"প্রযুক্তির যুগে গিগ ইকোনোমি”
৩০ নভেম্বর ২০২৪, ১২:০২ পিএম
আজ থেকে প্রায় তিন বছর আগে, একজন ডিজাইনার কিংবা লেখক কোনো নির্দিষ্ট অফিসে বসে কাজ না করে, নিজের সময় ও স্থান অনুযায়ী কাজ করবে এটা কল্পনা করা বেশ দুরূহ ছিলো। কিন্তু আজকের ডিজিটাল যুগে এই ধরনের কাজের সুযোগ অভূতপূর্বভাবে বেড়েছে। এটি শুধু কাজের পরিবেশকেই বদলে দেয়নি বরং একটি নতুন অর্থনৈতিক মডেলও সৃষ্টি করেছে, যাকে আমরা বলি গিগ ইকোনোমি।
গিগ ইকোনোমি এক নতুন ধরনের শ্রম বাজার বা অর্থনৈতিক কাঠামো, যেখানে কর্মীরা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য, অস্থায়ী প্রকল্পভিত্তিক কাজ করেন। আধুনিক প্রযুক্তির বিকাশ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে গিগ ইকোনোমি একে অপরকে সংযুক্ত করেছে যা কর্মী এবং ক্লায়েন্টকে সরাসরি একে অপরের কাছে নিয়ে এসেছে। এখানে কাজের সময়, কাজের প্রকৃতি এবং কাজের স্থান সব কিছুই কর্মী নিজেই নির্বাচন করেন। এটি কেবল কাজের ধরন পরিবর্তন করেনি, বরং সামাজিক এবং অর্থনৈতিকভাবে নতুনভাবে শ্রম বাজারকে পুনর্গঠন করেছে।
এত বড় পরিবর্তন পৃথিবীজুড়ে ব্যাপক সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে। এই গিগ ইকোনোমি ভবিষ্যতে কীভাবে আমাদের জীবনে প্রভাব ফেলবে? এবং বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এর প্রভাব কী হতে পারে? আসুন, এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি।
গিগ ইকোনোমির অগ্রগতি মূলত আধুনিক প্রযুক্তির কারণে। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সহজলভ্যতা এই ইকোনোমির বিস্তারকে আরো ত্বরান্বিত করেছে। প্ল্যাটফর্ম যেমন উবার (Uber), লিফট (Lyft), ফিভার (Fiverr), আপওয়ার্ক (Upwork) এই প্রযুক্তিগুলোর মাধ্যমে বিশ্বের যে কোনো কোণ থেকে একেবারে নির্দিষ্ট কাজের জন্য কর্মী এবং ক্লায়েন্টদের সরাসরি সংযুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া, অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম যেমন টাস্করাবিট, গিগওয়ার্ক, রাইডশেয়ারিং অ্যাপস, মাইক্রো-জব সাইটস এই ইকোনোমির অংশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
বিশ্বের বড় শহরগুলোতে গিগ ইকোনোমি এখন একটি শক্তিশালী কাজের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের মতো দেশে গিগ ইকোনোমি একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রম বাজারের অংশ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে, উন্নত দেশগুলোতে এই নতুন কাজের ধরন অত্যন্ত জনপ্রিয়তা পেয়েছে, কারণ এই ব্যবস্থা কর্মীদের জন্য সময় ও স্থান অনুযায়ী কাজ করার স্বাধীনতা দেয়। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রে গিগ ইকোনোমির মাধ্যমে এককভাবে আয় করা কর্মীদের সংখ্যা ২০২৩ সালে ৩৭ মিলিয়নের বেশি ছিলো এবং এটি শ্রম বাজারের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে, গিগ ইকোনোমির প্রবণতা একদিকে যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি বর্তমান পরিস্থিতি অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। শহুরে যুবসমাজ, বিশেষত যারা প্রযুক্তি, ডিজিটাল মার্কেটিং, কনটেন্ট রাইটিং, গ্রাফিক ডিজাইন, ফটোগ্রাফি ইত্যাদি ক্ষেত্রে দক্ষ, তারা ফ্রিল্যান্সিং এবং গিগ ইকোনোমির মাধ্যমে আয় করার সুযোগ পাচ্ছে। তবে, গত কয়েক বছর ধরে দেশের অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, মূল্যস্ফীতি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা এই খাতের উপর চাপ সৃষ্টি করেছে। এর পাশাপাশি, গিগ কর্মীদের জন্য সঠিক সুরক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা সিস্টেমের অভাব এখনও এক বড় সমস্যা।
বাংলাদেশের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো, যেমন ‘ল্যান্সার বাংলাদেশ’ এবং বিভিন্ন ফ্রিল্যান্সিং সাইট গিগ কর্মীদের জন্য নতুন রাস্তা খুলে দিয়েছে। বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে কাজের সুযোগ গ্রহণ সম্ভব হয়েছে, বিশেষ করে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ বেড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সাররা এখন আন্তর্জাতিক কনটেন্ট রাইটিং, গ্রাফিক ডিজাইন, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টসহ নানা কাজে নিয়োজিত হচ্ছেন। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সিং শিল্প ব্যাপকভাবে বেড়েছে এবং দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে।
তবে, গিগ ইকোনোমির অনেক সুবিধার পাশাপাশি কিছু গুরুতর চ্যালেঞ্জও রয়েছে, যা অনেক কর্মীর জন্য সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অস্থিতিশীল আয়। গিগ কর্মীদের আয় সব সময় সমান থাকে না। তারা নির্দিষ্ট প্রকল্প বা কাজের মাধ্যমে আয় করে থাকেন এবং একাধিক প্রকল্পের কাজ না পেলে তাদের আয় কমে যেতে পারে। বিশেষ করে, বর্ধিত অর্থনৈতিক অস্থিরতা বা অন্যান্য অসুবিধা তাদের আয় প্রভাবিত করতে পারে। বাংলাদেশে, মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের কারণে, অনেক গিগ কর্মী তাদের আয় নিশ্চিত করতে সংগ্রাম করছেন।
কর্মী সুরক্ষা গিগ ইকোনোমির আরেকটি বড় সমস্যা। যেখানে পূর্ণকালীন কর্মীরা স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন, বেতন ইত্যাদি সুবিধা পান, সেখানে গিগ কর্মীদের জন্য এসব সুবিধা নেই। ফলে, ভবিষ্যতে যদি তাদের কোনো শারীরিক সমস্যা বা অন্য কোনো সমস্যা হয়, তবে তাদের জন্য সহায়তা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া, অনেক গিগ কর্মী শ্রমের শোষণের শিকার হন। কিছু প্ল্যাটফর্মে, কর্মীদের কাছ থেকে কাজ নেওয়া হয়, কিন্তু তারা সঠিক মূল্য বা পেমেন্ট পান না। এই ধরনের সমস্যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এবং বাংলাদেশেও দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের গিগ কর্মীদের জন্য সঠিক মূল্য নির্ধারণ এবং কর্মী সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারের নীতিগত পদক্ষেপের প্রয়োজন।
বর্তমানে, অনেক উন্নত দেশে গিগ কর্মীদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা এবং সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কিছু দেশ গিগ কর্মীদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন সুবিধা এবং অবসর ভাতা চালু করেছে। তবে, বাংলাদেশে এসব সুবিধা এখনও অনেক দূরে। সরকারের এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়, যাতে তারা গিগ ইকোনোমি সম্পর্কে সঠিক নীতিমালা প্রণয়ন এবং কর্মীদের জন্য একটি সুরক্ষিত পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
গিগ ইকোনোমি আমাদের জন্য একটি নতুন, স্বাধীন, কিন্তু অনিশ্চিত পৃথিবী উন্মুক্ত করেছে। তবে, এর সম্ভাবনা যখন সুরক্ষা ও সঠিক আইন দিয়ে চূড়ান্ত হবে, তখন গিগ ইকোনোমি আধুনিক শ্রম বাজারের অন্যতম অঙ্গ হয়ে উঠবে, যা আমাদের ভবিষ্যতের কর্মজীবনকে নতুনভাবে রূপান্তরিত করবে।
লেখনীতে
সানজিদা নওরীন ঝিনুক
শিক্ষার্থী, দ্বিতীয় বর্ষ
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।




































