চট্টগ্রামের আনোয়ারা ভূমি অফিস
দালাল চক্রের নিয়ন্ত্রণে, তদবিরে অতিষ্ঠ সেবাগ্রহীতা ও কর্মচারী-কর্মকর্তারা
২৩ মে ২০২৬, ০৮:৩০ পিএম
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলা ভূমি অফিস এখন একটি বড় দালাল চক্রের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে বলে তীব্র অভিযোগ উঠেছে। এই চক্রের নিয়মিত দৌরাত্ম্য ও হয়রানিতে সাধারণ সেবাগ্রহীতারা যেমন ক্ষুব্ধ, তেমনই খোদ ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন। দালালের যন্ত্রণায় স্বাভাবিক দাপ্তরিক কাজ পরিচালনা করা রীতিমতো কঠিন হয়ে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট দপ্তর সূত্রে জানা গেছে।
গত বৃহস্পতিবার দুপুরে সরেজমিন অনুসন্ধান ও দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ভূমি অফিস প্রাঙ্গণ দখল করে রাখে এই চক্রটি। নামজারি (মিউটেশন), মিস মামলা, খাজনা আদায়সহ ভূমির বিভিন্ন স্পর্শকাতর কাজে তারা অন্যায় তদবির শুরু করে। চক্রের সদস্যরা অনেক সময় ভূমি অধিগ্রহণ, খাসজমি ও আদালতে চলমান মামলার নিষেধাজ্ঞা থাকা বিতর্কিত জমি এবং ১৯৬৯ সালের জাল দলিল নিয়ে এসে নামজারি করার জন্য কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এসব অনৈতিক সুবিধা আদায় করতে তারা ক্ষমতার অপব্যবহার, হুমকি ও হেনস্তার আশ্রয় নিতেও দ্বিধাবোধ করে না। ফলে অন্যায় তদবিরের চাপে মাঠপর্যায়ের ভূমি কর্মকর্তারা প্রতিনিয়ত হাঁপিয়ে উঠছেন।
এই পরিস্থিতির কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা প্রান্তিক ভূমিসেবা প্রার্থীরা। দালালের খপ্পরে পড়ে সাধারণ মানুষ যেমন আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন, তেমনি সময়মতো কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না।
এ বিষয়ে আনোয়ারা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জানান, শুধু সাধারণ সেবাপ্রত্যাশীরাই নন, খোদ কর্মকর্তারাও এই চক্রের অনৈতিক তদবির ও যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ। এই বৈরী পরিবেশের কারণে দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা ঠিকমতো মন দিয়ে কাজ করতে পারছেন না। ভূমিসেবার মান ধরে রাখতে এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি দূর করতে ভূমি অফিসকে অতি দ্রুত এই চক্রের হাত থেকে মুক্ত করা জরুরি বলে মনে করছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সচেতন মহল।
সেবা নিতে আসা কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খতিয়ান, নামজারি, দিয়ারা সংশোধনী ও ভূমিসংক্রান্ত মামলাসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ডিঙ্গিয়ে দালালদের নিকট যান সহজে করার জন্য। এতে দালালরাও টাকা নিয়ে প্রতারণা করেন।
স্থানীয় বাসিন্দা সেলিম উদ্দিন বলেন, ‘অনেকেই ত্রুটিপূর্ণ কাজ টাকার বিনিময়ে আদায় করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। কাগজপত্রের ত্রুটির কারণে কাজ গুলো করতে ভূমি কর্তারা অপারগতা প্রকাশ করলে ঘটে ক্ষমতা প্রয়োগসহ হুমকির ঘটনা।’
অভিযোগ উঠেছে, তদন্ত প্রতিবেদনসহ জমি সরেজমিনেও বিপাকে পড়তে হয় কর্মকর্তাদের। নামজারি আবেদন প্রক্রিয়ায় দখল না থাকা জমিও দখল প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য ক্ষমতা প্রয়োগ করেন অনেকেই। প্রতিবেদন পক্ষে না গেলে অফিসে এসে হুমকিসহ হেনস্তার শিকার হতে হয় অনেক সময়।
জানা গেছে, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দীপক ত্রিপুরা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ভূমি অফিসে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। প্রতিদিন অফিসের বিভিন্ন কার্যক্রম তদারকি করছেন তিনি। সেবা নিতে আসা মানুষদের অনেক সময় নিজেই ডেকে তাদের সমস্যার কথা শুনছেন। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে আস্থা ও স্বস্তি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, আগে ভূমি অফিসে দালাল ছাড়া কাজ করা কঠিন ছিল। ছোট একটি কাজ করতেও ভোগান্তি পোহাতে হতো সাধারণ মানুষকে। এখন অনেকেই সরাসরি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে সমাধান পাচ্ছেন। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা বিভিন্ন জটিল নামজারি ও ভূমিসংক্রান্ত মামলার নিষ্পত্তিও দ্রুত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সেবাগ্রহীতারা।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) দীপক ত্রিপুরা দ্য প্রতিদিনের চিত্র বিডিকে বলেন, পুরো অফিস ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার আওতায় এনে কঠোর মনিটরিংয়ের মাধ্যমে দালালমুক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ভূমি অফিসে সৌন্দর্যবর্ধনের জন্যেও নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। সেবাপ্রত্যাশীদের সরাসরি আমার অফিসে আসতে উৎসাহ দিচ্ছি। অন্য কারো হাত দিয়ে আসা মানেই সেখানে দালাল ঢুকে পড়া। ফলে এখন সেবা গ্রহীতারা সরাসরি আমার অফিসে আসতে পারছেন।
তিনি আরও বলেন, ‘ইতিমধ্যে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দীর্ঘদিন দখলে থাকা বেশ কয়েকটি সরকারি খাসজমি উদ্ধার করা হয়েছে। এসব উদ্ধারের পর থেকে তারা দালাল চক্রসহ বিভিন্ন অন্যায় তদবির করছেন। আমরা তাদেরও চিহ্নিত করে রাখছি এবং তাদের বিষয়ে কতৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

































