ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২৬ মে ২০২২,   জ্যৈষ্ঠ ১২ ১৪২৯

ব্রেকিং:
চট্টগ্রাম, গাজীপুর, কক্সবাজার, নারায়ানগঞ্জ, পাবনা, টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহ ব্যুরো / জেলা প্রতিনিধি`র জন্য আগ্রহী প্রার্থীদের আবেদন পাঠানোর আহ্বান করা হচ্ছে। শিক্ষাগত যোগ্যতা- স্নাতক, অভিজ্ঞদের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল যোগ্য। দৈনিক প্রতিদিনের চিত্র পত্রিকার `প্রিন্ট এবং অনলাইন পোর্টাল`-এ প্রতিনিধি নিয়োগ পেতে অথবা `যেকোন বিষয়ে` আর্থিক লেনদেন না করার জন্য আগ্রহী প্রার্থীদের এবং প্রতিনিধিদের অনুরোধ করা হল।
সর্বশেষ:
ডাক্তারদের ফাঁকিবাজি রুখতে হাজিরা খাতায় দিনে তিনবার সই করার নির্দেশ! ১০০০ জনবল নিয়োগ দেবে ওয়ালটন ঢাকায় আসছে ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি সরকারকে ৬ দিনের আল্টিমেটাম ইমরান খানের ফাইনালের পথে বেঙ্গালুরু, লখনৌর বিদায় সেনেগালে হাসপাতালে আগুন; ১১ নবজাতকের মৃত্যু বিশ্বব্যাপী মাঙ্কিপক্স আক্রান্ত ২০০ ছাড়িয়েছে ঢাবিতে ফের ছাত্রলীগ-ছাত্রদল সংঘর্ষ

রাশিয়ান ফেডারেশন ও বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্কের পঞ্চাশ বছর

মো. জিল্লুর রহমান

প্রকাশিত: ২৪ জানুয়ারি ২০২২  

মো. জিল্লুর রহমান, ছবি- প্রতিদিনেরচিত্র বিডি।

মো. জিল্লুর রহমান, ছবি- প্রতিদিনেরচিত্র বিডি।

 

রাশিয়া বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাষ্ট্র। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় রাশিয়া বাংলাদেশের পক্ষে জোড়ালো ভূমিকা রেখেছিল। এজন্য বাংলাদেশ রাশিয়ার প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞ। বাংলাদেশ সৃষ্টির সময় থেকে রাশিয়া এদেশের অকৃত্রিম বন্ধু। ১৯৭১ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সহায়তা না পেলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন কষ্টকর হতো। বর্তমানে বাংলাদেশ–রাশিয়া সম্পর্ক বলতে মূলত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ এবং রুশ ফেডারেশনের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে বোঝায়। ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে এবং ২৫ জানুয়ারি রাষ্ট্রদ্বয়ের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর তার উত্তরসূরি রাষ্ট্র রাশিয়ান ফেডারেশনের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক চালু রয়েছে। বাংলাদেশ ও রাশিয়ার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক দুই দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে অবদান রাখছে।

 

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভারত প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করলেও পরোক্ষেভাবে সর্বাত্মক ভূমিকা রেখেছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। মিত্র দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে এ রাষ্ট্রটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপক্ষে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে জোরালো পদক্ষেপ নেয়। এ রাষ্ট্রের অনমনীয়তার কারণেই পাকিস্তানের পক্ষে একাত্তরের ডিসেম্বরে বঙ্গোপসাগর অভিমুখে সপ্তম নৌবহর পাঠিয়েও তা ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয় যুক্তরাষ্ট্র। মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্র দিয়ে সহযোগিতার পাশাপাশি স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে মাইন ও ধ্বংসাবশেষ অপসারণেও দৃষ্টান্তমূলক ভূমিকা রেখেছে এ দেশটি। যদিও নব্বইয়ের দশকে এ রাষ্ট্রটি ভেঙে ১৫টি নতুন দেশ হয়েছে।

 

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা লাভের পর প্রথমদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্পর্ক ভালো ছিল না। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে সোভিয়েতদের সম্পর্ক ভালো না হলেও পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) মোজাফফর এবং পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় পূর্ব পাকিস্তানেই দল দু'টির জনসমর্থন বেশি ছিল। পূর্ব পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং মার্কিনবিরোধী মনোভাব পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় জোরদার ছিল, যা পরোক্ষভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নকে সুযোগ করে দেয়। ১৯৫৪ সালে পাকিস্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর করলে পূর্ব পাকিস্তানে এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এই চুক্তির বিপক্ষে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখা দেয় এবং পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের ১৬২ জন নবনির্বাচিত সদস্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক চুক্তির নিন্দা জানিয়ে যৌথ বিবৃতি প্রদান করেন।

 

আমরা অনেকেই হয়তো জানি, সে সময়ে বিশ্ব প্রধানত দুই শিবিরে বিভক্ত ছিল। এক শিবিরের নেতৃত্ব দিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অপর শিবির নিয়ন্ত্রণ করত সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন।সোভিয়েত ইউনিয়ন সে সময় নীতিগত কারণে বিভিন্ন দেশের মুক্তি সংগ্রামে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা দিয়ে যেত। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ২৫ মার্চ গণহত্যার প্রেক্ষাপটে সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পদগোর্নি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কাছে প্রেরিত এক বার্তায় পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক প্রাণহানি, নিপীড়ন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও অন্যান্য রাজনৈতিক নেতার গ্রেপ্তারের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন। দমন-পীড়ন বন্ধ করে একটি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধানের উপায় উদ্ভাবনের জন্য তিনি ইয়াহিয়ার প্রতি আহ্বান জানান। শীর্ষ দুই দেশের একটির তরফ থেকে এমন বার্তা মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ সঞ্চার করে।

 

পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া খানের কাছে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পদগোরনির চিঠি পাঠানোর পরপরই ৬ এপ্রিল মার্কিন নীতি নিয়ে ঢাকার মার্কিন কনস্যুলেট থেকে আর্চার কে ব্লাড ও তার অধস্তন ২০ সহকর্মীর পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবাদপত্র পাঠানো হয়, যা হোয়াইট হাউসকে চরমভাবে বিব্রত করে। ব্লাড লিখেছিলেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন যেখানে গণতন্ত্র সুরক্ষা ও রক্তপাত বন্ধের আবেদন করেছে, সেখানে 'পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়' অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র নৈতিক প্রতিবাদ জানাতেও ব্যর্থ হয়েছে।

 

কেবল বার্তা প্রেরণ নয়, সোভিয়েত ইউনিয়নের আরো জোরালো সমর্থন ও সহায়তা প্রত্যাশিত হয়ে উঠছিল ভারত-বাংলাদেশ উভয় দেশের জন্য। সোভিয়েত ইউনিয়নের আরও বেশি সমর্থন আদায়ের জন্য তখন দুই দেশই বেশ সচেষ্ট হয়। সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে প্রবাসী মুজিবনগর সরকার কলকাতায় সোভিয়েত প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে আবদুস সামাদ আজাদকে বিশেষ দূত নিয়োগ করে মস্কো পাঠায়। মস্কোপন্থি ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টি তাদের মতো করে সোভিয়েত সমর্থন আদায়ের চেষ্টা নেয়। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিও এ বিষয়ে সম্পৃক্ত হয় এবং সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়।

 

অবস্থা দৃষ্টে ভারত ধরেই নিয়েছিল, সমস্যার দ্রুত সমাধান চাইলে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ভারতকেও যুদ্ধে জড়াতে হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের সক্ষমতা ও দেশের ভেতর তীব্র জনমত বিবেচনায় ভারত সরকার জয়ের ব্যাপারে সন্দেহমুক্ত ছিল। ১৯৭১ সালের ৯ আগস্ট দিল্লিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারতের মধ্যে ২০ বছর মেয়াদি একটি সামরিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ চুক্তি অনুসারে ভারত পাকিস্তানের মধ্যে কোনো কারণে যুদ্ধ দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিলে সোভিয়েতও ভারতের সহায়তায় এগিয়ে আসবে। এই চুক্তিটিই মূলত যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান ও তাদের মিত্রদের মধ্যে উদ্বেগ উৎকন্ঠা সৃষ্টি করে। এই চুক্তির মাধ্যমে ভারত আসলে তাদের যুদ্ধ প্রস্তুতির প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করে এবং চুক্তিটির তাৎপর্য এত গভীর ছিল যে, পরবর্তী সময়ে হেনরি কিসিঞ্জার একে ‘বোম্বসেল’ বলে আক্ষ্যায়িত করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ প্রবাসী সরকারের পক্ষ থেকে ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তিকে স্বাগত জানান এবং দুই দেশের তরফ থেকে আরো বেশি সহায়তা কামনা করেন।

 

চুক্তি সম্পাদনের পরের মাস সেপ্টেম্বরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর করেন। তিনি দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক এল আই ব্রেজনেভ এবং প্রেসিডেন্ট এন ভি পদগোর্নি ও প্রধানমন্ত্রী এ এন কোসিগিনের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে যে যুক্ত ইশতেহারটি প্রকাশিত হয় সেটি বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। এতে বলা হয়, শান্তি রক্ষার প্রয়োজনে উদ্ভুত সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান ও শরণার্থীদের নিরাপদে দেশে ফেরার স্বার্থে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন। সেই জরুরি ব্যবস্থা প্রকৃতপক্ষে ভারতকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার ছাড়পত্র। মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েতের নিরঙ্কুশ সমর্থন প্রদানের স্পষ্ট ইঙ্গিত।

 

মৈত্রী চুক্তি ও যুক্ত ইশতেহারের পর ভারত বাংলাদেশের প্রতি সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন আরো খোলামেলা হয়ে উঠে। ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের প্রস্তাব দিয়ে আসছিল পাকিস্তান। ভারত সুকৌশলে তাতে অসম্মতি জানিয়ে বলে, তারা কোনো পক্ষ নয় যে আলোচনায় বসবে কারণ এটা পাকিস্তান ও বাংলাদেশের আভ্যন্তরিণ সমস্যা। ভারত জানায় বাংলাদেশের জনগণ ও তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে গ্রহণযোগ্য কোনো রাজনৈতিক মীমাংসার মধ্যে প্রকৃত সমাধান নিহিত রয়েছে এবং ভারত আগাগোড়া এই যুক্তিতে অটল থাকে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের বহুল আলোচিত অধিবেশনে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিং একই যুক্তির পুনরাবৃত্তি করেন। সেই যুক্তির সঙ্গে সুর মেলান অধিবেশনে উপস্থিত সোভিয়েত প্রতিনিধি দলের নেতা সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এ গ্রোমিকো। পরে সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট পদগোর্নি দিল্লি সফরে এসে অভিন্ন যুক্তি প্রদর্শন করেন।

 

৩ ডিসেম্বর ভারত-বাংলাদেশের যৌথ বাহিনী ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মধ্যকার সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে সোভিয়েত ইউনিয়ন অসাধারণ ভূমিকা পালন করে। পাকিস্তানের পরাজয়ের সম্ভাবনা আঁচ করতে পেরে পরদিন ৪ ডিসেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আনে। ‘একতরফা’ আখ্যায়িত করে সোভিয়েত ইউনিয়ন সে প্রস্তাবে ‘ভেটো’ দেয়। পরের দিন নিরাপত্তা পরিষদের অপর আটটি দেশ মার্কিন প্রস্তাবের অনুরূপ প্রস্তাব পেশ করলে সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্বিতীয়বারের মতো তাতেও ‘ভেটো’ প্রয়োগ করে। নিরাপত্তা পরিষদে দুই-দুইবার সোভিয়েত ‘ভেটো’র সম্মুখীন হয়ে পাকিস্তান-আমেরিকা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যুদ্ধবিরতি ও সৈন্য প্রত্যাহারের প্রস্তাব আনে। সোভিয়েত ইউনিয়নসহ কয়েকটি দেশের বিরোধিতা সত্ত্বেও সাধারণ পরিষদে ওই প্রস্তাব পাস হয়ে যায়। প্রস্তাব উপেক্ষা করে ভারত-বাংলাদেশের যৌথ বাহিনী যুদ্ধ অব্যাহত রাখে। সোভিয়েত ইউনিয়নের নিরঙ্কুশ সমর্থন এক্ষেত্রে বড় সহায়ক ছিল।

 

যুদ্ধ চলাকালে সোভিয়েত ইউনিয়ন বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাপক সামরিক ও আর্থিক সহায়তা এবং সামগ্রিকভাবে নৈতিক সমর্থন প্রদান করে। স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষদিকে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর নিকট প্রায় পরাজিত পাকিস্তানকে সহায়তা করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গোপসাগরে মার্কিন সপ্তম নৌবহরকে প্রেরণ করে। এর প্রত্যুত্তরে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর প্রতি সম্ভাব্য মার্কিন হুমকি প্রতিহত করার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর এবং ১৩ ডিসেম্বর ভ্লাডিভোস্তক থেকে সোভিয়েত প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহরের দুই স্কোয়াড্রন ক্রুজার ও ডেস্ট্রয়ার এবং পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত একটি পারমাণবিক ডুবোজাহাজ প্রেরণ করে। সোভিয়েত নৌবহরটির নেতৃত্বে ছিলেন অ্যাডমিরাল ভ্লাদিমির ক্রুগ্লিয়াকভ। সোভিয়েত নৌবহরের আগমনের ফলে মার্কিন নৌবহর পাকিস্তানকে সহায়তা করতে ব্যর্থ হয়। সোভিয়েত নৌবহর ১৯৭১ সালের ১৮ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭২ সালের ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত ভারত মহাসাগরে মার্কিন নৌবহরকে তাড়া করে বেড়ায়। এছাড়া সোভিয়েত নৌবাহিনী গোপনে ভারতীয় নৌবাহিনীকে সহায়তা করে এবং পাকিস্তান নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে গুপ্ত অভিযান পরিচালনা করে।

 

এদিকে সপ্তাহখানেকের ভেতর পাকিস্তানের পরাজয় নিশ্চিত হয়ে গেলে দুই নৌবহর বঙ্গোপসাগরে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়ানোর আগেই চীন আকস্মিকভাবে ঘোষণা দেয়, তারা পাকিস্তানের পক্ষ হয়ে সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে না। চীনের এই ঘোষণায় স্তম্ভিত আমেরিকা সপ্তম নৌবহরকে নিশ্চল করে ফেলে। এরপর ১৩ ডিসেম্বর আমেরিকার উদ্যোগে নিরাপত্তা পরিষদে আবার যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব উঠলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ঠাণ্ডা মাথায় তৃতীয়বারের মতো তাতেও ‘ভেটো’ দেয়। অতঃপর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ ছাড়া উপায় থাকে না এবং বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়।

 

সোভিয়েত ইউনিয়ন মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিনগুলোতে বাংলাদেশের বিষয়ে জাতিসংঘের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে তিনবার ভেটো না দিলে ইতিহাসের গতিস্রোত অন্যরকম হতো। তা হলে হয়ত আমাদেরও ভিয়েতনামের মতো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ করতে হতো। এ কারণে মুক্তিযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন যে ভূমিকা রেখেছে, তা বাঙালি জাতির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। মার্কিন সপ্তম নৌবহরকেও সোভিয়েত ইউনিয়নের রাশান ৬ নম্বর ফ্লিট ভারত মহাসাগর পর্যন্ত তাড়া করেছিল। এতে কোনো সংশয় নেই, সোভিয়েত ইউনিয়নের দৃঢ় অবস্থান ছাড়া নয় মাসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন কঠিন হয়ে পড়ত।

 

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরবর্তী বছরগুলোতে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের বিশেষ সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রাম বন্দর ও কর্ণফুলি নদীতে পাকিস্তানি বাহিনী অসংখ্য মাইন পুঁতে রেখেছিল। তাছাড়া যুদ্ধের সময় অনেক নৌযান ডুবে যাওয়ায় বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এ বন্দরটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে উঠেছিল। যুদ্ধের পর সোভিয়েত নৌবাহিনী যুদ্ধবিধ্বস্ত চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে মাইন অপসারণ এবং বন্দরটির কার্যক্ষমতা পুনরুদ্ধারের কাজে নিয়োজিত হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহরের ২২টি জাহাজ এ উদ্দেশ্য ১৯৭২ সালের মে মাসে দূর প্রাচ‍্যের ভ্লাদিভোস্তক বন্দর থেকে চট্টগ্রামে আসে। মাইন অপসারণের কাজটি সম্পন্ন করতে তাদের প্রায় এক বছর সময় লাগে এবং ইউরি রেদকিন নামক একজন সোভিয়েত মেরিন এসময় মাইন বিস্ফোরণে প্রাণ হারান। বাংলাদেশ নেভাল একাডেমি প্রাঙ্গণে তার কবর অবস্থিত।

 

সোভিয়েত সহযোগিতার ফলেই চট্টগ্রাম বন্দর খুব দ্রুত একটি প্রধান বন্দর হিসেবে পূর্বের অবস্থান ফিরে আসে এবং ১৯৭৩ সালে এর ধারণক্ষমতা যুদ্ধপূর্ব ধারণক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যায়। এছাড়া, সোভিয়েত ইউনিয়ন নবপ্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ বিমানবাহিনীকে ব্যাপক সহায়তা প্রদান করে। বিশেষত সোভিয়েত সরকার বাংলাদেশ বিমানবাহিনীকে ১০টি এক-আসনবিশিষ্ট মিগ-২১ এমএফ এবং ২টি দুই-আসনবিশিষ্ট মিগ-২১ ইউএম যুদ্ধবিমান উপহার প্রদান করে। ১৯৭২ সালের মার্চে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম মস্কো সফর করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় সহায়তার জন্য সোভিয়েত সরকারকে ধন্যবাদ ও বিশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।

 

বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। পরবর্তী সরকারগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে, ফলে স্বাভাবিকভাবে এসব রাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শীতল হয়ে পড়ে। এসময় বাংলাদেশ সক্রিয় সোভিয়েত বিরোধী পররাষ্ট্রনীতি অবলম্বন করে। ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ কম্পুচিয়ায় ভিয়েতনামের আক্রমণে সোভিয়েত সমর্থনের নিন্দা জানায় এবং ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন কর্তৃক আফগানিস্তানে সামরিক হস্তক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করে। আফগানিস্তানে সোভিয়েত হস্তক্ষেপের প্রতিবাদে বাংলাদেশসহ আরো ৬৪টি রাষ্ট্র ১৯৮০ সালে মস্কোয় অনুষ্ঠিত গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক গেমস বয়কট করে। এছাড়া, ১৯৮৩ সালের ডিসেম্বরে এবং ১৯৮৪ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সরকার ঢাকা থেকে নয় জন সোভিয়েত কূটনীতিককে বহিষ্কার করে।

 

তবে এসব সত্ত্বেও সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশকে বিভিন্ন সময় নানাক্ষেত্রে সহায়তা প্রদান করতে থাকে। রাশিয়া বিদ্যুৎ উৎপাদন, প্রাকৃতিক গ্যাস ও জ্বালানি তেল – এই তিনটি ক্ষেত্রের উন্নয়নে বাংলাদেশকে বিশেষভাবে সহযোগিতা করে। সোভিয়েত অর্থায়নে বাংলাদেশের বৃহত্তম তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ঘোড়াশাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মিত হয়। ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশে দাতা দেশগুলোর মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নের অবস্থান ছিল ১৪তম। এছাড়া, তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের সঙ্গে সক্রিয় সাংস্কৃতিক সম্পর্ক বজায় রাখে।

 

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বাংলাদেশ রাশিয়ান ফেডারেশনকে এর উত্তরসূরি হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক অব্যাহত রাখে। ১৯৯০-এর দশকে রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ছিল খুব ভাল ছিল না। বসনীয় যুদ্ধ এবং অন‍্যান‍্য আন্তর্জাতিক ঘটনাবলিতে এসময় বাংলাদেশ ও রাশিয়া ভিন্ন পক্ষ অবলম্বন করে। পরবর্তীতে ২০০০-এর দশকে রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের উন্নতি ঘটে।

 

২০০৯ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেন্ট পিটার্সবার্গ সফর করেন এবং তৎকালীন রুশ প্রধানমন্ত্রী ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে শেখ হাসিনা আবার মস্কোতে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ২০১৪ সালের ক্রিমিয়া সঙ্কটের সময় বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা রাষ্ট্রের মতো রাশিয়ার বিরোধিতা না করে নিরপেক্ষতা অবলম্বন করে।

 

রাশিয়া বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা বাহিনীকে অস্ত্রশস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহকারী রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে অন্যতম। এজন্য রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশ ১০০ কোটি ডলারের একটি সমরাস্ত্র ক্রয়ের চুক্তি করেছে এবং এর আওতায় সেনাবাহিনীর জন্য ট্যাঙ্কবিধ্বংসী মিসাইল ও সাঁজোয়া যান, বিমান বাহিনীর জন্য প্রশিক্ষণ জঙ্গি বিমান, পণ্যবাহী হেলিকপ্টার সহ নানা অস্ত্রসম্ভার সংগ্রহ করছে। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ রাশিয়ার কাছে থেকে মেতিস-এম ট্যাঙ্ক-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহ করে। ২০১৫ ও ২০১৬ সালে বাংলাদেশ রাশিয়ার নিকট হতে ১৬টি ইয়াক-১৩০ প্রশিক্ষণ বিমান ক্রয় করে এবং ২০১৬ সালে বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে ৬টি এমআই-১৭১ এসএইচ হেলিকপ্টার ক্রয় করে।এছাড়া, বাংলাদেশ রাশিয়ার কাছ থেকে কেনা বিটিআর-৮০ সাঁজোয়া যান জাতিসংঘের অধীনে শান্তিরক্ষার কাজে ব্যবহার করছে।

 

রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য বৃদ্ধির প্রচুর সুযোগ রয়েছে। ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন এবং কিছু শুল্ক জটিলতার কারণে রাশিয়ার সঙ্গে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাণিজ্য বৃদ্ধি করা যাচ্ছে না। রাশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের বিপুল চাহিদা রয়েছে। বিভিন্ন জটিলতার কারণে বাংলাদেশ বাধ্য হয়ে অন্য দেশের মাধ্যমে রাশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক সহ অন্যান্য পণ্য রপ্তানি করছে। উভয় দেশের ব্যবসায়িক স্বার্থে এসব সমস্যা দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও কুটনীতির মাধ্যমে সমাধা করা জরুরি। গত ২০২০-২০২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৬৬৫.৩১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য রাশিয়ায় রপ্তানি করেছে এবং একই সময়ে আমদানি করেছে ৪৬৬.৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য।

 

২০১২ সালে বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ শক্তির উন্নয়নে সহায়তা করার জন্য রাশিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। ২০১৩ সালে রাশিয়া বাংলাদেশের পাবনা জেলার রূপপুরে ২,৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়। এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার, যার ৯০ শতাংশ দেবে রাশিয়া সরকার। ২০১৬ সালে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ২০২৪ সালের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির দুইটি ইউনিট সম্পূর্ণ হবে বলে আশা করা যায়।

 

বাংলাদেশের প্রথম এই পারমাণবিক বিদ্যুেৎ কেন্দ্র নির্মাণ কাজ এগিয়ে নিচ্ছে রুশ প্রতিষ্ঠান এএসই গ্রুপ অব কোম্পানি। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম পর্যায়ের কাজ ইতোমধ্যে অনেক দূর এগিয়েছে। প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষেই শুরু হবে মূল কেন্দ্র নির্মাণের কাজ। এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে দুটি ভিভিইআর পাওয়ার ইউনিট থাকবে। যার প্রত্যেকটির বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ১২০০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে প্রথম ইউনিটটি উৎপাদনে যাওয়ার কথা ২০২২ সালে এবং দ্বিতীয় ইউনিটটি ২০২৩ সালে উৎপাদনে যাওয়ার কথা।

 

অন্যদিকে, বাংলার সঙ্গে রাশিয়ার সাংস্কৃতিক যোগসূত্র স্থাপিত হয় অষ্টাদশ শতাব্দীতে। প্রথম বাংলা নাটক মঞ্চস্থ করেছিলেন রুশ নাট্যকার ও অভিযাত্রী গেরাসিম লেবেদেভ। লেবেদেভ তার ভাষা-শিক্ষক গোলকনাথ দাশের সহায়তায় ১৭৮৫ সালের ২৭ নভেম্বর 'দ্য ডিসগাইজ' নামক একটি ইংরেজি নাটক বাংলায় অনুবাদ করে 'ছদ্মবেশ' নামে মঞ্চস্থ করেন। স্থানীয় বুদ্ধিজীবীদের সহায়তায় লেবেদেভ বাংলায় প্রথম ইউরোপীয় ধাঁচের থিয়েটারও স্থাপন করেন। এছাড়া, লেবেদেভ একটি ছোট বাংলা অভিধান রচনা করেন, পাটিগণিতের ওপর বাংলায় একটি বই লিখেন এবং আনন্দমঙ্গল কাব্যের অংশবিশেষ রুশ ভাষায় অনুবাদ করেন। রাশিয়ার অনেক শিল্পী সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিক জনমত তৈরিতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছিলেন। অন্যদিকে এক সময়ে সোভিয়েত রাশিয়ার রাজধানী মস্কো থেকে প্রগতি প্রকাশনীর অনেক বাংলা বই প্রকাশিত হত এবং সেগুলো বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে বেশ জনপ্রিয় ছিল।

 

রাশিয়া সরকার বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দিচ্ছে। এ দেশের অনেক শিক্ষার্থী রাশিয়ায় গিয়ে পরমাণু বিদ্যাসহ বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিচ্ছে এবং ভবিষ্যতে রাশিয়া সরকার এ সুযোগ আরও বাড়াবে। এছাড়া বিদ্যুৎ, জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করছে; ভবিষ্যতে আরও বাড়াবে বলে রাশিয়া সরকার থেকে বলা হয়েছে।

 

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বাংলাদেশের বৈদেশিক বা পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হলো 'সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়', এই নীতি অনুসরণ করে বৈদেশিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ সবসময়ই বিংশ শতাব্দীর স্নায়ুযুদ্ধে প্রভাবশালী রাষ্ট্রসমূহের পক্ষাবলম্বন থেকে বিরত থেকেছে। একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র হওয়ার কারণে অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোর বাংলাদেশের সঙ্গে সুদৃঢ় কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সুসম্পর্ক রয়েছে। ২০২২ সালের ২৫ জানুয়ারি বাংলাদেশ ও রাশিয়ান ফেডারেশনের মধ্যের কূটনৈতিক সম্পর্কের পঞ্চাশ বছর পূর্তি পূর্ণ হবে এবং এটা হবে একটি ঐতিহাসিক মূহুর্ত। ঐতিহাসিক কারণে এবং বাস্তবতার নিরিখে বন্ধুপ্রতিম দুটি দেশের সৌহার্দপূর্ণ ও দৃঢ় সম্পর্ক ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে আশা করা যায়।  

 

সূত্র ও কৃতজ্ঞতাঃ লেখাটি সম্প্রতি সেন্টার ফর ইস্ট এশিয়া ফাউন্ডেশন, ঢাকা, বাংলাদেশ এর কোয়ার্টারলি ম্যাগাজিন "রাইজিং এশিয়া" এর জানুয়ারি মার্চ ২০২২ (১৮ তম) সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।

 


লেখক: ব্যাংকার ও কলাম লেখক,
সতিশ সরকার রোড, গেন্ডারিয়া, ঢাকা।

এই বিভাগের আরো খবর