Berger Paint

ঢাকা, শনিবার   ২৪ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ৯ ১৪২৭

ব্রেকিং:
ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক আজ বিশ্ব পোলিও দিবস মাস্ক খুললেই করোনার ঝুঁকি বাড়ে ২৩ গুণ যুক্তরাষ্ট্রে নৌবাহিনীর উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত, ২ পাইলট নিহত জাল ডলার প্রস্তুতকারী চক্রের ৬ সদস্য আটক চলে গেলেন ব্যারিস্টার রফিক উল হক
সর্বশেষ:
আজ মহাষ্টমী: করোনা থেকে মুক্তিতে ভক্তদের বিশেষ প্রার্থনা নোয়াখালীতে চকলেট দেয়ার কথা বলে শিশুকে ধর্ষণ

পুঁজিবাদী সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে প্রতিবছর রঙ দেখাবে পেঁয়াজ

মাজহারুল ইসলাম লালন

প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০  

পঠিত: ৪২৮
মাজহারুল ইসলাম লালন। ছবি- প্রতিদিনের চিত্র

মাজহারুল ইসলাম লালন। ছবি- প্রতিদিনের চিত্র


গত বছরের বেশ কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে "পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধি,ভবিষ্যৎ কর্পোরেটোক্রেসি ষড়যন্ত্রের নতুন ফাঁদ!" শিরোনামে কলাম লিখেছিলাম। তাতে সুবিস্তারে তুলে ধরা হয় পুঁজবাদী সিন্ডিকেটের মূল রহস্য।বিষয়টিতে সংশ্লিষ্ট মহল সুনজর দিলে প্রতিবছর আমাদের এরকম সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে হা হুতাশ করতে হতো না।

 

সরকারি মহল নিজেদের আশেপাশের জ্বি হুজুর মার্কা লোকগুলো ছাড়া আর কারো পরামর্শ কানে তুলে না,আর আশেপাশের সেই বুদ্ধিজীবিগুলো পুঁজিবাদী চক্রের অংশ।সুতরাং সমস্যা যা তার ধারেকাছেও সমাধানের মলম লাগানো সম্ভব হয়ে উঠেনা।

 

গত কয়েকদিনে পেঁয়াজের যে নৈরাজ্য সাধারণ মানুষকে হাঁপিয়ে তুলেছে তা বর্ণনাতীত। ঢাকার বাজার সহ বিভিন্ন এলাকার পেঁয়াজের বাজার যাচাই করে যা দেখা গেলো তাতে চোখ কপালে তোলা ছাড়া উপায় কি?

 

গত বছর ঠিক এরকমটাই প্রত্যক্ষ করেছি আমরা। নতুন পেঁয়াজ বাজারে উঠার আগে প্রতি বছরই পেঁয়াজের বাজার কিছুটা চড়া থাকলেও গতবছর বাংলাদেশে পেঁয়াজের বাজার বিশ্ব ইতিহাস কে ছাড়িয়ে গেছে। এবছরও ঠিক সেই পথেই হাঁটতে চলেছে পেঁয়াজের বাজার।
দাম বাড়তে পারে, কিন্তু অতোটা আকাশ সমান বাড়ার কি কারন থাকতে পারে, আমাদের বোধগম্য হচ্ছে না।

 

"ভারত পেঁয়াজ রপ্তানী নিষিদ্ধ করার একদিন পরই বাংলাদেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যটির দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে শুরু করেছে।" তার মানে কি দাঁড়ায়?বাংলাদেশে পেঁয়াজের বাজার কি পুরোপুরি ভারত নির্ভর?

 

টিসিবি বলছে, দেশীয় পেঁয়াজের ভালো মজুদ বাংলাদেশে রয়েছে। এছাড়া, বেসরকারিভাবে তুরস্ক এবং মিশর থেকে দু'টি জাহাজে পেঁয়াজ চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছে। এরপরও পেঁয়াজের বাজার সেঞ্চুরির পথে? কোন অশুভ শক্তি পেঁয়াজের উপর চড়াও হয়েছে তবে? বাংলাদেশ নিজেই বিপুল পরিমান পেঁয়াজ উৎপাদন করে। কিন্তু দেশটিতে পেঁয়াজের দাম কী হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে এর আমদানী মূল্যের ওপর - এক কথায় ভারতে পেঁয়াজের দাম ঠিক কী, তার ওপর।

 

আর সে কারনেই প্রশ্ন উঠেছে যে পেঁয়াজের সংকট কাটাতে সরকার কি দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পেরেছে? পারেনি, কেন পারেনি? সরকারের ব্যবস্থাপনার কমতি কিসে?

 

প্রতিবছর এই সময়টাতে পেঁয়াজের মূল্য স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়, এর স্থায়ী সমাধান করতে সরকারের পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়না। পেঁয়াজ যেহেতু পচনশীল পণ্য, সুতরাং পেঁয়াজ সংরক্ষণের যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। নিজেদের উৎপাদিত পেঁয়াজ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করলে এধরনের সংকটের স্থায়ী সমাধাণ করা যেতে পারে। আমদানি নির্ভর সংকট সমাধান করতে চাইলে প্রতিবছরই এধরনের সমস্যা সম্মুখীন হওয়াটাই স্বাভাবিক।

 

টিসিবি'র দেওয়া তথ্যানুযায়ী এখনো বাংলাদেশে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ মজুদ আছে! আমাদেরও ধারনা এমনটিই। তবে এ পর্যাপ্ত পরিমাণ পেঁয়াজ কোথায়, কাদের কাছে?

 

সরকারের যে ব্যবস্থাপনা, তাতে দায়িত্বপ্রাপ্তরা যদি সততা ও আন্তরিকতার সহিত দায়িত্ব পালন করেন,তাহলে অবশ্যই বেড়িয়ে আসতো,কারা এই রাঘব বোয়াল!যে সংসদের ৮০% সাংসদ ব্যবসায়ী।এদের অনেকে আবার শীর্ষ স্থানীয় ব্যবসায়ী নেতা।তাহলে সরকারের পক্ষে সেইসব সিন্ডিকেটধারী রাঘব বোয়ালদের খোঁজে পাওয়া খুব বেশি মুশকিল হওয়ার কথা না। তথাপি বাইরে আসছে না কেন,এইসব মুখোশধারী অসাধু ব্যবসায়ীদের রূপ?

 

অতিমুনাফালোভী গুটিকয়েক ব্যক্তির করা সিন্ডিকেটের কাছে সরকার বরাবরই জিম্মি থেকে যায়!তাহলে কতটুকু অসহায় আমরা ষোলকোটি মানুষ? সরকারের চলমান ব্যবস্থাপনার সাথে বাজার মনিটরিং ব্যবস্থাপনা আরেকটু জোড়ালো করা হোক। তৃণমূল পর্যন্ত মনিটিরিং করে অসাধু সিন্ডিকেটধারীদের শাস্তির আওতায় আনলেই এধরনের অস্থিরতা রোধ করা সম্ভব হবে বলে আমরা মনে করি।

 

আমরা বাঙালীরা বরাবরই যেকোনো বিষয়ে অতি উৎসাহী।এটা আমাদের পূর্বাপর অভ্যাস।যে কারনে আমাদের বলা হয়ে থাকে -হুজুগে বাঙালী!
আর এই হুজুগের কারনেও দেখা যায় দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির সময় আরো দাম বাড়তে পারে বলে ক্রয়ের মাত্রাও বেড়ে যায় কিংবা চলমান ক্রয়মাত্রা অব্যাহত থাকে। বাংলাদেশীদের ক্ষেত্রে মাসলোর চাহিদা-সোপান তথ্যের উল্টো প্রয়োগ ঘটে। এর ফলে যা হয় তা সূদূরপ্রসারী ভয়াবহ।
এই যে পেঁয়াজের লাগামহীন মূল্য বৃদ্ধি এর ফলে কর্পোরেটোক্রেসি ধারনা জোরালো হলো বলে আমার মনে হয়। যেহেতু পেঁয়াজ কোনো মৌলিক খাদ্য নয়,ইহা খাদ্যাভ্যাসের সহায়ক উপাদান।

 

ভাত, মাছ, আটা, ময়দা, ডাল নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির মতো পেঁয়াজ কোনো মৌলিক খাদ্য নয়। এটা খাবারকে সুস্বাদু করে, এটা ছাড়াও রান্নাবান্না হতে পারে (সুস্বাদু নাও হতে পারে)। খাদ্যাভ্যাসের এই অমৌলিক উপাদানটির মূল্য আকাশ ছোঁয়া হয়ে যাওয়াতেও মানুষের ক্রয় করার চাহিদা কমেনি,তার মানে এটা প্রমানিত হয় যে আমরা দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির সাথে তাল মেলাতে অভ্যস্ত।এটা কর্পোরেটোক্রেসি'র ডেমোও হতে পারে এবার পেয়াজের উচ্চমূল্য আমাদেরকে একটা শিক্ষা দিচ্ছে,সেটা হলো আমাদের খাদ্যের উচ্চমূল্যের সাথে অভ্যস্ত হওয়ার সময় এসেছে। পেঁয়াজ দিয়ে সেটা টেস্ট করা হলো।আমরা যে কর্পোরেটোক্রেসি নামক অর্থনৈতিক আগ্রাসনের কথা বললাম, সেটার প্রধান লক্ষণ হলো জনগণের দৈনন্দির খরচ বেড়ে যাবে। জনগণ হাসফাস করবে, তৈরী হবে কৃত্তিম দুর্ভিক্ষ। এক বাবার ইনকামে সংসার চলবে না, মা-ভাই-বোন সবাইকে ইনকাম করতে মাঠে নামতে হয়। ফলে শ্রমের মূল্য সস্তা হবে, আর বিদেশী কর্পোরেটরা সস্তায় শ্রমও পাবে।

 

মৌলিক খাদ্যগুলোর দাম বাড়লে,আমরা মোটেও অভ্যাস পরিবর্তন করবো না, এটাই নিশ্চিত হলো কর্পোরেটোক্রেসি'র উদ্ভাবকরা। এবার সিন্ডিকেটকারী অসাধু ব্যবসায়ী যেকোনো সময় চাল,ডাল,আটা,ময়দার দাম বাড়িয়ে দিতে পারে নিজেদের মতো করে। আর এইসব নাটেরগুরু বরাবরই শীর্ষস্থানীয় দু'তিনজন মোড়ল।এদের লাগাম এখনই টেনে ধরতে না পারলে আমরা অচিরে আটকা পড়ে যাবো কর্পোরেটোক্রেসি'র আগ্রাসনে।

সরকারকে সময় থাকতেই কঠোরহস্তে দমন করতে হবে এইসক পুঁজিবাদী অর্থনীতি ব্যবস্থাপনার মোড়লদের।

 

আমরাও সমুচিত কিছু জবার দিতে পারি এসব কর্পোরেটোক্রেসি ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে। আমরা নিজেদের আয়েশের সাথে খানিকটা সমঝোতা করে নিলেও পারি। ধরেন আমরা বাঙালীরা এক সপ্তাহ/দশদিন পেঁয়াজ ছাড়া আহারকার্য সম্পন্ন করলাম,হয়তো সুস্বাদু হবে না তবু কর্পোরেটোক্রেসি ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে এটা করতে পারি আমরা। আর পেঁয়াজ পচনশীল দ্রব্য হওয়ায়, গোটা দেশের মানুষ একযোগে পেঁয়াজ কেনা বাদ দিলে সিন্ডিকেটকারী অসাধু ব্যবসায়ীরা নিজেদের ফাঁদে নিজেরাই পড়তে পারেন।


আপাততো পেঁয়াজের মূল্য নিয়ন্ত্রণে যেসব ব্যবস্থাপনা হাতে নেয়া হয়েছে,তা দ্রুত কার্যকর করা হোক। বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিনিধি ও সাহায্য সংস্থাগুলোকে সরকারের সহযোগীতায় এগিয়ে আসা উচিৎ। গত দুয়েকদিনে যাদের গোডাউনে পেঁয়াজ মজুদ পাওয়া যাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি এ্যাকশন নেওয়া হোক। যেকোনো ধরনের ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া হোক সরকারি ব্যবস্থাপনায়।


লেখক:কবি ও কলামিষ্ট

এই বিভাগের আরো খবর