Berger Paint

ঢাকা, রোববার   ০৭ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ২৪ ১৪২৭

ব্রেকিং:
দেশের ৫০ জেলা পুরোপুরি লকডাউন, ১৩ জেলা আংশিক
সর্বশেষ:
করোনায় বিপর্যস্ত স্পেনকে ছাড়িয়ে পঞ্চমে ভারত চট্টগ্রামে আরও ১৫৬ জনের করোনা শনাক্ত বাজেট অধিবেশনের আগেই সব এমপির করোনা টেস্ট রুবানা হক শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দেননি: বিজিএমইএ বান্দরবানে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিংসহ নয়জনের কোভিড-১৯ রোগ শনাক্ত হয়েছে।

পাহাড়ের প্রাণের উৎসবে করোনার ধূসর ছায়া

মুকুল কান্তি ত্রিপুরা

প্রকাশিত: ১৬ এপ্রিল ২০২০  

পঠিত: ৮৫৭
মুকুল কান্তি ত্রিপুরা। ছবি- প্রতিদিনের চিত্র

মুকুল কান্তি ত্রিপুরা। ছবি- প্রতিদিনের চিত্র


“তুরু রুতু তুরু রু সুমুর সুপতিয়ৈ, পাড়া পাড়া বেড়েইন বাকসা মিলিয়ৈ” অর্থাৎ তুরু রুতু তুরু রু বাঁশি বাজিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরবো সবাই মিলে। ককবরক ভাষায় রচিত এমন সুমধুর গানের মতো পাহাড়ে রয়েছে আরো অনেক গান, যেগুলোর সুরে সুরে পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী প্রাণের উৎসবগুলো জমে উঠার কথা ছিল ঠিক প্রত্যেক বছরের ন্যায় এবারের বর্ষের সংক্রান্তি অথবা নববর্ষতেও। কথা ছিল পাহাড়ের প্রতিটি গ্রামের আবাল, বৃদ্ধ, বনিতার হৃদয়ে সঞ্চারিত হবে প্রাণের উৎসবের আমেজ। কোথাওবা সুমধুর সুরে বেজে উঠবে “সাংগ্রাইমা ঞি ঞি ঞা ঞা” আবার কোন কোন পাহাড়ে ধ্বনিত হবে বিঝুর গান। গঙ্গা জলে ভাসানো ফুলগুলো রাঙিয়ে তুলবে জলরং। জমবে সুংগুই বা ঘিলা খেলার আসর অথবা গরিয়া দেবতার স্তুতির জন্য পাহাড়ের গ্রামগুলোতে বাইশ তালের অসাধারণ নৃত্য। আবার কোন এক মারমা গ্রামে জমে উঠার কথা ছিল প্রাণবন্ত যুবক-যুবতীর জলকেলী উৎসব বা পানিখেলা। কিন্তু একটি নিরবতা, একটি স্তব্ধতায় যেন হারিয়ে গেল উচ্ছ্বাসের এই দিনগুলো। মনে হয় একদম অচেনা কোন এক অতিশয় শৃঙ্খলিত জনপদের উৎসব। তবে প্রকৃতি থেমে নেই প্রাণের এ উৎসবে মেতে উঠতে । এমনকি সব বাধা উপেক্ষা করে বসন্তের শেষ আর গ্রীষ্মের শুরুর সময়টাকে যেন উপভোগ্য করে তুলেছে সারি সারি পাহাড়, তীব্র গতিময় ঝর্ণাধারা, চিরকাল বহমান নদী, চারদিকে পাহাড় ঘেরা হ্রদ, গহীন অরণ্য, শিমুলের লাল হলুদের সমারোহ, সবুজাভ বৃক্ষরাজির পত্রগুলো। এককথায় পাহাড়ের প্রকৃতির রূপকে রাঙিয়ে তুলেছে পুরোটাই অনন্যরূপে। তাই করোনার অদৃশ্য ছায়ায় ম্লান হয়ে যাওয়া উৎসবগুলোর সজীবতা ফিরিয়ে আনতে প্রকৃতির এমন ভূমিকাও নিতান্ত কম নয়। দেখিয়েছে আশার আলো, যুগিয়েছে অনুপ্রেরণা। ভাতৃত্ববোধ জেগেছে ডিজিটাল এ উৎসবে।  হোক না সেটা নিজের ঘরে নিজের মতো করে।

 

বলছি পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী প্রধান সামাজিক উৎসব বৈসুক, সাংগ্রাই, বিঝু, বিষু, বিহু, সাংক্রানসহ বিভিন্ন নামের বর্ষ সংক্রান্তি ও নববর্ষের উৎসব পালনের কথা। স্মরণাতীত কাল থেকে পাহাড়ের মানুষ যে উৎসবটি বেশ বর্ণাঢ্য আয়োজনে পালন করতো, বিশ^ব্যাপী আক্রমণকারী ‘কোভিড-১৯’ সংক্রমণ রোধে সেই ঐতিহ্যবাহী প্রধান সামাজিক উৎসবটির চিরাচরিত নিয়ম ভেঙ্গে পালন করতে হলো নিজ নিজ বাড়িতে অত্যন্ত সীমিত পরিসরে। বলা যায় এমন ভিন্ন রূপের উৎসব পাহাড়ের ইতিহাসে বরাবরই বিরল। এই অঞ্চলের ত্রিপুরা, চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, রাখাইন, খুমী, ম্রো, মুরং, চাক, খেয়াং, গুর্খা, অহমীয়াসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পার্বত্য অঞ্চলের সংস্কৃতিকে করেছে আরো বৈচিত্র্যময়। আর এই জনগোষ্ঠীর ভিন্ন ভিন্ন নামে পালিত হওয়া বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ উৎসবটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি শ্রেষ্ঠ উপাদান। প্রতি বছর অনেক আনন্দ, উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে বহু বর্ণাঢ্য আয়োজনে পালিত হয় এই উৎসবটি।  এই উৎসব বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নিকট ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। যেমন- ত্রিপুরারা বলে বৈসুক বা বৈসু, মারমারা বলে সাংগ্রাই বা সাংগ্রাইং, চাকমারা বলে বিঝু বা বিজু, তঞ্চঙ্গ্যারা বলে বিষু, অহমিয়ারা বলে বিহু আবার ম্রোরা বলে সাংক্রান ইত্যাদি। আবার তিনটি উৎসবের আদ্যাক্ষর নিয়ে তৈরি ‘বৈসাবি’ নামও বেশ প্রচলিত। ‘বৈসুক’ নাম থেকে ‘বৈ’,  ‘সাংগ্রাই’ নাম থেকে ‘সা’ আর ‘বিঝু’ নাম থেকে ‘বি’ নিয়ে নামকরণ করা হয়েছে ‘বৈসাবি’। বছরের ৩৬৫ দিন পরিক্রমা শেষে সংক্রান্তির সময়কালে অথবা বছরের নতুন দিনে নিজ নিজ জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি অনুযায়ী নানা আয়োজনে এই উৎসবগুলো পালিত হয়ে থাকে। মূলত এপ্রিলের ১২, ১৩ ও ১৪ তারিখে তিন দিন ধরে এই উৎসবটি পালিত হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্ব স্ব জাতিগোষ্ঠীর বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী তারিখগুলো একটু এদিক ওদিকও হয়ে থাকে। যেমন- ত্রিপুরারা তিন দিন ধরে বৈসুক উসব পালন করে থাকে। তাদের মধ্যে অনেকেই ভারতীয় পঞ্জিকা অনুযায়ী ২৯ ও ৩০ চৈত্র এবং ১ বৈশাখ। ত্রিপুরাদের নিজস্ব বর্ষপঞ্জির নাম ত্রিপুরাব্দ যা যার বয়স বঙ্গাব্দ থেকেও তিন বছরের বড় যা বর্তমানে ১৪৩০ চলমান।  প্রথম দিন  হারি বৈসুক, দ্বিতীয় দিন বৈসুকমা এবং তৃতীয় দিন বিসিকাতাল বা আতাদাক নাম দিয়েই ত্রিপুরারা নানা আয়োজন করে থাকে এই উৎসবে। যেমন, হারি বৈসুকের দিনে ভোরে উঠে ফুল তোলে ফুলগুলো মালা গেঁথে বাড়ির দরজায় টাঙিয়ে দেওয়া হয় এবং গঙ্গাজলে ফুলের পুজো করে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। গৃহপালিত পশু ও পাখির প্রতি শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি প্রদর্শণ করে পশুর গলায় ফুলের মালা পরিয়ে দেয় এবং ভালো খাবার পরিবেশন করে। অনেকে পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে হাঁস মুরগীদের জন্য খাদ্য শস্য চাউল , ধান ও তিল ছিটিয়ে দিয়ে আসে। সামর্থবান লোকেরা এ দিনে গরীবদের মাঝে দান দক্ষিণা প্রদান করে । আর বৈসুকমার দিনে বাড়িতে হরেক রকমের খাবারের আয়োজন করা হয় । বিশেষ করে উলেখযোগ্য খাবারটি হলো অনেকগুলো সবজির মিশ্রণ যাকে বলা হয় গন্টক, গন্দ অথবা পাঞ্চন তরকারী। পাহাড়ের শিশু, কিশোর, নর-নারী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা সকলেই দলে দলে ঘুরে বেড়ায় এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে, এক পাড়া থেকে আরেক পাড়ায় এবং এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় । আবার আতাদাক বা বিসিকাতালের দিনটি ত্রিপুরাদের জন্য নতুন  বছরের দিন। সেদিন সকালে পরিবার বা গ্রামের বয়োবৃদ্ধদেরকে ম্লান করিয়ে প্রণাম করে থাকে পরিবার তথা গ্রামের অনেকেই। অনেকেই পূজা পার্বনের মধ্য দিয়ে জগতের মঙ্গল কামনা করে থাকেন সেদিন। অরো অনেক মনোমুগ্ধকর আয়োজন থাকে এ উৎসবে। আবার অন্যদিকে চাকমারা এই তিন দিন পালন করে থাকে ফুল বিঝু, মূল বিঝু ও গজ্যা পজ্যা বিঝু নামে। চাকমারাও এই উৎসবটি পালন করে থাকে নানা আয়োজনে। ঠিক তেমনি মারমা, তঞ্চঙ্গ্যাসহ সকলেই যার যার নিয়ম অনুযায়ী পালন করে থাকে। তবে এই উৎসবগুলোর মধ্যে কয়েকটি আমার কাছে যে আয়োজনগুলো খুব বেশি উল্লেখযোগ্য মনে হয় সেগুলো হল- গঙ্গাজলে ফুল ভাসানো, গরিয়া দেবতার স্তুতির জন্য ২২ তালের নৃত্য, জলকেলি উৎসব বা পানি খেলা ইত্যাদি। এমনকি আধুনিককালে দেখা যায় অনেক জনগোষ্ঠী অনেক বড় আয়োজনে একটি নির্দিষ্ট স্থানে ঐতিহ্যবাহী খেলাধূলার আসর, কবিতা পাঠের আসর, নৃত্য-সংগীতের আসরের অনুষ্ঠান করে থাকে যা  বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বৃহৎ মিলন মেলার এক অনন্য আয়োজন। কিন্তু এসব পালিত হয়নি এবারে। ঘরের বাইরে কোন আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ তথা  বিশ^ব্যাপী করোনার সংক্রমণে স্থগিত সমস্ত আয়োজন। এখনও পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকারিভাবে করোনায় আক্রান্ত রোগী পাওয়া না গেলেও এর সংক্রমণ রোধ করার কঠোর পদক্ষেপ হিসেবেই এমন সিদ্ধান্ত হয়তোবা। এ যেন করোনার ধূসর ছায়ায় পালন করতে হল তাদের এই প্রাণের উৎসবটি পাহাড়বাসী।

 

অবৈধ অনুপ্রবেশকারী করোনা ভাইরাস অর্থাৎ ‘COVID-19’ ২০১৯ সালের শেষের দিকে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে জন্ম নেওয়ার পর রাতারাতি বংশবিস্তার করতে সক্ষম হয়। খুবই শক্তিশালী ও ক্ষমতাধর এই ভাইরাসটি শুধু চীনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, ঘুরে বেড়িয়েছে পৃথিবীর প্রায় সব দেশে এবং বাহক হিসেবে ব্যবহার করেছে মানব জাতিকে। তার কাছে কোন নির্দিষ্ট জাতি, ধর্ম অথবা বর্ণের জায়গা নেই। বলা যায় পৃথিবীর সকল দেশ ও সকল জাতির মানুষের দেহের উপর ভর করে স্বাধীনতার বিজয় কেতন উড়াতে উড়াতে বর্তমানে প্রায় পুরো পৃথিবীই তার দখলে। প্রায় বিশ লক্ষাধিক মানুষের শরীরে জায়গা করে নেওয়া এই ভাইরাসটি কেড়েও নিয়েছে লক্ষাধিক মানষের প্রাণ। তাই সচেতন মনে হোক আর অবচেতন মনে হোক সাধারণ মানুষের মনে যে ধারণাটি সবচেয়ে ভয়াবহ সেটি হল, বর্তমানে কোভিড-১৯ মানেই একটি মারণভাইরাস, আর শরীরে এই ভাইরাসের আক্রমণ থাকা মানেই যে কোন মুহূর্তে একজন রোগী পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে পারে। যদিও ধারণাটা একেবারেই সঠিক নয়। তবে এমন ধারণার উদ্রেক হওয়ার পেছনে যে বিষয়টি প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করেছে সেটি হল পৃথিবীতে এখনও পর্যন্ত এই রোগের প্রতিষেধক আবিষ্কার করতে না পারাটা। কারণ এই থেকে প্রমাণিত হয় যে পৃথিবীতে এখনও পর্যন্ত একজন মানুষও নেই যে করোনাকে কোন এক প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিন দিয়ে সহজেই মেরে ফেলতে পারবে। যদিও বিভিন্ন সময় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিভিন্ন দেশের সরকারের পক্ষ থেকে অভয় বানী শুনতে পাই। তাঁরা জনসাধারণকে সচেতন করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপও গ্রহণ করেছেন। হ্যাঁ বিভিন্ন দেশে তাই হচ্ছে । যতজন করোনায় সংক্রমিত হয়েছে তার মধ্যে অধিকাংশই সুস্থ হয়ে বড়িতেও ফিরছে। এমনকি কিছু কিছু দেশের বিজ্ঞানীদের প্রতিষেধক আবিষ্কারের প্রচেষ্টার খবরগুলোও কিছুটা আশার আলো সঞ্চারিত করে প্রাণে।  তাই বলতে দ্বিধা নেই করোনা মানেই আতঙ্ক নয়, একটু সচেতন থাকলে করোনাকে অবশ্যই জয় করা সম্ভব।

 

এই কোভিড-১৯ বিশ^ ভ্রমণ করতে করতে বাংলাদেশে এসে পৌঁছতে সময় নিয়েছিল প্রায় দুই মাস অথবা তারও একটু বেশি। যদিও নির্দিষ্ট করে করোনার আগমনের তারিখ বলাটা মুসকিল। কেননা দেশে প্রথম করোনায় আক্রান্ত রোগীর সনাক্তকরণ হয়েছিল বিগত ৮ মার্চ। হতে পারে ৮ মার্চের আগেই রোগীটি দেশে ফিরেছে অথবা এমনওতো হতে পারে যে ঐ রোগীর করোনা টেস্ট করার পূর্বে টেস্ট করা হয়নি এমন আরো অন্য কারো না কারোর শরীরে কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ ছিল। ৮ মার্চ থেকে আজ ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশের সরকারি হিসাবে পাওয়া গেল মোট  ‘COVID-19’ আক্রান্তের সংখ্যা ১৫৭২ জন, মোট মৃত্যু ৬০ জন। যাহোক, প্রথমদিকে সকলের মনে একটু ডিলেঢালা মনোভাবের জন্ম হলেও মার্চ মাসেই বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে কোভিড-১৯ সংক্রমণ রোধ করার চেষ্টা করে। এমনকি বিগত ১৭ মার্চ দেশের স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারিভাবে গৃহিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানও স্থগিত বা বন্ধ করে দিয়েছিল সরকার অথবা সীমিত পরিসরে পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। যেমন দেশে আরেকটি বড় ধরণের অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল ২৬ মার্চ দেশের মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে।  মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এমন জাতীয় দিবস পালনেও পিছপা হয়েছিলেন শুধুমাত্র জনস্বার্থের কথা চিন্তা করে অর্থাৎ কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ ঠেকাতে।  ঠিক এমনই সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে আরেকটি স্থগিতাদেশ জারি হলো ‘বৈসাবি ও  নববর্ষের সকল অনুষ্ঠানের উপর স্থগিতাদেশ। বলা হলো ডিজিটাল পদ্ধতিতে নিজ নিজ ঘরে থেকে এমন প্রাণের উৎসবটি পালন করতে। বিগত ১ এপ্রিল ২০২০ তারিখে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব অসীম কুমার দে এর স্বাক্ষরিত একটি নোটিশে জনসমাগম না করে ঘরোয়াভাবে বৈসাবি পালনের অনুরোধ জানানো হলো। উক্ত নোটিশের বিষয় ছিল “তিন পার্বত্য জেলায় ‘বৈসাবি ১৪২৭’ বা এতদসময়ে সকল ধরণের অনুষ্ঠান/কার্যক্রম স্থগিতকরণ” এবং বিবরণে ছিল “উপর্যুক্ত বিষয়ে নির্দেশক্রমে জানানো যাচ্ছে যে, করোনাভাইরাস জনিত রোগ (কোভিড-১৯) এর বিস্তার রোধকল্পে জনসমাগম পরিহার করার লক্ষ্যে আসন্ন ‘বৈসাবি-১৪২৭’ বা এতদসময়ে সকল ধরণের অনুষ্ঠান/কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। তবে যে কোন ধরণের জনসমাগম পরিহার করে সম্ভাব্য ক্ষেত্রে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ‘বৈসাবি-১৪২৭’ পালন করা যেতে পারে” এবং আরো বলা হয় “বর্ণিত অবস্থায়, আলোচ্য বিষয়ে যথাযথভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো।” তবে এমন সংবাদে পাহাড়ের মানুষ খুব বেশি হতাশ হয়নি এবং আনন্দিতও নয়। প্রয়োজনটা যততা না উৎসব পালন তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন জীবন বাঁচানোর হলেও যুগ যুগ ধরে নানা আয়োজনে পালন করে আসা পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী এই প্রধান সামাজিক উৎসবকে এমন সংযমের সাথে পালনে পাহাড়বাসী যেমন অভস্থ্য নয় তেমনি যথাযথ ঐতিহ্য লালনেও ব্যাঘাত ঘটার সম্ভাবনা বেশি থেকে যায় । আর এমন সময়ের জন্য কখনোই প্রস্তুত ছিল না পাহাড়বাসী। তবে দেশের মানুষের জীবন তথা নিজের জীবন বাঁচানোটাই যখন মূখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে তখন উসবের চিত্রটা এমন হওয়াটাও অস্বাভাবিক কিছু নয়। অন্যদিকে বিগত ০৩ এপ্রিল ২০২০ তারিখে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের মাঠ প্রশাসন সমন্বয় শাখার উপসচিব মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ৩১ দফা নির্দেশনাসমূহ প্রতিপালনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয়। সেখানেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ৩১ টি দফার মধ্যে ১৮ নং দফায় উল্লেখ করা হয় যে, “জনস্বার্থে বাংলা নববর্ষের সকল অনুষ্ঠান বন্ধ রাখতে হবে, যাতে জনসমাগম না হয়। ঘরে বসে ডিজিটাল পদ্ধতিতে নববর্ষ উদযাপন করতে হবে।” অর্থাৎ সমগ্র বাংলাদেশে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানটিকে জনসমাগম এড়িয়ে একদম সীমিত পরিসরে ঘরে বসে ডিজিটাল পদ্ধতে উৎসব পালনেই বেশি জোড় দিয়েছেন সদাশয় সরকার। তবুও বাংলাদেশ সরকারের এমন বিজ্ঞপ্তিগুলোতে জনমানুষের নেই কোন অভিযোগ অথবা নেই কোন প্রতিবাদ। কেননা এমন নিষেধাজ্ঞা একান্ত জনগণের প্রয়োজনে। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এ বছরের মতো এমন একটি অনুষ্ঠান না করে যদি দেশের মানুষ ভাল থাকে তাহলে কারইবা অভিযোগ থাকতে পারে। তাই সাধারণ জনগণ প্রতিবাদের বদলে বরং স্বাধুবাদ জানিয়ে নিজ নিজ ঘরে অবস্থান করেই এমন প্রধান সামাজিক উৎসব পালনে বেশ ব্রতী হয়েছিল বলা যায়।

 

পাহাড়ের মানুষ যে এই উৎসবটি একদমই পালন করেননি তা কিন্তু নয়। এই উৎসব পালনে যেহেতু দু’টি পথ খোলা ছিল সেহেতু সে দু’টি পথেই হেটেছে মানুষ। সেগুলোর প্রথমটি হল নিজ নিজ বাড়িতে যতটুকু সম্ভব বিভিন্ন আয়োজনে উৎসবটি পালন করা এবং দ্বিতীয়টি হল ডিজিটাল পদ্ধটিতে ফেইসবুক, টুইটার অথবা অন্যকোন মাধ্যমে শুভেচ্ছা বিনিময় ও অন্য কোন আয়োজনে উৎসবটি পালন করা। তাই প্রথমত তারা নিজ নিজ বাড়িতে পরিবারের যতজন সদস্য রয়েছে সবাইকে নিয়ে নানান প্রকার মুখরোচক খাবারের আয়োজন করেছে, পরিবারের বয়োবৃদ্ধদের ম্লান করিয়ে প্রণাম করেছে, গঙ্গাজলে নানান রঙের রঙিন ফুলগুলো ভাসিয়েছে নানান বয়সের মানুষ, পরিবার তথা জগতের মঙ্গলের জন্য মঙ্গল প্রদীপ জ¦ালিয়েছে তারা।  দ্বিতীয়ত, বর্তমানে বাংলাদেশ তথা বিশে^র অনেক জনপ্রিয় একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মার্ক জুকারবার্গের ফেইসবুকেও পড়েছিল শুভেচ্ছা বিনিময়ের হিড়িক। অনেকের অনেক সুন্দর ও কাব্যিক ভাষায় স্ট্যাটাস প্রদান অথবা ছবি ও ভিডিও আপলোড এবং সেগুলোতে বন্ধুমহলের নানারকমের কমেন্ট, লাইক প্রদান ইত্যাদি। যেমন- জনপ্রিয় কন্ঠশিল্পী ও সাহিত্যিক শ্রীমতি অনামিকা ত্রিপুরা ১৪ এপ্রিল পোস্ট করেছেন ১৯৯৮ সালের স্বরচিত ও সুরারোপিত গান “আজ আমাদের বৈসাবি দিন”।  আবার অনেকেই শুভেচ্ছা বিনিময় করেছিল ম্যাসেঞ্জারে বিভিন্নরকমের ম্যাসেজ প্রদানের মাধ্যমে। এছাড়াও অনেকেই গ্রুপ ও পেইজে নানান রকম শেয়ারিং এর মাধ্যমে পালন করেছে এবারের বৈসুক, সাংগ্রাই, বিঝু, বিষু, বিহু ও সাংক্রান উৎসবের মতো বিভিন্ন নামের বর্ষ সংক্রান্তি ও বর্ষ বরণের উৎসবগুলো। এতে দেশে-বিদেশে থাকা পাহাড়ের অনেক মানুষ অংশগ্রহণ করেছে অনেক আনন্দে। প্রাণ খুলে গেয়েছে গান। জানিয়েছে শুভেচ্ছা। যেমন- শ্রী পল্লব চাকমার পরিচালনায় একটি পাবলিক গ্রুপ ‘Digital Biju-Boisu-Sangrai-Bisu 2020’ এ বেশ আনন্দের সাথে নিজ নিজ ঘরে প্রাণের উৎসবটি পালনের স্থিরচিত্র অথবা ভিডিও চিত্র শেয়ার বা আপলোড করতে দেখা যায়। যেমন গেয়েছে বাংলাদেশ তথা আন্তর্জাতিক মর্যাদাসম্পন্ন একজন ব্যক্তি চাকমা সার্কেল চীফ ব্যারিস্টার Raja Devasish Roy গেয়েছেন- “শাওন ফুরি যিইয়িগই”। রাজাবাবু আরো গেয়েছেন কুমার সমিত রায়ের লেখা ও সুর করা গান  “দগিনো বুয়ের বাহ্র”। শ্রী Binota M Dhamai এই গ্রুপে ১৪ এপ্রিল সকাল ১০: ১১ টায় লিখেছেন- “শুভ গজ্যা-পয্যা দিন এবং বাংলা নববর্ষ। সবাইকে অফুরন্ত ভালবাসা। আগামীর দিনে আমাদের সকলের জীবনে বয়ে নিয়ে আসুক অনাবিল আনন্দ। সহবাই সুস্থ থাকুন, ভাল থাকুন, নিরাপদে থাকুন।” অস্ট্রেলিয়ার প্রবাসী শ্রীমতি Rajeshware Roaza এই গ্রুপে ১৪ এপ্রিল লাইভে এসে সবাইকে বৈসাবি ও নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে গেয়েছেন শ্রী জীবন রোয়াজার কথা ও সুর করা গান “ফাইদি ফাইদি ওহ ববই বৈসু বেড়াইনি, বৈসু বেড়াইনি ববই বৈসু বেড়াইনি।” আবার শ্রী Abhilash Tripura ও সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে গেয়েছেন প্রয়াত কুমার সমিত রায়ের গান একটি সুমধুর গান “সাজন্যা তারাবু ঐ দুপ্পিগই আগাজত উততোন জুনি, আয় না পরানি গাঙ পারত বাচ্যি আগং মুই” । আবার শ্রী Pallab Rangei ১৫ এপ্রিল বিকাল ৫:১৭ তে পোস্ট করেছেন শ্রী Kalayan Chakma এর গাওয়া একটি অসাধারণ গান “চেঙে পাড়ে পাড়ে হুচ ফেলেই লাড়ে লাড়ে কোন গাবুরী জাত্যে আদি দগিনো মাত্তল বোয়েরে.. ” গেয়েছেন আরো “কর্ণফুলী দুলি দুলি হুদু যেবে হনা” ইত্যাদি অসাধারণ সুমধুর গান। শুভেচ্ছা জানিয়েছেন ও গেয়েছেন অনেকেই এই গ্রুপে। অন্যদিকে ‘BWISU TER 1430 (DIGITAL VERSION)’ আরেকটি গ্রুপও বেশ সারা ফেলেছে ফেইসবুকে। এই গ্রুপে শ্রী Apul Tripura গেয়েছেন শ্রী বলংরায় সাধুর লেখা শ্রী সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরার একটি অসাধারণ গান “অ আনি হানি বরকরক, খানাদি আনি কক, খানাদি আনি কক”। শ্রীমতি Dozy Tripura এর একটি ভিডিও পোস্ট-এ দেখা যায় অত্যন্ত সুমধুর সুরে জনপ্রিয় শিল্পী শ্রীমতি প্রহেলিকা ত্রিপুরার গাওয়া একটি গান “খুমবারিও তকবাক মাসা বিরই বিরই বেড়েঅ” এছাড়াও দেখা যায় জনপ্রিয় শিল্পী শ্রীমতি তৃষ্ণা ত্রিপুরা ও শ্রীমতি প্রহেলিকা ত্রিপুরার কন্ঠে “ তুনুই তামানি দিন তামানি সাল”। শুধু গান নয় অনেকেই ফেইসবুকের নিজ নিজ ওয়ালে পোস্ট করেছেল নাচও। যেমন- বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় নৃত্যশিল্পী শ্রীমতি Dhina TripuraI পোস্ট করেছেন তাঁর নৃত্যদল সহ একটি নাচ। এভাবে অত্যন্ত সীমিত পরিসরে হলেও প্রাণের উৎসবটি পালন করেছে ডিজিটাল পদ্ধতিতে, কোনভাবেই হাল ছড়েনি পাহাড়বাসী।

 

তবে শুধুই এই ডিজিটাল উৎসবই চায়না পাহাড়বাসী। চায় ভার্চুয়াল জগতে উৎসব পালনের পাশাপাশি আগের মতো পালনের।  তারা চায় একদিন মুক্ত বিঙ্গের মতো ঘর থেকে বেড়িয়ে নব উচ্ছাসে মাতিয়ে তুলবে পাহাড়, নতুন উৎসাহ উদ্দীপনায় চিরচেনা প্রাণের উৎসবটিকে ফিরে পাবে আবার, যোগাবে নতুন সাহস ও অনুপ্রেরণা, ঘোর আমানিশা কেটে গিয়ে প্রাণে প্রাণে সঞ্চারিত হবে আশার আলো। বিশ^মানবের চিরশত্রু করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) কে পরাজিত করে একই সুরে দীপ্ত কন্ঠে সবার মুখে মুখে ধ্বনিত হবে জয়গান। তাই সময় এসেছে শপথ নেওয়ার। করোনার ধূসর ছায়া থেকে মুক্ত হয়ে পাহাড়ের এমন প্রাণের উৎসবটিকে ফিরিয়ে আনার । ভাববার সময় নেই এখন । সময় শুধু করোনা মোকাবিলার। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাংলাদেশ তথা বিশ^কে গড়ে তুলতে হবে একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থলে।

 

লেখক: শিক্ষক, সাহিত্যিক ও মুক্ত গবেষক।

 

এই বিভাগের আরো খবর