Berger Paint

ঢাকা, শুক্রবার   ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০,   আশ্বিন ৯ ১৪২৭

ব্রেকিং:
বাংলাদেশ ও সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক রোববার দক্ষিণ আফ্রিকায় ২ প্রবাসী বাংলাদেশিকে হত্যা করোনা চিকিৎসায় সফল অ্যাভিগান, জাপানি প্রতিষ্ঠানের দাবি সৌদি প্রবাসীদের জন্য চলতি মাসেই বিমানের বিশেষ ফ্লাইট ঈশ্বরদীতে আওয়ামী লীগের দুটি নির্বাচনী অফিস ভাংচুর-গুলিবর্ষণ
সর্বশেষ:
করোনা রোধে স্বাস্থ্যবিধিই ভরসা, ভ্যাকসিন মিলছে না এ বছর প্রাথমিক স্কুল খোলার প্রস্তুতির নির্দেশ ইতালির ভেনিস সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বাংলাদেশির জয়

সাগরকন্যা কুয়াকাটা-সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের লীলাভূমি

মো: জিল্লুর রহমান

প্রকাশিত: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২০  

পঠিত: ১৬৬
মো: জিল্লুর রহমান। ছবি- প্রতিদিনের চিত্র

মো: জিল্লুর রহমান। ছবি- প্রতিদিনের চিত্র


"বহু দিন ধরে, বহু ক্রোশ দূরে
বহু ব্যয় করি, বহু দেশ ঘুরে
দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা, দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু।
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া,
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিসের উপরে, একটি শিশির বিন্দু।

শান্তিনিকেতনে মায়ের সাথে পৌষমেলা দেখতে গিয়েছিলেন দশ বছরের শিশু সত্যজিৎ রায়। ছোট্ট সত্যজিতের ভারি ইচ্ছে, প্রথম পাতায় রবি ঠাকুরের অটোগ্রাফ নেবেন। সেই অটোগ্রাফের খাতাতেই চমৎকার এই কাব্যাংশটি লিখে দিয়েছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ভ্রমন পিপাসুদের জন্য এটি একটি খুব সুন্দর বার্তা।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরুপ লীলাভূমি আমাদের বাংলাদেশ। পাখি ডাকা, গাছ গাছালির ছায়া ঢাকা, নদ-নদী,পাহাড় জঙ্গলে ভরপুর আমাদেরই সোনার
বাংলাদেশ। এ দেশের প্রকৃতি যেমন নিত্য প্রফুল্ল, তেমনি চিরসৌন্দর্যময়ী। সোনার খনি না থাকলেও এদেশের দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ মাঠের পরতে পরতে সোনা ছড়িয়ে আছে। নদী-নালা, সমুদ্র সৈকত ইত্যাদির মোহে মুগ্ধ হয়ে জনৈক বিদেশি পর্যটক মন্তব্য করেছিলেন এইরূপ- “There are many doors to entrance it but none to exit.”

মানুষ মাত্রই প্রকৃতির পূজারী। প্রাকৃতিক আকর্ষণগুলো মানুষকে বরাবরই টানে। প্রকৃতিকে ভালোবাসে না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুস্কর। জীবন যেখানে বৈচিত্রময়, প্রকৃতি যেখানে মানুষকে হাতছানি দিয়ে ডাকে, সমুদ্রের গর্জন যেখানে মানুষকে আবেগপ্লুত করে, সূর্যোদয় ও সূযাস্তের লুকোচুরি যেখানে মানুষকে ভীষণভাবে আকর্ষণ করে। এমনি একটি পর্যটন সম্ভবনাময়
স্থানের নাম কুয়াকাটা। পর্যটকদের কাছে কুয়াকাটা "সাগর কন্যা" হিসেবে সমধিক পরিচিত। বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিাঞ্চলে পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলায় এ দর্শনীয় স্থানটির অবস্থান। এটি একাধারে সমুদ্র সৈকত ও পর্যটনকেন্দ্র। ১৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সৈকত বিশিষ্ট কুয়াকাটা বাংলাদেশের অন্যতম নৈসর্গিক সমুদ্র সৈকত। এটি বাংলাদেশের একমাত্র সৈকত যেখান থেকে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দুটোই দেখা যায়।

কুয়াকাটা মূলত পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার মহিপুর থানার লতাচাপলী ইউনিয়নে অবস্থিত। ঢাকা থেকে সড়কপথে এর দূরত্ব ৩৮০ কিলোমিটার, বরিশাল থেকে ১০৮ কিলোমিটার ও পটুয়াখালী থেকে ৮৪ কিলোমিটার।

সড়ক, নৌ ও আকাশ পথ তিনটি মাধ্যমেই কুয়াকাটা পৌঁছানো সম্ভব। ঢাকার সায়েদাবাদ ও গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে বেশ কয়েকটি বাস সকাল ও সন্ধ্যায় এখন সরাসরি কুয়াকাটা যায়। সাকুরা, হানিফ, ঈগল, কুয়াকাটা, গোল্ডেন লাইন, মেঘনা, সুগন্ধা, সুরভী, সোনারতরী, বিআরটিসি পরিবহনের বাস সরাসরি কুয়াকাটায় যায়। এসব বাস কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত থেকে মাত্র ২০০ মিটার দূরে নামিয়ে দেয়। ঢাকা থেকে কুয়াকাটা বাসে যেতে মোট সময় লাগে প্রায় ৮/১০ ঘন্টা। বর্তমানে দুটি ফেরি পার হতে হয়। পদ্মা সেতু ও লেবুখালী সেতুর নির্মান কাজ শেষ হলে ৫/৬ ঘন্টায় কুয়াকাটা পৌঁছানো সম্ভব হবে।

নৌ পথে ঢাকা থেকে বরিশাল, পটুয়াখালী বা আমতলী হয়ে কুয়াকাটা যাওয়া যায়। লঞ্চ এক্ষেত্রে অনেক ভালো ও আরামদায়ক একটা বিকল্প। ঢাকার সদরঘাট থেকে বিকাল ৪.৩০ টার মধ্যে আমতলীর, বিকাল ৫.৩০ থেকে ৬.৩০ টার মধ্যে পটুয়াখালীর লঞ্চ এবং রাত ৮.৩০ থেকে ৯.০০ টার মধ্যে বরিশালের লঞ্চ ছেড়ে যায় এবং ফজরের নামাজের ওয়াক্তের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছে যায়। আরামদায়ক লঞ্চের কেবিন সবচেয়ে নিরাপদ ভ্রমন। তবে সবচেয়ে সহজ যাতায়াত ব্যবস্থা হল ঢাকার সদরঘাট থেকে লঞ্চে বরিশাল বা পটুয়াখালী, সেখান থেকে বাসে কুয়াকাটা। বরিশাল থেকে পটুয়াখালী হয়ে কলাপাড়া পর্যন্ত রাস্তা বেশ ভাল এবং এ পথটুকু বাসে ভ্রমন করতে হয়। আগে তিনটা ফেরী পার করতে হতো কিন্তু এখন ৩টা নতুন ব্রিজ হওয়াতে পুরো ঝকঝকে রাস্তা। মনে রাখতে হবে, সন্ধ্যা ৫টার পর আর কোনো বাস পটুয়াখালী থেকে কুয়াকাটা যায় না।

এছাড়া, বর্তমানে ঢাকা থেকে নিয়মিত বরিশালে বেশ কয়েকটি বিমান চলাচল করে এবং বরিশাল পর্যন্ত পৌঁছে সড়কপথে কুয়াকাটা যাওয়া যায়। অদূর ভবিষ্যতে হয়তো পায়রা সমুদ্র বন্দরকে কেন্দ্র করে এর নিকটবর্তী কোন স্থানে সুদৃশ্য বিমান বন্দর হবে এবং তখন খুবই স্বল্প সময়ে কুয়াকাটায় পৌঁছানো যাবে।

কুয়াকাটায় পর্যটকদের থাকার জন্য বিভিন্ন মানের হোটেল মোটেল আছে। পর্যটন করপোরেশনের আছে ইয়ুথ ইন কুয়াকাটা ও হলিডে হোম। এছাড়া হোটেল বনানী প্যালেস, কুয়াকাট ইন, নীলাঞ্জনা, গোল্ডেন প্যালেস ইত্যাদি। সচ্ছলদের জন্য আছে সিকদার রিসোর্ট। দীর্ঘ বন্ধের ছুটিতে বেড়াতে গেলে ১০/১৫ দিন আগে হোটেল বুকিং দিয়ে বেড়াতে যাওয়া ভাল, অন্যথায় অনেক সময় মানসম্মত হোটেল পাওয়া যায় না এবং ফ্যামিলি নিয়ে বেড়াতে গিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। নেটে সার্চ দিলে খুব সহজে সব হোটেলে যোগাযোগের তথ্য পাওয়া যায়।

বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে দেশের সর্বদক্ষিণে পটুয়াখালী জেলায় কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত। আশির দশক থেকে ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ দক্ষিণাঞ্চলের এই জায়গার কদর বাড়তে থাকে। তখন থেকে দেশ-বিদেশের ভ্রমণ প্রেমীরা আসতে শুরু করেন। এখানে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে বিমোহিত হন তারা। ধীরে ধীরে পর্যটকদের মনে জায়গা করে নেয় এই সৈকত। একই স্থানে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখা যায় কুয়াকাটায়। এছাড়া এখানে রয়েছে রাখাইন সম্প্রদায়ের বৈচিত্র্যময় পরিবেশ ও তাদের ঐতিহাসিক বৌদ্ধবিহার।

কুয়াকাটা নামের পেছনে রয়েছে আরকানদের এদেশে আগমনের সাথে জড়িত ইতিহাস। 'কুয়া' শব্দটি এসেছে মূলত 'কুপ' থেকে। ধারণা করা হয় ১৮ শতকে মুঘল শাসকদের দ্বারা বার্মা থেকে বিতাড়িত হয়ে আরকানরা এই অঞ্চলে এসে বসবাস শুরু করে। তখন এখানে সুপেয় জলের অভাব পূরণ করতে তারা প্রচুর কুয়ো বা কুপ খনন করেছিলেনে, সেই থেকেই এই অঞ্চলের নাম হয়ে যায় কুয়াকাটা! সেই কুয়া খনন থেকে আজকের ‘কুয়াকাটা’ নামকরণ করা হয় বলে জনশ্রুতি রয়েছে। জিরো পয়েন্টের কাছে এমন একটি কুয়া এখনও টিকে আছে।

এছাড়া, প্রবীণ জয়নাল খাঁ (৯৭) নামে এক সময়কার ব্রিটিশ সেনা সদস্যের তথ্য মতে, এখানকার প্রথম আদিবাসী পাড়া-প্রধান কুয়াসা মংয়ের নামে ‘কুয়াকাটা’ নামকরণ করা হয়েছে। তবে যাই হোক, কবে কখন কুয়াকাটা নামকরণ করা হয়েছে তা আজও সঠিকভাবে জানা সম্ভব হয়নি। কুয়াকাটার আরেক নাম ‘সাগরকন্যা’।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ২২৫ বছর আগে বার্মার আরাকানে জাতিগত কোন্দলের কারণে রাতের আধাঁরে রাখাইন সম্প্রদায়ের ১৫০টি পরিবার ৫০টি কাঠের নৌকা যোগে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আসে। দীর্ঘ ৭দিন নৌকায় থেকে বসবাসের জন্য প্রথমে কক্সবাজার, পরে হাতিয়া, সন্দ্বীপ, রাঙ্গাবালী, মৌডুবী এবং সর্বশেষে কুয়াকাটায় আসে। কুয়াকাটা তখন ছিল গহীন বনাঞ্চল। বসবাসের জন্য রাখাইনরা ঘাটলা (বর্তমান কুয়াকাটা) নামের এ অঞ্চলটিকেই বেছে নেয়। বন্যহিংস্র প্রাণীদের সাথে যুদ্ধ করে বন আবাদ করে বসবাস শুরু করে। এ অঞ্চলে বসবাসে সবকিছু অনুকূলে থাকলেও সংকট দেখা দেয় খাবার পানির। এ সময় অঞ্জলি পরিবারের লোকজন কুয়া (কুপ) খনন করে মিষ্টি পানির সন্ধান পায়। রাখাইনরা এ স্থানের নাম দেয় ক্যাঁচাই (ভাগ্য গড়ার স্থান)। এর আগে বৃটিশদের ঘাট থাকায় এর নাম ছিলো ঘাটলা। কিন্তু বাঙালীরা এসে রাখাইনদের কুয়াকে কেন্দ্র করে এই স্থানের নামকরন করে কুয়াকাটা। একে পর্যটকরা সাগরকন্যা বলে থাকলেও এর কোনই ঐতিহাসিক তাৎপর্য নেই। তবে কক্সবাজারের ইনানি বিচকেও অনেকে সাগরকন্যা বলে থাকে। পটুয়াখালী জেলাকেও বলা হয় সাগরকন্যা। আর দেশি বিদেশি পর্যটকরাও এই নামেই কুয়াকাটাকে চিনে। তবে পৌরাণিকে সাগরের দেবতা হচ্ছে পসাইডন এবং তার কন্যা এম্ফিত্রিতি কে বলা হত সাগরকন্যা।

১৯৯৮ সালের মে মাসে কুয়াকাটাকে পর্যটন কেন্দ্র ঘোষণা করা হয়। ২০১০ সালে পৌরসভায় উন্নীত হয়েছে কুয়াকাটা। কিন্তু এখানে কোনও বাস টার্মিনাল নেই। তাই বাসগুলো কুয়াকাটা জিরো পয়েন্ট থেকে টিঅ্যান্ডটি ভবন পর্যন্ত রাস্তার মাঝখানেই রাখা হয়। এ কারণে ভোগান্তিতে পড়েন পর্যটকরা।

কুয়াকাটার সন্নিকটবর্তী যেসব দর্শনীয় স্থান রয়েছে সেগুলো হলঃ

১) ফাতরার বন - সমুদ্র সৈকতের পশ্চিম দিকের সংরক্ষিত ম্যানগ্রোভ বন, যা 'দ্বিতীয় সুন্দরবন' হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে;

২) কুয়াকাটার 'কুয়া'- কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের কাছে জিরো পযেন্টের রাখাইন পল্লী কেরানী পাড়ার শুরুতেই একটা বৌদ্ধ মন্দিরের কাছে রয়েছে একটি প্রাচীন কুপ;

৩) সীমা বৌদ্ধ মন্দির - প্রাচীন কুয়াটির সামনেই রয়েছে প্রাচীন সীমা বৌদ্ধ মন্দির, যাতে রয়েছে প্রায় সাঁইত্রিশ মন ওজনের অষ্ট ধাতুর তৈরি ধ্যানমগ্ন বুদ্ধের মূর্তি;

৪) কেরানিপাড়া - সীমা বৌদ্ধ মন্দিরের সামনে থেকেই শুরু হয়েছে রাখাইন আদিবাসীদের পল্লী কেরানিপাড়া;

৫) আলীপুর বন্দর - কুয়াকাটা থেকে প্রায় চার কিলোমিটার উত্তরে রয়েছে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বড় মৎস্য ব্যবসা কেন্দ্র আলীপুর;

৬) মিশ্রিপাড়া বৌদ্ধ মন্দির- কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত থেকে প্রায় আট কিলোমিটার পূর্বে রাখাইন আদিবাসীদের আবাস্থল মিশ্রিপাড়ায় রয়েছে একটি বৌদ্ধ মন্দির, যাতে রয়েছে উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় বৌদ্ধ মূর্তি;

৭) গঙ্গামতির জঙ্গল - কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের পূব দিকে গঙ্গামতির খালের পাশে গঙ্গামতি বা গজমতির জঙ্গল।

৮) চর বিজয়-কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব কোণে বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে ওঠা পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা "চর বিজয়"। প্রায় ১০ বর্গ কিলোমিটারের এই দ্বীপটিতে এখনো কোনো জনবসতি গড়ে ওঠেনি, কিংবা নেই কোনো গাছপালা। বর্ষার ছয় মাস পানিতে ডুবে থাকে এ চরটি আবার শীতের মৌসুমে ধু-ধু বালুচর। জনবসতিহীন দ্বীপজুড়েই লাল কাঁকড়া ও নানা প্রজাতির পরিযায়ী পাখির অভয়াশ্রম।

কুয়াকাটা থেকে ট্যুরিস্ট বোটে সেখানে যেতে সময় লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা। এ সময় পর্যটকগণ উপভোগ করতে পারবেন সমুদ্রের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য। বিস্তীর্ণ জলরাশি ও সমুদ্রের বিশালতা ভ্রমণে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। দ্বীপটির কাছাকাছি গেলেই স্বাগত জানাবে অসংখ্য পরিযায়ী পাখি। বোট থেকে নামলেই লাল গালিচা সংবর্ধনা জানাবে লাল কাঁকড়ায় জড়ানো দ্বীপ। দ্বীপের স্বচ্ছ জলে সামুদ্রিক মাছের ছোটাছুটি নিমেষেই আপনার সারাদিনের ক্লান্ত মনকে ভরিয়ে দেবে অন্যরকম আনন্দে। তবে এ দ্বীপে কোনো দোকানপাট নেই, তাই কুয়াকাটা থেকেই খাবার ও পানিসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সংঙ্গে নিয়ে যেতে হবে। সকালে গিয়ে বিকেলেই ফিরে আসা যায়।

বিজয়ের মাসে নতুন এ চরটির সন্ধান মেলায় ভ্রমণ প্রেমিকরা এটিকে 'চর বিজয়' নামে আখ্যায়িত করেন। তবে সরকার এখনও আনুষ্ঠনিকভাবে কোনো নামের স্বীকৃতি দেয়নি। চর বিজয়ে বাংলাদেশের পতাকা হাতে শিক্ষার্থীরা ও টাঙানো সাইনবোর্ডতাই দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে চরটিকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলতে ও নিরাপদ ভ্রমণের সম্ভাব্যতা নিশ্চিত করতে ২০১৭ সালে পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসন, কুয়াকাটা পৌর প্রশাসন, বন বিভাগ, ট্যুরিস্ট পুলিশ, নৌ পুলিশ, হোটেল মালিক সমিতি, সামাজিক, স্বেচ্ছাসেবী এবং পরিবেশ সংগঠন ও সাংবাদিকদের প্রতিনিধি, পর্যটন ব্যবসায়ীরাসহ বিভিন্ন সংগঠনের লোকজন চরটি পরিদর্শন করে। বন বিভাগের উদ্যোগে বাগান সৃজনে রোপণ করা হয় ম্যানগ্রোভ প্রজাতির প্রায় ২ হাজার গোল, ছইলা, কেওড়া ও সুন্দরী গাছের চারা। যার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পতাকা ওড়ানো ও সরকারের পক্ষে সাইনবোর্ড টানিয়ে দেয়া হয়। সবমিলিয়ে 'চর বিজয়' এক অপার সম্ভাবনাময় পর্যটনস্থল। আগামী শীতে আপনিও ঘুরে আসতে পারেন বিজয়ের নামাঙ্কিত অপরূপ চরটিতে।

৯) কুয়াকাটার কাছেই সুন্দরবন আকর্ষণীয় ভ্রমণ স্পট। তবে ট্রলারযোগে এ যাত্রাপথ বেশ দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ। কুয়াকাটা থেকে যদি সুন্দরবন যাওয়ার আরামদায়ক নৌভ্রমণের সুব্যবস্থা থাকতো, তাহলে পর্যটক সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেত বলে অভিমত স্থানীয়  অনেকের। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা যেমন লাভবান হতেন, তেমনই সরকারও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব পেত।

১০) পায়রা সমুদ্র বন্দর বাংলাদেশের পটুয়াখালী জেলায় অবস্থিত বাংলাদেশের তৃতীয় এবং দক্ষিণ এশিয়ার একটি সামুদ্রিক বন্দর। এটি পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার লালুয়া ও বালিয়াতলী সংলগ্ন রাবনাবাদ চ্যানেল ও সংলগ্ন আন্ধারমানিক নদী তীরবর্তী টিয়াখালী ইউনিয়নের ইটবাড়িয়া স্থানে অবস্থিত। ২০১৩ সালের ১৯ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টিয়াখালী ইউনিয়নের ইটবাড়িয়া গ্রামে এর ভিত্তিফলক উন্মোচন করেন। আগস্ট ১৩, ২০১৬ সালে সমুদ্র বন্দরটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়৷ প্রায় ৬০০০ একর জায়গায় এটি গড়ে উঠেছে যেখানে বিশাল অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে। এটিও ধীরে ধীরে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।

পদ্মা সেতু নির্মান শেষ হলে দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও উন্নত হবে। এতে দক্ষিণাঞ্চলের ছোট ছোট বিভিন্ন দ্বীপগুলোতে মালদ্বীপের মতো পর্যটন উপযোগী করা যাবে। কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত ঘিরে দেখা দেবে পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা। দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন চর ও দ্বীপকে কেন্দ্র করে মালদ্বীপের মতো পর্যটনের বিশাল জগৎ তৈরি করা সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন রাজধানীর সঙ্গে উন্নত যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ যথাযথ উদ্যোগ। পদ্মা সেতু চালু হলে সেই সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যাবে। এদিকে, দ্রুত এগিয়ে চলছে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ। পদ্মা সেতুর নির্মান কাজ শেষ হলে কক্সবাজারের চেয়ে কম সময়ে কুয়াকাটায় পৌঁছানো সম্ভব হবে। কক্সবাজার যেতে যেখানে সময় লাগে ১০-১২ ঘন্টা সেখানে কুয়াকাটায় পৌঁছানো যাবে মাত্র ৬ ঘন্টায়, ফলে নিঃসন্দেহে পর্যটকের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য পরিমানে বাড়বে। এলাকায় বুলেট ট্রেন চালুর কথা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় বলা হয়েছে। সেক্ষেত্রে কুয়াকাটা ও আশপাশে বেশ কিছু দ্বীপ আছে সেগুলোর সঙ্গে ভালো ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। তাহলে পর্যটকরা আকৃষ্ট হবে। এজন্য ইতোমধ্যে অনেক দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান পটুয়াখালী ও এর আশপাশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

এখনকার প্রধান দুটি আকর্ষণীয় স্থান লাল কাকড়ার চর এবং অতিথি পাখির অভায়ারন্য চর বিজয়। কুয়াকাটার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরতে বাইক, ভ্যান, নৌকা বা ট্রলার ব্যবহার করতে হয়। তবে সমুদ্র সৈকতে বাইক নিয়ে ঘুরলে আলাদা অনুভূতি পাওয়া সম্ভব। এতে সময় বেঁচে যাবে একই সাথে অনেক জায়গা ঘুরে দেখা যাবে।

তবে, দূর-দূরান্ত থেকে অনেকেই প্রাইভেট কার নিয়ে ঘুরতে আসেন। কিন্তু গাড়ি নিয়ে স্পট পর্যন্ত যাওয়া সম্ভব হয় না। তাই সড়কগুলোর উন্নয়ন প্রয়োজন। অবকাঠামোর পর্যাপ্ত উন্নয়ন ও বিনোদনের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো দরকার কুয়াকাটায়। তাহলে পর্যটকরা আরও আকৃষ্ট হবে।

অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি কুয়াকাটায় ছিল ফয়েজ মিয়ার নারিকেল বাগান। যেখানে দেখা যেতো বিভিন্ন প্রজাতির শত শত গাছ। পাখির অভয়াশ্রম এই বাগানে ছিল বন্য শিয়াল, বানর ও অন্যান্য প্রাণী। পাখির কলকাকলিতে মুখর থাকতো গোটা স্থান। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সাগরের অব্যাহত ভাঙনে সেই ফয়েজ মিয়ার বাগান বিলীন হয়ে গেছে। হুমকির মুখে রয়েছে কুয়াকাটা জাতীয় উদ্যান। অবশ্য কুয়াকাটায় বাঁধ রক্ষার কাজ চলমান রয়েছে।

কিন্তু নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত সাগরকন্যা ভালো নেই। পর্যটক সমাগম বাড়াতে এগুলোর নিরসন হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয়রা মনে করেন, উন্নত নগরীতে গড়ে তুললে কুয়াকাটায় পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বাড়বে, একইসঙ্গে সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থানের।

নানা প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে এখানে বছরে তিন থেকে পাঁচ লাখের বেশী পর্যটক সাগরকন্যা কুয়াকাটা দেখতে আসে। বর্তমান সরকার কুয়াকাটাকে পর্যটন বান্ধব করার লক্ষ্যে যেসকল পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে তার বাস্তবায়ন সম্ভব হলে পর্যটকদের সংখ্যা তিনগুন বেড়ে যাবে। বাংলাদেশ সরকার, টুরিস্ট পুলিশ, টোয়াকসহ আরো স্থানীয় পর্যটন সংস্থাগুলো পর্যটন বিষয়ে সচেতনা বৃদ্ধি,পর্যটকদের নিরাপত্তা, মানসম্মত হোটেল ও রেঁস্তোরা, পর্যটকদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ, ট্যুরিস্ট গাইড সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করছে।

এতে পর্যটকসহ স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীরা উভয়ে উপকৃত হবে। এসব বিষয় বাস্তবায়ন সম্ভব হলে কুয়াকাটা হবে মডেল পর্যটন কেন্দ্র। সারগকন্যা কুয়াকাটাকে সম্ভাবনা থেকে সমৃদ্ধ করতে প্রয়োজন দক্ষ নেতৃত্ব, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, স্থানীয়দের পর্যটন বান্ধব আচরণ, হোটেল ও রেঁস্তোরা পরিচালনার প্রয়োজনীয় নীতিমালা, ট্যুরিস্ট পুুলিশের সহযোগিতা, ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা, দক্ষ গাইড, ট্যাভেল এজেন্সী, ট্যুর অপারেটর, স্থানীয় পরিবহন সংস্থাগুলোর পর্যটন বান্ধব আচরণ ও সহযোগিতা। পর্যটনের মাধ্যমে মানুষ সাবলম্বী হবে, স্থানীয় লোকজন উপকৃত হবে, বেকার সংখ্যা কমে যাবে।

এক্ষেত্রে আমাদের একটি বিষয় মাথায় রাখা দরকার তা হলো, পর্যটন শুধু আকর্ষণীয় স্থানের ওপর নির্ভর করে না। সঙ্গে ওই পর্যটন স্পটকে কেন্দ্র করে যে ভৌত কাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা সেটিও বেশ জরুরি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনুন্নত অবকাঠামো, পর্যটন স্পটগুলোকে বিশ্বমানে রূপান্তর না করা, স্পটসংলগ্ন এলাকায় অপরিকল্পিত উন্নয়ন, বাড়তি আকর্ষণ তৈরি না করা, সাংস্কৃতিক আয়োজন না থাকা, পরিচালনে রাজনৈতিক প্রভাব, পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাব ও সর্বোপরি সরকারের সুনজর না থাকায় পর্যটনের কাঙ্খিত বিকাশ ঘটছে না।

একইসঙ্গে পটুয়াখালীর লেবুখালী সেতুর কাজ চলছে। সেখানে ফেরিতে প্রতিনিয়ত বিড়ম্বনায় পড়ছেন ভ্রমণপিপাসুরা। সেতুটি চালু হলে তাদের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত চিত্তবিনোদনের একটি পার্ক নির্মাণ, কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত থেকে বিভিন্ন স্পট পর্যন্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সৈকতে সিসি ক্যামেরা যুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন স্থানীয়রা। সরকারের উদ্যোগে কুয়াকাটার উন্নয়নে মাস্টারপ্ল্যানের কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ দৃষ্টিনন্দন পর্যটন স্পট হিসেবে গড়ে উঠবে কুয়াকাটা। পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটার উন্নয়নে মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন হলে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। পাশাপাশি এখানে পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

তবে আশার বিষয় হলো, অতি সম্প্রতি বেশ কিছু উদ্যোগ সরকারিভাবে গ্রহণ করা হয়েছে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতসহ আশপাশ এলাকাগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য। আমরা চাই, সরকার দ্রুত পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করুক। পর্যটকরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করলে দেশের অর্থনীতির উন্নয়নে পর্যটন শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সে আশা আপনার, আমার সকলের।

লেখক: ব্যাংকার ও কলাম লেখক, সতিশ সরকার রোড, গেন্ডারিয়া, ঢাকা।

এই বিভাগের আরো খবর