Berger Paint

ঢাকা, বুধবার   ২৮ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ১৩ ১৪২৭

ব্রেকিং:
আজারবাইজানের হামলায় কারাবাখের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আহত কুষ্টিয়া কুষ্টিয়ায় বিষাক্ত মদপানে প্রাণ গেল ৩ যুবকের বদলির কারণে উন্নয়ন যেন বাধাগ্রস্ত না হয় :প্রধানমন্ত্রী ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণার ওয়েবসাইট হ্যাকড
সর্বশেষ:
তুর্কি-ইসরাইলি পতাকায় আগুন আর্মেনীয়দের হাজী সেলিমের দখলে থাকা অগ্রণী ব্যাংকের জমি উদ্ধার ইরফান সেলিম ও তার সহযোগীর বিরুদ্ধে আরও ৪ মামলা

মার্কিন-তালেবান চুক্তি, শান্তি আসবে কী?

মো: জিল্লুর রহমান

প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর ২০২০  

পঠিত: ২৪৩
মো: জিল্লুর রহমান। ছবি- প্রতিদিনের চিত্র

মো: জিল্লুর রহমান। ছবি- প্রতিদিনের চিত্র

 

আফগানিস্তান থেকে ‘মার্কিন সেনা’ প্রত্যাহার করে নেয়ার বিষয়ে তালেবানের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র। দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে চলা আফগান যুদ্ধের অবসানে কাতারের মধ্যস্থতায় এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। গত ২৯ ফেব্রুয়ারি কাতারের রাজধানী দোহায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং তালেবান নেতাদের উপস্থিতিতে এই চুক্তি  স্বাক্ষরিত হয়। আফগান বিষয়ে মার্কিন বিশেষ দূত জালমি খলিলজাদ ও তালেবানের পক্ষে মোল্লা আবদুল গণী বারদার চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ব রাজনীতিতে ঘটে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির মধ্যে অন্যতম আলোচিত সমালোচিত চুক্তি হলো ‘মার্কিন-তালেবান শান্তিচুক্তি’। এরই মধ্যে এই চুক্তিকে ঘিরে বিশ্লেষকদের মধ্যে শুরু হয়েছে নানামাত্রিক বিশ্লেষণ। তবে সব বিশ্লেষণকে ছাপিয়ে যে বিষয়টি মূল প্রাধান্য পাচ্ছে তা হলো এই চুক্তি আসলে কী আফগানিস্তানে ‘শান্তি’ আনতে পারবে?

চুক্তির শর্তানুযায়ী, আগামী ১৪ মাসের মধ্যে আফগানিস্তান ছাড়তে হবে মার্কিন ও ন্যাটো সেনাদের। খবরে প্রকাশ তালেবানদের দেয়া শর্ত মেনেই এ চুক্তিতে সই করেছে যুক্তরাষ্ট্র। চুক্তি মতে, এখন থেকে আফগানিস্তানে আর কোনো হামলা চালাবে না তালেবান। এছাড়া তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে আল-কায়েদাকে কোনো তৎপরতা চালাতে না দেয়ারও অঙ্গীকার করা হয়েছে। চুক্তির আওতায় যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান থেকে হাজার হাজার মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পাশাপাশি দেশটিতে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি পালনের কথা বলা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, আজ এ চুক্তির মাধ্যমে শান্তির সূচনা হল। আফগানিস্তানে শান্তি ফিরিয়ে আনতে যুক্তরাষ্ট্র সব পক্ষের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করে। তালেবানের মুখপাত্র সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, আমরা আশা করি দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা এবং শান্তি চুক্তি সই হওয়ার সময় যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিশ্রুতির প্রতি অনড় থাকবে।

২০০১ সালের অক্টোবরে আমেরিকা ও তার মিত্ররা আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালায়। নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার এক মাসের মধ্যে এ আগ্রাসন চালানো হয়। মার্কিন বাহিনীর হামলায় তৎকালীন তালেবান সরকারের পতন ঘটলেও গত দেড় যুগেও তালেবানকে আফগানিস্তান থেকে নির্মূল করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয় আমেরিকা।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৭৯ সালে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলসহ দেশের অন্যান্য অংশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। সেই সোভিয়েত আধিপত্যের বিরুদ্ধে আফগান মুজাহিদরা বিদ্রোহ করে বসে। তৎকালীন সময়ে ওসামা বিন লাদেনের মতো কিছু আরব নাগরিক সোভিয়েত আধিপত্যের বিরুদ্ধে জিহাদের নামে আফগান মুজাহিদদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। ওই সময়ে আমেরিকার প্রত্যক্ষ মদতে ক্রমেই আফগান মুজাহিদরা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আফগানিস্তানে মার্কিন উপস্থিতির অন্যতম কারণ ছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন আধিপত্যঢ়। এই সোভিয়েত ইউনিয়নের আধিপত্য রুখতেই প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে আমেরিকা তৈরি করে তালেবান নামক বাহিনীকে।

সেই সময় তালেবানরা আমেরিকার প্রত্যক্ষ সহায়তায় আফগানিস্থানে সোভিয়েত ইউনিয়নের আধিপত্য রুখতে সক্ষম হয়। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই আমেরিকার মদতে গড়া বাহিনী আমেরিকার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। সোভিয়েত ইউনিয়নকে বিতাড়িত করতে আমেরিকার পৃষ্ঠপোষকতায় যে তালেবানি শক্তির উত্থান ঘটেছিল, সেই তালেবানি শক্তিই আমেরিকার জন্য বড় যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলশ্রুতিতে আমেরিকা তালেবানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে।

লক্ষ্যনীয় বিষয় হলো ভৌগোলিকভাবে আফগানিস্তান একটি রুক্ষ অনুর্বর মরুসদৃশ পাহাড়-পর্বতসংকুল দুর্গম দেশ হলেও নিঃসন্দেহে দেশটি তেল-গ্যাসসহ মূল্যবান খণিজসম্পদে সমৃদ্ধ। খণিজসম্পদে সমৃদ্ধশালী হওয়ার কারণেই বিভিন্ন সময় বিদেশি বেনিয়াদের কুদৃষ্টি পড়েছে আফগানিস্তানের ওপর। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী এবং নিকট অতীতে সোভিয়েত দখলদাররা কখনোই সেখানে আধিপত্য তো দূরে থাক, ন্যূনতম সুবিধাও আদায় করতে পারেনি। সেখানে শক্তিশালী মার্কিন বাহিনীর ব্যর্থতা ও নাস্তানাবুদে অবাক হওয়ার মতো কোনো ঘটনা নয়।

২০০১ সালের পর থেকে প্রায় দীর্ঘ দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে আমেরিকাকে চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি হিসাবমতে, ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে আফগানিস্তানে অন্তত এক লাখ মার্কিন সেনা ছিল, যাদের পেছনে ব্যয় হয়েছে ১০০ বিলিয়ন ডলার। পরে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযানে নিজেদের সেনা পাঠানোর বদলে আফগান বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করলে ব্যয় বেশ কমে আসে। ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালে তাদের বার্ষিক ব্যয় ছিল ৪০ বিলিয়ন ডলার। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হিসাব থেকে জানা যায়, এ বছর ব্যয় হয়েছে ৩৮ বিলিয়ন ডলার।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের হিসাবমতে, ২০০১ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আফগানিস্তানে মার্কিন প্রশাসনের সামরিক ব্যয় হয়েছে ৭৭৮ বিলিয়ন ডলার। এর সঙ্গে মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগ যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডি এবং অন্য সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে আরও ৪৪ বিলিয়ন ডলার পুনর্নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় করেছে। সব মিলিয়ে ২০০১ সালে আফগানযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৮২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে আফগানিস্তানে সামরিক অভিযানের ঘাঁটি হিসেবে পাকিস্তানকে ব্যবহার করলেও সেখানকার ব্যয় ধরা হয়নি এই হিসাবে।

তবে, ব্রাউন ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দাবি করা হয়, আফগানযুদ্ধে ব্যয়ের যে সরকারি হিসাব দেখানো হয়েছে তা প্রকৃত ব্যয়ের চেয়ে অনেক কম। আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানের জন্য মার্কিন কংগ্রেস এক ট্রিলিয়ন ডলারের তহবিল অনুমোদন করেছিল। মজার বিষয় হলো, ২০১৯ সালের ৯ ডিসেম্বর ওয়াশিংটন পোস্ট কর্তৃক প্রকাশিত এক মার্কিন গোপন নথিতে দেখা যায়, মার্কিন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা স্বীকার করেন আফগানযুদ্ধে তাদের কৌশলগত ভুল ছিল এবং আফগানিস্তানকে একটি আধুনিক রাষ্ট্রে রূপান্তর করতে গিয়ে তাদের বহু অর্থের অপচয় ঘটেছে।

ফলশ্রুতিতে, ইতিহাসের দীর্ঘতম এই যুদ্ধ অনির্দিষ্টকাল চালিয়ে যাওয়া ক্রমেই যেন আমেরিকার জন্য কঠিন হয়ে পড়ছিল। ভিয়েতনামে ১০ বছরের যুদ্ধে প্রায় ৫৩ হাজার সৈন্য নিহত হওয়ার পর জনগণের প্রবল চাপে মার্কিন প্রশাসন লজ্জাজনক পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হয়। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনীও আফগানিস্তান থেকে দীর্ঘদিন থেকেই পলায়নের পথ খুঁজছিল। সব মিলিয়ে আমেরিকা কিছুটা কোণঠাঁসা হয়েছে পড়েছিল।

সন্ত্রাসবাদের বিভিন্ন কলাকৌশল ও পদ্ধতির মধ্যে অন্যতম হলো ‘এট্রিশন’, যার প্রায়োগিক অর্থ হচ্ছে ক্রমাগত প্রতিপক্ষকে আক্রমন করা, হতে পারে সেই আক্রমণটি ছোট পরিসরে তবুও আক্রমণটি চালিয়ে যাওয়া। এই ক্রমাগত আক্রমণের ফলে প্রতিপক্ষের আর্থিক অবস্থা চাপের মুখে পড়ে এবং সৈনিকদের ও মনোবল ভেঙে যায়। এই কৌশল অবলম্বনের কারণে সামরিক ও অর্থনৈতিক, উভয় ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনী তালেবানদের সঙ্গে কোন ক্রমেই পেরে উঠতে পারেনি।

এই ব্যর্থতার ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সাল থেকে তালেবানদের সঙ্গে কাতারের দোহায় অনেকবার আলোচনা হয়। সর্বশেষে ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ তালেবানদের সঙ্গে মার্কিন প্রশাসন এক সমঝোতায় পৌঁছায়। এই চুক্তির ভিত্তিতে আগামী ১৪ মাস আফগানিস্তানে তালেবানরা চুক্তির শর্ত মেনে চলবে। যদি ওই সময়ের মধ্যে তালেবানরা চুক্তি মেনে চলে, তাহলে আফগানিস্তানে তালেবানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র চূড়ান্ত চুক্তি করবে এবং তাদের সব সৈন্য প্রত্যাহার করে নেবে।

চুক্তির পর থেকে আফগানিস্তানে বেশ কয়েকবার সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে এবং মার্কিন বিমান হামলার ঘটনাও ঘটেছে। গত ৬ মার্চ বিরোধীদলীয় নেতা আবদুল্লাহ আবদুল্লাহর এক জনসভায় বন্দুকধারীদের হামলার ঘটনা ঘটে। যার দায় স্বীকার করেছে আইএস। যেহেতু ইতোমধ্যে আইএস হামলার দায় স্বীকার করে নিয়েছে তাই হতে পারে আসন্ন ভবিষ্যতেও আফগানিস্তানকে তাদের একটি শক্তঘাঁটি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইবে। এহেন পরিস্থিতিতে মার্কিন-তালেবান চুক্তি ভবিষ্যৎ ফল নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

মার্কিন-তালেবান চুক্তির সবচেয়ে বড় ঝুঁকির জায়গায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল বর্তমান আফগান সরকার। এই চুক্তিতে অনেক কিছুই স্পষ্ট করে বলা নেই। পরবর্তী সময়ে আফগানিস্তানের শাসনপদ্ধতি কেমন হবে, বিশেষ করে চুক্তি অনুসারে ন্যাটোর সেনা প্রত্যাহার করা হলে, তখন কাবুলের বর্তমান সরকারের ক্ষমতার পরিধি কেমন হবে সেই বিষয়ে স্পষ্টভাবে চুক্তিতে কিছু বলা নেই।

অপরদিকে তালেবানরা গণতন্ত্রের প্রতি সহানুভূতি দেখালেও তাদের লক্ষ্য একেবারেই ভিন্ন। তালেবানদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন করা। তাই বর্তমান আফগান সরকারের সঙ্গে তালেবানদের আদর্শগত চূড়ান্ত বিরোধ রয়েছে। নারী নেতৃত্ব ও নারী অধিকার নিয়েও বর্তমান ক্ষমতাসীনদের রয়েছে প্রকট বিরোধ। তাই তালেবানদের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগির যে কথা বলা হচ্ছে, সেটা কতটা বাস্তবসম্মত, সেটা নিয়েও রয়েছে সংশয়। কারণ তালেবানদের পক্ষে তাদের মূল লক্ষ্য থেকে সরে আসা সম্ভব নয়। যদি কখনও শান্তির স্বার্থে তারা সরে আসতেও চায়, তাহলে তাদের অভ্যন্তরেই ভয়াবহ সংঘাত সৃষ্টি হবে।

তবে মার্কিন-তালেবান চুক্তি হওয়ার পর থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা হচ্ছে, মার্কিন-তালেবানদের এই চুক্তি কি সফল হবে? কারণ সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আফগানিস্তানে তালেবান ছাড়াও আরও অনেক জঙ্গিবাহিনী সক্রিয়ভাবে জঙ্গি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সেই সমস্ত জঙ্গিবাহিনী কতটুকু সফল হতে দেবে এই চুক্তি সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। যার ফলে যুক্তরাষ্ট্র-তালেবান শান্তিচুক্তিও হয়ে পড়তে পারে মূল্যহীন। আফগানিস্তান নামক রাষ্ট্রে শান্তির অভিপ্রায়ে দুই গোষ্ঠী কতটা আন্তরিকভাবে এই বিপত্তিগুলোর সমাধান করবে তা ভবিষ্যতই বলে দেবে।

লেখক: ব্যাংকার ও কলাম লেখক, সতিশ সরকার রোড, গেন্ডারিয়া, ঢাকা।

এই বিভাগের আরো খবর