্যে না পড়ে, হয়রানির শিকার না হয়। নিরপরাধ একজন কিশোরকে হুট করে সন্দেহের ভিত্তিতে আটক করা হলে তা ঐ কিশোরকে ট্রমার মধ্যে ফেলে দিতে পারে।

সে যদি তাৎক্ষণিক ছাড়াও পায়, এরপরও এর একটা প্রভাব থাকতেই পারে। একইসঙ্গে ঐ পরিবারটিও সামাজিকভাবে হেয় হতে পারে।
যেহেতু বিষয়টি স্পর্শকাতর,সুতরাং প্রশাসনকে সুনিশ্চিত হয়েই গ্যাং নির্মূল অভিযান পরিচালনা করতে হবে।

গ্যাং নির্মূলে সবচে বেশি ভূমিকা রাখতে হবে অভিভাবকদের।বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেখা যায় মা-বাবা দুজনেই কর্মজীবি হওয়ায় সন্তান নিঃসঙ্গতা ঘুচাতে বেপরোয়া সঙ্গ খোঁজে নিচ্ছে এবং এক পর্যায়ে সঙ্গদোষেই পতিত হচ্ছে এধরনের মৃত্যু ফাঁদে।
কিংবা বিত্তশালী মা বাবার প্রভাব প্রতিপত্তির দাপটে কেউ কেউ জড়িয়ে পড়ে গ্যাং কালচারে,আবার কেউ কেউ দাপটে বন্ধুত্বের আনুগত্য চলে আসে এই পথে।

এক্ষেত্রে পিতামাতাকে একসাথে দুটি ভূমিকা রাখতে হবে-একদিকে সমাজে অপরাধী হওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে হবে। অন্যদিকে পরিবারে কিশোরদের একাকী বা বিচ্ছিন্ন না রেখে যথেষ্ট সময় দিতে হবে।

এছাড়াও সন্তানের চলাফেরা, বন্ধু বান্ধব নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখা আবশ্যক পিতামাকে।
বর্তমান প্রযুক্তি সহজলভ্য হওয়ার অনেক পিতামাতা সন্তানের হাতে তুলে দিচ্ছেন অত্যাধুনিক প্রযুক্তি।আর এগুলোর অপব্যবহারেও সন্তান হয়ে উঠছে বেপরোয়া স্বভাবের।
এক্ষেত্রে পিতামাতাকে সন্তানের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে হবে।পারিবারিকভাবে নৈতিক শিক্ষাকে প্রাধান্য দিতে হবে।

সন্তানের চলাফেরা,পছন্দ অপছন্দের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে ভালো ও মন্দ দিক গুলো চিহ্নিত করে দেখাতে হবে।
কিছু বিষয়ে  বাবা-মাকে যথেষ্ট রক্ষণশীল হতে হবে।তা না হলে সন্তানের অন্ধকার পথের রচয়িতা বলে নিজেরাই আখ্যায়িত হবেন।

লেখক: কবি ও কলামিষ্ট

এই বিভাগের আরো খবর