Berger Paint

ঢাকা, রোববার   ০৭ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ২৪ ১৪২৭

ব্রেকিং:
দেশের ৫০ জেলা পুরোপুরি লকডাউন, ১৩ জেলা আংশিক
সর্বশেষ:
করোনায় বিপর্যস্ত স্পেনকে ছাড়িয়ে পঞ্চমে ভারত চট্টগ্রামে আরও ১৫৬ জনের করোনা শনাক্ত বাজেট অধিবেশনের আগেই সব এমপির করোনা টেস্ট রুবানা হক শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দেননি: বিজিএমইএ বান্দরবানে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিংসহ নয়জনের কোভিড-১৯ রোগ শনাক্ত হয়েছে।

`কুন্তলীন পুরস্কার` প্রাপ্ত লেখিকা মানকুমারী বসু

রহিমা আক্তার মৌ

প্রকাশিত: ২৬ ডিসেম্বর ২০১৯  

পঠিত: ৫৭২
`কুন্তলীন পুরস্কার` প্রাপ্ত লেখিকা মানকুমারী বসু

`কুন্তলীন পুরস্কার` প্রাপ্ত লেখিকা মানকুমারী বসু

প্রকৃতি, সমাজ, ইতিহাস ও জাতীয়তা ছিল যাঁর লেখার মুল উপজীব্য। কবিতা গল্প, প্রবন্ধ উপন্যাস লিখি যিনি সবার কাছে পরিচিত ছিলেন তিনি 'কুন্তলীন পুরস্কার' প্রাপ্ত লেখিকা মানকুমারী বসু। পড়তে বসেছি মৈত্রেয়ী দেবীর 'ন হন্যতে' বইটি। সেখানেই আবিস্কার করি বাংলা সাহিত্যের আরেক লেখিকা মানকুমারী বসুকে। ১৮৬৩ সালের ২৩ জানুয়ারী যশোর  জেলার কেশবপুর থানার শ্রীধরপুর গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন উনবিংশ শতাব্দীর প্রখ্যাত এই লেখিকা। তাঁর পৈত্রিক নিবাস কেশবপুর থানার সাগরদাঁড়ী গ্রামে। তিনি মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের পিতৃব্য রাধামোহন দত্তের পুত্র আনন্দ মোহন দত্তের কনিষ্ঠ কন্যা।

শিশুকালে মানকুমারীর বিদ্যাশিক্ষার সূচনা হয় পারিবারিক পরিবেশে পিতার নিকটে। পারিবারিক ঐতিহ্যসূত্রেই সাহিত্যসাধনায় প্রয়াসী হন তিনি। শৈশবকাল থেকেই লেখা-লেখির ব্যাপারে ছিল তাঁর প্রবল আগ্রহ ও আকর্ষণ। এই অল্প বয়সেই তিনি গদ্য ও পদ্য রচনায় হাত দেন। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে তিনি মহাভারত, রামায়ণ প্রভৃতি ধর্মীয় গ্রন্থগুলি আয়ত্ত করে ফেলেন। মাত্র দশ বছর বয়সে ১৮৭৩ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজের ছাত্র বিবূধশঙ্কর বসুর সাথে তাঁর বিবাহ হয়। মানকুমারী বসুর শশুরবাড়ী ছিল কেশবপুর থানার বিদ্যানন্দকাটি গ্রামে। শ্বশুর রাসবিহারী বসু তৎকালীন বৃটিশ সরকারের একজন নামজাদা ডেপুটি ম্যজিষ্ট্রেট ছিলেন। তাঁর স্মৃতি স্মরণ করে রাখার জন্য তাঁর জন্মভূমি বিদ্যানন্দকাটিতে ‘রাসবিহারী ইনস্টিটিউট’ নামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।

বিবাহের পর স্বামী বিবূধশঙ্কর বসুর উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় কবি মানকুমারী বসুর কবিতা লেখার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। ১৮৭৭ সালে বিবূধশঙ্কর বসু কলকাতায় অবস্থানকালে মানকুমারী বসু ‘পুরন্দরের প্রতি ইন্দুবালা’ নামক অমিত্রাক্ষর ছন্দে একটি কবিতা লিখে পাঠিয়ে দেন স্বামীকে। কবিতাটির অংশ বিশেষ----

“দুরন্ত যবন সবে ভারত ভিতরে
পসিল আসিয়া, পুরন্দন মহাবলি
কেমনে সাজিল বনে, প্রিয়তমা তার
ইন্দুবালা কেমনে বা করিলা বিদায় ?
কৃপা করি কহ মোরে হে কল্পনা দেবী।
কেমনে বিদায় বীর হল প্রিয় কাছে। ”

পরবর্তীতে কবিতাটি ঈশ্বরগুপ্ত সম্পাদিত মাসিক ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। মান কুমারী বসুর এটিই মুদ্রিতাকারে প্রথম প্রকাশিত কবিতা। ১৮৮০ সালের ৩০ ডিসেম্বর মানকুমারী বসু ও বিবূধশঙ্কর বসুর একমাত্র কন্যা পিয়বালার জন্ম হয়। ১৮৮২ সালে বিবূধশঙ্কর বসু কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে এল. এম. এফ পাশ করে প্রথমে কলকাতায় পরে সাতক্ষীরায় ডাক্তারী পেশা শুরু করেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস,১৮৮২ সালেই এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে বিবূধশঙ্কর বসু সাতক্ষীরায় মৃত্যুমুখে পতিত হন। বিয়ের মাত্র নয় বছর পরে একমাত্র কন্যাসন্তান নিয়ে মানকুমারী বসু বিধবা হন। স্বামী মৃত্যু বেদনায় বিরহিনী মানকুমারী বসু স্বামীর মনোবাঞ্ছাকে স্মরণযোগ্য করে রাখার জন্যে এবং বিধবা নারীদের কর্তব্যকর্মে অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে সাহিত্য সাধনায় পূর্ণোদ্যমে আত্ননিয়োগ করেন।

সংগীতের প্রতিও ছিল তাঁর প্রবল আকর্ষণ। তিনি কীর্তনের আংশবিশেষ মুখস্থ করে নির্ভুলভাবে মধুর কণ্ঠে গাইতে পারতেন।অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত ও সংবাদ প্রভাকরে প্রকাশিত তাঁর প্রথম কবিতা ‘পুরন্দরের প্রতি ইন্দুবালা’। এর বিষয় ও আঙ্গিকে মধুসূদনের স্পষ্ট প্রভাব রয়েছে। উনিশ শতকের গীতি কবিতার মানকুমারী বসুর কাব্য একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। তাঁর প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘প্রিয় প্রসঙ্গ’ ১৮৮৪ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। ১৮৯৩ সালে কাব্য ‘কুসুমাঞ্জলী’, ১৯০৪ সালে ‘বীরকুমার বধ’, ১৯২৪ সালে ‘বিভূতি’, ‘পুরাতন ছবি’, ও ‘শুভ সাধনা’ প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থগুলি প্রকাশিত হয়।

মানকুমারী গল্প ও প্রবন্ধ রচনাতেও সিদ্ধহস্ত ছিলেন। ১৯৩৬ সালে ছোটগল্পের বই 'পুরাতন ছবি' এবং ১৮৯০ সালে 'বাঙ্গালী রমণীদের গৃহধর্ম' ও বিবাহিতা স্ত্রীলোকের কর্তব্য প্রবন্ধ-পুস্তক। স্ত্রীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা এবং সমাজের দুর্নীতি ও কুসংস্কার দূরীকরণের ওপর রচিত তাঁর বেশ কিছু প্রবন্ধ খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল। তাঁর স্বামীর মৃত্যুতে গদ্যেপদ্যে রচিত 'বিয়োগ-বেদনা ও করুণরসের' একখানি উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রেও মান কুমারী বসুর হাত ও হৃদয় সচলসিদ্ধ। ১৮৮৮ সালে ‘বনবাসিনী’, ১৯২৬ সালে ‘সোনার সাখা’ এবং ছোট গল্প ‘রাজলক্ষ্ণী’, ‘অদৃষ্ট চক্র’ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হলে পাঠকসমাজে তাঁর জনপ্রিয়তা ব্যাপক বৃদ্ধি পায়।

সমাজের বিভিন্ন সমস্যাবিষয়ক প্রবন্ধ লেখায় তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। অন্তপুর শিক্ষার জন্য ‘শিক্ষায়িত্রী’, পল্লীগ্রামে স্ত্রী চিকিৎসক ও ধাত্রীর আবশ্যকতা বিষয়ে এবং সমাজের দুর্নীতি ও কুসংস্কার নিবারণের জন্য মূল্যবান কয়েকটি প্রবন্ধ লিখে তিনি পুরস্কৃত হন। মান কুমারী বসুর গৌরবময় কৃতিত্বের সম্মান প্রদর্শনপূর্বক ভারত সরকার ১৯১৯ সাল থেকে তাঁকে অমৃত্যু বৃত্তি প্রদান করেন।

মানকুমারী বসু বামাবোধিনী পত্রিকার লেখিকা-শ্রেণিভুক্ত ছিলেন। তাঁর সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ দুর্লভ সম্মান ও মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। তিনি ‘রাজলক্ষ্মী’, ‘অদৃষ্ট-চক্র’ এবং ‘শোভা’ গল্প লিখে ‘কুন্তলীন পুরস্কার’ পান। ১৯৩৯ সালে  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘ভুবনমোহিনী স্বর্ণপদক’ ও ১৯৪১ সালে ‘জগত্তারিণী স্বর্ণপদক দ্বারা পুরস্কৃত করে। মানকুমারী ১৯৩৭ সালে চন্দননগরে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনের ‘কাব্যসাহিত্য’ শাখার সভানেত্রী ছিলেন। বাংলা সাহিত্যের এই সুলেখিকা আজীবন সাহিত্য সাধনা করে আশি বছর বয়সে ১৯৪৩ সালের ২৬শে ডিসেম্বর মাসে কন্যা পিয়বালার খুলনাস্থ বাড়ীতে মৃত্যুবরণ করেন। খুলনার ভৈরব নদীর তীরে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। মৃত্যুর পুর্বে মধুসূদনের সমাধিলিপির ভাব অবলম্বনে ‘অন্তিম’ শীর্ষক জীবনের শেষ কবিতাটি রচনা করেন মানকুমারী বসু। কবিতাটির অংশ বিশেষ--

"যে কুলে জন্মিলে কবি শ্রী মধুসূদন
সে কুলে জন্ম মম বিধির আদেশ,
মাতা শান্তমনি পিতা আনন্দমোহন
বিধুব শঙ্কর বসু পতিদেব মম।
যদি প্রিয় বঙ্গবাসী ভালবাস মোরে
ক্ষণেক দাঁড়ায়ে দেখ তটিনীর তীরে,
স্নেহমতি মা জননী বসুমতি কোলে
বঙ্গের মহিলা কবি রয়েছে ঘুমায়ে।"

কবি মানকুমারী বসুর বিখ্যাত দুটি কবিতা --

"মোহিনী"

                (১)
কেন যে এ দশা তার সে তা' জানে না
চাহিলে মুখের পানে আঁখি তোলে না;
     মুখ খানি রাঙা রাঙা,
     কথা বলে ভাঙা ভাঙা,
কত বলি "সর্ সর্" তবু সরে না
কেমন সে হতভাগী,কিছু বোঝে না!

               (২)
সকালে গোলাপ ফুটে বন উজলি,
কে এসে দাঁড়ায় আগে সোহাগে গলি;
    দেখি তার মুখে চেয়ে,
    হাসি পড়ে বেয়ে বেয়ে,
কচি হাতে পড়ে কতো কুসুম-কলি!...
দেখিলে সে ফুল-তোলা ভুলি সকলি।

              ( ৩)
বাসন্ত বিকালবেলা মৃদু বাতাসে,
তারি ছবিখানি কেন পরানে ভাসে?
    শরত- চাঁদেরে ছেয়ে,
   সে কেন গো থাকে চেয়ে,
শুকতারা-রূপে কভু নীল আকাশে,
কেন সে মরমে সদা ঘনায়ে আসে?

                 ( ৪)
যতবার উপেক্ষিয়া গিয়াছি চলে
ততোবার এসেছে সে "আমার" বলে!...
   সে মধুর সুধা-সুরে,
   প্রাণ দিয়েছে পূরে,
পথে বাধা,আঁখি বাঁধা,চরণ টলে,
তাই ফিরিয়াছি তারে "আমারি" বলে!

                 (৫)
কি মোহিনী মায়া যে সে তা ত জানিনে,
ছেড়ে যেতে চাহি ভুলে--তাও পারিনে;
        উপেক্ষিত আমি তা'য়,
        প্রাণ ভেঙে চুরে যায়,
পাছে অশ্রু হেরি তার আঁখি-নলিনে!
কি বাঁধনে বেঁধেছে সে কিছুই জানিনে।

         ----***-----

"সখী"

যারে আমি " মোর"  বলি
                সে নাহি আসে কাছে,
তাই ভয় করে, সখী!
                তুমি ফাঁকি দাও পাছে!
এখনো রয়েছি বেঁচে
               ওই মুখপানে চেয়ে
এ দেহে শোনিত বহে
               তোমারই বাতাস পেয়ে।
হৃদয় দেবতা তুমি,
               কর্মের উত্সাহ বল,
সুখের উত্সব মম,
                বিষাদে আরাম স্থল;
এই ভিক্ষা মাগি তোরে
                দু'খানি চরন ধরি,
মরমে জাগিয়া থাক্
                এ আঁধার আলো করি!
নিশায় হাসিবে শশী
                 খুলি যাবে চন্দ্রানন,
স্বরগ-অমিয় নিয়ে
                 বহি যাবে সমীরণ :
প্রকৃতি মানিক-ফুলে
                 সাজাবে গগন -ডালা
জ্বালাইবে দিগঙ্গনা
                 উজল আলোক- মালা;
নীরব নিজন পুরী
                 স্তিমিত আলোক-রেখা,
সংসারে অগোচরে
                  তুমি আমি র'ব একা!
ধীরে ধীরে মহানিদ্রা
                  নয়নে আসিবে মম,
দেখিব পরাণ ভরি
                  ও আনন নিরুপম!
ঢলিয়া পড়্ব যবে,
                  তোরি কোলে মাথা র'বে,
বল দেখি,সোনামুখী!
                  এ কপালে তা'কি হবে?

লেখক- সাহিত্যিক কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক।

এই বিভাগের আরো খবর