Berger Paint

ঢাকা, রোববার   ০৭ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ২৪ ১৪২৭

ব্রেকিং:
দেশের ৫০ জেলা পুরোপুরি লকডাউন, ১৩ জেলা আংশিক
সর্বশেষ:
করোনায় বিপর্যস্ত স্পেনকে ছাড়িয়ে পঞ্চমে ভারত চট্টগ্রামে আরও ১৫৬ জনের করোনা শনাক্ত বাজেট অধিবেশনের আগেই সব এমপির করোনা টেস্ট রুবানা হক শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দেননি: বিজিএমইএ বান্দরবানে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিংসহ নয়জনের কোভিড-১৯ রোগ শনাক্ত হয়েছে।

খাগড়াছড়িতে ৪২তম ককবরক দিবস পালিত

দহেন বিকাশ ত্রিপুরা, খাগড়াছড়ি

প্রকাশিত: ২০ জানুয়ারি ২০২০  

পঠিত: ১৭৫৩
খাগড়াছড়িতে যথাযোগ্য মর্যাদায় ৪২তম ককবরক দিবস পালিত। ছবি-প্রতিদিনের চিত্র

খাগড়াছড়িতে যথাযোগ্য মর্যাদায় ৪২তম ককবরক দিবস পালিত। ছবি-প্রতিদিনের চিত্র

ককবরক ত্রিপুরা জাতির মাতৃভাষা এবং ত্রিপুরা রাজের আদি ভাষা ককবরক। ১৯৭৯ সালের ১৯ জানুয়ারীতে ত্রিপুরা রাজ্যের একটি সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করায় প্রতিবছর এই দিনে ককবরক দিবস পালিত হয়। বাংলাদেশেও প্রথমবারের মতো ২০১৯সালে বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদ; ককবরক রিসার্চ ইনস্টিটিউট, ত্রিপুরা স্টুডেন্টস্ ফোরাম, বাংলাদেশ; য়ামুক’র সম্মিলিত উদ্যোগে খাগড়াছড়িতে ৪১তম ককবরক দিবসে বিশেষ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এবারেও দিবসটি উপলক্ষে দ্বিতীয় বারের মতো ১৯ জানুয়ারী ২০২০খ্রি. রবিবার বিকাল ৪টায় বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদ, খাগড়াছড়ি সদর আঞ্চলিক শাখা; ত্রিপুরা স্টুডেন্টস্ ফোরাম, বাংলাদেশ, খাগড়াছড়ি সদর শাখা; য়ামুক (একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন) ও সালকাতাল ক্লাব এর সম্মিলিত উদ্যোগে ‘‘র‌্যালি, আলোচনা সভা, ককবরক ভাষা উপর প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের পুরষ্কার বিতরণী ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়েছে।

 

 

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদ খাগড়াছড়ি সদর আঞ্চলিক শাখার সভাপতি কাজল বরন ত্রিপুরার সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য খগেশ্বর ত্রিপুরা। অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলা একাডেমী পুরস্কারপ্রাপ্ত, বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক প্রভাংশু ত্রিপুরা।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন বিশিষ্ট সমাজসেবক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সুধাকর ত্রিপুরা, ককবরক (ত্রিপুরা ভাষা) লেখক ও নাট্যকার অলিন্দ্র ত্রিপুরা, ৪নং পেরাছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তপন বিকাশ ত্রিপুরা, ত্রিপুরা চাকুরীজীবি কল্যাণ সমিতির প্রাক্তন সভাপতি পরিমল জ্যোতি ত্রিপুরা, তৃণমূল উন্নয়ন সংস্থার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সংস্কৃতি কর্মী চামেলী ত্রিপুরা ও ত্রিপুরা স্টুডেন্টস্ ফোরাম, বাংলাদেশ’র কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নক্ষত্র ত্রিপুরা প্রমুখ।

এর আগে দিবসটি উপলক্ষে একটি বর্ণাঢ্য র‌্যালি বের করা হয়। র‌্যালিটি খাগড়াছড়ি জেলা সদর খাগড়াপুরস্থ ককবরক লাইব্রেরী প্রাঙ্গন থেকে শুরু হয়ে খাগড়াপুর কমিউনিটি সেন্টারে গিয়ে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এসময় র‌্যালি উদ্বোধন করেন খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য পার্থ ত্রিপুরা জুয়েল।

এসময় অতিথিরা তাদের বক্তব্যে বলেন, ককবরক ত্রিপুরার হাজার হাজার বছরের আদি ভাষা। ‘কক’ মানে ভাষা, ‘বরক’ মানে মানুষ। অর্থাৎ যে জনগোষ্ঠির মানুষ ককবরক ভাষায় কথা বলে এবং তারা ত্রিপুরা জাতি হিসেবেও পরিচিত।

 

 

অনুষ্ঠানে ত্রিপুরা স্টুডেন্টস্ ফোরাম, বাংলাদেশ, খাগড়াছড়ি সদর শাখার সভাপতি ও ৪২তম ককবরক দিবস উদযাপন কমিটির সদস্য-সচিব দহেন বিকাশ ত্রিপুরার সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন য়ামুক (একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন) ও ৪২তম ককবরক দিবস উদযাপন কমিটির আহবায়ক প্রমোদ বিকাশ ত্রিপুরা।

এসময় বাংলাদেশে এ পর্যন্ত বিভিন্ন বই, পুস্তিকা, ম্যাগাজিন ইত্যাদি প্রকাশনার মাধ্যমে ককবরকে যতটুকু সাহিত্য চর্চা হয়েছে সেই কাজকে সামনে এগিয়ে নিতে হলে নতুন প্রজন্মের ককবরক প্রেমীদের আরোও অধিক সক্রিয় হতে হবে। কারণ ত্রিপুরাদের আত্মপরিচয়ের একটি প্রধান উপাদান বলেই শুধু নয়, তাদের আর্থ সামাজিক উন্নয়নের জন্যও ককবরকের লিখিত চর্চার বিকাশ ঘটানো দরকার বলে উল্লেখ করেন বক্তারা ।

এছাড়াও দিবসটি উপলক্ষে ধারণা পত্রও বিলি করা হয়। এতে উল্লেখ যে, বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিকতা, বদান্যতা ও বিশেষ অবদান স্মরণীয়। ইতোমধ্যে ২০১৭সাল থেকে সরকারের উদ্যোগে ককবরকভাষি শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়নের নিমিত্তে প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে প্রাক-প্রাথমিক থেকে ৩য় শ্রণি পর্যন্ত ককবরক পাঠ্যবই প্রণীত হয়েছে এবং পাঠদানের কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

 

 

ককবরক সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলতে হলে নতুন প্রজন্মকে অধিকতর সক্রিয় হতে হবে। এটা সম্ভব হতে পারে-

(০১)ককবরক অভিজ্ঞ ব্যক্তি বর্গের সমন্বয়ে “ককবরক শব্দ ভান্ডার” বের করা।

(০২) ককবরক শিক্ষা ক্ষেত্রে ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি করা।

(০৩) গ্রাম-এলাকা , রাস্তা, ক্লাব, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামসহ শিশুর নামকরণের ক্ষেত্রে ককবরক ব্যবহারে গুরুত্ব প্রদান করা।

বাংলাদেশে ককবরকের লিখিত চর্চা দেখা যায় চল্লিশ দশকের প্রথমার্ধে। ১৯৪২সালে সাধক খুশী কৃষ্ণ (বলং রায় সাধু) সর্বপ্রথম ককবরকে আধ্যাত্মিক গান রচনা করে প্রকাশ করেন। ককবরকে রচিত তার প্রথম বইটর নাম‘‘ত্রিপুরা খা-কাচংমা খুমবার বই’’। তারই পদাঙ্ক অনুসরণ করে বর্তমান পর্যন্ত ককবরক সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে কতিপয় প্রবীন-নবীণ ব্যক্তিত্বের পদচারণা দেখা যায়। তন্মধ্যে বরেন ত্রিপুরা, সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরা, মহেন্দ্র লাল ত্রিপুরা, সুরেশ মোহন ত্রিপুরা, প্রভাংশু ত্রিপুরা, অলেন্দ্র লাল ত্রিপুরা প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৬৬সালে বরেন ত্রিপুরার ‘‘অজানা পাহাড়ী সুর’’ নামে ককবরক ভাষায় (বাংলায় অনুবাদসহ) একটি গানের বই প্রকাশিত হয়।

ককবরকের লিখিত চর্চায় প্রয়াত সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরার অবদান স্মরণীয়। তিনি ত্রিপুরা ককবরক গীতিকার, সুকরার ও শিল্পী গবেষক। তার লেখা দুইটি উল্লেখযোগ্য বই হল ‘‘ককবরক অভিধান ও ব্যাকরণ’’ (১৯৯০) এবং ত্রিপুরা শিক্ষার প্রথম পাঠ’’ (১৯৮৪)। ত্রিপুরা সমাজে বহুল প্রচারিত একটি জনপ্রিয় গীতিকাব্য ‘‘পুন্দাতান্নায়’’ বা জিজোক পুন্দা গীতিকাব্য  বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদ থেকে ১৯৭৯সালে প্রকাশিত হয়। সাধু চিত্তরঞ্জন ত্রিপুরা সর্বপ্রথম বাংলা থেকে শ্রী ভাগবদ গীতাকে ‘‘ককবরক’’ ভাষায় অনুবাদ করেন। লেখক প্রভাংশু ত্রিপুরা ‘‘কক্-বরক ও আদি শিক্ষা’’ নামে একটি বই প্রকাশ করেছেন। রেডিও বাংলাদেশ, চট্টগ্রাম কেন্দ্র থেকে পাহাড়িকা অনুষ্ঠানে ত্রিপুরা ভাষায় স্থানীয় সংবাদ ও গান প্রচারিত হয়।

এই বিভাগের আরো খবর