ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২৬ মে ২০২২,   জ্যৈষ্ঠ ১২ ১৪২৯

ব্রেকিং:
চট্টগ্রাম, গাজীপুর, কক্সবাজার, নারায়ানগঞ্জ, পাবনা, টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহ ব্যুরো / জেলা প্রতিনিধি`র জন্য আগ্রহী প্রার্থীদের আবেদন পাঠানোর আহ্বান করা হচ্ছে। শিক্ষাগত যোগ্যতা- স্নাতক, অভিজ্ঞদের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল যোগ্য। দৈনিক প্রতিদিনের চিত্র পত্রিকার `প্রিন্ট এবং অনলাইন পোর্টাল`-এ প্রতিনিধি নিয়োগ পেতে অথবা `যেকোন বিষয়ে` আর্থিক লেনদেন না করার জন্য আগ্রহী প্রার্থীদের এবং প্রতিনিধিদের অনুরোধ করা হল।
সর্বশেষ:
ডাক্তারদের ফাঁকিবাজি রুখতে হাজিরা খাতায় দিনে তিনবার সই করার নির্দেশ! ১০০০ জনবল নিয়োগ দেবে ওয়ালটন ঢাকায় আসছে ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি সরকারকে ৬ দিনের আল্টিমেটাম ইমরান খানের ফাইনালের পথে বেঙ্গালুরু, লখনৌর বিদায় সেনেগালে হাসপাতালে আগুন; ১১ নবজাতকের মৃত্যু বিশ্বব্যাপী মাঙ্কিপক্স আক্রান্ত ২০০ ছাড়িয়েছে ঢাবিতে ফের ছাত্রলীগ-ছাত্রদল সংঘর্ষ

শিশুশ্রম নামক মধ্যযুগীয় বর্বরতা বন্ধে সরকারসহ সচেতন মহলকে এগিয়ে আসতে হবে

সাফাত বিন ছানাউল্লাহ্

প্রকাশিত: ১ মে ২০২২  

ছবি- সংগৃহীত।

ছবি- সংগৃহীত।

 

"ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে" "আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ" এই সব মর্মবাণী বিখ্যাতরা বলে গেছেন, আমরা বইয়ে পড়েছি। এখনো যোকোন প্রয়োজনবোধে আমরা প্রতিনিয়ত বলে যাচ্ছি। বক্তৃতায়, টকশোতে, আলোচনায় অনেকে আবার বিষয়গুলো নিয়ে চর্বিতচর্বণ করেন। কিন্ত, দেশের মহামূল্যবান সম্পদ শিশুরা যে অনেকখানি পিছিয়ে যাচ্ছে বা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে এসব নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেন কয়জন? আজও আমাদের দেশের শিশুরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। শিক্ষার আলো তাদের হৃদয় ঘরে জলছে না। দেশটা যখন স্বাধীন হয়েছিল অনেক শিশুরা পর্যন্ত ভূমিকা রেখেছিলেন দেশকে শত্রুমুক্ত করতে সেই খবরই বা রাখেন কয়জন?

 

বাংলাদেশটা যদি একবার ঘুরে দেখা যেত তবেই খুব সহজেই বুঝা যায় শিশুরা কত অসহায়, নানান বৈষম্যের শিকার। যে বয়সে তাদের বই, খাতা, পেন্সিল নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কোমল সেই বয়সে কঠিন কাজ তাদের দিয়ে করানো হচ্ছে অত্যন্ত নির্দয়ের সঙ্গে। আমি একজন বাংলাদেশ নামক দেশটির একজন নাগরিক হয়ে যদি চোখে দেখতে হয় একজন ছোট বাচ্চা যার বয়স কিনা ১০-১২ বছর ভারী বোঝা কাঁধে নিয়ে পথের পর পথ অতিক্রম করছে, শহর বা গ্রামে বাসায় কাজ করার সময় একজন ছোট বাচ্চাকে - যার কিনা এখনো ভাল করে সবকিছু বুঝার শক্তি হয়নি তাঁকে অত্যন্ত নির্দয় ভাবে ভারী কাজ করানোর পাশাপাশি নির্মম নির্যাতন করছে, অনেক শিশুকন্যা আবার মালিকের ছদ্মবেশ ধারণকারী পশুদের লালসার শিকার হচ্ছে, ওদের পশুত্ব ধরা পরার ভয়ে হত্যা করা হচ্ছে। এমন ঘটনার প্রমাণ অহরহ। ঘরের মালিক/মালকিন বড় কোন পর্যায়ে থাকার ভয় দেখিয়ে দিনের পর দিন নির্মম অত্যাচার করেন তখন বড় কষ্ট আর অনুশোচনা হয় স্বাধীন দেশটার জন্য।

 

এসবের জন্য তো আমরা মুক্তিযুদ্ধ করিনি! মাত্র নয় মাসে ছিনিয়ে আনিনি বিজয় পতাকা! এই দেশটি প্রতিষ্ঠার পিছনে অসংখ্য শিশু-কিশোর মুক্তিযোদ্ধার ভূমিকা আছে ইতিহাস সবারই জানা। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সর্বকনিষ্ঠ বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত লালুর বয়স ছিল মাত্র ১০ বছর। এভাবে হাজারো লালুরা দুঃসাহস করেছিল পাকিস্তানি হায়েনাদের বিরুদ্ধে লড়তে।  আমাদের এই রাষ্ট্রটির যিনি প্রতিষ্ঠাতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিশুদের ভালবাসতেন, আদর করতেন আপনজনের মত। তাইতো প্রতিবছর বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন কে জাতীয় শিশু দিবস ঘোষণা করেছে সরকার। ঐ দিনে আমাদের দেখা যায় ওদের প্রতি কত দরদ, লোক দেখানো ভালবাসা, স্নেহ, মমতা কত কী। বিশেষ দিনটি চলে গেলে কার খবর কে নেয়। শুধুমাত্র এসব করেই কী আমাদের দায়িত্ব শেষ?

 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত একটা টান আছে শিশুদের প্রতি। ওনার বেশ কয়েকটি সাক্ষাতকারে বলেছেন বলেছেন, নাতি-নাতনিদের নিয়ে সময় কাটালে আমি নতুন প্রাণ ফিরে পাই। আমার সম্পূর্ণ সুস্থ থাকার এটাও একটা কারণ । ওদের নিয়ে খেলি, ঘরময় দৌড়ে বেড়াই, বাগানে ঘুরতে যাই, রান্না করে খাওয়াই। আবার কোথাও অনুষ্ঠানে গেলে শিশুদের আদরে বুকে টেনে নিতে দেখে আপ্লুত হই। প্রতি বছরের প্রথম মাসে ছোট্ট কোমলমতিদের হাতে বই তুলে দিয়ে সেকি বাঁধভাঙা আনন্দ উচ্ছাস ভাষায় প্রকাশ করার মত না। কারণটা সবাই জানে, একটি কালরাতের নৃশংসতায় পরিবারের সবাইকে হারানো প্রধানমন্ত্রীর ছোট আদরের ভাইটি ছিল মাত্র ১০ বছরের! জার্মানিতে যাওয়ার সময় সবার কনিষ্ঠ ভাইটিকে বিমানবন্দরে শেষবার বুকে জড়িয়েছিলেন হাসু আপা। রাসেলের মুখটি বারবার চোখে ভেসে উটলে মনে পরে এখনকার রাসেলদের জীবনের গল্প। পৃথিবীর অন্ধকারময় সেই রাত্রিতে হৃদয়হীন নরপশুদের কালো থাবায় ছোট্ট রাসেলদের মতই অকালে ঝরে যাচ্ছে তাজা সম্ভাবনাময় প্রাণগুলো।  কিন্ত, একার পক্ষে কোন কিছুই তো সম্ভব না। এজন্য দরকার সম্মিলিত প্রচেষ্টা আর ঐক্যবদ্ধতা।
আমি ইদানিং টেলিভিশন খুব একটা দেখিনা। মিথ্যার ফুলঝুরি আর গালগল্প দেখতে শুনতে অনেক সময় পেড়িয়ে গেছে। জীবনের বাকি দামি সময়গুলো এখন কাজে লাগাতে চাই। রিমোর্টের বোতাম টিপলে একের পর এক বচন আর বাণীতে চ্যানেলগুলো সয়লাব। টকশোতে বসলেই বুদ্ধিজীবীর যেন নতুন প্রাণ পান। এটা করতে হবে, ওটা করতে হবে, এটা চাইনা, ওটা চাইনা এসব বলতে বলতে এক সময় ঝগড়া এমনকি হাতাহাতি ও দেখেছি। এসব আবার চারকোণা বিশিষ্ট বক্সের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

 

কয়েকবছর আগে জীবনের বাস্তব প্রত্যক্ষ করা একটি ঘটনা মনে পড়ছে। ঢাকা থেকে ট্রেনে চট্টগ্রাম ফিরছিলাম। একটা ছেলে উঠলো কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে। ওর সাথে আমার দেখা এবং কথা হয় কুমিল্লা গিয়ে। বয়স মাত্র ১২-১৩ বছর। যাবে চট্টগ্রাম মায়ের সাথে দেখা করতে। নাম রাজু। বাড়ী কিশোরগঞ্জ। আমার একটা বদঅভ্যাস কোন ছোট বাচ্চা, বয়স্ক বা বন্ধু বয়সী নতুন কাউকে দেখলে কুশল বিনিময় করি, পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করি। রাজু নামের ছেলেটি ঢাকায় কাজ করে সিমেন্টের দোকানে। বাবা হটাৎ মারা যাওয়ায় একপ্রকার বাধ্য হয়েই তার মা চট্টগ্রামে এসে গার্মেন্টস এ চাকরি করে। তাঁর একটা ছোট বোন ও আছে দুই বছরের। আলাপনীতে এসব বলছিল রাজু। জিগ্যেস করলাম - তুমি তো অনেক ছোট, কাজ কেন কর? পরতে ইচ্ছে করেনা? চোখ মুছে যে বলল, বাবা নেই কাজ করতে হবে। আমি চট্টগ্রাম আসা পর্যন্ত বড়ভাইয়ের মত অনেক বোঝালাম যে, তোমার মা কাজ করে অবশ্যই তুমি আর বোনটিকে দেখবে। কোন কাজ করার প্রয়োজন নাই। তুমি নতুন করে পড়ালেখা শুরু কর। আজকাল গরীব আর অসহায়দের জন্য অনেক সুযোগসুবিধা আছে। সে বলে - ৩য় শ্রেণী পর্যন্ত পরেছে সে। বাবা মারা যাওয়ার কিছুদিন পর বাড়ী থেকে পালিয়ে গিয়ে ৬ মাস নিখোঁজও ছিল সে। তারপর দোকানে চাকরি নিয়ে ঢাকায় থাকতে শুরু করে। একা  ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম আসতে কোন সমস্যা হবে না জিগ্যেস করতেই সোজা উত্তর- না। আমার সাহস আছে। একবার মায়ের সাথে এসেছিলাম সেই থেকে আমি চিনি। রাজু তাঁর বেগে ছোট বোনটার জন্য লিচির প্যাকেট, চকলেট আরো কত কিছু নিয়েছে অনেকদিন পর দেখা হবে বলে। রাজু আনন্দের সাথে বললো ভাইয়া - আমাকে দেখে মা আর বোন অনেক খুশি হবে। সিটে বলে গল্প শুনছিলাম আর মনে মনে আবেগাপ্লুত হয়ে চিন্তা করছিলাম - কত ভালবাসা আর সুন্দর একটি মন থাকে এসব সম্ভব!

 

রাত ১০ টায় ট্রেন থেকে নেমে রাজুর দেয়া নাম্বারে মাকে ফোন করলে কিছুক্ষণ পর মা এসে অনেকক্ষণ জড়িয়ে ধরে উৎফুল্ল হয়ে সন্তানকে আগলে রাখলেন। আমিও রাজুর মাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম - আপনার ছেলে অনেক ভাল। সে গভীরভাবে চিন্তা করে তাঁর যে একটা ছোটবোন আছে ওর জন্য কিছু নিয়ে যেতে হবে। রাজুকে আবার স্কুলে ভর্তি করে দিন। আপনি সামাজিক ও রাষ্ট্রের অনেক সুযোগসুবিধা পাবেন। কেঁদে কেঁদে মা বলল কী করব। বাবা নেই, সংসার চালাতে হবে তো। তাকে বললাম - বাবা সারাজীবন কারো থাকেনা। আমার ও বাবা নেই! আমার মায়ের ও স্বামী নেই! তাই বলে রাজুর সুন্দর ভবিষ্যৎ আপনি নষ্ট করবেন না। আমার কথায় যদি রাজুর মায়ের একটু হলেও বোধগম্য হয় তাহলেই আমার মত একজনের প্রশান্তি এই ভেবে যে, কিছু কথার কার্যকারিতা হবে, একজন সম্ভাবনাময় প্রজন্মের প্রতিনিধি সোনালী ভবিষ্যৎ ফিরে পাবে।

 

শুধু কিশোরগঞ্জের অজপাড়ার রাজু নয় সারা দেশের আজ লক্ষ রাজুর জীবন বড়ই দুর্বিষহ। সুন্দর পৃথিবীতে জন্মানোর পরও অন্ধকার জীবন পায় ওরা নিয়তির ভাগ্যদোষে। "শিশুশ্রম" নামক দেশব্যাপী এই মহামারি বন্ধে  এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে সরকার সহ বেসরকারি, সামাজিক সংগঠন গুলো থেকে। গ্রাম, শহর, ইউনিয়ন, পাড়া, মহল্লায় ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে পাশ করতে হবে "শিশুশ্রম বন্ধে নতুন আইন"। আবার দেখা যায়, অহরহ আইন পাশ হচ্ছে। সঠিক প্রয়োগ আর যথাযথ কার্যকরের বেলায় শুভঙ্করের ফাঁকি। যদি এ ব্যাপারে জনসচেতনতা বাড়ানো যায় তবেই কোমলমতি শিশুদের দিয়ে কাজ করানো বন্ধ হবে। শিক্ষা, সমাজ, রাষ্ট্রের তরুণ সচেতন মহল এগিয়ে এলেই আমাদের দেশটা ১০০ বছর এগিয়ে যায় ।।


কবি, প্রাবন্ধিক, সংগঠক
সাতবাড়িয়া, চন্দনাইশ, চট্টগ্রাম

এই বিভাগের আরো খবর