Berger Paint

ঢাকা, রোববার   ২৯ নভেম্বর ২০২০,   অগ্রাহায়ণ ১৫ ১৪২৭

ব্রেকিং:
নাইজেরিয়ায় ৪৩ শ্রমিককে একসঙ্গে গলা কেটে হত্যা
সর্বশেষ:
মন্টেনিগ্রো-সার্বিয়ায় পাল্টাপাল্টি রাষ্ট্রদূত বহিষ্কার হঠাৎ বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী , ২৮ দিনে আক্রান্ত ৫০৭ বৃটেনে ভ্যাকসিন বিষয়ক মন্ত্রী হলেন নাদিম জাহাওয়ী

পলিথিন ও প্লাস্টিক, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের নীরব ঘাতক

আবু ফারুক

প্রকাশিত: ২৭ অক্টোবর ২০২০  

পঠিত: ৩১৮
ছবি- সংগৃহীত

ছবি- সংগৃহীত



পৃথিবীতে আমরাসহ যাবতীয় প্রাণীকুলের বেঁচে থাকার জন্য যাবতীয় অপরিহার্য উপাদান অক্সিজেন, পানি, খাবার, ওষুধপত্র ইত্যাদি পরিবেশই আমাদের যোগান দেয়। এসবের মানবসৃষ্ট বিকল্প কোনো উৎস নেই। তাই পরিবেশ আমাদের অকৃত্রিম বন্ধু বলে নির্দ্বিধায় বিবেচিত । সুতরাং বন্ধু পরিবেশের বায়বীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষা, ভারসাম্য ও উন্নয়নে সম্পূর্ণ দায়-দায়িত্ব আমাদেরই। অথচ আমাদের নানাবিধ কার্যকলাপে প্রতিনিয়ত নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের স্বাভাবিকতা। যার নেতিবাচক পরিণতিও আমাদের সামনে বর্তমান। পরিবেশ দূষণের বিবিধ কারণ ও তার প্রভাবে জলবায়ু পরিবর্তনসহ প্রাণীজগতের স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনা থেমে নেই। পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যেমন পানি, বায়ু, মাটি ইত্যাদি দূষণের পরিণামে জলবায়ুর অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন পৃথিবী ও মানবজাতির জন্য কতোটা হুমকির তা নতুন করে বলা নিষ্প্রয়োজনই। বিশে^র নানা দেশের ন্যায় বাংলাদেশের পরিববেশও মারাত্মক দূষণের শিকার। নদীমাতৃক বাংলাদেশের সিংহভাগ নদী তার স্বরুপ হারিয়েছে। নাব্যতা নষ্ট হয়ে পরিণত হয়েছে সরু খালে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই নদীর উপচে উঠা পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দুই পাশের স্থাপনাসহ সংশ্লিষ্ট সবকিছুই। আবার, নালা-নর্দমার জলাবদ্ধতার চিত্র বেশ পুরাতন। প্রচুর ময়লা-আবর্জনা ও পরিত্যক্ত সামগ্রীর দরুণ শহর-বন্দরের নালা-নর্দমায় জলাবদ্ধতার কারণে প্রতি বছর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও কম নয়। জীবনের অপর নাম বলে অভিহিত পানি দূষণের মাত্রা তো নিয়তই বাড়ছে। সবকিছুর প্রভাবে আমাদের চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট, ক্যান্সার, বন্ধ্যাত্ব ইত্যাদির মতো নানা জটিল শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
একটি দেশের মোট আয়তনের শতকরা ২৫ ভাগ বনভূমি থাকার শর্ত পূরণ থেকে আমরা কখনোই পূরণ করতে পারি নি। এর উপর অপরিকল্পিত নগরায়ন, অবৈজ্ঞানিক উন্নয়ন এবং নিয়ত বর্ধমান জনসংখ্যার বাসস্থান ও অনিবার্য সব চাহিদা পূরণের স্বার্থে দিন দিন কমছে বহুল কথিত ১৭ ভাগ বনভূমির পরিমাণ। নানা কারণে নষ্ট হচ্ছে মাটির উর্বরতাও। ময়লা-আবর্জনার ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়নের ধারেকাছেও আমরা এখনও যেতে পারি নি। প্রতিদিন কয়েক হাজার টন ময়লা-আবর্জনা ও পরিত্যক্ত সামগ্রী উন্মুক্ত স্থানে পুড়িয়ে নষ্ট করা হচ্ছে নয়তো খাল-বিল, ডোবা-নালা ইত্যাদিতে ফেলা হচ্ছে। ফলে একইসাথে যেমন বিশুদ্ধ বাতাস তার স্বাভাবিকতা হারাচ্ছে তেমনি দূষিত হচ্ছে ব্যবহারযোগ্য পানিও। বিশ্বব্যাংকের এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, ঢাকার বায়ু দূষণের কারণে প্রতিবছর পাঁচ সহস্রাধিক লোক মারা যায়। করোনা সংক্রমণের কারণে ২ মাসেরও বেশি সময় পরিবহনসহ সিংহভাগ কাজকর্ম এবং মানুষের অবাধ চলালচ বন্ধ থাকা অবস্থায়ও রাজধানীর বায়ু দূষণের মাত্রা ছিল আশঙ্কাজনক। তথ্যমতে, কেবল বায়ু দূষণের কারণে বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৫ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারায়। শিশু, বৃদ্ধসহ কোটি মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে বায়ু দূষণজনিত নানা রোগে প্রাকৃতিক পরিবেশের তিনটি অপরিহার্য উপাদান (মাটি, পানি ও বায়ু) দূষিত হওয়ার ক্ষেত্রে সিংহভাগ দায় আমাদের নানা কাজে ব্যবহৃত নিষিদ্ধ পলিথিনের। প্লাস্টিকের দায়ও কোনো অংশে কম নয়। বাজারে সহজলভ্য যেসব পলিথিন নিত্য উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহার করা হচ্ছে তা ১০০ বছরেও নষ্ট হয় না। ফলে মাটিতে থেকে এটি মাটির উর্বরতা নষ্ট করছে। একইসাথে আগুনে পুড়িয়ে নতুনভাবে পলিথিন বা প্লাস্টিক উৎপাদনের ফলে উৎপন্ন বিষাক্ত ধোঁয়া কার্বন মনোঅক্সাইড নির্বিঘ্নে বায়ুর বিশুদ্ধতাকে ধ্বংস করছে। সড়কের পাশের নালা-নর্দমায় সৃষ্টি করছে জলাবদ্ধতার। হ্রাস করছে নদ-নদীর নাব্যতা। এছাড়া বিপুল পরিমাণ পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য নদীর মাধ্যমে সরাসরি সাগরে জমা হয়ে সাগরের পানি ও সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করছে।  আর এসবের প্রত্যক্ষ ফলাফল বা প্রভাব আমাদের পরিবেশ ও জীবনের জন্য কতোটা ক্ষতিকর তা সহজেই অনুমেয়। সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কে নোংরা পানির স্রোত, নাব্যতা সংকটের ফলে নদীর ধারের বসতি ও অন্যান্য স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি, বাতাসে বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতি বেড়ে যাওয়া, শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সকল বয়সের মানুষের শ্বাসজনিত সমস্যা ও অন্যান্য রোগ বৃদ্ধি, জমির উর্বরতা কমে ফলনের পরিমাণ কমানো এবং তার বিপরীতে বিষাক্ত কীটনাশক প্রয়োগ করে ক্ষতি লাঘবের অসাধু কার্যকলাপ বৃদ্ধির নেপথ্যে পলিথিন ও প্লাস্টিকের দায় অস্বীকার করার উপায় নেই। পলিথিন ও প্লাস্টিক আমাদের জীবন রক্ষাকারী পরিবেশের জন্য প্রাণঘাতী বিষ। সার্বিক পরিস্থিতি ও বিপর্যয়কর পরিণতি বিবেচনায় নিয়ে উচ্চ আদালত একবার ব্যবহার যোগ্য সর্বনাশা এই পলিথিন বা প্লাস্টিক সামগ্রী এক বছরের মধ্যে বন্ধের নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু রাজধানী ও তার আশেপাশের এক হাজারেরও বেশি কারখানায় নিষিদ্ধ পলিথিন উৎপাদন করা হয়। যেসব পলিথিন বাজারজাতকরণ করা হচ্ছে সারা দেশে।

 

এতসব নেতিবাচক ফলাফল আমলে নিয়ে এবং বিশ^ব্যাপী প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে ২০০২ সালে তৎকালীন সরকার সর্বপ্রথম দেশে পলিথিন নিষিদ্ধ করে। তার আট বছর পর অর্থাৎ ২০১০ সালেও সরকারের পক্ষ থেকে পলিথিনের ব্যবহার বন্ধে আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরিবেশ অধিদপ্তরও সময়ে সময়ে আইনানুগ তদারকি ও জরিমানা আদায়ের মাধ্যমে সর্বনাশা পলিথিন উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহার বন্ধের চেষ্টা করে যাচ্ছে। অনেক আগে থেকেই সোচ্চার আছে পরিবেশ রক্ষা সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি বেসরকারি সংগঠনও। পলিথিন ও প্লাস্টিক-বর্জ্য উৎপাদনে বিশে^র প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান দশম। বর্তমান বাজারে ১ টাকা মূল্যের চকলেট বা চুইংগাম থেকে শুরু করে লাখ টাকা মূল্যের সামগ্রী মোড়কে এবং বহনে সহজলভ্য পলিথিনের ব্যবহার দৃশ্যমান। বিকল্প সামগ্রী না থাকায় মানুষ পলিথিন ব্যবহারে বাধ্য। আর ব্যবহার শেষে পরিত্যক্ত এসব পলিথিন যত্রতত্র ফেলা হচ্ছে। এতে করে বিপর্যয় বাড়ছে বন্ধু পরিবেশের। সমন্বয়হীন অভিযান সাময়িকভাবে পলিথিনকে আড়ালে লুকাতে বাধ্য করলেও এর স্থায়ী অস্তিত্ব ধ্বংস করতে অক্ষম। তাই পলিথিন ব্যবহারে ক্রেতা ও ভোক্তাদের নিরুৎসাহিত করার আগে বন্ধ করতে হবে এর উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ। এক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকাই মুখ্য।

 

পরিবেশের অন্যতম শত্রু পলিথিনের বেসামাল দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হলে প্রণীত আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি খাদ্য ও অন্যান্য সামগ্রী মোড়ক ও বহনের নিমিত্তে পলিথিনের বিকল্প পরিবেশবান্ধব বিকল্প কিংবা পচনযোগ্য পলিথিন উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা নিশ্চিত করতে হবে। পলিথিন ও প্লাস্টিক সামগ্রীর ব্যবহার বন্ধে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম নিয়মিত ও জোরদার করতে হবে। বৃহৎ পরিসরে জনসাধারণের মধ্যে পলিথিন ও প্লাস্টিকের ধ্বংসযজ্ঞের ব্যাপারে সচেতনতা পরিবেশ রক্ষায় সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। গণমাধ্যম  এবং সাম্প্রতিক সময়ে বহুল ব্যবহৃত ও জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সচেতনতা সৃষ্টিতে শক্তিশালী ও সময়োপযোগী মাধ্যম হতে পারে। একইসাথে দেশের গৃহস্থালী ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের পরিত্যক্ত পলিথিন ও প্লাস্টিক-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সময়োপযোগী আধুনিক পরিকল্পনা গ্রহণ সময়ের অন্যতম দাবি। উন্নত রাষ্ট্রগুলোর আদলে পরিবেশ বান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য সরকারকে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। পরিবেশ বিপর্যয়ের জন্য আমাদের চেয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মই বেশি দুর্ভোগ পোহাবে। আমাদের সর্বোচ্চ সচেতনতা এবং প্রচলিত আইনের কঠোর প্রয়োগই বর্তমান ও ভবিষ্যতের পরিবেশকে সুরক্ষিত করতে পারে। প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ। তবেই ভালো থাকবে আমাদের সবসময়ের প্রকৃত মিত্র পরিবেশ।

 

(শিক্ষক ও ফ্রিল্যান্স লেখক)
সহকারী শিক্ষক
ভাগ্যকুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
সদর, বান্দরবান।

 

এই বিভাগের আরো খবর