আলীকদমে রোহিঙ্গা ভোটার কেলেঙ্কারি
জেলা প্রশাসকের সুপারিশ এক বছর ধরে সচিবালয়ে আটকা, ধরা ছোঁয়ার বাহিরে চক্র
২৬ জুন ২০২৬, ১০:৫১ এএম
রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব করণ, ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট একটি গুরুতর অভিযোগ তদন্তে সত্য প্রমাণিত হওয়ার পরও দীর্ঘদিন ধরে কোনো দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রহণ করা হয়। অভিযোগ উঠেছে দীর্ঘ এক বছর ধরে ফাইলটি সচিবালয়ে আটকে রাখা হয়েছে।
স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে, বান্দরবানের আলীকদম সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন এবং কয়েকজন ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের ভুয়া নাগরিকত্ব সনদ ও প্রত্যয়নপত্র প্রদান করে জাতীয় ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলেও এখনো তাদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর প্রশাসনিক বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
জেলা প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার পর স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯ অনুযায়ী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা প্রহণের সুপারিশ করা হয়।
জেলা প্রশাসকের তদন্ত প্রতিবেদন (https://drive.google.com/file/d/1MU9TMQYBi0JgOZ-n4bohGaabAHBsNwZ2/view?usp=drive_link)
তবে অভিযোগ রয়েছে, সেই তদন্ত প্রতিবেদন ও সুপারিশ দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের দপ্তরে অমীমাংসিত অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে অভিযুক্ত জনপ্রতিনিধিরা এখনো স্বপদে বহাল থেকে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ না হওয়ায় স্থানীয় জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, আলীকদম সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সন্তোষ কান্তি দাশ, ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মোহাম্মদ জাকের হোসেন এবং ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আব্দুল মতিন অর্থের বিনিময়ে তদন্ত প্রতিবেদনটি স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের দপ্তরে আটকে রেখেছেন। ফলে অভিযোগের বিষয়ে দীর্ঘদিনেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি করেন তারা।
নাগরিকত্ব প্রদানের নথি- https://drive.google.com/file/d/18KLNrK-6fm_ns2qcqKqZI8SxIL9fxqpo/view?usp=drive_link
১ নম্বর সদর ইউনিয়নের বাজারপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো: আরাফাত ইসলাম, নুরুল ছফাসহ বেশ কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, ভুয়া জন্মনিবন্ধন ও অন্যান্য কাগজপত্র ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করায় স্থানীয়রা মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।
তারা জানান, তদন্তে প্রতিবেদনটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে প্রায় এক বছর হয়েছে। তবে পরবর্তীতে আমরা জানতে পারি, আলীকদমের সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানের সহযোগিতায় মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে সচিবালয়ে ফাইলটি আটকে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
অভিযুক্ত ইউপি সদস্য সন্তোষ কান্তি দাশের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে পরে কথা বলবেন বলে ফোন কেটে দেন।
তবে ইউপি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন ঘুষের বিনিময়ে সচিবালয়ে তদন্ত ফাইল আটকে রাখার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এ ধরনের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।
তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ভোটার তালিকা হালনাগাদ কর্মসূচি-২০২৫ চলাকালে গত ৩ এপ্রিল ২০২৫ বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয় যে, রোহিঙ্গা নাগরিকদের বাংলাদেশি পরিচয়ে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চলছে। অভিযোগ ওঠে, আলীকদম সদর ইউনিয়ন পরিষদের কয়েকজন জনপ্রতিনিধি অর্থের বিনিময়ে ভুয়া নাগরিকত্ব সনদ এবং ‘রোহিঙ্গা নয়’ মর্মে প্রত্যয়নপত্র প্রদান করছেন।
অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা এবং উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে নিয়ে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি সরেজমিন অনুসন্ধান, নথিপত্র যাচাই এবং স্থানীয় ব্যক্তিদের সাক্ষ্যগ্রহণ করে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করে।
তদন্তে উঠে আসে উদ্বেগজনক সব তথ্য। প্রতিবেদনে বলা হয়, অভিযুক্ত জনপ্রতিনিধিদের দেওয়া সনদ ব্যবহার করে একাধিক রোহিঙ্গা ব্যক্তি বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে নিবন্ধনের চেষ্টা করেছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে। কোথাও পিতার নামের স্থানে শ্বশুরের নাম, কোথাও মৃত ব্যক্তিকে জীবিত দেখানো হয়েছে। বিভিন্ন নথিতে অসামঞ্জস্যপূর্ণ, বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্যও শনাক্ত করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে যে, উপস্থাপিত জাতীয়তা প্রমাণক নথিপত্রের তথ্য অমূলক, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং গুরুতর অসঙ্গতিপূর্ণ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্থানীয় সাক্ষ্য-প্রমাণ ও নথিপত্র যাচাইয়ের ভিত্তিতে তদন্ত কমিটি মত দেয় যে, নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে অভিযুক্ত জনপ্রতিনিধিদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এসব রোহিঙ্গা নাগরিক ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযুক্ত হিসেবে আলীকদম সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সন্তোষ কান্তি দাশ, ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মোহাম্মদ জাকের হোসেন এবং ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আব্দুল মতিনের নাম উল্লেখ করা হয়।
স্থানীয়রা স্বাক্ষ্য দেন, জনপ্রতি ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত গ্রহণ করে রোহিঙ্গাদের জন্য ভুয়া নাগরিকত্ব সনদ ও প্রত্যয়নপত্র প্রদান করা হয়েছে। তদন্ত কমিটিও তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, অভিযুক্ত জনপ্রতিনিধিরা উত্থাপিত অভিযোগের দায় এড়াতে পারেন না।
জানা গেছে, তদন্ত প্রতিবেদনটি ১৭ জুন ২০২৫ তারিখে উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জমা দেন। পরবর্তীতে তৎকালীন জেলা প্রশাসক শামীম আরা রিনি ২০ জুলাই ২০২৫ তারিখে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবেদন প্রেরণ করেন। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯ অনুযায়ী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেন।
কিন্তু প্রতিবেদন প্রেরণের প্রায় এক বছর অতিবাহিত হলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোন প্রকার ব্যবস্থা গ্রহণের তথ্য জনসমক্ষে আসেনি।
এবিষয়ে বর্তমান জেলা প্রশাসক মো: সানিউল ফেরদৌস বলেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে এখনো পর্যন্ত মন্ত্রণালয় থেকে কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। নির্দেশনা পাওয়া মাত্রই সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা প্রহণ করা হবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, রোহিঙ্গাদের অবৈধভাবে জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি কেবল একটি প্রশাসনিক অনিয়ম নয়; এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্যও একটি গুরুতর ঝুঁকি। কারণ জাতীয় পরিচয়পত্র অর্জনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পাসপোর্ট, ব্যাংক হিসাব, ভূমি নিবন্ধনসহ বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা গ্রহণের সুযোগ পেতে পারে। এতে নাগরিকত্ব ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুন্ন হওয়ার পাশাপাশি জাতীযয় নিরাপত্তা ঝুঁকিও বহুগুণে বেড়ে যেতে পারে।



















