Berger Paint

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১১ আগস্ট ২০২০,   শ্রাবণ ২৭ ১৪২৭

ব্রেকিং:
‘এসপির ত্রিমুখী নিশ্ছিদ্র ছকেই মেজর সিনহার নৃশংস হত্যাকাণ্ড’ ৯৪ বছরের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনায় ভারতে করোনা শনাক্ত ২২ লাখ ছাড়াল, ৪৪ হাজারের বেশি মানুষ করোনা রোগী শনাক্তের সংখ্যা ২ কোটি ছাড়াল, মৃত ৭ লাখ ৩৪ হাজার
সর্বশেষ:
কসবায় ব্যবসায়ী জনি ও অন্ধ ভিক্ষুক হত্যার প্রধান আসামীসহ আট খুনি রামগড়ে ইউএনডিপি`র অসহায়দের মাঝে ত্রাণ বিতরণ অনিরাপদ মাস্ক কেনার দায়ে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে মামলা ৩০ কোটি ডলারের ক্ষতিতে চামড়া শিল্প ভারতে ৪ মাস জেল খেটে দেশে ফিরলো তাবলিগ জামাতের ১৭ সদস্য

কুরবানির পশু নির্বাচন ও চামড়ার সঠিক সংরক্ষণ

তুফান মাজহার খান

প্রকাশিত: ২৮ জুলাই ২০২০  

পঠিত: ১৫৪
তুফান মাজহার খান। ছবি- প্রতিদিনের চিত্র

তুফান মাজহার খান। ছবি- প্রতিদিনের চিত্র



এই তো অল্প কয়েকদিন পরই আসছে পবিত্র ঈদ উল আযহা অর্থাৎ কুরবানির ঈদ। বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের কারণে প্রতি বছরের ন্যায় এবার স্বাভাবিক ঈদ হবে না এটা বলাই বাহুল্য। তবে যেহেতু কুরবানি উপযুক্ত মুসলিমদের জন্য ওয়াজিব করা হয়েছে সেহেতু কুরবানি থেমে থাকবে না। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে মুসলিমরা কুরবানি করবে। আর পশু বিক্রির হারও তাই বলছে। প্রতি বছরের তুলনায় খুব একটা কম বেচাকেনা হচ্ছে না। আর তাই কুরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা একটি জরুরি বিষয়।

চামড়া একটি মূল্যবান জাতীয় সম্পদ। বাংলাদেশের রপ্তানিযোগ্য অন্যতম খাত হলো চামড়া শিল্প। বিগত বছরগুলোতে চামড়া রপ্তানি করে বাংলাদেশ প্রায় ১.২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেছে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রায় ১.৩৭% চামড়া ও চামড়াজাত দ্রব্যাদি থেকে আসে। বিশ্বে যার স্থান পঞ্চম। কুরবানির ঈদকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে চামড়া সংগ্রহের সব প্রস্তুতি শেষ করেছে ট্যানারিগুলো। জানা যায়, সাভার চামড়া শিল্প নগরীর একশোরও বেশি ট্যানারি এবার চামড়া সংগ্রহ করবে। তবে বন্যা, আর্থিক মন্দা, মহামারি এবং বিশ্ববাজারে পণ্যের চাহিদার কমতি থাকায় বিগত বছরগুলোর তুলনায় চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়েছে ট্যানারি ব্যাবসায়ীগণ। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের ভাষ্যে, কুরবানি উপলক্ষ্যে অনেক বাড়তি চামড়া আসে কারখানায়। তাই প্রক্রিয়াজাতকরণের চাপটাও সামলানো কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। সারাবছর এত চাপ না থাকায় খুব বেশি লোকবলের দরকার হয় না কিন্তু কুরবানি ঈদ আসলে সময়ের প্রয়োজনে অনেক লোক নিতে হয়। সব কর্মীর কাজের দক্ষতা একরকম নয়। তাছাড়া পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না থাকাতেও সমস্যা হয়ে থাকে। তাই পুরো বিষয়টা এখন কিছুটা হুমকির সম্মুখীন।

গত বছর প্রায় ৫০ লাখ গরুর চামড়া সংগ্রহ করেছিল ট্যানার্সরা। তবে এবার বিভিন্ন কারণে লক্ষ্যমাত্রাটা কমিয়ে ফেলেছে তারা। তবে চামড়া সঠিকভাবে ছাড়ানো ও  সংরক্ষণ করতে পারলে এরূপ হুমকি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। আর তাই চামড়া সঠিকভাবে ছাড়ানো ও সংরক্ষণ করা আপনার, আমার সবার দায়িত্ব। পশুর দেহ থেকে নিখুঁত চামড়া ছাড়ানো ও সঠিক সংরক্ষণের ওপরই নির্ভর করে এর মান ও মূল্য। আমাদের দেশে মূলত গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ইত্যাদি কুরবানি করা হয়ে থাকে। তবে স্বল্প পরিমাণে কিছু কিছু স্থানে উট ও দুম্বাও কুরবানি করা হয়ে থাকে। সে যাই হোক, পশুর দেহ থেকে ছাড়ানো এইসব চামড়ার মধ্যে যে সব সমস্যাগুলো প্রায়ই দেখা যায় তা হলো চামড়ার নানাস্থানে কাটা দাগ, নিয়মানুসারে চামড়া না কাটা এবং চামড়ায় পচন ধরা ইত্যাদি।। তাই সঠিক পদ্ধতিতে পশুর চামড়া ছাড়ানো ও সংরক্ষণ একান্ত জরুরি।

এবার আসুন কুরবানির পশু নির্বাচন, চামড়া ছাড়ানো ও সংরক্ষণের নিয়মাবলি সম্পর্কে জানি। পশু কেনার সময় লক্ষ্য রাখুন, আপনার কুরবানির জন্য পছন্দ করা পশুটির গায়ে কোনো ধরণের ক্ষত আছে কিনা। যারা ঈদের কয়েকদিন আগে কুরবানির পশু কিনে থাকেন তারা পশুটি রাখার স্থানের মেঝের উপর খড় বা চট বিছিয়ে দিন। যাতে পশুটির গায়ে কোনোভাবে আঘাত না লাগে। হাট থেকে পশুকে বাড়িতে নিয়ে আসার সময় এমনভাবে টানাটানি করবেন না যাতে পশুটির চামড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চামড়ার মান ভালো হওয়ার জন্য শুরুতেই পশুর শরীর উত্তমরূপে ধুয়ে পরিষ্কার করতে হবে। প্রয়োজনে স্বল্প মাত্রায় সাবান অথবা শ্যাম্পু ব্যবহার করা যেতে পারে। পশু জবাই করার কমপক্ষে ঘণ্টা দুয়েক পূর্বে পশুকে প্রচুর পরিষ্কার পানি পান করাতে হবে তবে কোনো অবস্থাতেই সে সময় ঘাস, খড় বা ভূসি খাওয়ানো যাবে না। এতে পশুর দেহ থেকে চামড়া ছাড়ানো সহজ হবে। পশুকে জবাই করার সময় বা মাটিতে শোয়াবার সময় সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে, যাতে পশুর দেহে চোট না লাগে। চোট লাগলে চামড়া থেতলে যাওয়ার সম্ভবনা থাকে। পশু কুরবানি দেয়ার জন্য নির্বাচিত স্থানটি যেন এবড়ো-থেবড়ো বা গর্তযুক্ত না হয়। সমতল জায়গায় পশু কুরবানি দিন। জবাই করার জন্য নকদার ছুরি এবং চামড়া ছাড়াবার জন্য মাথা বাঁকানো ছুরি ব্যবহার করতে হবে। তবে পশু জবাই ও চামড়া ছাড়ানোর জন্য আগে থেকেই অভিজ্ঞ এরকম কাউকে কাজটির দায়িত্ব দেওয়া উচিত। জবাই করার পর পশুর দেহ নিস্তেজ হয়ে গেলে পশুকে চিৎ করে শুইয়ে দু’পাশে ঠেস দিতে হবে। এতে চামড়ায় ছুরির কাটা দাগ লাগার সম্ভাবনা থাকে না। নকদার ছুরির অগ্রভাগ দিয়ে জবাই করার স্থান থেকে গলা, সিনা ও পেটের মাঝখান দিয়ে অÐকোষ বা ওলান পর্যন্ত সোজাসুজি চামড়া ফেড়ে নিতে হবে। সামনের দু’পায়ের হাঁটু থেকে সিনা পর্যন্ত চামড়া কেটে সিনার উপর দিয়ে কাটা দাগের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে। একইভাবে, পিছনের দু’পায়ের হাঁটু থেকে লেজের কাছাকাছি পর্যন্ত চামড়া কেটে প্রথমোক্ত লম্বা কাটা দাগের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে। কোনোক্রমেই যেন দাগ আকাবাঁকা না হয় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। ছোট পশুকে গাছের ডালে বা ঝুলনে ঝুলিয়ে চামড়া ছাড়াতে হবে। এতে চামড়া নষ্ট হবে না। ঝুলিয়ে চামড়া ছাড়ানো সম্ভব না হলে দাগ কাটার পর প্রথমেই গলার অর্ধেক ছাড়াতে হবে। তারপর সামনে পা ছাড়িয়ে সিনা, কাঁধ ও পেটের চামড়া ছাড়াতে হবে। পিছনের পা ছাড়িয়ে পিঠ পর্যন্ত নিতে হবে। সিনা ও নিতম্বের অংশে চামড়া লেগে থাকে, সুতরাং এ স্থানে চামড়া ছাড়ানোর সময় সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। চামড়া ছাড়ানোর জন্য মাথা বাঁকানো কম ধারালো ছুরি ব্যবহার করতে হবে। চামড়া ছাড়ানোর পর মাটিতে টানাটানি যাবে না। রক্ত, গোবর এবং কাদাযুক্ত মাটি যেন চামড়ায় না লাগে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। চামড়া ছাড়ানোর পর লেগে থাকা রক্ত, চর্বি যত দ্রæত সম্ভব সরিয়ে ফেলুন। না হলে ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে পচন ধরে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিষ্কার পানি দিয়ে চামড়া ভালো করে ধুয়ে হালকা রোদে দিন পানি ঝরে যাওয়ার জন্য। ছাড়ানোর পর চামড়া যত শীঘ্র সম্ভব বিক্রয়কেন্দ্রে পাঠাবার ব্যবস্থা করতে হবে। ৫-৬ ঘন্টার মধ্যে চামড়া বিক্রি না হলে চামড়া সংরক্ষণের পদ্ধতি অনুযায়ী নিজেদেরই সংরক্ষণ করতে হবে। লবণ দিয়ে চামড়া সংরক্ষণ করা সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি। সংরক্ষণ করার জন্য চামড়ার ধরণ বুঝে লবণ লাগাতে হবে। সাধারণত চামড়ার ওজনের ২০ শতাংশ হারে লবণ ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ চামড়ার ওজন ১৫ থেকে ২০ কেজি হলে লবণ ব্যবহার করতে হবে ৩ থেকে ৪ কেজি। চামড়া বিছিয়ে তার ওপর লবণ ছিটিয়ে দিলে চামড়ার মধ্যকার পানি ও ব্যাকটেরিয়া বের হয়ে আসে। এরপর চামড়া ভালো করে ভাঁজ করে রাখতে হয়। লবণের পর্যাপ্ততা না থাকলে লবণ ও পানির মিশ্রণের সাহায্যেও কিছুদিন চামড়া সংরক্ষণ করা যায়।
আসুন, আমরা কুরবানির পশুর চামড়ার সঠিক ব্যবস্থাপনা শিখে নিই এবং দেশের চামড়াশিল্পকে এগিয়ে নিয়ে অর্থনীতিতে অবদান রাখতে সাহায্য করি।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কবি ও কথাসাহিত্যিক

 

এই বিভাগের আরো খবর