Berger Paint

ঢাকা, সোমবার   ২৮ নভেম্বর ২০২২,   অগ্রাহায়ণ ১৪ ১৪২৯

ব্রেকিং:
চট্টগ্রাম, গাজীপুর, কক্সবাজার, নারায়ানগঞ্জ, পাবনা, টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহ ব্যুরো / জেলা প্রতিনিধি`র জন্য আগ্রহী প্রার্থীদের আবেদন পাঠানোর আহ্বান করা হচ্ছে। শিক্ষাগত যোগ্যতা- স্নাতক, অভিজ্ঞদের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল যোগ্য। দৈনিক প্রতিদিনের চিত্র পত্রিকার `প্রিন্ট এবং অনলাইন পোর্টাল`-এ প্রতিনিধি নিয়োগ পেতে অথবা `যেকোন বিষয়ে` আর্থিক লেনদেন না করার জন্য আগ্রহী প্রার্থীদের এবং প্রতিনিধিদের অনুরোধ করা হল।
সর্বশেষ:
প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগের ফল প্রকাশ আবারও পেছালো যে কোনো মূল্যে শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হবে: প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামে শিশু আয়াত হত্যা : আসামি আবীর ফের রিমান্ডে ৫০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কেউ পাস করেনি এসএসসিতে পাসের হার ৮৭.৪৪ শতাংশ সাংহাইয়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, বিক্ষোভ

সেচ ব্যবস্থাপনায় এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং

রাবিয়া আক্তার মনিফা

প্রকাশিত: ২৩ অক্টোবর ২০২২  

রাবিয়া আক্তার মনিফা।

রাবিয়া আক্তার মনিফা।

 

ক্রমাগত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক সম্পদের হ্রাস, বর্তমান সময়ের একটি অন্যতম প্রধান সমস্যা। বর্ধিষ্ণু জনসংখ্যার আবাসনের জন্য প্রতিনিয়ত কমে যাচ্ছে ফসলি জমি, ভরাট হচ্ছে জলাধার, যা ভবিষ্যতের জন্য ভীতিকর। পৃথিবীতে শতকরা  ০.৩ শতাংশ স্বাদু পানি বিদ্যমান, যার শতকরা ৯০ ভাগ ব্যবহার উপযোগী, তন্মধ্যে ৭০ ভাগ পানি ব্যবহৃত হয় কৃষিকাজে। এতে করে ভূ-স্তরের পানির প্রাপ্যতা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। ফলে কৃষিকাজে পানি সাশ্রয় এখন সময়ের দাবি। কৃষির জন্য পানি এখন সবচেয়ে বড় সংকট। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনেক সময় আমরা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পানি পাই, আবার প্রয়োজনের সময় যথেষ্ট পানি পাই না। এই সমস্যা দীর্ঘায়িত হলে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য সংকট বয়ে আনবে। তাই জলবায়ুর অভিযোজন মোকাবেলায় কৃষিকে যেমন গুরুত্ব দিতে হবে, তেমনি পানি ব্যবস্থাপনায় আরও সতর্ক থাকতে হবে।

 

ফসল উৎপাদনে সেচ একটি গুরুত্বপুর্ণ উপকরণ। ভূগর্ভস্থ পানির ভারসাম্য রক্ষা করে ভূপরিস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং ক্রমবর্ধমান খাদ্য চাহিদার যোগান দেয়ার লক্ষ্যে কৃষিতে আধুনিক ও টেকসই প্রযুক্তির ব্যবহার করে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ ও সংযোজনের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি করা যেতে পারে। এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর অন্তর্ভুক্ত নানা প্রযুক্তি কৃষিক্ষেত্রে সেচ ব্যবস্থাকে করতে পারে আরো সহজ। এসকল প্রযুক্তি একদিকে যেমন কৃষিতে পর্যাপ্ত সেচ ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে তেমনি বাড়িয়ে তুলবে ফলন। পর্যাপ্ত সেচ ব্যবস্থা নিশ্চিত হলে এবং সময়মতো সঠিক অনুপাতের সেচ প্রয়োগ করা হলে টেকসই কৃষির সকল লক্ষ্য খুব সহজেই পূরণ করা যাবে। তথাপি বাংলাদেশে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতেও তা সহায়তা করবে।

 

সেচ ব্যবস্থাপনা বলতে মূলত ফসলের ক্ষেত্রে সঠিক নিয়ন্ত্রণসহ সময়মতো প্রয়োজনীয় পরিমান পানির সরবরাহকরণকে বোঝায়। বাংলাদেশে ষাটের দশকের শুরু থেকে গভীর নলকূপ এবং লো-লিফ্ট পাম্পের সাহায্যে সেচকার্য শুরু হয়েছিল। এর পূর্বে কৃষকরা বৃষ্টির পানি ব্যবহারের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন করতো। ১৯৮০ সালের পর সেচ কার্যক্রমে অগভীর নলকূপের ব্যবহার শুরু হয়। বাংলাদেশের প্রায় ১৪৪ লক্ষ হেক্টর জমির মধ্যে ৯০.৩ লক্ষ হেক্টর চাষের আওতায় আনা হয়েছে। যার প্রায় ৬১% জমিতে সেচ সুবিধা রয়েছে।

 

সেচ হলো জমিতে ফসল ফলানোর জন্য কৃত্রিমভাবে মাটিতে পানি দেওয়ার ব্যবস্থা। স্বল্প বৃষ্টি এবং অনাবৃষ্টির সময় পানির অভাবে ফসল উৎপাদন যাতে বাধাগ্রস্থ না হয় সেজন্য গাছের বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে কৃত্রিমভাবে জমিতে এই পানি সরবরাহ করা হয়। সেচ কার্যক্রম এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকায় বহু হাজার বছর পূর্ব থেকেই চালু হয়েছে বলে অনুমান করা হয়। এক হিসেবে জানা যায় যে, সারা পৃথিবীতে সেচকৃত মোট জমির প্রায় অর্ধেক জমি ভারত, পাকিস্তান, চীন এবং বাংলাদেশে। সুতরাং বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থার উন্নতিতে আধুনিক সেচ ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন।

 

বোরো মৌসুমে ধান চাষাবাদে খরচের অন্যতম প্রধান খাত হলো সেচ। ব্রির সেচ ও পানি ব্যবস্থপনা বিভাগের সমীক্ষায় দেখা গেছে, বর্তমানে বোরো মৌসুমে ধান চাষে সেচের জন্য প্রতি বিঘায় খরচ হয় ২০০০ টাকার বেশি। আর সেচ খরচ বৃদ্ধির প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০৩১ সালে প্রতি হেক্টরে এ খরচ  ১৬,৭১২ টাকায় দাঁড়াতে পারে। কাজেই উৎপাদন খরচ কম রাখতে হলে মাঠ পর্যায়ে যথাযথ সেচ ব্যবস্থাপনা এবং সেচ প্রযুক্তি গ্রহণের মাধ্যমে খরচ সীমিত করার উদ্যোগ নেয়া একান্ত আবশ্যক।

 

ধান চাষে পানি সাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানো যায় এবং সঠিক পদ্ধতির সেচ ব্যবস্থাপনা অনুসরণের মাধ্যমে ধানের ফলনের ক্ষতি এড়ানো যায়। সমীক্ষায় দেখা গেছে, কেবল আমন মৌসুমেই সম্পূরক সেচ প্রয়োগের মাধ্যমে খরা মোকাবেলা করে দশ লাখ টন বাড়তি ধান উৎপাদন করা সম্ভব। এ দেশে মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ, ৮৫ লাখ ৮৫ হাজার ২০৭ দশমিক ৪ হেক্টর। আর মোট সেচকৃত জমির পরিমাণ ৭৬ লাখ ১৪ হাজার ৫৭২ হেক্টর। এর মধ্যে আমন মৌসুমে ২০ লাখ হেক্টর জমিতে  বিভিন্ন পর্যায়ে সেচের প্রয়োজন হয়। আমাদের দেশে আউশ, আমন ও বোরো তিন মৌসুমেই কমবেশি সেচের প্রয়োজন হয়। তবে বোরো মৌসুমে সেচের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। শুকনো মৌসুমে বোরো চাষে সেচ কাজে পানির চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায় যা মেটাতে ভূ-গর্ভস্থ পানি অধিক পরিমাণে উত্তোলন করা হয়। ফলে ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর ব্যাপক চাপ পড়ে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য বিঘিœত হয়।

 

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) এর সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা বিভাগের সমীক্ষায় দেখা যায়, প্রতি কেজি ধান উৎপাদনে ১৫০০-২০০০ লিটার পানির প্রয়োজন হয় যা সেচের মাধ্যমে পূরণ করা ব্যয়বহুল। আমন মৌসুমে বিশেষ করে ধান রোপণের সময়টাতে এবং ধানের ফুল আসা পর্যায়ে যখন খরা দেখা দেয় তখন সম্পূরক সেচ প্রয়োগ করা অতীব প্রয়োজন। এছাড়াও  আউশ মৌসুমে ধান চাষে সম্পূরক সেচ প্রয়োগের মাধ্যমে ফলন বৃদ্ধি করা যায়। অনুরূপভাবে বিভিন্ন সেচ প্রযুক্তি যেমন বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে রবি ফসল উৎপাদন, অগভীর নলকূপে চেক ভালভ সংযোজনের মাধ্যমে প্রাইমিং সমস্যা দূরীকরণ, গভীর নলকূপে পিভিসি পাইপের মাধ্যমে পানি বিতরণ পদ্ধতি, এডবিøউডি পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে আউশ-আমনের পাশাপাশি বোরো ধান চাষে পানি সাশ্রয় এবং ফলন বৃদ্ধি করা সম্ভব।

 

উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টির পানি পুকুরে সংরক্ষণ করে তার মাধ্যমে সেচ প্রয়োগ করে সফলভাবে রবি শস্য উৎপাদন করা যায়। অগভীর নলকূপে চেক ভালভ প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেচ কার্য সহজ করা যায়। এই চেক ভালভ ব্যবহার করলে মৌসুমের শুরুতে একবার প্রাইমিং করলে সারা মৌসুমে আর প্রয়োজন হবে না। এ প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য বিশেষ কোনো কারিগরি দক্ষতার প্রয়োজন নেই। এটি সহজে বহনযোগ্য এবং যেকোনো স্থানীয় ওয়ার্কশপে এটি তৈরি করা যায়।  সেচ মৌসুম শেষে চেক ভালভ খুলে বাড়িতে রাখা যায় । তাছাড়া এর রক্ষণাবেক্ষণ খরচ প্রায় নেই বললেই চলে। গভীর নলকূপে পিভিসি পাইপের মাধ্যমে পানি বিতরণ প্রযুক্তি পিভিসি পাইপ, ক্রস, টি, ব্যান্ড ও ক্যাপ ব্যবহার করে সেচ যন্ত্রের পানি বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দেয়।  এ পদ্ধতিতে পানি সাশ্রয়ের মাধ্যমে সেচ এলাকা বৃদ্ধি ও সেচ খরচ কমানো সম্ভব। বোরো মৌসুমে ধান আবাদে পানি সাশ্রয়ী আরেকটি পদ্ধতির নাম অল্টারনেট ওয়েটিং এন্ড ড্রাইং বা এডবিøউডি প্রযুক্তি। এ প্রযুক্তি পর্যায়ক্রমে ভিজানো এবং শুকনো পদ্ধতিতে চলবে জাতভেদে ৪০-৫০দিন পর্যন্ত। ব্রির সেচ ও পানি ব্যবস্থপনা বিভাগ শস্যবিন্যাসে সামান্য পরিবর্তন এনে দেশের উত্তরাঞ্চলে খরা মোকাবেলার একটি নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। এ প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার সেচের খরচ কমাবে এবং সেচের জন্য ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাবে।

 

বাংলাদেশে সেচকৃত জমির ৯৪ শতাংশই ক্ষুদ্র ও গৌণ সেচ প্রকল্পের অধীনে। সাম্প্রতিক এক জরিপে জানা গেছে বাংলাদেশে ২৬৭০৪টি গভীর নলকূপ, ৪৪৯২২৬টি অগভীর নলকূপ, ৫৬৮২৯টি সাধারণ নলকূপ, ১৪২১৩২টি হস্তচালিত নলকূপ ও ৫,৬৫০০০টি দেশীয় সেচযন্ত্র দিয়ে সেচকার্য চলছে। এসকল সেচ যন্ত্র সুপ্রাচীন দেশীয় পদ্ধতি ব্যবহার করে সেচকার্য পরিচালনা করে। যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সবসময় সঠিক পরিমাণে সেচ প্রদানে সক্ষম নয়। এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর নানা প্রযুক্তি ব্যবহার করে আধুনিক সেচযন্ত্র তৈরি করা যায়। বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও গৌণ সেচ প্রকল্পের অধীনে এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা যায় সুদক্ষ অত্যধুনিক পাম্প। পাম্পসমূহে বৈদ্যুতিক মোটর বা ইঞ্জিন ব্যবহার করা যেতে পারে কেননা যান্ত্রিকভাবে শক্তিচালিত পাম্প ব্যবহারে অধিক উৎপাদন ও উচ্চতর দক্ষতার স্তর সহজেই অর্জন করা যায়। তাছাড়া এটি সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

 

বিদ্যুৎ এবং ডিজেলের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে সূর্যের আলোকে কাজে লাগিয়ে তা দিয়ে সোলার পাম্পের ব্যবহার দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। সাধারণত সোলার পাম্পের সাহায্যে পানি উত্তোলন, কৃষি জমিতে সেচ দেওয়া প্রভৃতি কাজ করা হয়। এর ফলে বিদ্যুতের উপর চাপ কমছে। এছাড়া এটি পরিবেশবান্ধব হওয়ায় পরিবেশের উপর কোনো বিরূপ প্রভাব পরবে না। বাংলাদেশের উপকূলীয় ও উত্তরাঞ্চলীয় এলাকাগুলোতে যেখানে নিরাপদ পানির সংকট রয়েছে, সেখানে এই নবায়নযোগ্য জ¦ালানি ব্যবহারের মাধ্যমে সোলার পাম্প সিস্টেমকে জনপ্রিয় করতে পারলে নিরাপদ পানির সরবরাহ নিশ্চিত হবে। সোলার পাম্প অত্যন্ত সাশ্রয়ী একটি পদ্ধতি যার মাধ্যমে সেচ মৌসুমে অত্যন্ত কম খরচে পানি দেয়া যায়। যা বাংলাদেশের অর্থথনীতিতে খুলে দিতে পারে নতুন দুয়ার।

 

কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির বাংলাদেশে ডিজেলের ঘাটতি কিংবা বিদ্যুতের মাত্রাতিরিক্ত চাপের কারণে প্রায় প্রত্যেক বছরই বিঘ্নিত হয় সেচ কার্যক্রম, ফলে কমে যায় উৎপাদন লক্ষমাত্রা। এ সমস্যা দূর করতে বিভিন্ন সরকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠান দেশব্যাপী ফসলি জমিতে স্থাপন করছে সৌর বিদ্যুৎ চালিত সোলার পাম্প। ডিজেল বা বিদ্যুতের চেয়ে এতে খরচ কম হয় বলে কৃষকরাও দেখছে আশার নতুন আলো। বাংলাদেশে প্রায় ১৩ লাখেরও বেশি ডিজেল চালিত সেচ পাম্প আছে যার পরিবর্তে সোলার পাম্প স্থাপন করা গেলে সাশ্রয় হবে প্রায় ১০ লাখ টন জ্বালানি।

 

ড্রিপ সেচ বা বিন্দু সেচ হলো সাধারণ স্থানীয় সেচ ব্যবস্থা গুলির মধ্যে একটি যা ট্রিকল বা মাইক্রো সেচমেন্টের সমার্থক। এই সেচ ব্যবস্থা পাইপলাইন এবং ভালভ সমেত একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গঠিত। এই ভালভগুলি সরাসরি ফসলি জমির ভূমিতে ঝোলানো থাকে। ড্রিপসেচ পদ্ধতিতে চাষের অপ্রয়োজনীয় জায়গা পানি দ্বারা প্লাবিত হয় না এবং শেষ পর্যন্ত এটি বাষ্পীভবন ও লিকিং পদ্ধতির মাধ্যমে পানির অপচয় হ্রাস করে। নির্দিষ্ট সময়ে পানির প্রয়োজনের উপর ভিত্তি করে ভালভের আকার, পাইপ ব্যাস এবং প্রবাহ হার নির্ধারণ করা হয়। প্লাবন পদ্ধতি অথবা ঝরনা পদ্ধতিতে সেচ ব্যবস্থাপনার তুলনায় ড্রিপসেচ ব্যবস্থা অনেক সুবিধাজনক। ড্রিপসেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে শুধুমাত্র পানি সরবরাহ করা হয় তা নয় । এ পদ্ধতিতে সেচ দিয়ে পানি সরবরাহ করে দ্রবণীয় সার ও প্রয়োজনীয় রাসায়নিক পদার্থ (কীটনাশক, পরিষ্কারক এজেন্ট ইত্যাদি) ফসলের প্রয়োগ করা যেতে পারে। এছাড়া পানি এবং সারের প্রয়োজনীয় পরিমাণ জানা যেতে পারে। অতএব, কৃষি জমিতে ব্যবহৃত পানির অপচয়ের পরিমাণ হ্রাস করা যাবে। বাংলাদেশের যে সকল এলাকায় সেচ ব্যবস্থাপনায় পানির সংকট রয়েছে সে সকল এলাকায় ড্রিপ সেচ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

 

স্প্রিঙ্কলার ইরিগেশন সিস্টেম এমন একটি সেচ পদ্ধতি যা প্রাকৃতিক বৃষ্টির মত জমিতে বা বাগানে সেচ দিয়ে থাকে। মুলত, পাম্প থেকে পাইপের মাধ্যমে পানি প্রবাহিত করা হয় এবং স্প্রিঙ্কলার দিয়ে জমিতে বৃষ্টির মত ছড়িয়ে দেয়া হয়। স্প্রিঙ্কলার ইরিগেশন সিস্টেম একটি জনপ্রিয় সেচ পদ্ধতি। কারন এটি সেটাপ করা, পরিচালনা করা তুলনামূলক সহজ এবং সব ধরনের মাটি ও ফসলে ব্যবহার উপযোগী। স্প্রিঙ্কলার ইরিগেশন সিস্টেম ব্যবহার করার উপযোগী জনপ্রিয় ফসল হল চা, ভ্টুা, পেঁয়াজ, মরিচ, তুলা, সূর্যমুখী ফুল, নার্সারি এবং বিভিন্ন ফল ও ফুলের বাগান। স্প্রিঙ্কলার ইরিগেশন সিস্টেম এর পানি প্রবাহ করা হয় পরিকল্পনামাফিক ও পাইপের মাধ্যমে। ফলে অতিরিক্ত কোন নালা বা ড্রেইন করতে হয় না। স্প্রিঙ্কলার ইরিগেশন সিস্টেম ৩০ - ৫০% পানির অপচয় রোধ করে। যেখানে গাছ বা ফসলের সংখ্যা অনেক বেশি সেখানে স্প্রিঙ্কলার ইরিগেশন সিস্টেম বিশেষ ভুমিকা পালন করে। কারন একটি স্প্রিঙ্কলার ১০০ ফুট জায়গা কভার করে সেচ দেয়। এটি মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে ও ২০ - ২৫% ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি করে। শ্রমিক ও সেচ খরচ হ্রাস করে। স্প্রিঙ্কলার ইরিগেশন সিস্টেম ব্যবহার করতে হলে দরকার হবেঃ  ১ টি পাম্প ইউনিট ,১ টি ফিল্টার ইউনিট, পাইপ ও সাব পাইপ এবং স্প্রিঙ্কলার ।

 

সেচ ব্যবস্থাপনায় অত্যাধুনিক একটি প্রযুক্তি হচ্ছে ফগিং ইরিগেশন পদ্ধতি। হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে ঘাস চাষে সেচের যে সিস্টেমটি ব্যবহার করা হয় সেটার নাম হচ্ছে ফগিং ইরিগেশন। এ পদ্ধতি ব্যবহার করে সহজেই হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে ঘাস উৎপাদন করা যায়। কারন হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে ঘাস চাষের ক্ষেত্রে অল্প পরিমান পানির প্রয়োজন হয় সেজন্য ফগিং ইরিগেশন পদ্ধতির বিকল্প নেই।

 

এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে সৌরশক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে সোলার সেচে ডুয়েল সিস্টেম সংযোজন করা যেতে পারে। এ পদ্ধতিতে পানির পরিবহন ও যথাযথ প্রয়োগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যাবে। যার ফলে সেচ খরচ অনেকাংশে কমানো সম্ভব। একসেট সৌর প্যানেল দ্ধারা চলবে পর্যায়ক্রমে দুই পানির সোর্সের দুটি পাম্প। একটি থাকবে ভার্টিকেল  সারফেস পাম্প ও আরেকটি থাকবে সাব-মার্জড পাম্প। এতে নদীতে যতদিন পানি থাকবে ততদিন ভূপরিস্থ পানি ব্যবহারের জন্য সারফেস পাম্প চলবে এবং একেবারে শুষ্ক মৌসুমে পানি তলানীতে চলে গেলে অটোমেটিক সিস্টেমে সাব-মার্জড পাম্প দ্বারা পানি উত্তোলন হবে। এতে কৃষকের ফসলের জমিতে সেচ প্রদান অব্যাহত থাকবে।

 

টেকসই কৃষিতে সেচ ব্যবস্থপনায় এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর নানা প্রয়োগ টেকসই ফসল উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে এটি নিশ্চিতকরণে সরকারী কৌশল, গবেষণার সক্ষমতা বৃদ্ধি, অঞ্চল ভিত্তিক সম্ভাব্যতা মূল্যায়ন, উন্নত কৃষি যন্ত্রপাতি, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, দক্ষ জনশক্তি উন্নয়ন, বিক্রয়োত্তর সেবা, প্রয়োজনীয় উপকরণ ইত্যাদি নিশ্চিতকরণ আবশ্যক। বাংলাদেশে সেচ ব্যবস্থাপনায় এসকল আধুনিক প্রযুক্তি কৃষকের দোর গোড়ায় পৌঁছে যাওয়া এখন সময়ের দাবি। আসুন ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ রেখে যাই।

 

শিক্ষার্থী
এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
ত্রিশাল, ময়মনসিংহ

 

এই বিভাগের আরো খবর