Berger Paint

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২,   আশ্বিন ১৪ ১৪২৯

ব্রেকিং:
চট্টগ্রাম, গাজীপুর, কক্সবাজার, নারায়ানগঞ্জ, পাবনা, টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহ ব্যুরো / জেলা প্রতিনিধি`র জন্য আগ্রহী প্রার্থীদের আবেদন পাঠানোর আহ্বান করা হচ্ছে। শিক্ষাগত যোগ্যতা- স্নাতক, অভিজ্ঞদের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল যোগ্য। দৈনিক প্রতিদিনের চিত্র পত্রিকার `প্রিন্ট এবং অনলাইন পোর্টাল`-এ প্রতিনিধি নিয়োগ পেতে অথবা `যেকোন বিষয়ে` আর্থিক লেনদেন না করার জন্য আগ্রহী প্রার্থীদের এবং প্রতিনিধিদের অনুরোধ করা হল।
সর্বশেষ:
এসএসসির নির্বাচনি পরীক্ষার ফল ৩০ নভেম্বরের মধ্যে প্রকাশের নির্দেশ কোনো দলকে সমর্থন নয়, বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচন চায় যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ আফ্রিকাকে ৮ উইকেটে হারিয়েছে ভারত আরও তিন বছরের সাজা পেলেন অং সান সু চি করতোয়ায় নৌকাডুবি: পঞ্চম দিনের উদ্ধার অভিযান চলছে

বাঁপাশ

রহিমা আক্তার মৌ

প্রকাশিত: ১১ আগস্ট ২০২২  

রহিমা আক্তার মৌ, ছবি- প্রতিদিনেরচিত্র বিডি।

রহিমা আক্তার মৌ, ছবি- প্রতিদিনেরচিত্র বিডি।


ধানমন্ডি ২৭ নাম্বারের রাস্তা ধরে হাঁটছি আমি আর নিনা, ওর পুরো নাম নাহিদা পারভিন নিনা। খুব ইচ্ছে করছে নিনার হাত টা ধরেই হাঁটতে। কিন্তু ও যে কি মনে করবে সেটা ভেবেই পাচ্ছিনা।

 

আমাদের সম্পর্কটা হাত ধরার মতো হয়েছে কিনা তাও বুঝতে পারছিনা। আজ ইবনে সিনা হাসপাতালে যাবার কথা রবিনকে সাথে নিয়ে। গতকাল রবিন গিয়েছিল আমার সাথে। ফেরার পথে রবিন বলেছে,

-- কালকে যখন তুমি আসবে, আমায় জানাইও। আমিও আসবো সাথে।

সকালেও রবিনের সাথে কথা হয়েছে। বলেছি যাবার সময় ওকে পথে থেকে তুলে নিয়ে যাবো।  

 

সকাল দশটার দিকে নিনার কল আসে, ও বলে-
-- প্রিতম আজ তুমি একা হাসপাতালে যাবে না, আমি যাবো তোমার সাথে।
-- তোমার কষ্ট করতে হবে না, আমি রবিনকে নিয়েই যাব।
-- বলছি তো আমি যাবো, রবিনকে নিষেধ করে দাও।

 

বাধ্য হয়ে রবিনকে নিষেধ করি। ডাক্তারের সাথে দেখা করার সময় এখনো অনেক দেরি। ২৭ নাম্বার এর মাথায় এসে দুজন এক হই। রিকসা নিব নিব করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছি দুজনে। নিনা এদিকওদিক তাকায়, কেউ যদি ওকে দেখে ফেলে সেই ভয়ে। আমাদের হাঁটার গতি একেবারেই সমান। মাঝে মাঝে হাঁটার সময় হাতের সাথে হাতের স্পর্শ লেগে যাচ্ছে। কিন্তু কেউ কারো হাত ধরছিনা। জানিনা ওর ইচ্ছে করছে কিনা, কিন্তু আমার খুব ইচ্ছে করছে হাত ধরে হাঁটতে।

 

ঠিক তখনিই মোবাইলটা বেজে উঠে,
তুমি ইচ্ছে হলে ধরতে পার আমার হাতের আঙ্গুল....
একটু আগেই তুমি এলে কেনো যাবার তাড়া আজ না হয় থাকি দুজন একটু ঘর ছাড়া.....

 

মিনারের এই গান দিয়ে সেভ করেছিলাম মিনতির নাম্বার। রিংটোন শুনেই বুঝতে পারি এটা মিনতির কল। ইচ্ছে করেই চেঞ্জ করিনি, কিছু কিছু বিষয় কষ্টের হলেও মন্দ লাগে না। ইয়েস বার্টুন দিতে পারিনি, শুধু রিংটোনটা সরিয়ে দিয়ে হাঁটছি আমি আর নিনা।

 

পারিবারিক ভাবেই মিনতির সাথে আমার বিয়ে ঠিক হয়। কয়েকদিন কথা হয়েছিল আমাদের। বলেছিলাম বিয়ের আগে ওকে সামনাসামনি দেখব না, একসাথে বাসরেই দেখবো।

 

দিনতারিখ সব ঠিক ও হয়েছিল। হলুদের আগের দিন হঠাৎ মিনতিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অত:পর  ওদের বাসা থেকে জানানোর পর সব আয়োজন বন্ধ হয়। মা সেই সময়টাকে কাটিয়ে উঠতে অনেক কষ্ট পেয়েছেন। বাবা চলে যাওয়ার পর মা যেমন আমাকে কোন কষ্ট দেন নি, আমিও না। একটা সুন্দর পরিবার ছিল মা আমার আর পলি আপুর। আপুর বিয়ের পর আমি আর মা এই আমাদের শান্তির ঠিকানা।

 

কষ্ট থেকে বেরিয়ে এসে মা বলেছেন,
-- বাবা তুই যাকে পছন্দ করে ঘরে আনবি আমি তাকেই ভালোবেসে গ্রহণ করব।

 

সামনে এগিয়ে গিয়ে ঠান্ডা কিছু খাবারের কথা বলি নিনাকে। ও না করেনি বলে বেশ ভালো লাগছে। রাস্তার বাঁপাশে একটা খাবারের স্টলে ঢুকি আমরা। দুই বা চার চেয়ারের সাথে টেবিল দেয়া। মাথার উপরে ছাতা ও আছে। নিনা ঘুরছে আর ঘুরছে, কোন টেবিলে বসলে ওকে কেউ দেখতে পাবেনা তাই খুঁজছে। অত:পর কি জানি ভেবে একেবারেই সামনের টেবিলে বসে। ওর বাঁপাশে বসেছি আমি। আমাদের সামনের দুইটা চেয়ার খালি। একটু অপ্রস্তুত লাগলেও মন্দ লাগছে না। ইচ্ছে করে মিনতিকে কল করে বলি-

 

-- মিনতি তুমি এসে দেখে যাও আমি নিনার সাথে বসে আছি পাশাপাশি চেয়ারে। ইচ্ছে করলে ওর হাতও ধরতে পারি। কিন্তু আমি ধরছি না ইচ্ছে করেই।

 

আমরা কিছু খাবারের অর্ডার দিলাম। নিনা দিল ফালুদা আর আমি দিলাম নাগেট আর ফ্রেস আমের জুস। সবই একটা করে। কিন্তু ফালুদায় দুই চামচ, জুসেও দুই স্ট্রিট। এটা না ওটা করতে করতে নিনা আমার হাতটা ধরে ফেলে। অসম্ভব এক ভালোলাগা আমার মাঝে কাজ করে। নিনাকে কিছু বলিনি, ও এমন ভাব করলো যেন এই হাত অনেক অ-নে-ক বার সে ধরেছে। সর্বশেষ একটা নাগেট নিয়ে দুজনের আড়াআড়ি, আমি বলি তুমি খাও, নিনা বলে তুমি খাও। সেটাও দুজন ভাগ করে খেলাম।

 

সময় ঘনিয়ে আসছে, যেতে হবে ডাক্তারের কাছে। কিন্তু আমার একটুও উঠতে ইচ্ছে করছে না। কি হয় আজ না গেলে। অবশ্য প্রয়োজন আমারই। নিনা খুব স্বাভাবিক ভাবেই উঠে গেলো, আমায় উঠার জন্যে তাড়াও দিচ্ছে। আবেগের জায়গা থেকে নিজেকে বের করে নিয়ে আসি অনেক কষ্টে।

 

দুজনে একসাথেই পা ফেলি রাস্তায়। একটা রিকসা ডেকে দুজনে উঠি। তখন বিকেল ছয়টা বেজে তেরো মিনিট। সূর্যের আলো কমে আসছে, নিনা আমার ডানপাশে বসা। রিকসার পেছনের দিক না ধরলে নাকি ও বসতেই পারে না। সে ভাবেই বসলো নিনা। আমি ওর শরীরের বাঁপাশে বসা। রিকসার ঝাঁকুনি দুজনকে আরো কাছে নিয়ে আসে। আমি হারিয়ে যাই সেই বাঁপাশ নাটকের মাঝে.......

উহ! মেহজাবিন কি কান্নাই না কাঁদলো। আমার সামনে কোন মেয়ে এভাবে কাঁদলে আমি ঠিক থাকতে পারব না।

 

মনে হচ্ছে আমরা অনেক অনেক দিনের কাছের। নিনার সাথে পরিচয় আমার সাত কি আট বছর আগে। তেমন যোগাযোগ ছিল না, মাত্র দুই বছরের বন্ধুত্ব, দুজন দুজনের সুখ দু:খকে জানা চেনা। দেখা হয়েছে পরিচয়ের ছয় বছর পর। আজ তৃতীয় দেখা আমাদের। হঠাৎ নিনা পেছন থেকে হাতটা সামনে নিয়ে আসে। ওর বাঁহাত দিয়ে আমার ডানহাতটি ধরে। আমি ওর চোখের দিকে তাকাই, দুজনের চোখ এক হয়ে যায়। নিনা স্বাভাবিক ভাবেই ধরে রাখলো আমার হাত। এ ভাবেই চলে যাচ্ছে আমাদের রিকসা। ভাবছি, এই পথ যদি না শেষ হয় কেমন হতো.......

 

সুন্দর সময় খুব দ্রুতই চলে যায়। আজ আর রাস্তায় ও জ্যাম নেই। চলে এলাম হাসপাতালে। মাত্র পঁয়ত্রিশ মিনিট ছিলাম আমরা হাসপাতালে। মজার বিষয় হল ডাক্তার আরেফিন ভেবেছিল আমরা স্বামী স্ত্রী।  আমিও উনার ভাবনাটাকে মিথ্যে বুঝাতে চাইনি। আর নিনাও কোন আপত্তি করেনি। অন্যরকম আনন্দ লেগেছে মনে। জীবনের সবকিছু সাজিয়ে গুছিয়ে হয়না তা আমার অতীত থেকেই শেখা।

 

বের হয়ে ভাবছি ওকে দ্রুত হোস্টেলে পৌছে দিয়ে ফিরতে হবে আমায়। সিএনজি নিতে চেয়েছি,  কিন্তু নিনা তাতে রাজি হয়নি, রিকসা নিতে বলল। তাই করলাম, রিকসা ডেকে উঠলাম দুজনে। নিনার পেছনে হাত দিয়ে আমি বসি। ডানহাতে ওর হাতটা ধরে বসা। মনে হচ্ছে ও আমার বুকের বাঁপাশেই আছে। নিজেকে আর সামলাতে পারিনি। লোকে বলে আবেগ নাকি মোমের মতো অল্পতেই গলে যায়। আমারও তাই হলো, বলতে বাধ্য হলাম-

-- নিনা আমার বাঁপাশটা খালি করে চলে যাবে নাতো।
-- যাবো না বলেই তো আজ এসেছি সব কিছুকে পেছনে ফেলে। আমি জানি আজকের এই আসাতে আমি অনেক কিছু হারিয়েছি, যা হারিয়েছি তার চেয়েও অনেক অ-নে-ক বেশি পেয়েছি।

 

রিকসা এসে থামে ২৭ নাম্বারের পশ্চিম পাশে। তখন আকাশে চাঁদের আলো। রিকসা থেকে নেমে দুজন হাত ধরে হাঁটছি।

-- নিনা এই প্রথম কারো হাত ধরে আমার হাঁটা।
-- প্রিতম তুমি কি বিশ্বাস করবে জীবনে এই প্রথম কারো হাত ধরে হাঁটছি আমি।

-- চলো এ ভাবেই হাঁটতে থাকি, যতদূর যেতে পারি।
-- বেশি দুর নয়, ওই যে কাজী অফিস। চলো যাই।
-- বাস্তবতা?
-- এতো কিছুর পরও বাস্তবতা! থাকি না আজ সব বাস্তবতা ভুলে।
-- মাসুল দিতে হয় যদি।
-- তোমার জন্যে সব পারি, যদি তুমি দাও হাত বাড়িয়ে।

 

হাঁটতে হাঁটতে সংসদ ভবনের সামনে। সামান্য সময়ের জন্যে চাঁদের আলোতে বসি দুজনে। ইয়ার ফোনের দুই পাশ দুজনের কানে দিয়ে মোবাইলে গান ছাড়ি...

এতো কাছে ছিলে তবু করিনি খেয়াল, তোমার আমার মাঝে অদৃশ্য দেয়াল.....
তোমাকেই বুঝি খুঁজেছি এতটা কাল.....
আমার শুধু একটা তুমি চাই তা কি বুঝ না, তুমিও আমাকে ছাড়া কিছু খোঁজ না......

 

গান শুনতে শুনতে অন্য এক নিনাকে আবিস্কার করলাম। কিছুক্ষণ বসে দুজনে চলে আসি বিজয় সরণির কাছে একটা মিনি চাইনিজে। রাতের খাবার খেয়ে ওকে হোস্টেলের সামনে দিয়ে আসি। কানে ইয়ার ফোন লাগিয়ে হাঁটতে থাকি চেনা গলির দিকে অচেনা ভাবনাকে সাথে করে। গান চলছে,

 

এখন আমার ভালো থাকা আমার উপর নেই, এখন আমার আমি বাঁচেএএএ ঘিরে তোমাকেই.....
আমি পুড়ে যাই মরে যাই তোমার হাসির শূণ্যতায়....
আমি হেসে যাই ভেসে যাই তোমার স্বপ্নের পূর্ণতায়......

 

বাসা থেকে কল আসে মায়ের,
"হ্যাঁ মা আমি ডাক্তারকে দেখিয়ে বাসায় ফিরছি। বুকের বাঁপাশের ব্যাথাটা এখন অনেক কমে গেছে। আশাকরি এ ব্যাথা আর হবে না।

 

লেখক- সাহিত্যিক কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক।