Berger Paint

ঢাকা, রোববার   ০৭ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ২৪ ১৪২৭

ব্রেকিং:
দেশের ৫০ জেলা পুরোপুরি লকডাউন, ১৩ জেলা আংশিক
সর্বশেষ:
করোনায় বিপর্যস্ত স্পেনকে ছাড়িয়ে পঞ্চমে ভারত চট্টগ্রামে আরও ১৫৬ জনের করোনা শনাক্ত বাজেট অধিবেশনের আগেই সব এমপির করোনা টেস্ট রুবানা হক শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দেননি: বিজিএমইএ বান্দরবানে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিংসহ নয়জনের কোভিড-১৯ রোগ শনাক্ত হয়েছে।

কোভিড-১৯: মানবিক প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনা প্যাকেজ

ড. মো. হুমায়ুন কবীর

প্রকাশিত: ৫ এপ্রিল ২০২০  

পঠিত: ৬০২
ড. মো. হুমায়ুন কবীর। ছবি- প্রতিদিনের চিত্র

ড. মো. হুমায়ুন কবীর। ছবি- প্রতিদিনের চিত্র

আমরা জানি এখন বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে কোভিড-১৯ রোগটি মহামারি আকার ধারণ করেছে। এটি জ্যামতিক হারে বাড়তে বাড়তে এখন বিশ্বের প্রায় সবকটি অঞ্চল ও দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নেই। ৮ মার্চ ২০২০ তারিখে বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী সনাক্ত হলেও সব ধরনের সচেতনতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরও প্রতিদিনই সনাক্তকৃত রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ইতোমধ্যে বিশ্বের বড়বড় অর্থনীতি এবং উন্নত দেশসমূহ এ পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমসিম খাচ্ছে। বাংলাদেশ যদিও শুরু থেকে রোগটি নিয়ন্ত্রণের সকল উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল তারপরও যেভাবে প্রাদুর্ভাব বেড়ে চলেছে এমনভাবে চলতে থাকলে কতটুকু নিয়ন্ত্রণ করা যাবে সেটা নির্ভর করছে সরকারের পাশাপাশি সকল নাগরিকদের সচেতনতা। অন্যথায় শুধু একা সরকারের পক্ষে এ প্রাণঘাতী ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগটি কোন অবস্থাতেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।

বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির একটি দেশ। ইতোমধ্যে দেশটি যেভাবে দারিদ্র্য বিমোচন করে আসছে, বিভিন্ন কারণে বিশ^মন্দা সত্তে¡ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রেখে নানা সূচকে বিষ্ময়কর সাফল্য অর্জিত হয়ে আসছিল। এ পর্যায়ে সারাবিশ^ই কোভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে লকডাউন কিংবা শাটডাউনের ভিতর দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশেও ১৮ মার্চ ২০২০ থেকে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ২৬ মার্চ ২০২০ থেকে শুধুমাত্র নিত্য জরুরি সার্ভিসসমূহ সীমিত আকারে চালু রেখে সকল সরকারি বেসরকারি দপ্তর, পরিবহন, কলকারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এতে বন্ধ রয়েছে আমদানি রপ্তানিসহ বিমান পরিবহন। বন্ধ করা হয়েছে সকল স্থল, নৌ ও বিমানবন্দর। জরুরি না হলে কাউকে বাড়ির বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ প্রদান করা হয়। কিন্তু তাতেও জনসমাগম না কমায় সেনাবাহিনী, র‌্যাব, পুলিশসহ আইনশৃ্খংলা বাহিনীর সহযোগিতা নেওয়া হয়।

এতে পুরো দেশ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। বিচ্ছিন্ন হয়েছে সারাবিশ্ব থেকেও। তাতে বিশে^র অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সাথে আমাদের দেশের অর্থনীতিও হুমকির সম্মুখীন। এতে করে বাংলাদেশের অর্থনীতির মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। যদিও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয়ের প্রক্রিয়া চলছে তারপরও বর্তমানে করোনা পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে থামবে তা পর্যবেক্ষণ না করা পর্যন্ত কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে এ মুহূর্তে নির্ণয় করা কঠিন। আমরা জানি বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত মানবিক। মানবিকতার জন্য তাঁকে মানবতার মা বলে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। তিনি সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সিদ্ধ হস্ত। কখন কোন পরিস্থিতিতে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে সেগুলো তাঁকে কারো বলে দিতে হয়না। তিনি সবার আগেই ভাবেন। এবারেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। যেখানে বড় বড় অর্থনীতির দেশসমূহ যা করতে সাহস করেন নি। বঙ্গবন্ধুকন্যা বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তেমনই অগ্রিম চিন্তার বাস্তবায়ন ঘটালেন ৫ এপ্রিল ২০২০ তারিখে একটি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে। সেখানে করোনা পরিাস্থতির কারণে আমাদের অর্থনীতিতে কী কী নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে সে সম্পর্কে একটি বিবরণ তুলে ধরেন।

উল্লেখযোগ্য প্রভাবগুলো হলো (১) আমদানি ব্যয় ও রপ্তানি আয়ের পরিমাণ গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ কমেছে। অর্থবছর শেষে এর হার আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। (২) চলমান মেগা প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়ন, অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা ও ব্যাংক সুদের হার কমানোর পরিকল্পনার বাস্তবায়ন বিলম্বের কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত মাত্রায় অর্জিত না হওয়ার সম্ভাবনা আছে। (৩) সার্ভিস সেক্টর বিশেষতঃ হোটেল-রেস্টুরেন্ট, পরিবহন এবং এভিয়েশন সেক্টরের উপর বিররূপ প্রভাব পড়বে। (৪) বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশের শেয়ার বাজারের উপরেও বিরূপ প্রভাব পড়েছে। (৫) বিশ^ব্যাপী জ্বালানী তেলের চাহিদা হ্রাসের কারণে এর মূল্য ৫০ শতাংশের অধিক হ্রাস পেয়েছে। যার বিরূপ প্রভাব পড়বে প্রবাসী আয়ের উপর।

তিনি আরো উল্লেখ করেন (৬) বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ তিন দশমিক শূন্য ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হবে মর্মে এশিয় উন্নয়ন ব্যাংক প্রাক্কলন করেছে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে মনে হচ্ছে এ ক্ষতির পরিমাণ আরো বেশি হতে পারে। (৭) দীর্ঘ ছুটি ও কার্যত লকডাউনের ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প পতিষ্ঠানসমূহের উৎপাদন বন্ধ এবং পরিবহন সেবা ব্যাহত হওয়ায় স্বল্প আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস এবং সরবরাহ চেইনে সমস্যা হতে পারে। (৮) চলতি অর্থবছরের রাজস্ব সংগ্রহের পরিমাণ বাজেটের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম হবে। এরফলে অর্থবছরের শেষে বাজেট ঘাটতির পরিমাণ আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। এবং (৯) বিগত তিন বছর ধরে ধারাবাহিক সাত শতাংশের অধিক হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং ২০১৮-১৯অর্থবছরে ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং সহায়করাজস্ব ও মুদ্রানীতি। সামষ্টিক চালকসমূহের নেতিবাচক প্রভাবের ফলে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেতে পারে।  

আমরা জানি শেখ হাসিনার সরকার পরিচালনার চিন্তা চেতনায় কেবলই বাংলদেশের মানুষের কল্যাণ ভাবনা। আর তারই অংশ হিসেবে ২৬ মার্চ থেকে লকডাউন করার প্রাক্কালে ২৫ মার্চ জাতির উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণেই দরিদ্র কর্মজীবী মানুষের কথা চিন্তা করে বিশেষত তৈরী পোশাক শিল্প ও কল-কারখানা বন্ধ থাকার কারণে কর্মহীন এবং সেসকল শিল্পোদ্যোক্তাদের সহযোগিতার অংশ হিসেবে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় চলমান অর্থনৈতিক গতিধারা বজায় রাখা এবং দেশের সকল স্তরের মানুষের কল্যাণের কথা চিন্তা করে এসময়ে সর্বমোট বাহাত্তর হাজার সাতশত পঞ্চাশ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। এখানে কৃষক, শ্রমিক, কামার, কুমার, জেলেসহ সকলের জন্যই সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার প্রস্তাবনা রয়েছে। এতে ক্ষতির সম্মুখীন শিল্পখাত, শিল্পউৎপাদন, কর্মসংস্থান, সেবাখাত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এবং পর্যটনের মতো খাতগুলো বেশি প্রভাবিত হবে।

ইতোমধ্যে পরিস্থিতির শিকার হয়ে যারা কর্ম হারিয়েছেন তাদের সকলকে সামাজিক খাদ্য নিরাপত্তা বেষ্টনির আওতায় নিয়ে এসেছে সরকার। বিভিন্ন কলকারখানার প্রান্তিক পর্যায়ের শ্রমিক, রিক্সা শ্রমিক, পরিবহন শ্রমিক, হোটেল শ্রমিক, ভিক্ষুক, হিজড়া, ভ্রাম্যমান কৃষিশ্রমিক, নাপিত, কামার, কুমার, জেলে, বিধাবা, স্বামী পরিত্যক্তা কেউই বাদ যাচ্ছে না সামাজিক খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচির ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম থেকে। সরকারের ঘোষণা এমনই যে, সেখানে যতদিন এমন পরিস্থিতি বিরাজ করবে ততদিনই এভাবে সাহায্য সহযোগিতা কার্যক্রম চালু থাকবে। দশ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রি, খোলা বাজারে চাল বিক্রি, ন্যায্যমূল্যে টিসিবির নিত্যপণ্য বিক্রি কার্যক্রম, ভিজিডি এবং ভিজিএফ কার্যক্রমসমূহও এগুলোর সাথে সাথে চালু থাকার ঘোষণা রয়েছে। আর একাজে প্রধানমন্ত্রীর ডাকে সাড়া দিয়ে অনেক বিত্তবানরাও এগিয়ে এসেছেন। কাজেই করোনা মোকাবেলার অংশ হিসেবে এখন শুধুই ঘরে থাকা। তাছাড়া সহজেই এ মহামারি থেকে পরিত্রাাণ পাওয়া কঠিন হবে।  
         
লেখক: কৃষিবিদ ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

 

এই বিভাগের আরো খবর