ডিজিটাল পার্বত্য চট্টগ্রাম: পাহাড়ের সম্ভাবনাকে অর্থনীতির শক্তিতে রূপান্তরের সময়
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:০১ পিএম
ডিজিটাল পার্বত্য চট্টগ্রাম: পাহাড়ের সম্ভাবনাকে অর্থনীতির শক্তিতে রূপান্তরের সময়
বাংলাদেশের সামগ্রিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় বর্তমানে অন্যতম বড় নীতিনির্ধারণী চ্যালেঞ্জ হলো—কীভাবে ভৌগোলিকভাবে পিছিয়ে থাকা ও দুর্গম অঞ্চলগুলোকে জাতীয় অর্থনীতির মূল স্রোতে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা যায়।
এই সমীকরণে সম্ভাবনা ও বৈচিত্র্যে পূর্ণ ভূখণ্ডগুলোর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান—এই তিন জেলা নিয়ে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রামের আয়তন প্রায় ১৩ হাজার বর্গকিলোমিটার। ২০২২ সালের জাতীয় জনশুমারি অনুযায়ী এ অঞ্চলে প্রায় ১৮ লাখ ৪৩ হাজার মানুষের বসবাস।
অর্থাৎ এটি কোনো বিচ্ছিন্ন বা প্রান্তিক জনপদ নয়; এটি একটি বড় জনগোষ্ঠী, বিশাল ভূখণ্ড এবং বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অঞ্চল। কিন্তু এই বিপুল সম্ভাবনার বিপরীতে রয়েছে একটি বড় ডিজিটাল বৈষম্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর মাত্র ২১.১৭ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। নিজ ব্যবহারের জন্য মোবাইল ফোন রয়েছে ৭০.৪৫ শতাংশের এবং মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট রয়েছে ৩৭.৬৫ শতাংশের। একই সঙ্গে সাক্ষরতার হার ৬৯.৬ শতাংশ।
অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালে জাতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশের ৫৩ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ জাতীয় পর্যায়েও ডিজিটাল বিভাজন পুরোপুরি দূর হয়নি; পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যবধানটি আরও গভীর। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের বিশ্লেষণ আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় সামনে এনেছে—২০২৪ সালে বাংলাদেশের ৪জি নেটওয়ার্ক জনসংখ্যার প্রায় ১০০ শতাংশকে কভার করলেও ইন্টারনেট ব্যবহার করেছেন ৫৩ শতাংশ মানুষ। অর্থাৎ শুধু নেটওয়ার্ক পৌঁছালেই ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত হয় না; ডিভাইসের দাম, ডেটার ব্যয়, ডিজিটাল দক্ষতা ও ব্যবহারযোগ্য সেবাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই বাস্তবতা প্রমাণ করে—পার্বত্য চট্টগ্রামে ডিজিটালাইজেশন কোনো বিলাসী উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং নাগরিক সেবা পাওয়ার বৈষম্য কমানোর একটি মৌলিক কৌশল। তাই সমতল বা বড় শহরের জন্য তৈরি ডিজিটাল নীতিকে পাহাড়ে হুবহু প্রয়োগ না করে পাহাড়ের ভৌগোলিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অবকাঠামোগত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি বিশেষায়িত ‘ডিজিটাল পার্বত্য চট্টগ্রাম’ রোডম্যাপ প্রয়োজন। এই রোডম্যাপের প্রথম ভিত্তি হতে হবে নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী ডিজিটাল সংযোগ।
ইন্টারনেট ও নেটওয়ার্ক অবকাঠামো ছাড়া কোনো অ্যাপ, অনলাইন শিক্ষা, টেলিমেডিসিন কিংবা ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস কার্যকর হবে না। দুর্গম ইউনিয়ন ও পাহাড়ি গ্রামগুলোতে দ্রুতগতির মোবাইল নেটওয়ার্ক, ফাইবার অপটিক, প্রয়োজন অনুযায়ী স্যাটেলাইট সংযোগ এবং সৌরবিদ্যুৎনির্ভর কমিউনিটি ইন্টারনেট সেন্টার স্থাপন করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (ADB) সাম্প্রতিক উদ্যোগ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালে ADB ‘Advancing a Future Ready Digital Economy for Bangladesh’ নামে একটি কারিগরি সহায়তা উদ্যোগ প্রস্তাব করেছে। এর আওতায় ডিজিটাল অবকাঠামো ও সংযোগ, ডিজিটাল সরকার, ডিজিটাল দক্ষতা, ডেটা গভর্ন্যান্স, সাইবার নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ ডিজিটাল বিনিয়োগের প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জাতীয় ডিজিটাল রূপান্তরের এই কর্মসূচিতে পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি বিশেষ অগ্রাধিকার অঞ্চল হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা তাই সময়োপযোগী।
পর্যটন হতে পারে এই ডিজিটাল রূপান্তরের সবচেয়ে দ্রুত ফলদায়ী খাত। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়, হ্রদ, ঝরনা, বন, জীববৈচিত্র্য, বৌদ্ধবিহার, স্থানীয় সংস্কৃতি, খাদ্য ও নৃ-সংস্কৃতির বৈচিত্র্য দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য বড় আকর্ষণ। সাম্প্রতিক ঈদ ও ছুটির সময় খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে পর্যটকের চাপ দেখিয়েছে যে পর্যটনকে ঘিরে একটি শক্তিশালী স্থানীয় অর্থনীতি গড়ে তোলার বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে।
কিন্তু পর্যটনের এই সম্ভাবনাকে এখনও আমরা যথেষ্ট সংগঠিত ও ডিজিটাল করতে পারিনি। প্রয়োজন তিন পার্বত্য জেলার জন্য একটি সমন্বিত ‘Smart Hill Tourism Platform’। এতে পর্যটনকেন্দ্র, হোটেল-রিসোর্ট, নিবন্ধিত গাইড, স্থানীয় পরিবহন, রেস্তোরাঁ, আবহাওয়া, রাস্তার অবস্থা, জরুরি নম্বর, নিরাপত্তা নির্দেশনা ও স্থানীয় সাংস্কৃতিক আচরণবিধি এক জায়গায় থাকবে। পর্যটক আগাম আবাসন ও পরিবহন বুক করতে পারবেন, নিবন্ধিত গাইড বেছে নিতে পারবেন এবং ডিজিটাল পেমেন্ট করতে পারবেন।
এখানে আরও বড় সম্ভাবনা রয়েছে কমিউনিটি-বেইজড ট্যুরিজমে। পাহাড়ের কৃষক, নারী উদ্যোক্তা, কারুশিল্পী, স্থানীয় খাদ্য উৎপাদক ও তরুণ গাইডদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা গেলে পর্যটনের অর্থ শুধু বড় হোটেল বা রিসোর্টে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা ছড়িয়ে পড়বে গ্রামের পরিবার পর্যন্ত। পর্যটন তখন বিনোদনের খাত না থেকে স্থানীয় অর্থনীতির বহুমুখী কর্মসংস্থান ও আয় সৃষ্টির ইঞ্জিনে পরিণত হবে।
কৃষি খাতেও ডিজিটালাইজেশন বড় পরিবর্তন আনতে পারে। পার্বত্য অঞ্চলে আনারস, আম, কলা, আদা, হলুদ, কাজুবাদাম, কফি, বিভিন্ন মসলা ও ফলমূল উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু কৃষকের অন্যতম প্রধান সমস্যা উৎপাদন নয়—বাজার। তিনি অনেক সময় জানেন না কোন বাজারে তার পণ্যের দাম কত, কখন বিক্রি করলে বেশি লাভ হবে, কোথায় সরাসরি ক্রেতা পাওয়া যাবে কিংবা কীভাবে পণ্য সংরক্ষণ ও পরিবহন করা যায়।তাই প্রয়োজন একটি ‘Digital Hill Agriculture’ প্ল্যাটফর্ম। মোবাইল ফোনে সহজ বাংলার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় স্থানীয় ভাষায় আবহাওয়া, বাজারদর, রোগবালাই, কৃষি পরামর্শ ও সরকারি সহায়তার তথ্য পৌঁছাতে হবে। একই সঙ্গে পাহাড়ি কৃষিপণ্যের জন্য ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে কৃষক সরাসরি পাইকার, সুপারশপ, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং অনলাইন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যুক্ত হবেন।এর সঙ্গে ডিজিটাল আর্থিক অন্তর্ভুক্তি যুক্ত করা জরুরি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি শেষে দেশে ১৩টি MFS (Mobile Financial Service) প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধিত অ্যাকাউন্ট ছিল প্রায় ২৪.০৫ কোটি এবং MFS এজেন্ট ছিল প্রায় ১৮.৬ লাখ।
অর্থাৎ ডিজিটাল লেনদেনের একটি বিশাল অবকাঠামো ইতোমধ্যে দেশে তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক MFS-এর মাধ্যমে ব্যক্তি-থেকে-ব্যক্তি, ব্যক্তি-থেকে-ব্যবসা, ব্যবসা-থেকে-ব্যক্তি এবং সরকার-থেকে-ব্যক্তিসহ বিভিন্ন ধরনের লেনদেনের সুযোগ দিয়েছে। এখন সেই অবকাঠামোকে পাহাড়ের ক্ষুদ্র কৃষক ও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হবে।
শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন হলো ডিজিটাল রূপান্তরের দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় দক্ষ শিক্ষক, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক এবং মানসম্মত শিক্ষা উপকরণের ঘাটতি রয়েছে। তাই প্রতিটি উপজেলায় ‘Digital Learning Hub’ গড়ে তোলা যেতে পারে। সেখানে উচ্চগতির ইন্টারনেট, স্মার্ট ক্লাসরুম, ডিজিটাল লাইব্রেরি এবং অনলাইন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে।
শুধু সাধারণ শিক্ষাই নয়, কর্মমুখী শিক্ষার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। পর্যটন ব্যবস্থাপনা, হসপিটালিটি, ডিজিটাল মার্কেটিং, গ্রাফিক ডিজাইন, ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্স, কৃষি উদ্যোক্তা, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণ দিয়ে পাহাড়ের তরুণদের স্থানীয় ও বৈশ্বিক শ্রমবাজারের উপযোগী করে তোলা সম্ভব।
একই সঙ্গে ডিজিটাল শিক্ষা হতে হবে সাংস্কৃতিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা এবং অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর ভাষা, ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে ডিজিটাল কনটেন্টে স্থান দিতে হবে। স্থানীয় ভাষার ডিজিটাল আর্কাইভ, অভিধান, লোকগান, লোককথা ও ঐতিহাসিক তথ্য সংরক্ষণ করা গেলে প্রযুক্তি শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যম হবে না; সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষারও শক্তিশালী হাতিয়ার হবে।
স্বাস্থ্যসেবায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার আরও জরুরি। দুর্গম এলাকার একজন রোগীকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে অনেক সময় দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিককে জেলা ও জাতীয় পর্যায়ের বিশেষায়িত হাসপাতালের সঙ্গে Telemedicine Network-এ যুক্ত করা যেতে পারে। ডিজিটাল রোগী রেকর্ড, টেলিকনসালটেশন, ই-প্রেসক্রিপশন, অনলাইন রেফারেল এবং মাতৃ-শিশু স্বাস্থ্য ট্র্যাকিং চালু করা গেলে চিকিৎসার সময় ও ব্যয় কমবে।
পাহাড়ধস, দুর্ঘটনা, বিষধর সাপের কামড় এবং অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিতেও ডিজিটাল স্বাস্থ্য নেটওয়ার্ক জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রত্যন্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসক না থাকলেও ভিডিও কনসালটেশনের মাধ্যমে জেলা বা জাতীয় পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ পাওয়া সম্ভব।
পরিবেশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাতেও প্রযুক্তিকে যুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ধসের ঝুঁকি রয়েছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক দুর্যোগের ঝুঁকিও বাড়ছে। GIS, স্যাটেলাইট চিত্র, বৃষ্টিপাতের সেন্সর ও স্থানীয় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাকে সমন্বিত করে একটি ‘Hill Disaster Early Warning System’ গড়ে তোলা যেতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অতিবৃষ্টির মাত্রা নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ও গ্রামের মানুষের মোবাইলে আগাম সতর্কবার্তা পাঠানো সম্ভব।
ভূমি ব্যবস্থাপনাও ডিজিটাল রূপান্তরের বাইরে থাকতে পারে না। পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি একটি সংবেদনশীল ও জটিল বিষয়। ভূমির রেকর্ড, মানচিত্র, ব্যবহার এবং প্রশাসনিক তথ্য ডিজিটাল সংরক্ষণ ও GIS-ভিত্তিক ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা গেলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়তে পারে। তবে এই প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান আইন, স্থানীয় বাস্তবতা, প্রচলিত ভূমি ব্যবহার এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর অধিকারকে অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। প্রযুক্তি যেন বিরোধ কমানোর পরিবর্তে নতুন বিরোধ সৃষ্টি না করে, সেজন্য শক্তিশালী ডেটা গভর্ন্যান্স প্রয়োজন।
সবশেষে প্রয়োজন একটি সমন্বিত ‘Digital CHT Mission 2030’। এর পাঁচটি প্রধান স্তম্ভ হতে পারে—প্রথমত, দুর্গম এলাকা পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী ডিজিটাল সংযোগ; দ্বিতীয়ত, পর্যটনের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম; তৃতীয়ত, কৃষকের সরাসরি বাজার ও ডিজিটাল পেমেন্ট সংযোগ; চতুর্থত, টেলিমেডিসিন ও ডিজিটাল শিক্ষা হাব; এবং পঞ্চমত, GIS-ভিত্তিক ভূমি, পরিবেশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা।
এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ, স্থানীয় প্রশাসন, বাংলাদেশ ব্যাংক, টেলিকম অপারেটর, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড, বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি খাত এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে অংশীদার করতে হবে। ADB-র চলমান ডিজিটাল রূপান্তর উদ্যোগও এই বিনিয়োগ ও সক্ষমতা উন্নয়নের সঙ্গে সমন্বয় করা যেতে পারে। কারণ পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন শুধু রাস্তা, সেতু বা ভবন নির্মাণের প্রশ্ন নয়। উন্নয়ন মানে মানুষের কাছে সুযোগ পৌঁছে দেওয়া। একজন কৃষক যেন বাজারের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন, একজন শিক্ষার্থী যেন ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে মানসম্মত শিক্ষা পান, একজন রোগী যেন দূরবর্তী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ পান, একজন পর্যটক যেন নিরাপদ ও তথ্যসমৃদ্ধ ভ্রমণ করতে পারেন এবং একজন তরুণ যেন পাহাড়ে বসেই জাতীয় ও বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতির অংশ হতে পারেন—এটাই হওয়া উচিত নতুন উন্নয়ন দর্শন।
২০২২ সালের জনশুমারির একটি পরিসংখ্যান আমাদের বিশেষভাবে ভাবতে বাধ্য করে—পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর ৭০.৪৫ শতাংশের নিজস্ব মোবাইল ফোন থাকলেও ইন্টারনেট ব্যবহারকারী মাত্র ২১.১৭ শতাংশ। অর্থাৎ মানুষের হাতে ডিভাইস পৌঁছেছে, কিন্তু সুযোগ পুরোপুরি পৌঁছেনি। এই ব্যবধানই এখন নীতিনির্ধারকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের আগামী উন্নয়ন পরিকল্পনায় ডিজিটাল সংযোগকে রাস্তা-সেতুর মতোই মৌলিক অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। পাহাড়ের ভৌগোলিক দূরত্ব হয়তো এক দিনে কমানো যাবে না; কিন্তু প্রযুক্তি সেই দূরত্বের অর্থ বদলে দিতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, স্থানীয় অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে ডিজিটাল প্রযুক্তি পাহাড়কে শুধু দেশের সঙ্গে যুক্ত করবে না—পাহাড়ের পর্যটন, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি ও মানবসম্পদের নিজস্ব সম্ভাবনাকে জাতীয় অর্থনীতির নতুন প্রবৃদ্ধির শক্তিতে রূপান্তর করতে পারে।পার্বত্য চট্টগ্রামের আগামী উন্নয়নের প্রশ্ন তাই শুধু কত কিলোমিটার রাস্তা নির্মিত হলো—তা নয়; বরং কতজন মানুষ তথ্য, প্রযুক্তি, বাজার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সুযোগের সঙ্গে যুক্ত হলেন। সেই অন্তর্ভুক্তিমূলক সংযোগই হতে পারে একটি আধুনিক, সমৃদ্ধ ও সম্ভাবনাময় ‘ডিজিটাল পার্বত্য চট্টগ্রাম’-এর ভিত্তি।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।



























