Berger Paint

ঢাকা, সোমবার   ২৮ নভেম্বর ২০২২,   অগ্রাহায়ণ ১৪ ১৪২৯

ব্রেকিং:
চট্টগ্রাম, গাজীপুর, কক্সবাজার, নারায়ানগঞ্জ, পাবনা, টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহ ব্যুরো / জেলা প্রতিনিধি`র জন্য আগ্রহী প্রার্থীদের আবেদন পাঠানোর আহ্বান করা হচ্ছে। শিক্ষাগত যোগ্যতা- স্নাতক, অভিজ্ঞদের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল যোগ্য। দৈনিক প্রতিদিনের চিত্র পত্রিকার `প্রিন্ট এবং অনলাইন পোর্টাল`-এ প্রতিনিধি নিয়োগ পেতে অথবা `যেকোন বিষয়ে` আর্থিক লেনদেন না করার জন্য আগ্রহী প্রার্থীদের এবং প্রতিনিধিদের অনুরোধ করা হল।
সর্বশেষ:
প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগের ফল প্রকাশ আবারও পেছালো যে কোনো মূল্যে শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হবে: প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামে শিশু আয়াত হত্যা : আসামি আবীর ফের রিমান্ডে ৫০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কেউ পাস করেনি এসএসসিতে পাসের হার ৮৭.৪৪ শতাংশ সাংহাইয়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, বিক্ষোভ

ধরলা পাড়ের সৈয়দ শামসুল হক

রহিমা আক্তার মৌ

প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২  

সৈয়দ শামসুল হক। ছবি- সংগৃহীত

সৈয়দ শামসুল হক। ছবি- সংগৃহীত


"আমার কল্পনায়, আমার গল্প-উপন্যাসের জন্য একটা এলাকা গড়ে তুলেছি—জলেশ্বরী। শহরের নাম জলেশ্বরী এবং এলাকার নাম জলেশ্বরী। এটার ভেতর কুড়িগ্রামের একটা প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাওয়া যাবে। কিন্তু আমি কিছু উপাদান যোগ করেছি। যেমন, কুড়িগ্রাম শহরে আমি কোনো মাজার দেখিনি। আমি একটি প্রাচীন মাজার কল্পনা করে নিয়েছি। এটা আমার দরকার হয়েছে গল্প-উপন্যাসের জন্য। "--- সৈয়দ শামসুল হক।

 

গল্পকে তিনি গল্প বলেন না। বলেন গল্পপ্রবন্ধ। কারণ তিনি সবল সাহসী হাতে ভেঙে দিয়েছেন ফিকশন-ননফিকশন বিভাজন। ১৯৫৪ সালে মাত্র আঠারো বছর পেরিয়ে যখন উনিশ চলেছে বয়স, ঠিক তখনি সাতটি গল্প নিয়ে বের করেন  তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘তাস’। এটা নিশ্চই সাহিত্যাঙ্গনের জন্যে বিশাল সাহসের বিষয়। এই কাজটিই করে দেখিয়েছেন কবি ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, চিত্রকর, ভাস্কর এবং আরো বহুবিচিত্র সাহিত্য-শিল্পধারার কীর্তিমান স্রষ্টা সৈয়দ শামসুল হক।

 

মাত্র ২৯ বছর বয়সে ১৯৬৪ সালে বাংলা একাডেমী পুরস্কার অর্জন করা সব্যসাচী কবি সৈয়দ শামসুল হক ১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর কুড়িগ্রাম জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। হোমিওপ‌্যাথিক চিকিৎসক সৈয়দ সিদ্দিক হুসাইন ও গৃহিনী হালিমা খাতুনের আট সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে বড় ছিলেন তিনি। একজন বিখ্যাত সব্যসাচী লেখক বলেই তিনি অধিক পরিচিত। শুধু সৃষ্টিপ্রয়াসই লেখক নয়, বরং দেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক আন্দোলনে তিনি ভূমিকা রেখে গেছেন। বাংলা একাডেমী পুরস্কার পাওয়া সাহিত্যিকদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে কম বয়সে এ পুরস্কার লাভ করেছেন।

 

তার ডাক নাম বাদশা। জীবনও পার করেছেন বাদশার মত। কোনকিছুকে পরোয়া করেননি। হাতের মুঠোয় জীবনকে নিয়ে বাদশার মতই দিগদারী করেছেন। বাংলা সাহিত্যের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এক অলৌকিক মন্ত্রমুগ্ধের স্নিগ্ধতায় কাটিয়ে দিয়েছেন জীবনের উজ্জল সময়।

 

১৯৫১ সালে বম্বে পালিয়ে যান, কারণ বাবা চেয়েছেন তিনি ডাক্তারি পড়েন। সেখানে তিনি বছর খানেকের বেশি এক সিনেমা প্রডাকশন হাউসে সহকারী হিসেবে কাজ করেন। এরপর ১৯৫২ সালে তিনি দেশে ফিরে এসে জগন্নাথ কলেজে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী মানবিক শাখায় ভর্তি হন। লালনের মত একশ ষোল বছর বাঁচতে চেয়েছিলেন সাহিত্যের এই শ্রেষ্ঠ গল্পকার, কবি, নাট্যকার, ও ঔপন্যাসিক। কিন্তু জন্ম মৃত্যু যে সৃষ্টিকর্তার হাতে, দীর্ঘদিন ফুসফুসে ক্যান্সারজনিত রোগে এই বছর ২৭ সেপ্টেম্বর ৮১ বছর বয়সে সাহিত‌্যের সব ক্ষেত্রে সদর্প বিচরণকারী সৈয়দ হক না ফেরার দেশে চলে যান।

 

স্নাতক পাসের আগেই ১৯৫৬ সালে  পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখে বেরিয়ে আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর ইংরেজি বিভাগ থেকে। এর কিছুদিন পর তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘’দেয়ালের দেশ’’ প্রকাশিত হয় ।

 

মহাকাব্যিক পটভূমিকায় বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ নামে  দীর্ঘ উপন্যাস যেমন তিনি লিখেছেন, তেমনি ছোট আকারের উপন্যাস লিখেছেন সমান তালে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে তাৎপর্যময় হয়ে উঠেছে তার ‘নিষিদ্ধ লোবান’সহ নানা উপন‌্যাসে। আয়না বিবির পালা’সহ ৫০টির বেশি উপন‌্যাস এসেছে তার হাত দিয়ে। 'খেলারাম খেলে যা’, ‘নীল দংশন’য়, ‘মৃগয়া’, ‘সীমানা ছাড়িয়ে’, ‘এক মহিলার ছবি’, ‘দেয়ালের দেশ’, ‘স্তব্দতার অনুবাদ’, ‘এক যুবকের ছায়াপথ’, ‘মহাশূন্যে পরানমাস্টার’, ‘তুমি সেই তরবারী’, ‘দ্বিতীয় দিনের কাহিনী’, ‘অন্তর্গত’, ‘এক মুঠো জন্মভূমি’, ‘শঙ্খলাগা যুবতী ও চাঁদ’, ‘বাস্তবতার দাঁত ও করাত’, ‘বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ’ তার অসামান্য রচনা।

 

পঞ্চাশ বছর যাবৎ তাঁর প্রায় শত সংখ্যক ছোট ও বড় গল্পের মধ্য দিয়ে অভিনতুন গল্পকলা তৈরি করে গেছেন। ১৯৫১ সালে 'অগত্যা' নামে একটি ম্যাগাজিনে তার প্রথম প্রকাশিত লেখাটি ছিল একটি গল্প। মার্কেজের যেমন মাকন্দো, দেবেশ রায়ের যেমন তিস্তা তেমনি সৈয়দ হকের হলো জলেশ্বরী। ধরলা পড়ের গল্পকার বললেও ভুল হবে না তাকে। ধরলা নদীকে তিনি ধরলা না বলে আধকোষা নামে ডাকতেন। আধকোষা মানে হচ্ছে যেটা এক মাইল। এক ক্রোশের অর্ধেক।  কুড়িগ্রামের পাশ দিয়ে ধরলা বয়ে গেছে , বর্ষার সময় এই ধরলা বিশাল নদী হতো। বর্ষার এই ধরলাই ছিলো কবির দেখা ছেলেবেলার বড় নদী।

 

ছোটগল্পে তিনি নিজের এলাকা উত্তরাঞ্চলের হতদরিদ্র মানুষের জীবনের মর্মন্তুদ ছবি একেছেন। গত শতকের ষাট, সত্তর ও আশির দশকে অনেক চলচ্চিত্রের চিত্রনাট‌্যের সঙ্গে চলচ্চিত্রের জন‌্য গানও লিখেছেন সৈয়দ হক। তার লেখা গান ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস’, ‘তোরা দেখ দেখ দেখরে চাহিয়া’, ‘চাঁদের সাথে আমি দেব না তোমার তুলনা’র মতো বহু গান এখন মানুষের মুখে ফেরে। তার নিষিদ্ধ লোবান উপন‌্যাস নিয়ে কয়েক বছর আগে গেরিলা নামে চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়।

 

শুধু নিজের হৃদয়ের শান্তির জন্য তিনি গল্প উপন্যাস লিখেননি বরং নিজের মগজের অক্লান্ত শ্রমের প্রতিদানে তিনি শিল্পকে সার্থকতা প্রদান করেছেন নিজের লেখায়। প্রকৃতির সাথে মিশে শব্দের ঝাল বুনেছেন, এনেছেন গল্পে কাঠামোগত বৈচিত্র্য। ভারত সীমান্ত পর্যন্ত উত্তরে চলে গেছে মান্দার বাড়ি, হরিশাল, হস্তিবাড়ি; দক্ষিণে নবগ্রাম, শকুনমারি, বুড়িরচর। উত্তর বাংলার পরিবেশ, গাছপালা, মানুষের সারল্য আর সংগ্রামকে ল্যান্ডস্কেপ করে সৈয়দ শামসুল হক তাঁর গল্পের ভুবন বিস্তৃত করেছেন। যে উত্তর বাংলার আরেক নাম মঙ্গা, সে উত্তর বাংলার অঘোষিত মুখপাত্র কথাকার সৈয়দ হক।

 

দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে তিনি সাহিত্যের সব শাখায় তার মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। বাঙ্গালি মধ্যবিত্ত সমাজের আবেগ-অনুভূতি-বিকার সবই খুব সহজ কথা ও ছন্দ তুলে এনেছেন নিজের লেখনীর কবিতা, গল্প, উপন্যাস এবং নাটকসহ শিল্প-সাহিত্যের নানা অঙ্গনে। গ্রামবাংলা সাধারণ মানুষের স্বপ্ন সাধনাকে তিনি নিজের করে দেখতে চেয়েছেন।

 

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান সৈয়দ শামসুল হক সম্পর্কে বলেন,,,,,
"সৈয়দ শামসুল হকের রচনায় সমসাময়িক বাংলাদেশকে তুলে ধরা হয়েছে। আগের বড় লেখকেরা সকলেই গ্রামকেন্দ্রিক উপন্যাস বা গল্প লিখেছেন। সৈয়দ শামসুল হক নতুন উদীয়মান মধ্যবিত্তের কথা ভালো করে বললেন এবং মধ্যবিত্ত জীবনের বিকারকেও তিনি ধরলেন"।

 

সৈয়দ শামসুল হকের জন্মদিনে প্রয়াত নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ একটি লেখায় লিখেছিলেন, "অনেকেই বলেন বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর আসনটিই সবার ওপরে, আমার বিবেচনায় সৈয়দ হকের অবস্থানটিই সর্বোচ্চে হওয়া উচিত"।

 

১৯৭০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থ, বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা। আধুনিক সময়ে কোন কবির এত দীর্ঘ কবিতা বেশ বিরল। তার এই কাব্যগ্রন্থের কারণে তিনি তখন আদমজী পুরস্কার লাভ করেন।

 

অসামান্য প্রতিভাধর এই সাহিত্যিক তাঁর সারাজীবন এই বাংলার প্রতি কৃতজ্ঞ থেকেছেন। দায়বদ্ধ থেকেছেন। বাংলা, বাঙালি, বাংলাদেশ যার রক্তকণিকার ভেতর প্রবহমান ছিল। আদর্শ আর নীতিবোধের জায়গা থেকে সরে যাননি এক চুলও। বাংলাদেশের যেকোন আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি নানাভাবে জড়িয়ে ছিলেন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতি অবিচল থেকেছেন।

 

বর্ণাঢ্য লেখকজীবনের অধিকারী সৈয়দ হক। কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, কাব্যনাট্য, চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য, চলচ্চিত্রের গান – যা লিখেছেন সবকিছুতেই পেয়েছেন জনপ্রিয়তা, সাফল্য। তাই পুরস্কার এর তালিকাও তাঁর অনেক দীর্ঘ। ১৯৬৪ বাংলা একাডেমী পুরস্কার, ১৯৬৬ আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৬৯ অলক্ত স্বর্ণপদক ,১৯৮২ আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৮৩ কবিতালাপ পুরস্কার,  ১৯৮৩ লেখিকা সংঘ সাহিত্য পদক, ১৯৮৩ একুশে পদক, ১৯৮৪ জেবুন্নেসা-মাহবুবউল্লাহ স্বর্ণপদক, ১৯৮৫ পদাবলী কবিতা পুরস্কার, ১৯৮৭ নাসিরুদ্দীন স্বর্ণপদক, ১৯৯০ টেনাশিনাস পদক, ১৯৯০ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, চিত্রনাট্য, সংলাপ ও গীতিকার মযহারুল ইসলাম কবিতা পুরস্কার ২০১১ পান তিনি।

 

লেখক: সাহিত্যিক, কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক