নতুন ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ নিতে ডিসেম্বরে আইএমএফের সঙ্গে চুক্তি
১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১১ এএম
বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে আগামী ডিসেম্বর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদে ৪৫০ কোটি (৪.৫ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারের একটি নতুন ঋণ সহায়তা পেতে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক রূপান্তর, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ফেরানোর লক্ষ্যে এই ঋণ কর্মসূচির পরিকল্পনা করা হয়েছে। সব আলোচনা সফলভাবে সম্পন্ন হলে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই উভয় পক্ষের মধ্যে এই আনুষ্ঠানিকভাবে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর) নাইজেল ক্লার্কের সাথে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের এক উচ্চপর্যায়ের ‘ফলপ্রসূ আলোচনা’ অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে প্রতিনিধি দলের শীর্ষ কর্মকর্তা ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, অর্থনৈতিক সংস্কারের ধারাবাহিকতায় এই নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত রূপরেখা চূড়ান্ত করতে চলতি অক্টোবর মাসের শেষভাগেই আইএমএফের একটি বিশেষ মিশন ঢাকায় পৌঁছাবে।
বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ব্যাংকিং খাতের চলমান সংস্কার পরিকল্পনা আইএমএফের কাছে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়, যেখানে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা এবং আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক খাতের বর্তমান সংকটের চিত্রে দেখা যায়, ২০২৩ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সম্পাদিত আইএমএফ চুক্তিতে ২০২৬ সালের মধ্যে খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা বর্তমানে বেড়ে প্রায় ৩৩ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। তবে নতুন চুক্তিতে খেলাপি ঋণের লক্ষমাত্রা কত নির্ধারণ করা হবে, তা ঢাকা সফরে চূড়ান্ত হবে। ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে সংকটগ্রস্ত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক এবং গত বৃহস্পতিবার থেকে ন্যাশনাল ব্যাংকের আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।
নতুন ঋণ কর্মসূচির শর্তাবলী নিয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, আইএমএফের সহায়তা পেতে হলে কিছু জরুরি শর্ত পূরণ করতে হবে এবং উভয় পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিক সমঝোতায় পৌঁছানো হবে। ব্যাংক খাতের পুনঃমূলধনীকরণ, রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় আইএমএফের যেসব পর্যবেক্ষণ রয়েছে, তাতে বাংলাদেশ সরকারও একমত প্রকাশ করেছে। মন্ত্রী উল্লেখ করেন, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক নানা অর্থনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও বাংলাদেশের অর্জিত অগ্রগতিতে আইএমএফ সন্তোষ প্রকাশ করেছে এবং ভবিষ্যতে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মতো বহুপক্ষীয় সংস্থার সংগে অংশীদারিত্ব জোরদার থাকবে।
অন্যদিকে, পৃথক এক সংবাদ সম্মেলনে আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের উপপরিচালক সোনালি জৈন চন্দ্র বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি ও আর্থিক খাত সংস্কারের ওপর জোর দেন। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, বর্তমানে বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যা বিশ্বজুড়ে সর্বনিম্ন অনুপাতগুলোর একটি। এর পাশাপাশি সাড়ে তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা মূল্যস্ফীতির চাপ (যা গত সেপ্টেম্বরে ৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে) মোকাবিলায় শুধু সংকোচনমূলক মুদ্রানীতিই যথেষ্ট নয়, বরং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক খাতে কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।
উল্লেখ্য, আগের ঋণ কর্মসূচির পরবর্তী কিস্তি না নিয়ে বাংলাদেশ সরকার গত মে মাসে নতুন একটি বিস্তৃত সহায়তার অনুরোধ জানায়। এরই ধারাবাহিকতায় গত জুলাইয়ে আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করে, যা সংস্থাটির ‘আর্টিকেল ফোর’ পরামর্শের সুপারিশগুলোর সাথে সামঞ্জস্য রেখে সংস্কার কৌশল নির্ধারণে সাহায্য করছে এবং বাংলাদেশকে পূর্ণ সহায়তা দিতে আইএমএফ তাদের আগ্রহ পুনর্ব্যক্ত করেছে।
























