স্মার্টফোন আসক্তি তরুণ প্রজন্মের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের উপর কতটা প্রভাব ফেলছে?
২৭ মে ২০২৫, ০১:৪৭ পিএম
স্মার্টফোন এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত, প্রায় প্রতিটি কাজেই আমরা কোনো না কোনোভাবে এর উপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে স্মার্টফোন যেন এক অত্যাবশ্যকীয় সঙ্গী। তবে অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহারের এই প্রবণতা ক্রমশ একটি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে তাদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের উপর।
এক সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে বসবাসকারী ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ দিনে গড়ে পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় স্মার্টফোনে ব্যয় করে। এদের মধ্যে অনেকেই সামাজিক মাধ্যম, অনলাইন গেমিং অথবা বিনোদনমূলক ভিডিওতে আসক্ত হয়ে পড়ছেন। এই অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে এবং দেখা দিচ্ছে নানা স্বাস্থ্য জটিলতা।
মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব:
অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহারের অন্যতম প্রধান কুফল হলো মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি। সামাজিক মাধ্যমে অন্যদের ঝলমলে জীবন দেখে অনেক তরুণ নিজেদের জীবন নিয়ে হতাশায় ভোগে। 'ফোমো' (Fear of Missing Out) বা কোনো কিছুতে পিছিয়ে থাকার ভয় তাদের মধ্যে অস্থিরতা ও উদ্বেগের জন্ম দেয়। এছাড়া, দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার কারণে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে, যা মানসিক স্বাস্থ্যের উপর আরও খারাপ প্রভাব ফেলে।
মনোবিজ্ঞানী ডক্টর মেহেরুন নেসা বলেন, "অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহার তরুণদের মধ্যে একাকীত্ব ও বিষণ্ণতা বাড়িয়ে তোলে। তারা ভার্চুয়াল জগতে বন্ধুদের সাথে যতটা সহজে মিশতে পারে, বাস্তব জীবনে ততটা স্বচ্ছন্দ বোধ করে না। এর ফলে সামাজিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যায় এবং মানসিক স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে।"
শারীরিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব:
শুধু মানসিক স্বাস্থ্যই নয়, অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহারের কারণে তরুণদের শারীরিক স্বাস্থ্যেরও মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। দীর্ঘক্ষণ ধরে ভুল ভঙ্গিতে ফোন ব্যবহারের কারণে ঘাড়ে ও পিঠে ব্যথা, চোখের ক্লান্তি এবং মাথাব্যথার মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে। শারীরিক কার্যকলাপ কমে যাওয়ায় বাড়ছে ওজন, যা ডেকে আনছে হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের মতো মারাত্মক রোগ।
ফিজিওথেরাপিস্ট রাশেদুল ইসলাম জানান, "আমরা এখন অনেক তরুণকে পাচ্ছি যারা স্মার্টফোন ব্যবহারের কারণে অল্প বয়সেই হাড়ের ও মাংসপেশীর সমস্যায় ভুগছে। দীর্ঘক্ষণ একই অবস্থানে থাকার কারণে রক্ত চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং স্নায়ুতে চাপ পড়ছে।"
সমাধানের পথে:
এই আসক্তির হাত থেকে মুক্তি পেতে সচেতনতা জরুরি। তরুণদের স্মার্টফোন ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণ করা উচিত এবং বাস্তব জীবনে সামাজিক কার্যকলাপ ও খেলাধুলার প্রতি মনোযোগ দেওয়া উচিত। বাবা-মা এবং শিক্ষকদেরও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।
অন্যদিকে, প্রযুক্তিও এক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। স্মার্টফোনে এমন কিছু অ্যাপ রয়েছে যা ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণ এবং অতিরিক্ত ব্যবহারে সতর্ক করতে পারে। এছাড়াও, ডিজিটাল ডিটক্স বা প্রযুক্তি থেকে নির্দিষ্ট সময় দূরে থাকার অভ্যাস গড়ে তোলাও জরুরি।
অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহার তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি নীরব হুমকি। সময় থাকতে সচেতন না হলে এর পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে, প্রযুক্তিই আমাদের নিয়ন্ত্রণ করবে – এই সত্যটি উপলব্ধি করা জরুরি।
























