জুলাই স্মৃতিকথা: জুলাই ২০২৪-এর প্রত্যাশা


জুলাই স্মৃতিকথা: জুলাই ২০২৪-এর প্রত্যাশা

৯৭১ সালের স্বাধীনতা অর্জনের পরে দেশের প্রথম প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ জুলাই ২৪ এর আন্দোলনে সরব ও সতর্ক ছিলেন। ছাত্র জনতার নেতৃত্বে আন্দোলনে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার। সেই সময় শিক্ষার্থীদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মহাসড়কে সক্রিয় অবস্থান নেন।

জুলাই অভ্যুত্থানের প্রথম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে এই অবিনাশী চেতনা স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে সংকলিত “জুলাই স্মৃতিকথা” নামে একটি স্মারক প্রকাশিত হয়েছে। যার— সম্পাদনায় ছিলেন, অধ্যাপক ড. মো. কামরুল হাসান, অধ্যাপক ড. মো. ওবায়দুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. রশিদুজ্জামান, জুলাই যোদ্ধা এস এম সুইট, সাদিক আহমদ, ইমতিয়াজ আহমেদ ইমন ও চয়ন হোসেন।

‘জুলাই স্মৃতিকথা’ স্মারকে ৫৩টি শিক্ষক-শিক্ষার্থীর লেখা স্থান পেয়েছে। তন্মধ্যে আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. এ.বি.এম ফারুকের লেখা ‘জুলাই ২০২৪-এর প্রত্যাশা’ পাঠকদের সুবিধার্থে ইবি প্রতিনিধি আশরাফুল ইসলাম হুবহু তুলে ধরেছেন।

বড় দুর্ভাগা এক জাতি। গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় যুগযুগ ধরে জাতি রক্ত দিয়ে আসছে। ৫২, ৬৯, ৭১ পেরিয়ে ২০২৪। সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন, জীবনের মানোন্নয়ন, বাক স্বাধীনতা, ন্যায় বিচার ও সমাজ থেকে শ্রেণী বৈষম্য দুর করার লক্ষ্যে সাধারণ মানুষের এ আত্মবলিদান।

১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে এ ভেবে যে, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে এবার তারা স্বাধীনভাবে কথা বলবে, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর হবে। গণমানুষের রাজ প্রতিষ্ঠিত হবে। নির্ভয়ে তারা শান্তিতে ঘুমাবে। সমাজের সর্বস্তরে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্রের শাসক প্রজাদের সেবক হবে। চুরি, ডাকাতি, রাহাজানী দূর হবে। আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হবে। ৭২-৭৫ এর সরকার মানুষের সে প্রত্যাশা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। তারা ১৯৭৩ সালে একতরফা নির্বাচন করে গণতন্ত্র হত্যা করেছে। একদলীয় শাসন কায়েম করেছে। ৭৪ সনে জাতিকে একটি দুর্ভিক্ষ উপহার দিয়েছে। রাষ্ট্রের রক্ষকরা ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। সর্বত্র লুট-তরাজ, চুরি, ডাকাতি রাহাজানীর সয়লাব বয়েছে। জন নিরাপত্তার এমন চরম অবনতি হয়েছে যে, তৎকালীন বাম রাজনীতিক কমরেড মনি সিংহ রাষ্ট্র প্রধানের কাজে স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চেয়েছিলেন। রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিতরা ভোগ-বিলাস, আমোদ-প্রমোদে মত্ত ছিল।

অবশেষে মানুষের মুক্তি এল। ৭৫ এর ১৫ আগষ্ট পট পরিবতন হল। মানুষ হাফ ছেড়ে বাঁচল। নতুন উদ্যমে দেশ গড়ার কাজ শুরু হল। সর্বক্ষেত্রে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হল।

একদলীয় শাসনের পরিবর্তে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হল। রাষ্ট্রের সর্বত্র উন্নয়নের হৈ চৈ পড়ে গেল। দেশে-বিদেশে দেশের চেহারা উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হতে শুরু করল। কিন্তু দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র ১৯৮১ সনে দেশের এ অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিল। পরবর্তী সরকারগুলো দেশের উন্নয়নের নামে আবার মানুষের সাথে প্রতারণা করল। গণতন্ত্র নির্বাসনে গেল। সমাজের বৈষম্য বৃদ্ধি পেতে লাগল। ধনী আরো ধনী গরীব আরো নিঃস্ব হতে লাগল। ফলশ্রুতিতে ৯০ তে গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরশাসকের পতন হল। ১৯৯১ সনে অবাধে ভোট দিয়ে মানুষ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করল। গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সর্বদলীয় কিছু সিদ্ধান্ত গৃহিত হল। কিন্তু তা বেশি দিন টিকেনি। কায়েমী স্বার্থবাদীরা এদেশে কখনই গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণ হতে দেয়নি। রাজনীতিক ও ধনীক শ্রেণী রাষ্ট্রকে তাদের বাপ-দাদার সম্পত্তি বানিয়ে অবাধে লুটতরাজ করে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হতে লাগল। ক্ষমতা আরোহণকারী সকল দলের নেতা কর্মীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠতে লাগল। ২০০৬ সনে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করল। দু'বছর দেশ শাসন করে তারা নিয়মতান্ত্রিক একটি ইলেকশন করল। নিরংকুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এল। তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠাকে বুলি হিসেবে গ্রহণ করে নানা অজুহাতে বিরোধী কণ্ঠ রোধ করা শুরু করল। ২০১৪, ১৮ ও ২৪ সনে তারা ভোটবিহীন তিনটি নির্বাচন করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করল। দেশের সকল প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করল। নির্যাতননিষ্পেশন, গুম, খুন, লুটতরাজ স্বাভাবিক কর্মে পরিণত করেছে। সর্বস্তরে সর্বদলীয় লোক নিয়োগ দিয়ে নিজেদের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার বন্দোবস্ত করেছে। বিরোধীতা বা সমালোচনা মানে অবধারিত মৃত্যুর কালচার গড়ে তুলল।

দলকানা লোক দিয়ে বিচারালয়গুলো সাজানো হল। যাতে তারা সরকারের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটান। সর্বত্র মিথ্যার সয়লাব বইয়ে দিল। উন্নয়নের নামে বৈদেশিক ঋণে বড় বড় প্রকল্প গ্রহণ করে দলীয় নেতা কর্মী ও আত্মীয়স্বজনদের হাজার হাজার কোটি টাকা লোটার ব্যবস্থা করল। দেশ রসাতলে যেতে লাগল। দেশের সাধারণ মানুষ আতংকে নির্বাক হয়ে গেল। অপমান, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, দাম্ভিকতা রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হলো। দলের পাতি নেতাও কোটিপতি। পিয়ন, ড্রাইভারের ব্যাংক একাউন্টে শত কোটি টাকা, রাষ্ট্রীয় কোষাগার, ব্যাংক, বীমা, শেয়ার বাজারসহ সকল আর্থিক প্রতিষ্ঠান লুট করা হয়েছে। দলের বাইরের লোকজন কর্মসংস্থানের অভাবে দিশেহারা।

রাষ্ট্র প্রধানের অফিস থেকে সরকারী বেসরকারী অধস্তন অফিসের সর্বত্র ঘুষ লেন-দেন রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিগণিত হয়েছে। দলীয় লোক ছাড়া নাগরিকদের বৃহৎ অংশ সর্বগ্রাসী আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তায় হাবু-ডুবু খেয়ে আল্লাহর দরবারে এ থেকে নিষ্কৃতির আকুতি জানাতে থাকে।

জুলাই ২০২৪ শিক্ষিত বেকার যুবক ও উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সরকারী চাকুরীতে অন্যায্য কোটা বাতিলের দাবী তোলে। রাষ্ট্র প্রধান সেখানে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও মসকরা ভরা মন্তব্য করেন। এতে আন্দোলনকারীদের কাটা ঘায়ে পড়ে নুনের ছিটা। তারা রাষ্ট্র প্রধানের এহেন আচরণে উত্তেজিত হয়ে উঠে। তাদের আপামর জনতা একাত্মতা প্রকাশ করে। দেশের সর্বস্তরের মানুষ ছাত্রদের ন্যায্য দাবীর সমর্থনে মাঠে নামে। শুরু হয় নির্যাতন নিষ্পেশন, হত্যা, গুম, ধর পাকড়। জনগনের করের টাকায় গড়া পুলিশ, বিজিবিসহ সকল বাহিনীকে মানুষের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়া হয়। এতে দিশেহারা মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে, রাস্তায় নামে। গুলি চলতে থাকে মানুষ হতাহত হতে থাকে। মৃতের সংখ্যা হাজার ছাড়ায়। আহতদের সংখ্যা ৩০ হাজারের উপরে। গুলি চলছেই মানুষের ঢলও বাড়ছে। অবশেষে ফ্যাসিস্ট সরকার জীবন বাঁচাতে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রে পালিয়ে যায়। একটি স্বৈরাচারী ফ্যাসিস্ট দাম্ভিক ও লুটেরার অন্ধকার যুগ থেকে দেশবাসী মুক্তি লাভ করে।

৭১ থেকে ২৪ পর্যন্ত প্রতিটি গণআন্দেলনের বার্তা অভিন্ন। আর তা হল দুর্নীতি, বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক একটি দেশ গড়ুন। এ জন্য স্বৈরাচারী, নির্যাতনকারী গণতন্ত্র হত্যাকারী ও লুটপাটের সকল কালা-কানুন বাতিল করা। চব্বিশের গণআন্দোলনের চাওয়া খুব অল্প। এক, স্বৈরাচারীর বিচার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। দুই যেসব রাস্তা ধরে স্বৈরাচার লুটপাট, অবিচার, গণতন্ত্র হত্যাসহ গণমানুষের অধিকার হরণকারী সকল বিষয়ে কার্যকারী ও টেকসই সংস্কার নিশ্চিত করা। তিন একটি অবাধ সুষ্ঠু অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। এ কাজগুলো সুচারুরূপে সম্পন্ন করার জন্য সকল দলমতের মানুষের সর্বাত্মক সহযোগিতা একান্তভাবে কাম্য। এ ৩টি কাজ ভবিষ্যৎ সুন্দর বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য। নতুবা নব্য স্বৈরাচারের জন্ম হবে। দেশ বিপদে পড়বে। দেশের মানুষের কষ্ট বাড়বে। ফলশ্রুতিতে আবারো ৩৬ জুলাই আসবে। কিন্তু প্রশ্ন হল আর কত? কবে আমরা মানুষ হব? আমাদের বোধোদয় হবে।

লেখক স্বত্ব: ড. এ.বি.এম ফারুক, অধ্যাপক আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ,ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

Ads