ঢাকা, শনিবার   ১৭ এপ্রিল ২০২১,   বৈশাখ ৪ ১৪২৮

ব্রেকিং:
বাসায় হবে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা দিল্লিতে সাত দিনের কারফিউ জারির ঘোষণা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী
সর্বশেষ:
এসএসসি ফরম পূরণে অতিরিক্ত ফি নিলে তা ফেরতের নির্দেশ, কমিটি বাতিলের হুঁশিয়ারি মাঝ রাতে আশঙ্কাজনক অবস্থায় আসছেন করোনা রোগীরা করোনায় ২৫ প্রশাসন কর্মকর্তার মৃত্যু

বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

তুফান মাজহান খান

প্রকাশিত: ১৫ মার্চ ২০২১  

তুফান মাজহান খান, ছবি- প্রতিদিনের চিত্র।

তুফান মাজহান খান, ছবি- প্রতিদিনের চিত্র।


বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এর শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৬-১৭ এর তথ্য অনুযায়ী এ দেশে কর্মক্ষম বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ। এ হিসাবের বাইরেও আরও লাখ লাখ বেকার আছে যারা উচ্চশিক্ষিত হওয়া সত্তেও পাচ্ছে না যোগ্যতা অনুযায়ী কোনো চাকরি। আর এটির আধিক্য বেড়েই চলেছে দিনের পর দিন। এর প্রধান কারণ হিসেবে যেটাকে দাবি করা যায় তা হলো বৃত্তিমূলক শিক্ষার অভাব। বর্তমানে একঘেয়ে শিক্ষার ধারণা আমাদের মধ্যে প্রবল হয়ে গেছে। আমরা মনে করছি প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থাই আমাদের চলার পথ সুগম করে দেবে। আসলে কিন্তু তা নয়। যদি তাই হত তাহলে দেশে লক্ষ লক্ষ বেকার থাকার প্রশ্নই আসত না। অথচ বাস্তবে আমরা তাই দেখছি। আজ কর্মক্ষেত্র নেই অথচ বড় বড় সার্টিফিকেটধারীর কোনো অভাব নেই। একটা সময় ছিল যখন শিক্ষিত মানুষকে ডেকে ডেকে চাকরি দেয়া হত। জনসংখ্যার আধিক্য, প্রচলিত একঘেয়ে শিক্ষাব্যবস্থা ও কর্মক্ষেত্রের অপ্রতুলতার জন্য এখন লক্ষ তরুণ ফাইল হাতে ঘুরে বেড়ায় এখানে-ওখানে। আমি একটা কথা সবসময় বলি যে, জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তর করতে হবে। আর সে সুযোগটা আমাদের তৈরি করতে হবে। মানুষ তো ফেলনা জিনিস নয় বা দেশের জন্য বোঝাও নয়। হ্যাঁ, আমাদের দেশ একটি ছোট্ট ও উন্নয়নশীল দেশ। আর এ সুযোগটাকেই আমাদের কাজে লাগাতে হবে।

জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তরের দায়িত্বটা প্রথমত সরকারকে গ্রহণ করতে হবে। আর সেটার একমাত্র ও প্রধান উপায় হলো বৃত্তিমূলক তথা বহুমুখী শিক্ষার প্রসার ঘটানো। এখানে প্রচলন শব্দটি ব্যবহার করা যেত কিন্তু তা না করে প্রসার শব্দটির ব্যবহার করার কারণ হলো, ইতোমধ্যে আমাদের দেশে বহুমুখী শিক্ষার প্রচলন করা হয়েছে। কিন্তু তা খুবই স্বল্প পরিসরে। যা পুরোপুরি প্রসারিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। আমাদের ধারাণাকে পাল্টে বাস্তবধর্মী তথা কর্মমুখী শিক্ষার প্রসারই একমাত্র দেশের বেকার সমস্যার সমাধান করতে পারে। ঘুরিয়ে দিতে পারে অর্থনীতির চাকা। এখনও বেকারজনিত সমস্যা লক্ষের ঘরেই রয়েছে। তবে তা যে হারে বাড়ছে তাতে কোটির ঘরে পৌঁছাতে খুব বেশি সময় লাগবে বলে আমার মনে হয় না। তবে এখনই যদি সঠিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় তাহলে লক্ষ তরুণের মেধাকে কাজে লাগানো সম্ভব এবং কর্মমুখী শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে ভবিষ্যতের এরূপ সমস্যারও সমাধান করা সম্ভব। দেশে বর্তমানে প্রতিবছর ১০টি বোর্ডে ২০ থেকে ২২ লক্ষ এসএসসি পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দিচ্ছে। সেখানে শতকরা ৭০ থেকে ৮০ ভাগ শিক্ষার্থীই সন্তোষজনক ফলাফল করে পাশ করছে। আবার প্রতিবছর ১১ থেকে প্রায় ১৩ লক্ষ পর্যন্ত এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিচ্ছে। সেখানেও পাশের হার সন্তোষজনক। কিন্তু একটি বিষয় খেয়াল করবেন যে, প্রতিবছর এসএসসি থেকে এইচএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কিন্তু প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। তারপর এইচএসির পর বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত যেতে পারছে তারও অর্ধেক। কিন্তু তারা যাচ্ছে কোথায়? অবশ্যই অনেকে চাকরির পেছনে ছুটছে। অনেকে ছোটখাট ব্যবসার চিন্তা করছে। আবার অনেকে বাবা-মায়ের কাঁধের ওপর বসে খাচ্ছে অথবা চেয়ে আছে ভাগ্যের দিকে। আর যারা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছে তারাই কি পড়ালেখা শেষ করে ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারছে? অনেকে নির্দিষ্ট বয়সসীমা পর্যন্ত চাকরির পেছনে ছুটতে ছুটতে যখন ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত তখন নিজের যোগ্যতার চেয়ে কয়েকগুণ ছোট বেসরকারি চাকরিতে ঢুকতে বাধ্য হয়। আর যারা সে সুযোগটুকুও পান না তারা যোগ হয়ে যান বেকারদের তালিকায়। এর মধ্য খেকে কিছু লোক বের হয় যারা নিজে উদ্যোক্তা হতে পারে। তবে বেশিসংখ্যকদেরই সে সুযোগ বা সামর্থ্য থাকে না। তাই এ সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বৃত্তিমূলক শিক্ষার দিকে বেশি নজর দেওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। তবে হ্যাঁ, প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রতিবছর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ জনগণের প্রয়োজন হয় যারা সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত। আর বাকি শিক্ষিতদের আর গতি হয় না। তাই এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় হলো বৃত্তিমূলক শিক্ষা। যার মাধ্যমে ছেলেমেয়েরা শিক্ষিত হয়ে কৃষি, শিল্প এবং বিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটাতে সক্ষম হবে। যে পদ্ধতিতে শিক্ষাগ্রহণ করলে দেশে একটি মানুষও বেকার থাকবে না। উন্নত বিশ্বের মতো প্রতিটি শিক্ষার্থীকে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানোর পর তাদের অ্যাপটিচ্যুড টেস্ট করে তাদের পছন্দের বিষয়গুলোর উপরে শিক্ষার ব্যবস্থা করা হোক। যাতে একটি নির্দিষ্ট সময়ে তারা দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মী হিসেবে বের হয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারে অথবা সফল উদ্যোক্তা হতে পারে। কিছুদিন আগে শুনেছিলাম যে, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত নাকি প্রাথমিক শিক্ষা করা হবে। হ্যাঁ, যদি তা হয় তাহলে খারাপ হয় না বরং এতে বৃত্তিমূলক শিক্ষার পথ আরও সুগম হয়। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নের পর প্রতিটি শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা উচিত। যারা অবহেলিত ও দরিদ্র শিশু রয়েছে তাদেরও সরকারি উদ্যোগে প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা হোক। আর এর ভেতরেই সে বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞান সম্পর্কে ভালো ধারণা লাভ করবে। প্রাথমিক শিক্ষা স্তর শেষ হওয়ার মধ্য দিয়েই প্রতিটি শিক্ষার্থী নিজের পছন্দ, ইচ্ছা, অনিচ্ছা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করবে এবং সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। তখন তাদের আগ্রহের ভিত্তিতে বিভিন্ন কারিগরি, কর্মমুখী ও সাধারণ শিক্ষা প্রদান করা যাবে। সেই সময় থেকে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তাদের শুধুমাত্র সেই একটি বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ (হাতে-কলমে শিক্ষা) দিয়ে তাদের দক্ষ করে তোলা যাবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তারা দক্ষ হয়ে ওঠার পর বিশেষ পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের মেধার মূল্যায়ন করা যেতে পারে। তারপর তাদের অনায়াসেই রাষ্ট্র কাজে লাগাতে পারে আর তারাও পেতে পারে সুনিশ্চিত ভবিষ্যত।

এখন প্রশ্ন হতে পারে তাহলে রাষ্ট্র এত কর্মক্ষেত্র পাবে কোথায়? এর উত্তরে বলব, যেহেতু প্রতিটি শিক্ষার্থী বিশেষ বিশেষ কাজে দক্ষ হয়ে ওঠবে তখন তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করলে অবশ্যই তারা অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম হবে। আর তাদের সে কর্মসংস্থানের জন্য সরকারকে পূর্ব থেকেই প্রস্তুত থাকতে হবে। অর্থাৎ দেশে কর্মক্ষেত্র তৈরির জন্য সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। বেসরকারি শিল্প-কারখানা স্থাপন পদ্ধতি সহজ করতে হবে। প্রয়োজনে লোন পাওয়ার উপায়ও সহজ করতে হবে এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানায় বিভিন্ন শিল্প-কারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান স্থাপন  করতে হবে। প্রয়োজনে সেসব পরিচালনার জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় বা দপ্তর স্থাপন করা যেতে পারে। যা একটি নিখুঁত পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের পক্ষে করা তেমন কোনো কঠিন কাজ নয়। কারণ যে দেশের জনশক্তি রয়েছে সে দেশে বেকার শব্দটি থাকা সমীচীন নয়। কেননা, তা শুধু আমাদের অর্থনীতিকেই পঙ্গু করে না বরং বিশ্বের দরবারে দেশটির মান ক্ষুন্ন করে। তাই বৃত্তিমূলক শিক্ষা জোরদার করে এবং কর্মক্ষেত্র তৈরির মাধ্যমে বেকারত্ব শব্দটি আমাদের ডিকশনারি থেকে মুছে ফেলাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

 

লেখক: কলামিস্ট, কবি ও কথাসাহিত্যিক

 

এই বিভাগের আরো খবর