Berger Paint

ঢাকা, শনিবার   ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩,   মাঘ ২২ ১৪২৯

ব্রেকিং:
চট্টগ্রাম, গাজীপুর, কক্সবাজার, নারায়ানগঞ্জ, পাবনা, টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহ ব্যুরো / জেলা প্রতিনিধি`র জন্য আগ্রহী প্রার্থীদের আবেদন পাঠানোর আহ্বান করা হচ্ছে। শিক্ষাগত যোগ্যতা- স্নাতক, অভিজ্ঞদের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল যোগ্য। দৈনিক প্রতিদিনের চিত্র পত্রিকার `প্রিন্ট এবং অনলাইন পোর্টাল`-এ প্রতিনিধি নিয়োগ পেতে অথবা `যেকোন বিষয়ে` আর্থিক লেনদেন না করার জন্য আগ্রহী প্রার্থীদের এবং প্রতিনিধিদের অনুরোধ করা হল।
সর্বশেষ:
সৌদি আরবে এক বছরে ১৪৭ জনের মৃত্যুদণ্ড আ.লীগ জনগণকে দেওয়া ওয়াদা পূরণ করে : প্রধানমন্ত্রী বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হজের খরচ বাড়ল দেড় লাখ মিয়ানমারে জরুরি অবস্থা আরও ছয় মাস বাড়ল আমি বাংলাদেশে বাবার কাছে থাকতে চাই: লায়লা রিনা

হাড়কাঁপানো শীতে শীতবস্ত্র ও মানবিক সহায়তা জরুরি

মো. জিল্লুর রহমান

প্রকাশিত: ১১ জানুয়ারি ২০২৩  

মো. জিল্লুর রহমান। ছবি- প্রতিদিনেরচিত্র বিডি

মো. জিল্লুর রহমান। ছবি- প্রতিদিনেরচিত্র বিডি


প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলা ভূমি বাংলাদেশ। ষড়ঋতুর এমন দেশে প্রত্যেক ঋতু তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়েই আবির্ভূত হয়। পৌষ ও মাঘ মাস শীতকাল হলেও অগ্রহায়ণ মাস থেকেই শীতের সূচনা শুরু হতে থাকে। বর্তমানে ঘনকুয়াশা, হিমেল বাতাস আর হাড়কাঁপানো শীতে কাঁপছে সারাদেশ। হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে শীতজনিত রোগীর সংখ্যা। শীতার্তদের মধ্যে দেখা দিয়েছে শীতবস্ত্রের প্রচন্ড অভাব ও আকুতি। আবহাওয়া অফিসের তথ্য মতে, দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য কমে যাওয়ায় দেশের উত্তর, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল এবং মধ্যাঞ্চলে মাঝারি থেকে তীব্র শীতের অনুভূতি অব্যাহত থাকবে। দেশের অনেক স্থানে তীব্র শীতের সাথে ঘন কুয়াশা দেখা যাচ্ছে। দিনমজুর ও কৃষকেরা ঠিকমতো ক্ষেতে খামারে কাজে যেতে পারছে না। জবুথবু হয়ে পড়েছে জনজীবন। সারাদেশে প্রচন্ড শীত বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই শীত উপভোগ করলেও চরম দুর্ভোগে পড়েছে রাস্তায় থাকা স্বল্প আয়ের খেটে-খাওয়া মানুষ। এমনকি রাস্তায় থাকা বিড়াল কুকরের অবস্থাও নাজুক। সন্ধ্যা নামার পরপরই সারা দেশের ব্যস্ততম হাট বাজার, বিপনি বিতান, হোটেল মোটেল ইত্যাদি ফাঁকা হয়ে যায়, কমে যায় যানবাহন ও মানুষের আনাগোনা।

 

আবহাওয়া অফিস বলছে, বাংলাদেশের হিমালয়ের কোল ঘেষা জেলা হিসেবে পরিচিত পঞ্চগড়ে বইছে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ। সিলেটের শ্রীমঙ্গলেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। বেশ কয়েক দিন ধরে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বিরাজ করছে। বাড়ছে শীতের তীব্রতাও। ১ জানুয়ারি ২০২৩ পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা সারা দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। তবে, এর দুইদিন আগে সেখানে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮ দশমিক ৭ ডিগ্রী সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। একই সাথে দেশের অধিকাংশ অঞ্চলের তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেছে। বেশ কিছু দিন ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শীতের দাপুটে প্রভাব চলছে। উত্তরের জেলাগুলোর মতো শৈত্যপ্রবাহের অবস্থা না হলেও রাজধানী ঢাকাতেও বইছে হাড়কাঁপানো হিমেল হাওয়া এবং এর প্রভাবে শীতের তীব্রতা রাজধানীতেও বেশ বেড়েছে। দিনের তাপমাত্রা হুট করে কমে যাওয়ার পাশাপাশি সর্বোচ্চ তাপমাত্রা কমেছে প্রায় ৫ ডিগ্রির মতো। তাপমাত্রা আরও কিছুটা কমে জানুয়ারির মাঝামাঝি বা শেষ পর্যন্ত এ অবস্থা বিরাজ করতে পারে বলে জানা গেছে।

 

আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় দেশের ইতিহাসের সর্বনিন্ম তাপমাত্রা ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছিল। সেখানে তখন ব্যারোমিটারে তাপমাত্রা ছিল ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ইতিহাসের ৭০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে সর্বশেষ ১৯৬৮ সালে এত তীব্র শীত পড়েছিল এবং ওই বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি সিলেটের শ্রীমঙ্গলে ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল। এরও ২০ বছর আগে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত এত কম তাপমাত্রার রেকর্ড খুঁজে পায়নি আবহাওয়া অফিস।

 

দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে চলা তীব্র শৈত্যপ্রবাহে এবং শীতজনিত রোগে গত কয়েক দিনে সারা দেশে বেশ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। শীতে জনজীবন অনেকটাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ছিন্নমূল দরিদ্র মানুষের কষ্টের সীমা থাকে না। সব ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয় অসহায় দরিদ্র মানুষকেই। পুষ্টিহীন মানুষ সহজেই শীতে কাবু হয়ে পড়ে। তাছাড়া হিমেল শীতে বেশি ভোগে বয়স্ক ও শিশুরাও। শীতের তীব্রতায় বাড়ে সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, হাঁপানিসহ শীতজনিত নানা রোগ। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ইতিমধ্যেই শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে রোগীর ভিড় বাড়ার খবর গণমাধ্যম প্রকাশিত হয়েছে।

 

শীতার্তদের কষ্ট লাঘবে সবচেয়ে যা জরুরি তা হল মানবিক সহায়তা, বিশেষত ছিন্নমূল দরিদ্র মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র ও কম্বল বিতরণ করা। এজন্য প্রশাসনের পাশাপাশি সমাজের সামর্থ্যবানদের এগিয়ে আসা উচিত। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, দেশে আপাতত তাপমাত্রা বাড়তে থাকলেও প্রকৃতিতে শীতের আবেশ আরও কয়েকদিন থাকবে। তাছাড়া জানুয়ারির শেষদিকে আরও একটি তীব্র শৈত্যপ্রবাহের পূর্বাভাস রয়েছে। তাই প্রত্যেকের উচিত সামর্থ্য অনুযায়ী শীতার্তদের প্রতি সহায়তার হাত প্রসারিত করা।

 

ঋতু বৈচিত্র্যের হিসাব অনুযায়ী এ দেশে শীত নামে ডিসেম্বর থেকে। তবে এ বছর শীতের তীব্রতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে জানুয়ারি থেকে। বিশেষজ্ঞরা দেশে স্মরণকালের সবচেয়ে তীব্র শৈত্যপ্রবাহের কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বলে মনে করছেন। বস্তুত এখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে বিশ্বজুড়েই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার কোনো কোনো স্থানে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের অস্বাভাবিক নিচে নেমে গেছে। বেড়েছে তুষার ঝড়ের প্রকোপ। ইউরোপেও এ ধরনের অস্বাভাবিকতা লক্ষ করা যাচ্ছে। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ায় নাগরিকদের ঘরের বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এসব উদ্বেগজনক প্রভাব থেকে বাঁচার পথ বের করতে হবে বিজ্ঞানীদের।

 

দেশে তীব্র শীতের কারণে স্বাভাবিকভাবেই স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যায়। সারা দেশের কোনো কোনো স্কুলের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হয়। কৃষিক্ষেত্রে কিছুটা হলেও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শীতের প্রভাব পড়ে বোরো, শাকসবজি ও আলুর ফলনে। আসলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা কারও নেই। তবে তা বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে মোকাবেলা করা এবং বিদ্যমান পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে বসবাস করার মাধ্যমে দুর্যোগের ক্ষতি সহনীয় মাত্রায় নামিয়ে আনা যেতে পারে। শীতসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় আমরা যদি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেই, তাহলে দুর্যোগজনিত ক্ষয়ক্ষতি দ্রুত কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

 

পৌষ মাস শেষ হয়ে মাঘ মাস এখনও শুরু হয়নি। গ্রামীণ জনপদে আক্ষরিক অর্থে মাঘ মাস আসে শীতের দাপট নিয়ে। আসলে পৌষ মাসের শুরুতেই উত্তরের বিভিন্ন জেলায় শীত জেঁকে বসা শুরু করে। শীতের তীব্রতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় মানুষের কষ্ট। হাড়কাঁপুনি শীতে গরীব মানুষের কষ্ট অবর্ণনীয়। শৈত্যপ্রবাহের কারণে ব্যাহত হয় মানুষের স্বাভাবিক জীবন-জীবিকা। শীত মোকাবেলায় স্থানীয় প্রশাসনের প্রস্তুতি থাকে খুবই যৎ সামান্য। পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র না থাকায় দুস্থ মানুষের দুর্ভোগ বেড়ে যায় চরমে। তীব্র শীতের কারণে ডায়রিয়া, আমাশয়, সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ে আশঙ্কাজনক হারে। এদের মধ্যে শিশু ও বৃদ্ধের সংখ্যাই বেশি থাকে। অনেক স্থানে দুপুর পর্যন্ত সূর্যের মুখ দেখা যায় না। উত্তর পশ্চিম জনপদে শৈত্যপ্রবাহে গরম কাপড়ের অভাবে শীতের কষ্টে ভোগে শিশু, বৃদ্ধসহ নিম্ন আয়ের কর্মজীবী মানুষজন। শীতের উষ্ণতার আকুতি থাকে সবার মাঝে।

 

এ সময় শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো বৃত্তবানদের নৈতিক দায়িত্ব। দরিদ্র ও হতদরিদ্র মানুষ, যাদের শীতবস্ত্র নেই, শীত নিবারণের জন্য সামান্য একটি কম্বল নেই, এখন যত দ্রুত সম্ভব এসব মানুষের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। সরকারের পাশাপাশি দেশের বিত্তবান মানুষদেরও এ সময় এগিয়ে আসতে হবে। সবার সম্মিলিত চেষ্টায়ই শীতের কষ্ট থেকে দরিদ্র মানুষদের রক্ষা করা সম্ভব। আসুন আমরা সাধ্যমত শীতার্তদের পাশে দাড়াই, শীতের উষ্ণতা ছড়িয়ে দেই চারদিকে এবং শীতের তীব্রতা থেকে রক্ষা পাক অসহায় মানুষেরা।

 

ব্যাংকার ও কলাম লেখক,
সতিশ সরকার রোড, গেন্ডারিয়া, ঢাকা।

এই বিভাগের আরো খবর