Berger Paint

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০,   আশ্বিন ১৪ ১৪২৭

ব্রেকিং:
১৫ বছরের মধ্যে ১০ বছরই আয়কর দেননি ট্রাম্প! চির নিদ্রায় শায়িত অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম অস্ত্র মামলায় সাহেদ করিমের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ২৪ বলে ৮২, ৯ বলে ৭ ছক্কা, নতুন রেকর্ড আইপিএলে এমসি কলেজে স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে গণধর্ষণ: ছাত্রলীগ নেতা রাজনও গ্রেফতার এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গণধর্ষণ : রনি ও রবিউল গ্রেফতার ৭৪-এ পা রাখলেন শেখ হাসিনা
সর্বশেষ:
সৌদিতে শিডিউল ফ্লাইটের অনুমতি পেয়েছে বিমান ড. কামাল ও আসিফ নজরুল ঢাবি এলাকায় অবা‌ঞ্ছিত : সন‌জিত সাহেদের বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলার রায় আজ কাশ্মীর সীমান্তে পাক-ভারত উত্তেজনা, এক সেনা নিহত

চ্যালেঞ্জিং ফ্রিল্যান্সিং পেশা ও এর বাধাসমুহ

মো: জিল্লুর রহমান

প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০  

পঠিত: ১২৯
মো: জিল্লুর রহমান। ছবি- প্রতিদিনের চিত্র

মো: জিল্লুর রহমান। ছবি- প্রতিদিনের চিত্র


সম্প্রতি আমাদের প্রধানমন্ত্রী ফ্রিল্যান্সিংকে পেশা হিসাবে সামাজিক স্বীকৃতি প্রদানের অনুরোধ করেছেন। তথ্য-প্রযুক্তির অগ্রগতির এ সময়ে ফ্রিল্যান্সিং শব্দটির সঙ্গে আমরা সবাই কমবেশি পরিচিত। এটি বর্তমান সময়ে পত্রপত্রিকা, টিভি-ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার ও লোকমুখে খুব আলোচিত একটি শব্দ হলেও অনেকের এ সম্পর্কে পরিষ্কার কোন ধারণা নেই, যাদের আছে তাদের ধারণাও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। এ কারণে সমাজের অনেকাংশই ফ্রিল্যান্সিং পেশাজীবীদের নিয়ে ভুল ধারণা পোষণ করেন। অনেকেই ধারণা করেন অযথা ঘরে বসে কম্পিউটার টিপে সময় নষ্ট করার আরেক নাম ফ্রিল্যান্সিং। অনেক তরুণ ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং করে অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে নিজের পড়ালেখা এবং পরিবারের খরচ জোগান দেয়। অথচ সামাজিকভাবে তাকে পরিচয় নিয়ে হীনম্ম্যতায় ভুগতে হয়। শুধু পরিবার বা আত্মীয়স্বজন নয়, ব্যাংকে হিসাব খোলা থেকে শুরু করে পাসপোর্ট করার মতো সমাজের প্রতিটি স্তরে নিজের পরিচয় নিয়ে ঝক্কি ঝামেলায় পড়তে হয়।

 

আসলে ফ্রিল্যান্সিং শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে মুক্তপেশা। অর্থাৎ গৎবাঁধা নিয়মের বাইরে নিজের ইচ্ছেমতো সময়ে এবং পছন্দের ধরণ অনুযায়ী কাজ করার নাম ফ্রিল্যান্সিং। অন্যভাবে বলা যায়, নির্দিষ্ট কোন প্রতিষ্ঠানের অধীনে না থেকে মুক্তভাবে কাজ করাকে ফ্রিল্যান্সিং বলে। এ ধরণের পেশাজীবিকে বলা হয় ফ্রিল্যান্সার (Freelacer) বা মুক্ত পেশাজীবি। ফ্রিল্যান্সিং বা ফ্রিল্যান্সার শব্দগুলো আমাদের কাছে সাম্প্রতিক হলেও এই ধরনের পেশার সঙ্গে অনেকে অনেক আগ থেকেই কমবেশি পরিচিত। ঠিকাদার, পত্রপত্রিকার কলাম লেখক, স্থানীয় সাংবাদিক, বাসার/ভবনের ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রী – এরা নির্দিষ্ট একটি পত্রিকা বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকেনা। একই সাংবাদিক অনেকগুলো সংবাদপত্রের সঙ্গে কাজ করে, একই ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রী অনেকগুলো কাজে যুক্ত থাকে কিংম্বা কোন কাজ ১৫-২০ মিনিটে শেষ করে, আবার কোন কাজ মাসব্যাপী চলতে পারে।

 

চাকরীজীবিদের মতো এরা বেতনভুক্ত নয়। কাজ ও চুক্তির ওপর নির্ভর করে আয়ের পরিমাণ কম বা অনেক বেশি হতে পারে, তবে স্বাধীনতা আছে, ইচ্ছেমতো, ঘরে বসে বিশ্বের যে কোনো দেশ থেকে আয় করার সুযোগও আছে। এজন্য স্বাধীনমনা লোকদের আয়ের জন্য এটি একটি সুবিধাজনক পন্থা। সুতরাং ফ্রিল্যান্সিং বলতে আমরা সেই কাজগুলোকে বুঝি যেগুলো কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে করা হয় এবং কাজগুলো হয় বিদেশেীদের জন্য (মূলত পশ্চিমা ও ইউরোপের দেশগুলো) এবং প্রাপ্তিটা হয় আমরেকিান ডলার বা ব্রিটিশপাউন্ডে বা ইউরোতে।

 

উন্নত দেশগুলোতে (আমেরিকা কিংবা ইউরোপ) মজুরি অত্যন্ত বেশি। কোনো কোম্পানির যদি ওয়েবসাইট তৈরি করার প্রয়োজন হয়, এজন্য যদি একজন ওয়েব ডিজাইনার নিয়োগ করতে হয় তাহলে বিপুল পরিমাণ টাকা গুনতে হয়। সে কাজটিই অন্য কোনো উন্নয়নশীল দেশের (যে দেশের মজুরি অনেক সস্তা) ওয়েব ডিজাইনার দিয়ে করিয়ে নিলে তুলনামূলক কম টাকায় করানো যায়। তাই ঐসব দেশের মানুষ আমাদের মতো দেশ থেকে কম খরচে করিয়ে নেন, তাতে করে দুজনেরই লাভ। বর্তমান ইন্টারনেট ব্যবস্থায় খুব সহজে এ কাজ করা সম্ভব।

 

আমরা সাধারণতঃ দুই ধরণের পেশার সঙ্গে পরিচিত – চাকরী ও ব্যবসা। চাকুরীতে নির্দিষ্ট কোন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘ মেয়াদে চুক্তিবদ্ধ থাকতে হয়; মাস শেষে নির্দিষ্ট পরিমাণ বেতন পাওয়া যায় এবং এতে আপাতঃ কোন বিনিয়োগের দরকার পড়ে না। অন্যদিকে ব্যবসায় একাধিক ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ বা লেনদেনে সম্পৃক্ত থাকতে হয়, আয় কয়েক মিনিট বা কয়েক মাসেও হতে পারে। ব্যবসায়ে আয়ের পরিমাণও নির্দিষ্ট নয় এবং বিনিয়োগের জন্য কম-বেশি টাকা বা স্থাবর সম্পদের প্রয়োজন হয়। তবে ফ্রিল্যান্সিং চাকুরী ও ব্যবসায়ের চেয়ে একটু আলাদা। চাকুরীতে যেমন কোন বিষয়ে শিক্ষিত ও দক্ষ হতে হয়, ফ্রিল্যান্সিংয়েও তাই। তবে এক্ষেত্রে ব্যবসার মতো এখানে তেমন বিনিয়োগের প্রয়োজন পড়ে না। মোটামুটি একটা কম্পিউটার আর ইন্টারনেট সংযোগ হলেই শুরু করা যায়। ফ্রিল্যান্সিংয়ে মুল বিনিয়োগ দক্ষতা, শ্রম ও সময়। এগুলোর উপর নির্ভর করে আয়ের পরিমাণ কয়েক লক্ষ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। ফ্রিল্যান্সিংয়ে আয় নির্ভর করে সম্পূর্ণভাবে দক্ষতা, শ্রম ও সময়ের উপর। কাজ না করলে কোন আয় নেই। পক্ষান্তরে মূল্যবান কোন বিষয়ে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করলে আয় খুব বেশি হবে। এই আয়ের সীমা দক্ষতার উপর নির্ভর করে।

 

ফ্রিল্যান্সাররা অনলাইনে তাদের কাজের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে নিয়ে আসেন। রেমিটেন্স আহরণের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন দেশের লাখো তরুণ। তারা বেকারত্ব দূরীকরণ, নিজের এবং সমাজের আর্থসামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখলেও তাদের সামাজিক পরিচয় নিয়ে খুবই দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকেন। ব্লগসাইটগুলোতে কিংম্বা ট্রেনিং সেন্টারগুলোর পোস্টারে দেখা যায়, কম্পিউটারের পর্দা থেকে ডলার উড়ে আসছে, যেন ধরার লোক নাই কিংম্বা পায়ের উপর পা তুলে ডলার গুণছেন। এগুলো এ সম্পর্কে অতিরঞ্জিত প্রচারণা। তবে যারা এ পেশায় খুব দক্ষ তাদের ক্ষেত্রে এটি শতভাগ সত্য ও বাস্তবিক।

 

ফ্রিল্যান্সিংয়ের শতাধিক খাত রয়েছে। বহুল আলোচিত ও চাহিদা সম্পন্ন খাতগুলো হলো ডিজাইন, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, মোবাইল ডেভেলপমেন্ট, প্রোগ্রামিং ও সফটওয়্যার, নেটওয়ার্কিং, লেখালেখি, সাপোর্ট (সেবা/পণ্যের সঙ্গে জড়িত সহযোগীতা), বিক্রয় ও বিপণন (মার্কেটিং), ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি, খুচরো করে বললে প্রায় ৬০/৭০ টি বিষয়ে ফ্রিল্যান্সিং করা যায়। বাড়িতে, মেসে, নিজের ঘরে, ক্যাম্পাসে, যানবাহনে, যেখানে ইচ্ছা বা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ হয়, সেখানে বসে কাজ করা যায়।

 

ফ্রিল্যান্সিং কাজের বিখ্যাত সব সাইটগুলো হচ্ছে- আপওয়ার্ক, ফ্রিল্যান্সার, ফাইভার, গুরু, নাইনটিনাইন ডিজাইনস, পিপল পার আওয়ার ইত্যাদি এবং পেপল, পাইয়িনিয়র হচ্ছে ফ্রিল্যান্সিং সাইটে লেনদেনের আন্তর্জাতিক সব মাধ্যম।

 

আমাদের দেশের ফ্রিল্যান্সিংয়ের বেশ কিছু বাধা রয়েছে। যেমন-যেমন-প্রথমত, ফ্রিল্যান্সিংয়ের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে বাংলাদেশের অধিকাংশ ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড আন্তর্জাতিক মানের নয়। পেপল, পাইয়িনিয়র ইত্যাদি সাইটে হিসাব খুলতে গেলে আমাদের দেশের উপরোক্ত কার্ডগুলো গ্রহণ করে না। ফলে এসব সাইটে হিসাব খোলা যায় না এবং অনেক ফ্রিল্যান্সিং সাইটে রেজিষ্ট্রেশনই করা যায় না।

 

দ্বিতীয়ত, ইংরেজিতে দূর্বলতার কারণে তরুণরা ফ্রিল্যান্সিং সাইটে কাঙ্ক্ষিত কাজ পায় না বা কাজ পেলেও দক্ষতার সাথে কাজটি শেষ করে ডেলিভারি দিতে পারে না। ইংরেজিতে কথাবলা ও লেখালেখির দক্ষতা ফ্রিল্যান্সিংয়ের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে ইংরেজির দূর্বলতা কাটানোর জন্য যদি সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হতো, তবে ফ্রিল্যান্সিংয়ে আরও অনেকে যুক্ত হতে পারতো।

 

তৃতীয়ত, ফ্রিল্যান্সিংয়ের জন্য প্রশিক্ষণ দরকার। কিন্তু বেসরকারি উদ্যোগে কিছু প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে উঠলেও, সেগুলো বাজার চাহিদার সাথে যথেষ্ট নয়। তাছাড়া, এসব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধিকাংশ রাজধানী কেন্দ্রিক। দক্ষ ফ্রিল্যান্সার তৈরির জন্য সরকারি উদ্যোগে সারা দেশে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা দরকার।

 

চতুর্থত, ফ্রিল্যান্সিংয়ের জন্য সারাদেশে উচ্চগতির নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা দরকার। সরকার থ্রিজি, ফোরজির ইন্টারনেট সেবার কথা বললেও অনেক স্থানে উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা পর্যাপ্ত নয়, ফলে প্রত্যন্ত এলাকার অনেকে ফ্রিল্যান্সিংয়ে যুক্ত হতে পারছে না।

পঞ্চমত, ফ্রিল্যান্সিং আমাদের দেশে পেশা হিসাবে স্বীকৃত নয়, ফলে অনেকে এ পেশায় আসতে হীনমন্যতার ভোগে।

 

আশার কথা হচ্ছে, বর্তমানে আউটসোর্সিং বা ফ্রিল্যান্সিং হচ্ছে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের তৃতীয় ক্ষেত্র। বিশ্বে এখন বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সাররা প্রতিবছর প্রায় একশ’ মিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিটেন্স অর্জন করছে।

 

বাংলাদেশে প্রায় ছয় লাখ ফ্রিল্যান্সার রয়েছে। এ ফ্রিল্যান্সারদের কথা ভেবে তাদের উন্নয়নে এবং দেশের তরুণদের এ মুক্তপেশায় উদ্বুদ্ধকরণের লক্ষ্যে তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ফ্রিল্যান্সারদের জন্য সহায়তা করার প্লাটফর্ম করেছে। তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশের প্রায় ছয় লাখ ফ্রিল্যান্সারকে পরিচয়পত্র দিতে কাজ শুরু করছে সরকার। ফ্রিল্যান্সারদের জন্য একটি ‘ফ্রি কার্ড’ চালু করতে যাচ্ছে এবং সে কার্ডের নাম হবে ফ্রি কার্ড। ফ্রিল্যান্সারদের এ পরিচয়পত্র বা ফ্রি কার্ডে ব্যক্তিগত তথ্য, মোবাইল নম্বরসহ বিশেষ কোড থাকবে। সরকার তথ্য-প্রযুক্তিতে রফতানি আয় ৫ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে এবং একটা বড় ক্ষেত্র হচ্ছে ফ্রিল্যান্সিং। বর্তমান পুরো পৃথিবীতে এ মুহূর্তে ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের মার্কেট যেটি আইটি ফ্রিল্যান্সারদের দখলে।

 

সারা বিশ্বেই ফ্রিল্যান্সিং একটি আউটসোর্সিং মুক্তমনা পেশা হিসাবে স্বীকৃত এবং এ খাতে বাংলাদেশেরও উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে লক্ষ লক্ষ বেকার তরুণ তরুণী এ পেশায় যুক্ত হয়েছেন এবং কাঙ্ক্ষিত অর্থ উপার্জন করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। উপরোক্ত বাধাগুলো দূর করতে পারলে দেশে লক্ষ লক্ষ বেকার যুবকদের যেমন কর্মসংস্থান ও স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে, ঠিক তেমনিভাবে দেশে অনেক বৈদেশিক মূদ্রাও অর্জিত হবে। এক্ষেত্রে দরকার সরকারি উদ্যোগ, সঠিক পরিকল্পনা ও এর বাস্তবায়ন।

 

লেখক: ব্যাংকার ও কলাম লেখক, সতিশ সরকার রোড, গেন্ডারিয়া, ঢাকা।

এই বিভাগের আরো খবর