Berger Paint

ঢাকা, শুক্রবার   ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২,   আশ্বিন ১৪ ১৪২৯

ব্রেকিং:
চট্টগ্রাম, গাজীপুর, কক্সবাজার, নারায়ানগঞ্জ, পাবনা, টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহ ব্যুরো / জেলা প্রতিনিধি`র জন্য আগ্রহী প্রার্থীদের আবেদন পাঠানোর আহ্বান করা হচ্ছে। শিক্ষাগত যোগ্যতা- স্নাতক, অভিজ্ঞদের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল যোগ্য। দৈনিক প্রতিদিনের চিত্র পত্রিকার `প্রিন্ট এবং অনলাইন পোর্টাল`-এ প্রতিনিধি নিয়োগ পেতে অথবা `যেকোন বিষয়ে` আর্থিক লেনদেন না করার জন্য আগ্রহী প্রার্থীদের এবং প্রতিনিধিদের অনুরোধ করা হল।
সর্বশেষ:
এসএসসির নির্বাচনি পরীক্ষার ফল ৩০ নভেম্বরের মধ্যে প্রকাশের নির্দেশ কোনো দলকে সমর্থন নয়, বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচন চায় যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ আফ্রিকাকে ৮ উইকেটে হারিয়েছে ভারত আরও তিন বছরের সাজা পেলেন অং সান সু চি করতোয়ায় নৌকাডুবি: পঞ্চম দিনের উদ্ধার অভিযান চলছে

জাম্বুরা ফলকে ফুটবল বানিয়ে খেলা পাহাড়ী মেয়েরাই আজ সাফে সেরা

দহেন বিকাশ ত্রিপুরা, খাগড়াছড়ি

প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২  

ছবি- সংগৃহীত।

ছবি- সংগৃহীত।

খাগড়াছড়ি জেলা সদরের গোলাবাড়ি ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের সাতভাইয়া পাড়া পাড়া। এই গ্রামে জন্ম বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের খেলোয়াড আনাই মগিনী ও আনুচিং মগিনীর। তাদের বাড়ি ঢুকতেই দেয়ালে শোভা পাচ্ছে রঙে ফুঁটিয়ে তোলা চারটি ফুটবল। যেন এটা ফুটবল বাড়ি। তবে ফুটবলের জোয়ার ওই দেয়ালে আটকে নেই। ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের মারমা গ্রামে। জেলা শহর থেকে দূরত্ব খুব বেশি না। আনুমানিক ৩কিলোমিটারের মতো। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুন্নত কারণে সাতভাইয়া পাড়া বরাবরই পিছিয়ে পড়া একটি গ্রাম। সেই গ্রামটিকেই অবশ্য গত কয়েক বছর ধরে মানুষ চিনতে শুরু করেছে। শহরের মধুপুর বাজারে গিয়ে টমটম চালকদের জিঙ্গেস করলে সোজা নিয়ে যাবে। আর সবাইকে এই গ্রাম চিনতে বাধ্য করেছে আনাই ও আনুচিং মগিনী। যে মেয়েরা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে দেশকে চ্যাম্পিয়ন ট্রফি এনে দিয়েছে, সেই মেয়েদের গ্রামের কথা তো জানতেই হয়।

 

গত সোমবার সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা ঘরে এনেছে বাংলাদেশের মেয়েরা। নেপালকে ৩-১ গোলের ব্যবধানে হারিয়ে আনা এই ট্রফি দেশের জন্যও প্রথম। সেই দলেরই দুই সদস্য আনুচিং ও আনাই। তাদের বাড়ি তো বটেই, তাদের গ্রামেও তাই এখন বইছে আনন্দের জোয়ার। গ্রামবাসীও অপেক্ষায় তাদের বরণ করে নিতে।

 

বৃহস্পতিবার (২২ সেপ্টেম্বর) সাতভাইয়া পাড়া গিয়ে কথা হয় আনাই ও আনুচিংয়ের মা-বাবা, ভাইসহ প্রতিবেশীদের সঙ্গে। বাড়ির আঙ্গিনায় ১০/১২ বছরের কয়েকজন শিশু খেলা করছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনের সাথে পরিচয় হলো। এদের মধ্যে উক্রইঞো মগিনী নামে একজন বলল, আমিও পিসি আনাই ও আনুচিংয়ের মতো হতে চাই। সে বর্তমানে স্কুল পর্যায়ের ফুটবল খেলার সাথে সম্পৃক্ত বলে জানতে পেরেছি। পড়াশোনা করে খাগড়াছড়ি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে।

 

আনাই ও আনুচিংয়ের বাবা রিপ্রু মগ বলেন, আনুচিং ও আনাইয়ের ফুটবলে আসাটা মোটেও সহজ ছিল না। তাদের বাড়ি যেতে পার হতে হয় দুর্গম পথ। তাদের ফুটবলে আসার পথটাও ছিল তেমনই দুর্গম। অভাবের কারণে সকল ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা করাতে পারিনি।

 

রিপ্রু মগ আরো বলেন, আমাদের অভাব-অনটনের সংসার। মেয়েদের ঠিকমতো খাবার দিতে পারি না। পড়ালেখার খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হয়। এর মধ্যেও দুই বোনের ফুটবলের প্রতি আগ্রহ ছোটবেলা থেকে। তখন তো ফুটবল কিনে দিতে পারিনি। ওরা বাড়ির উঠানে জাম্বুরাকে ফুটবল বানিয়ে খেলত। আমাদের মতো অভাবের সংসারে মেয়েরা ফুটবল খেলবে, সেটা তো ভাবতেও পারতাম না। তাই অনেক সময় বকাও দিতাম।

 

দুই বোনের ফুটবলে আসার কথা জানিয়ে রিপ্রু বলেন, একসময় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্ট চালু হয়। আমরা খুব একটা আগ্রহী ছিলাম না। কিন্তু ওদের স্কুলের শিক্ষক দুই বোনকে খেলতে নিয়ে গিয়েছিল। টুর্নামেন্টে ওরা ভালো খেলে। আর আগ্রহ তো ছিলই। তা দেখেই ক্রীড়া শিক্ষক দুই জনকে নিয়ে যান রাঙামাটির ঘাগড়ায়। সেখানেই ফুটবল ঠিকমতো শিখতে শুরু করে। তারপর তো আজকে সবাই জানে ওদের কৃতিত্বের কথা।

 

২০১৮ সালে বয়সভিত্তিক ফুটবলে নেপালের মাটি থেকেই জয় ছিনিয়ে এনে দেশবাসীর কাছে পরিচিত হয়ে ‍উঠতে শুরু করে খাগড়াছড়ির মেয়ে আনাই, আনুচিং ও মনিকা। তাদের ফুটবল নৈপুণ্যে মুগ্ধ হয়েছিল দেশ। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ থেকে ওই সময় তিন খেলোয়াডের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দেয়া হয়। তবে তিনজনের বাড়িতে ঘর তুলতে সহায়তা ছাড়া আর কোনো আশ্বাস আলোর মুখ দেখেনি।

 

এ নিয়ে আক্ষেপ করে আনাই-আনুচিংয়ের মা আপ্রুমা মগিনী বলেন, পার্বত্য জেলা পরিষদ থেকে বাড়ির পাশের ছড়ার ওপর একটি কালভার্ট করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল। চার বছরেও সেই কালভার্ট হয়নি। আরও অনেক প্রতিশ্রুতি আছে। এখন তো মেয়েদের খেলাধুলার আয়ে এখন সংসার চলে। প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন হলে হয়তো আমাদের জীবনটা একটু সহজ হতো।

 

আনাই ও আনুচিংয়ের ভাই মংক্রজাই মগ বলেন, বোনদের খেলা দেখে আমি খুশি, মা-বাবা খুশি,পরিবারের সকলে খুশি। এতই খুশি হয়েছি, বলার ভাষা হারিয়ে ফেলছি। ওরা খাগড়াছড়িতে আসলে অনেক আনন্দ ও জয় উৎসব করবো।

 

আনাইদের প্রতিবেশী আপ্রু মগ জানান, আমরা আনাই ও আনুচিংদের খেলা দেখে সন্তুষ্ট হয়েছি। কারণ আমাদের এলাকার মেয়ে। এলাকাবাসীও খুশি। এখন গ্রামে আনন্দের জোয়ার বইছে।

 

অন্যদিকে মনিকা চাকমার গল্পটাও আনাই ও আনুচিংয়ের মতো

 

খাগড়াছড়ির সবচেয়ে দুর্গম উপজেলা লক্ষ্মীছড়ি। সেই উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম সুমন্তপাড়া। ভৌগলিকভাবে দুর্গম হলেও সব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করেই সাফল্য এনেছে সেই গ্রামের মেয়ে মনিকা চাকমা। আনাই-আনুচিংয়ের মতো সেও সাফ নারী ফুটবল দলের একজন সদস্য।

মনিকা চাকমাকে নিয়ে পাড়ায় বেশ উচ্ছ্বাস চলছে পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীদের মধ্যে। বিদ্যুৎ ও ভালো ইন্টারনেট না থাকায় সোমবার এ গ্রামের কেউ খেলা দেখতে পারেননি। কিন্তু মনিকাদের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার খবরটা পেয়েছেন। মঙ্গলবার দিনের বেলা তাই অনেকেই অনলাইনে দেখেছেন সেই খেলা। নিজেদের গ্রামের মেয়ের এমন সফলতায় তারা ভীষণ উচ্ছ্বসিত। খুশিতে মিষ্টি বিতরণও হয়েছে গ্রামে।

মনিকা চাকমার বাবা বিন্দু কুমার চাকমা জানান, সোমবার রাতে মেয়ের ফোনে সাফ বিজয়ের খবর শুনেছেন। পাহাড়ে তখন গভীর রাত। স্থানীয়রা জানান, আনাই-মনিকার জন্যই ইএনও-ডিসি তাদের গ্রাম চিনেছে। এখন তারা মনিকাদের সুবাদে গ্রামের কিছু উন্নয়ন চান।

 

ইতোমধ্যে সাফল্যের জন্য খাগড়াছড়ির তিন ফুটবলার ও এক কোচকে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস এক লক্ষ করে চার লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছেন।

 

জেলা প্রশাসক বলেন, এসব ফুটবলার শুধু জেলার নয়, পুরো দেশের গর্ব। এভাবেই দেশকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে হবে। তিনি আরও বলেন, যারা দেশের জন্য কাজ করে, দেশের জন্য অবদান রাখে, তারা তো গরিব হতে পারে না। তাদের যারা জন্ম দিয়েছেন, তারাও গরিব হতে পারেন না। তারা ও তাদের জন্মদাতারা সম্মানের দিক থেকে ধনী।

 

তারপরও অতীতেও প্রশাসন এই ফুটবলারদের পরিবারের পাশে ছিল, বর্তমানেও আছে এবং ভবিষ্যতে থাকবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন জেলা প্রশাসক।

এই বিভাগের আরো খবর