ভ্রমণের স্মৃতি
কাম্পুং তাগাল বাবাগন: মালেশিয়ার এক জীবন্ত বিদ্যালয়
১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২৭ এএম
৯ই এপ্রিলের সেই সফর ছিল জীবনের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা। পেনাম্পাং শহরের কোলাহল ছেড়ে রাস্তা যখন ক্রকার রেঞ্জের পাদদেশে উঠতে শুরু করে, তখনই যেন বাতাস বদলে যেতে শুরু করে। শীতল, সতেজ বাতাস। শহরের গরম ও আওয়াজ পিছনে ফেলে এখানে আকাশ যেন অনেক বড় হয়ে যায়। পুরনো গাছের কর্কশ আকৃতি আর সাবাহ’র অভ্যন্তরের কুয়াশাচ্ছন্ন পর্বতশৃঙ্গ আকাশকে ঘিরে রাখে। ভ্যান যখন একটি নদী তীরবর্তী গ্রামে থামল, ততক্ষণে নিচু ভূমির আর্দ্র গরম বাতাস ছেড়ে পাহাড়ি খনিজসমৃদ্ধ ঠান্ডা বাতাস এসে লাগতে শুরু করেছে, যেন সূর্যের তাপে গরম হয়ে ওঠা পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে চলা পানির গন্ধ। এই বাতাসের গন্ধ বহু বছর আগে ২০০৪ সালে ফিলিপাইনের করডিলেরা অঞ্চলের একটি প্রত্যন্ত আদিবাসী গ্রামের স্বর্ণখনি এলাকায় পেয়েছিলাম।
গ্রামে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই বাতাসে একটা প্রাণবন্ত, সংক্রামক উদ্দীপনা যেন জেগে উঠল। আমাদের দলটি সাধারণ কোন পর্যটক দল ছিল না। শিক্ষা গ্রহণের নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়েই আমরা সেখানে গিয়েছিলাম। তাই ইন্দ্রিয়ের উপচে পড়া উত্তেজনা অনুভূত হচ্ছিল নিজের ভেতর। আনুষ্ঠানিক আলোচনা-শেয়ারিং শুরু হওয়ার আগেই আমাদের দলের সদস্যরা ছড়িয়ে পড়লেন চারিদিকে। কেউ মোবাইল ক্যামেরা অন করে ধারাভাষ্য দিতে শুরু করেছেন, কেউবা ভিডিও কল করে তাদের পরিবারের সদস্যদেরকে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখাচ্ছেন, কেউ কেউ প্যান্ট-শার্ট পরিহিত ভদ্র অবস্থাতেই ঝাঁপিয়ে পড়েছেন নদীর শীতল পানিতে। বাবাগন নদীর আকর্ষণ ছিল চুম্বকের মতো। এখানকার পানি শুধু প্রাকৃতিক দৃশ্যের অংশ নয়, এটি যেন প্রকৃতির আত্মা। স্বচ্ছ, স্ফটিকের মতো পরিষ্কার ঝরনা দূর থেকে নূপুরের ধ্বনি ঝংকার তুলে ভেসে আসছে। বয়ে চলেছে মসৃণ, রঙিন নদীর পাথরের ওপর দিয়ে। তার অবিরাম, পুনরাবৃত্ত কলকল শব্দ আধুনিক পৃথিবীর সব ঝামেলা ঢেকে দিয়ে চোখে ঘুম এনে দেয়।

এটা যেন স্বপ্নময় এক মুহূর্ত। কয়েকজন চঞ্চল সহযাত্রী ভ্রমণের ক্লান্তি ও গরমে আর অপেক্ষা করতে পারলেন না। তাঁরা মিটিং এরিয়া থেকে প্লাস্টিকের চেয়ার নিয়ে ঠান্ডা, অগভীর পানিতে নেমে গেলেন এবং স্রোতের মাঝে চেয়ার পেতে বসে পড়লেন। ঘূর্ণায়মান পানিতে পা ডুবিয়ে তাঁরা নদীর উপর আড্ডা বসিয়ে দিলেন। নদীর প্রবাহের সাথে মানুষের এই মিতালী সৃষ্টি করেছিল এক অপূর্ব দৃশ্যপটের । এদিকে দলের ফটোগ্রাফাররা পাগলের মতো ছবি তুলছিলেন। প্রতিটি দৃশ্যই ছিল এক একটি ঐশ্বরিক শিল্পকর্ম। নানা রঙের স্থানীয় বুনো ফুলের পাতার ফাঁক দিয়ে আসা সূর্যের আলো ঝিক ঝিক করছে ঢেউ খেলানো পানির উপর। শ্যাওলাবিহীন মসৃণ পাথর যেন এক একটা ঘুমন্ত দৈত্য। স্বচ্ছ পানির ভিতর দিয়ে ভেসে বেড়ানো মাছ যেন পৃথিবীর সবচেয়ে মুক্ত প্রাণী।
শ্রী, জুনিয়া এবং আইপিএএস ও প্যাকোস টিমের অন্যান্য সদস্যরা যখন সবাইকে আনুষ্ঠানিক ব্রিফিংয়ের জন্য ডাকছিলেন, তখন প্রকৃতির ডাক এতটাই শক্তিশালী ছিল যে তা উপেক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। বাবাগনের মতো জায়গায় এক ধরনের ‘প্রকৃতি-বিভ্রম’ তৈরি হয়; চারপাশের সৌন্দর্য এতটাই মনোমুগ্ধকর যে কী করতে হবে তা বোঝে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে। বারবার নরম অনুরোধের পর অবশেষে পানির চুম্বকীয় আকর্ষণ ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন সবাই। আমাদের লক্ষ্যের সামনেই যেন নতি স্বীকার করলেন সবাই।
আমরা যখন সবাই খোলা একটি কমিউনিটি প্যাভিলিয়নের ছায়ায় জড়ো হলাম, তখন পরিবেশ বদলে গেল। উদ্দাম উত্তেজনা রূপ নিল শান্ত -সৌম্য প্রত্যাশায়। অংশগ্রহণকারীরা ব্রিফিং-এর সময় শিখে আসা তিনটি ‘আর’ (R) মেনে চললেন- Respect (সম্মান), Responsibility (দায়িত্ববোধ), এবং Reciprocity (পারস্পরিকতা)।
মি. জিডিয়াস গনসুইন ছিলেন বাবাগন এলাকার আত্মার প্রতীক। তাগাল বাবাগন কমিটির প্রধান তিনি, বয়স প্রায় ৭০। একটু কম বেশিও হতে পারে। তাঁর গায়ের রং ফর্সা কিন্তু পোড়-খাওয়া বলতে যা বোঝায় সে রকম। চোখে তীক্ষ্ণ ও সতর্ক দৃষ্টি, এ যেন নদীর পরিবর্তন দেখে দেখে গড়ে ওঠা অভ্যেস। তিনি আমাদের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন শিক্ষকের মতো তবে শিক্ষক হিসেবে নয়, বরং গল্প কথক হিসেবে।

নিমেষেই তিনি আমাদের নিয়ে গেলেন ১৯৫০-এর দশকে, যা আমাদের একেবারে ভিন্ন এক পৃথিবী। তিনি জানান, তখন বাবাগন কোনো ব্যস্ত ইকোট্যুরিজম গ্রাম ছিল না। ছিল মাত্র পাঁচটি পরিবারের ছোট্ট একটি জনপদ। ভাবুন, সেই নির্জন ও ঘনিষ্ঠ জীবন কেমন হতে পারে। চারপাশে ছিল অবাধ আকাশ-ছোঁয়া বন আর ঘন জঙ্গল। ভূত আর ছায়ার মিতালীতে জেগে থাকা নদী তীরবর্তী এক জগত যেন। উজানের পর্বত থেকে উপকূলীয় বাজারে ফসল বিনিময় করতে আসা আদিবাসীদের জন্য এটা ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট হাব বা যাতায়াতের প্রধান সংযোগস্থল।
বাবাগন তখন নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠেছিল। কারণ দীর্ঘ যাত্রা এবং চড়াই-উৎরাই পার হওয়ার পর পথচারীরা হয়ে পড়তেন ক্লান্ত-শ্রান্ত। ক্লান্ত পথিকেরা বড় বড় বেতের ঝুড়ি নিয়ে গ্রামে এসে বিশ্রাম নিতেন আর রাতে মাথা গুঁজার ঠাঁই খুঁজতেন। কোনো হোটেল বা সরাইখানা ছিল না সেই অঞ্চলে। তাই তাঁরা দয়ালু এক বয়স্ক ব্যক্তির বাড়িতে আশ্রয় নিতেন। মি. জিডিয়াস গল্প বলতে বলতে উদাস হয়ে যান। তিনি ফিরে যান সেই জনমানবহীন এক ছোট জনপদে, যেখানে সারি সারি পথচারী আসতো রাত কাটাতে। একটি দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে তিনি বলেন, এই অস্থায়ী আশ্রয়গুলো যাত্রীদের কাছে ‘নিজের শরীরেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ’ হয়ে উঠেছিল যেন। এটা শুধু আরামের রূপক নয়, বরং এক ধরনের আতিথেয়তার প্রকাশ, যেখানে অপরিচিত ব্যক্তি অতিথি নয়, বরং নিজেরই পরিবারের মতো করে থাকা-খাওয়ার আশ্রয় পেতো।
তিনি বলেন, গ্রামের নামটিই তার ইতিহাসের ভাষাগত মানচিত্র। এটা কাদাজান শব্দ ‘বাগন’ বা ‘মাবাগন’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘দোলা’ বা ‘দুলা’। এটা ছিল পুরনো ঝুলন্ত ব্রিজ-এর আক্ষরিক বর্ণনা, যা বাবাগন নদীর ওপর দিয়ে যেত। এই সেতুগুলো ছিল স্থানীয় লতা ও কাঠের তৈরি, যা কেউ হাঁটলে বিপজ্জনকভাবে দুলে উঠত। পার হওয়া মানেই ‘মাবাগন’। কিন্তু মি. জিডিয়াস দ্রুত মৌখিক ইতিহাসের একটা মাত্রা যোগ করেন, যা পাঠ্যপুস্তকে সাধারণত থাকে না। তিনি ‘তুন্দো’ঙগন’ শব্দটি ব্যবহার করেন, যার অর্থ ‘আশ্রয়’ বা ‘বিশ্রামের জায়গা’। তিনি বলেন, বাবাগনের পরিচয় শুধু সেতু পার হওয়া নয়, বরং সেখানে পৌঁছে যে বিশ্রাম পাওয়া যেত তা দিয়েও গড়ে উঠেছে। বাবাগন ছিল ক্লান্ত যাত্রীদের বিশ্রামের জায়গা, ঠিক পাশের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য শহর ডংগংগনের মতো।

সূর্য যত উঁচুতে উঠছিল এবং সমাবেশস্থলে শরীর আর ছায়াকে সমান্তরালে স্থাপন করছিল, মি. জিডিয়াসের গল্প আরও গভীর হয়ে উঠছিল। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দিলেন, এই নদীর অতীত সবসময় শান্তির গল্প ছিল না। কাদাজান জনগোষ্ঠী শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জীবনচক্রের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিয়ে মাছ ধরতেন। তাঁরা বাঁশের ফাঁদ ও হাতে ছোড়া জাল ব্যবহার করতেন যাতে ছোট মাছ পালিয়ে যেতে পারে। কিন্তু ১৯৭০-এর দশক ছিল ‘উন্নয়ন’-এর খারাপ সময়।
আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সঙ্গে লোভী ধ্বংসাত্মক মানসিকতা দেখা দিতে শুরু করেছিল তখন। মানুষ ব্লিচ, রাসায়নিক বিষ এবং আরও ক্ষতিকর পদ্ধতি ব্যবহার করে মাছ ধরতে শুরু করল। তারা কম পরিশ্রমে সর্বোচ্চ ফল পাওয়ার জন্য উদগ্রীব ও লোভী হয়ে উঠল। ফলাফল ছিল ভয়ানক। যে নদী ছিল জীবনের উৎস, তা যেন গোরস্থানে পরিণত হলো। মি. জিডিয়াস বলেন, এক সময় মাছের সংখ্যা এত কমে গিয়েছিল যে প্রায় বিলুপ্তির পথে চলে গিয়েছিল। আর সুন্দর পাহাড়ি বাতাসের জায়গায় পচা গন্ধ ভেসে বেড়াতে শুরু করল। নদীর নির্জনতা ছিল এক ভয়ংকর স্মারক। দয়ালু বৃদ্ধ’র ঘর যেন ভূমির জ্ঞান বিস্মৃত হল। ফলাফল ভয়ংকর। জীবন, সংস্কৃতি, অর্থনীতি সবকিছুতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করে মানুষের লোভ-লালসা।
কিন্তু ১৯৮০-এর দশক ছিল টার্নিং পয়েন্ট। ‘পুরনো প্রথা’ জানা বয়স্করা জনগণকে বোঝাতে শুরু করলেন, নদী মরে গেলে গ্রামবাসী মরবে, গ্রামও মরবে। তাঁরা ফিশারিজ ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে সমন্বয় করে নদী রক্ষায় প্রথাগত তাগাল পদ্ধতি ফিরিয়ে আনার আন্দোলন শুরু করলেন। প্রথাটি বিলুপ্তপ্রায় এক প্রাচীন আদিবাসী ঐতিহ্য।
কাদাজান-দুসুন ভাষায় ‘তাগাল’ শব্দের অর্থ ‘নিষেধাজ্ঞা’। এটা সম্পদ ব্যবস্থাপনার এক ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি, যা নদীকে সমাজের সামষ্টিক সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করে। এই সম্পত্তি সবার কিন্তু একক কারোর নয়। ‘তাগাল বাবাগন’ কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ২০০০ সালে। এটা ছিল এই পদ্ধতির প্রথম সরকারি স্বীকৃতি। তাই বাবাগনকে বর্তমান তাগাল আন্দোলনের ‘সূতিকাগার’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা পরে সারা সাবাহ রাজ্য জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।m
এটা পরিবেশ সুরক্ষার জন্য সাধারণ কোন নির্দেশনা বা পরামর্শ নয়, বরং প্রথাগত আইনের ওপর ভিত্তি করে গড়া একটি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি। মি. জিডিয়াস বলেন, নিয়মগুলো কঠোরভাবে পালন করা হয়। কেউ তাগাল নিয়ম ভঙ্গ করলে, যেখানে মাছ ধরা উচিত নয় সেখানে ধরা বা ভুল সময়ে মাছ ধরা ইত্যাদি অপরাধ করলে, শুধু জরিমানা নয়, তাকে গ্রামের প্রধানের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়, যা এক ধরনের ‘সামাজিক গ্রেপ্তার’। অপরাধীকে শাস্তি বা জরিমানা হিসেবে একটি শূকর বা গরু দিতে হয় সমাজের কাছে। যদি তা দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে নগদ মূল্য দিতে হয়, যা সাধারণ দামের চেয়ে বেশি। প্রতি কেজি ৫০ রিঙ্গিত করে সাধারণত ৩০-৫০ কেজি মাংসের দাম পরিশোধ করতে হয় অপরাধীকে। এতে লোভের শাস্তি সম্ভাব্য লাভের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে যায় এবং সমাজে অপরাধ-প্রবণতা হ্রাস পায়।
তাগাল বাবাগন অসাধারণ এক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি। কারণ, এটা শুধু মাছ ধরার নিয়ম নয়, পুরো সমাজের জন্য একটি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করে। গ্রামের ভিতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমরা সম্মিলিত কাজের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। শিশুদের হাসি আর নদীর অবিরাম প্রবাহ যেন সৃষ্টি করেছিল এক স্বর্গীয় আবহ।
গ্রামটি ইকো-ট্যুরিজমকে আদিবাসী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছে। তারা প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষণাবেক্ষণের খরচ হিসেবে আগত অতিথিদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৩ রিঙ্গিত করে আদায় করে থাকে। কিন্তু নিয়মে দেখা যায় তারা বয়স্ক ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সম্মান করে; ৬০ বছরের বেশি বা ৭ বছরের কম বয়সীদের জন্য কোন প্রবেশ ফি গ্রহণ করা হয় না। এই টাকা কেউ নিজের পকেটে রাখে না, তা যায় সম্প্রদায়ের স্ব-সহায়তা তহবিলে। এই তহবিল এক ধরনের বীমা পলিসির মতো কাজ করে, যা এলাকা রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি দুঃস্থ পরিবারগুলোকে সাহায্য করার জন্যে এবং প্রতিবন্ধীদের বিশেষ সহায়তা প্রদানে ব্যয় করা হয়। বাবাগনের মানুষ নিজেরাই নিজেদের দেখাশোনা করে, আর তারা মনে করে, নদী তাদের দেখাশোনা করে।
এই নদী ব্যবস্থাপনায় চমৎকার কিছু নিয়ম রয়েছে। তারা পুরো নদী অঞ্চলকে তিনটি আলাদা জোনে বিভক্ত করেছে: (১) লাল জোন, (২) হলুদ জোন ও (৩) সবুজ জোন।

লাল জোন হলো ‘নিষিদ্ধ’ জোন। এই এলাকাটি মাছের আশ্রয়স্থল হিসেবে চিহ্নিত। এখানে মাছ ধরা বা পরিবেশের ক্ষতি করতে পারে এমন কোনো কার্যকলাপ পুরোপুরি নিষিদ্ধ। লাল জোন মাছের জন্য নিরাপদ স্থান, যেখানে তারা বড় হয় ও প্রজনন করে।
হলুদ জোন হলো সীমিত আহরণের জন্য সীমাবদ্ধ জোন। এখানে সাধারণত মাছ ধরা নিষিদ্ধ, তবে বছরে একবার বা কয়েক বছর পর ‘আহরণ উৎসব’ হয়। স্থানীয় তাগাল কমিটি তারিখ বা সময়কাল ঠিক করে, আর ধরা মাছ সমাজের সবার মধ্যে সমানভাবে ভাগ করা হয় অথবা কাআমাতানের মতো বড় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ব্যবহার করা হয়।
সবুজ জোন হলো উন্মুক্ত জোন। এখানে সারা বছর পরিবেশের ক্ষতি না করে মাছ ধরা যায়। এটা বাসিন্দাদের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটায়।
মি. জিডিয়াস সবচেয়ে মর্মস্পর্শী একটি তথ্য আমাদেরক দিয়েছিলেন। তা হলো ‘প্রেগন্যান্সি রুল’ বা গর্ভাবস্থার নিয়ম। সমাজ জানে গর্ভবতী নারীদের কী খাওয়া দরকার। এটা তারা ঐতিহ্যগতভাবেই জানে। গর্ভবতী নারীদের জন্য ঘোষণা দিয়ে যে কোন জোন থেকে যে কোন সময় মাছ ধরা যাবে। তবে নির্দিষ্ট প্রজাতির মাছ, যা গর্ভকালীন সময়ের জন্য উপযোগী। তাদের বিশ্বাস, গর্ভাবস্থায় মাছ খাওয়ানো হলে বাবাগনের পরবর্তী প্রজন্ম নদীর শক্তি নিয়ে জন্মগ্রহণ করবে। পরিবারের স্বামী ও স্ত্রী উভয়ে মিলে সিদ্ধান্ত নেন, কখন গর্ভবতীদের জন্য মাছ ধরতে হবে।
ঘড়ি যখন ১২:৪০-এর কাছাকাছি, আমাদের দলের মধ্যে মৃদু বিতর্ক যেন দেখা দিল। আমরা ছিলাম ইচ্ছার দ্বন্দ্বে। এক অংশ তখনও প্রতিবন্ধী অধিকার, শিকারের নিয়ম এবং তাগাল ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন করে যাচ্ছেন। অন্য অংশ পাহাড়ি বাতাস ও কাঠের ধোঁয়ার গন্ধে অনুপ্রাণিত হয়ে ক্ষুধার তীব্র অনুভূতি অনুভব করতে লাগলেন। সংক্ষিপ্ত কিন্তু ন্যায্য আলাপে সিদ্ধান্ত হলো- প্রথমে লাঞ্চ, তারপর গ্রাম পরিক্রমায় বের হবো সবাই।
আমরা সবাই একসঙ্গে লাঞ্চ করলাম- স্থানীয় সবজি, পাহাড়ি চাল এবং দিনের প্রধান খাবার ‘ইনাভা’।
খাওয়ার পর আমরা ‘প্যাডি ক্লাসরুম’-এ গেলাম। এটা একটি ছোট্ট, খুব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জমি, যেখানে বয়স্করা নতুন প্রজন্মকে চাষাবাদ শেখান। সমাজ জানে, যদি নতুন প্রজন্ম ধান চাষ করতে ভুলে যায়, তাহলে সেলফোন ও শহরের জগতে গিয়ে তারা মাটির সঙ্গে যোগাযোগ হারাবে। এটা ছোট্ট সবুজ জায়গা, কিন্তু সংস্কৃতির টিকে থাকার জন্য এর গুরুত্ব অনেক। এখানে ছোট ছোট পুকুর আছে, যেখানে মাছ চাষ করা হয়। নতুন প্রজন্মকে প্রকৃতির ক্ষতি না করে মাছ চাষ ও ধরার পদ্ধতি শেখানো হয়।
দিনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ ছিল গ্রাম পরিক্রমা শেষে ইনাভার রান্নার প্রদর্শনী। ইনাভা হচ্ছে কাদাজান খাবারের প্রধানতম খাবার। ইনাভার অনেক আধুনিক সংস্করণে লাইম জুসে কাঁচা মাছ ম্যারিনেট করা হয়। কিন্তু বাবাগনের সুদক্ষ শিক্ষিকা আমাদের অতীতের একটা গোপন কথা বলে দিলেন। আসল বাবাগন ইনাভা বানাতে লাগে ৩০০–৫০০ গ্রাম একদম তাজা মাছ। এ মাছ সাধারণত ম্যাকেরেল বা টুনা, অথবা আরও ভালো হয় নদীর শক্ত মাংসের মাছ। মাছকে অস্ত্রোপচারের নিখুঁততায় ছোট ছোট টুকরোয় কাটতে হয়। শিক্ষিকা জোর দিয়ে বলেন, সঠিক টেক্সচার ও স্বাদের জন্য মাছের মাংসকে ‘ব্ল্যাঞ্চ’ করতে হয় অর্থাৎ গরম পানিতে অল্প সময়ের জন্য সেদ্ধ করতে হয়।
মাছ তৈরি হয়ে গেলে মিক্সিং বাটিতে মাছকে প্রচুর লাইম জুসের সঙ্গে মেশানো হয়, যা উজ্জ্বল টক স্বাদ দেয়। তারপর টেক্সচার ও ঝালের জন্য পাতলা করে কাটা লাল পেঁয়াজ (মিষ্টির জন্য), ঝাল মরিচ এবং পরিমাণমত লবণ। ফলাফল: এক ঝলক স্বাদ যা টক, ঝাল, লবণাক্ত এবং অত্যন্ত তাজা। নদীর পাশে বসে খাওয়ার মতো অনুভূতি পাঁচ তারকা রেস্তোরাঁ কখনোই দিতে পারবে না, যে নদী সংস্কৃতিকে লালন করে। আমরা লাঞ্চ খেয়েছিলাম, কিন্তু তবু খাচ্ছিলাম যেন আক্রমণ করছি।
সোনালি বিকেলের সূর্য যখন ক্রকার রেঞ্জের পেছনে ডুবতে শুরু করল, তখন বাবাগন উপত্যকায় লম্বা, সুন্দর ছায়া পড়তে শুরু করল। আমাদের যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। আমরা আসার সময় যে কোলাহল ও বিভ্রান্তি নিয়ে এসেছিলাম, তা থেকে গভীর, শান্ত কৃতজ্ঞতার অনুভূতিতে ফিরতে শুরু করলাম। ওদিকে মালয় সাগর (তানজুং আরু বিচ) তার সব আকর্ষণ নিয়ে ডাকছিল।
কাম্পুং তাগাল বাবাগন শুধু পরিবেশ সংরক্ষণের প্রয়াস নয়। এটি যেন বাস্তব জীবনের এক জীবন্ত ক্লাসরুম। এটি আমাদের শেখায়, সামনে এগোনো মানে অতীতকে ধ্বংস করা নয়। একটি সমাজ যখন নিজস্ব সম্পদের যত্ন নেয়, তখন সে ন্যায়সঙ্গত ও ব্যবসায়িকভাবে সফল একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে।
যখন আমরা ফিরে যাচ্ছিলাম, তখন নদীর প্রবাহ দেখতে দেখতে মি. জিডিয়াসের সেই ‘দয়ালু বৃদ্ধ’র কথা ভাবছিলাম। এক পৃথিবীতে যা প্রায়ই ‘মাবাগন’ বা অস্থির ও দুলছে। এরূপ অবস্থায় জলবায়ু পরিবর্তন ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কারণে, বাবাগনের মতো জায়গাগুলোই এখন যেন ‘তুন্দো’ঙগন’ বা আশ্রয়স্থল। সেখানে আমরা বিশ্রাম নিতে পারি, শিখতে পারি এবং প্রকৃতির অংশ হওয়ার অনুভূতি লাভ করতে পারি। নদী ও সেতু এখনও দোলে, কিন্তু বাবাগনের হৃদয় পানির নিচের পুরনো পাথরের মতোই দৃঢ়।
---
লেখক পরিচিতি:
মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা জাতীয় পুরস্কার ২০২১ ভূষিত লেখক ও গবেষক এবং পরিচালক- জাবারাং কল্যাণ সমিতির নির্বাহী। ইমেল: mathura.tripura@gmail.com



























