Berger Paint

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০,   আশ্বিন ১৩ ১৪২৭

ব্রেকিং:
১৫ বছরের মধ্যে ১০ বছরই আয়কর দেননি ট্রাম্প! চির নিদ্রায় শায়িত অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম অস্ত্র মামলায় সাহেদ করিমের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ২৪ বলে ৮২, ৯ বলে ৭ ছক্কা, নতুন রেকর্ড আইপিএলে এমসি কলেজে স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে গণধর্ষণ: ছাত্রলীগ নেতা রাজনও গ্রেফতার এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গণধর্ষণ : রনি ও রবিউল গ্রেফতার ৭৪-এ পা রাখলেন শেখ হাসিনা
সর্বশেষ:
সৌদিতে শিডিউল ফ্লাইটের অনুমতি পেয়েছে বিমান ড. কামাল ও আসিফ নজরুল ঢাবি এলাকায় অবা‌ঞ্ছিত : সন‌জিত সাহেদের বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলার রায় আজ কাশ্মীর সীমান্তে পাক-ভারত উত্তেজনা, এক সেনা নিহত

রোহিঙ্গা গণহত্যায় মিয়ানমারের দায় ও স্বীকারোক্তি

মো: জিল্লুর রহমান

প্রকাশিত: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২০  

পঠিত: ১৮৩
মো: জিল্লুর রহমান। ছবি- প্রতিদিনের চিত্র

মো: জিল্লুর রহমান। ছবি- প্রতিদিনের চিত্র

 

সম্প্রতি মিয়ানমারের দুজন পক্ষ ত্যাগকারী সৈন্য রোহিঙ্গা গণহত্যার স্বীকারোক্তি দেবার পর তাদের নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাদের স্বীকারোক্তি পড়ে মনে হলো আসলে ছাই চাপা আগুনের মতো সত্যকে লুকিয়ে রাখা যায় না। খবরে বলা হয়েছে. এই দুজন সৈন্য বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির হেফাজতে ছিল। গোষ্ঠীটি রাখাইনে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ছে। তারা আরাকান আর্মির হেফাজতে থাকা অবস্থাতেই স্বীকারোক্তি দিয়েছে। পরে তাদের নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ শহরে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তারা সাক্ষী হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে কিংবা বিচারের মুখোমুখি হতে পারে বলে মনে করা হয়।

 

মূলত মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট শুরু করে। তাদের সঙ্গে স্থানীয় মগরাও এতে যোগ দেয় বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী রোহিঙ্গারা। এ ঘটনায় নতুন করে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। সব মিলিয়ে টেকনাফ ও উখিয়ার ৩৪টি শরণার্থী শিবিরে এখন প্রায় ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে।

 

ইতোপূর্বে উক্ত সহিংসতার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কানাডা মিয়ানমারের সাতজন উচ্চ পদস্থ সামরিক কর্মকর্তার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। এ নিষেধাজ্ঞার কারণে মেজর জেনারেল মং মং কে মিয়ানমার সরকার সাথে সাথে বরখাস্ত করেছিল এবং আরেকজন কর্মকর্তা লেঃ জেঃ অং কেও জ তখন স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগে বাধ্য হযেছিল। উপরোক্ত বরখাস্ত, পদত্যাগ,  ঘটনার সময়কার বিভিন্ন ধরণের ফুটেজ ও নিষেধাজ্ঞা মূলত রাখাইনে সংগঠিত অপরাধের সত্যতার প্রমান বহণ করে। তাছাড়া, উক্ত ঘটনা তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য আইসিসির একটি প্রতিনিধিদল তখন বাংলাদেশ সফর করেছিল। এর দায় মিয়ানমারের সরকার ও সামরিক বাহিনী কোন ভাবেই অস্বীকার করতে পারে না।

 

তাছাড়া মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন ও গণহত্যা সম্পর্কে জাতিসংঘের একটি তদন্ত প্রতিবেদন জেনেভায় প্রকাশ করা হয়েছিল যা তখন সারা বিশ্বের গণমাধ্যম খুব গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করেছে। উক্ত প্রতিবেদনে মিয়ানমারের সেনাপ্রধানসহ ছয় উচ্চ পদস্থ জেনারেলকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। রোহিঙ্গা সমস্যার মুলে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী পিছনে অং সান সুচিই যে খলনায়কের ভূমিকা পালন করছেন, তাও উক্ত প্রতিবেদনে প্রমানিত হয়েছে। তাছাড়া, ফেসবুক কর্তৃপক্ষ ঘৃণা ও মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর অভিযোগে মিয়ানমারের সেনাপ্রধানসহ বেশ কিছু শীর্ষস্থানীয় জেনারেলের ফেসবুক হিসাব বন্ধ করে দিয়েছিল। রোহিঙ্গা নির্যাতনের শুরু থেকেই রাশিয়া ও চীনের চরম বিরোধীতার কারণে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোন কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না।

 

অবাক করার বিষয় দ্য হেগের জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের শুনানিতে গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সামরিক জান্তার মুখপাত্র ও মিয়ানমারের নব্য ঘসেটি বেগম অং সান সু চি। তার এ বক্তব্যে সারা বিশ্ব শুধু স্তম্ভিত হয়নি, বিস্মিতও হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, মিয়ানমারের প্রতিরক্ষা বাহিনী হয়তো (!) মাত্রাতিরিক্ত রকমের শক্তি প্রয়োগ করে থাকতে পারে এবং তিনি মনে করেন, যদি মিয়ানমারের সৈন্যরা যুদ্ধাপরাধ করে থাকে তাহলে তাদের বিচার তার নিজ দেশে করা হবে। রোহিঙ্গা গণহত্যার স্বীকৃতি দিতে অং সান সু চি'র প্রতি শান্তিতে আট নোবেলজয়ী আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু সে আহবানে তিনি কোন সাড়া দেননি।

 

অথচ বিশ্ববাসী রোহিঙ্গা গণহত্যার দায়ে রাখাইনের ইন দিন গ্রামে বিচারের নামে প্রহসন ও প্রতারণা লক্ষ্য করেছিল। তখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহানুভূতি অর্জনের জন্য মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইনের ইন দিন গ্রামে নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড চালানোর অভিযোগে ২০১৮ সালে সাত জন সেনা সদস্যকে দশ বছরের সাজা প্রদান করেছিল। কিন্তু অভিযুক্ত সেই সাত সেনা সদস্যের ১০ বছরের দন্ড মাত্র ১০ মাসের মাথায় সু চির সরকার গোপনে ২০১৮ সালের নভেম্বরে মওকুফ করেছিল। যা ২০১৯ সালের মে মাসে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ফাঁস হয়ে যায়। এটা যে এক ধরণের প্রতারণামূলক আইওয়াশ এবং এর সাথে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা ছিল, এটা তারই উজ্জ্বল স্বাক্ষ্য বহন করে।

 

অথচ রয়টার্সের যে দু'জন সাহসী সাংবাদিক ইন দিন গ্রামের হত্যাকান্ডের ঘটনাটি ফাঁস করেছিল, মিয়ানমার সরকার তাদেরকে একটি সাজানো ঘটনায় আটক করে দন্ড প্রদান করেছিল এবং আন্তর্জাতিক চাপে রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় তাদেরকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। রোহিঙ্গা সঙ্কটকে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ শুরু থেকেই অত্যন্ত চাতুর্যতার সাথে মোকাবেলা করছে এবং আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি উপেক্ষা করে একের একের পর প্রতারণা ও প্রপাগন্ডার আশ্রয় নিচ্ছে। আর এসবের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তথাকথিত গণতন্ত্রের ধারক বলে পরিচিত নব্য ঘসেটি বেগম অং সান সু চি ও তার লালিত সেনাপ্রধান সহ কিছু উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা। আর পেছন থেকে কলকাঠী নাড়ছে মিয়ানমারের তাদের পালিত কিছু ধর্মীয় উগ্রবাদী নেতা। অং সান সু চির নেতৃত্বে এসব ষড়যন্ত্র আর প্রতারণাকে শুধু সেই ঘসেটি বেগমের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

 

২০১৭ সালে রোহিঙ্গা মুসলমানদের গণহত্যা ও ধর্ষণের অভিযোগ সবসময়ই অস্বীকার করে আসছে মিয়ানমার। উপরোক্ত সাম্প্রতিক দুজন সৈন্যের স্বীকারোক্তি আবারও প্রমাণ করেছে, রোহিঙ্গা গণহত্যার দায় মিয়ানমার সরকার ও সেনাবাহিনী কোন ভাবেই এড়াতে পারবে না। দেশটিতে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে সরকার, সামরিক বাহিনী ও ধর্মীয় নেতৃত্ব এক কাতারে রয়েছে। এ কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমার সরকার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আন্তরিক নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিৎ জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে অভিযুক্তদের বিচারের পাশাপাশি মিয়ানমারের সরকারের উপর কঠোর চাপ সৃষ্টি করে রোহিঙ্গা সঙ্কটের ফলপ্রসু সমাধান করা। তবে লক্ষণীয় বিষয়, যতদিন রাশিয়া, চীন ও ভারত মিয়ানমারের উপর কোন কার্যকর চাপ প্রয়োগ না করবে, ততদিন রোহিঙ্গা সমস্যার সহজ সমাধান হবে না।

লেখক: ব্যাংকার ও কলাম লেখক, সতিশ সরকার রোড, গেন্ডারিয়া, ঢাকা।

এই বিভাগের আরো খবর