সাদা সেমাইতে ঝালকাঠির নারী উদ্যোক্তা সেলিনা বেগমের রঙিন স্বপ্ন
০৬ এপ্রিল ২০২৪, ০৭:০০ পিএম
ছবি- প্রতিদিনেরচিত্র বিডি।
ঝালকাঠির সফল নারী উদ্যোক্তা সেলিনা বেগম নিজ হাতে কারখানায় কাজ করে সময় কাটাচ্ছেন। সাদা সেমাইতে রঙিন স্বপ্নের জীবন দেখছেন, তেমনি তার সাথে অন্যান্য নারী ও পুরুষ শ্রমিকরাও একই স্বপ্নে আপন খেয়ালে কাজ করছেন। দেশে সারাবছর সেমাইয়ের যে বেচাকেনা হয়, তারচেয়ে প্রায় দশ গুণ বেশি বেচাকেন হয় ঈদ-উল ফিতরে। তাই রমজান মাসকে সেমাইয়ের মৌসুম বলা হয়ে থাকে। ঈদেরদিন বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি ঘরে ঘরে সেমাই খাওয়ার পুরোনো রেওয়াজ আজও বদলায়নি। ডালডা অথবা ঘিয়ের সঙ্গে মিশিয়ে আটা মাখিয়ে তৈরি মিষ্টিজাতীয় খাদ্য লাচ্ছা সেমাই ছাড়া ঈদ যেন কল্পনাই করা যায় না। ঝালকাঠির তার তৈরি লাচ্ছা সেমাইয়ের সুখ্যাতি ছড়িয়েছে সারাদেশে। মানুষের চাহিদার সঙ্গে দক্ষ কারিগরের সহজলভ্যতা এই সুনামকে আরও বিস্তৃত করেছে।তাই আসন্ন ঈদ-উল ফিতর উপলক্ষে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবারও ব্যস্ততা বেড়েছে ঝালকাঠির নারী উদ্যোক্তা সেলিনা বেগমের সেমাই তৈরির কারখানায়। সেমাই কারখানার কারিগর ও শ্রমিকদের এখন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত দম ফেলার ফুসরত নেই।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ঝালকাঠির পৌর এলাকার কাঠপট্টি কলাবাগানের সফল নারী উদ্যোক্তা সেলিনা বেগমের "মিনার ও রেশমি লাচ্ছা সেমাই" তৈরির কারখানায় রমজান মাসের শুরু থেকেই ঈদ-উল ফিতর উপলক্ষে সেলিনার কারখানায় ব্যস্ততা বেড়ে গেছে। তার কারখানার সেমাই জেলার চাহিদা মিটিয়ে যাচ্ছে পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। এটা বরিশাল বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও নামকরা কারখানা৷ ম্যানুয়াল ও অটোমেটিক উভয়পদ্ধতিতে তৈরি হচ্ছে লাচ্ছা সেমাই।
সেলিনা বেগমের স্বামী হুমায়ুন কবির প্রায় ২০বছর আগে "মিনার লাচ্ছা সেমাই" তৈরির কারখানাটি প্রতিষ্ঠা করেন তিনি দীর্ঘদিন থেকে ব্যাপক সুনামের সাথে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন। বিগত ৬ বছর আগে হুমায়ুন কবির মারা যান। তার মৃত্যুর পর ঠিকমতো শ্রমিকদের বেতন দিতে না পারায় দীর্ঘদিন কারখানাটি বন্ধ থাকে। এরপর তার একমাত্র মেয়ের জামাই তিনিও মারাযান তার কিছু দিন পরে তার মা ও শ্বাশুড়ি মারাযান একে একে ৪ জন আপন মানুষকে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে ভেঙে পরেন সেলিনা বেগম। এতে করে দুই ছেলে ও এক মেয়ের সংসার নিয়ে সেলিনার সংসারে নেমে আসে চরম অভাব অনটন। এরপর তিনি বেঁচে থাকার তাগিদে স্বামীর মৃত্যুর কয়েক মাস পর বন্ধ হয়ে যাওয়া সেমাই তৈরির কারখানাটি সেলিনা বেগম নিজে উদ্যোক্তা হয়ে নতুন করে চালু করেন। এরপর আরেকটি মেশিন ক্রয় করে "রেশমি লাচ্ছা সেমাই" নামে তৈরি করেন। স্বপ্ন দেখেন একজন সফল উদ্যোক্তা হওয়ার। ইতোমধ্যে তার সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে। প্রথমে একটি মেশিন দিয়ে তার কারখানায় সেমাই তৈরি করার কার্যক্রম শুরু করেন সেলিনা। একবছরের মধ্যে কঠোর পরিশ্রমের আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে এখন দুইটা মেশিনে সেমাই তৈরি করা হয়। কোনোরকম রং ও কেমিক্যাল ছাড়াই স্বাস্থ্যকর পরিবেশে কারখানার শ্রমিকরা সেমাই তৈরি করছেন। প্রথমে ময়দা দিয়ে সেমাই তৈরি করে পরবর্তীতে কারখানার মধ্যে বড় লোহার তৈরি করাইতে তেল দিয়ে এসব সেমাই ভাজা হয়। এরপর বিক্রির জন্য প্যাকেটজাত করে বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে। সারা বছর সেমাই তৈরির চাপ না থাকলেও প্রতিবছর রমজান মাসে অনেকটা চাপ থাকে তার কারখানায়। ইতোমধ্যে নিজের পাশাপাশি বিধবা সেলিনা বেগম অন্যদেরও বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। তার সেমাই তৈরির কারখানায় এখন নিয়মিত ১১ জন নারী ও পুরুষ শ্রমিক কাজ করেন। সেলিনার সংসারে তার একমাত্র বড় মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস কবিতার স্বামী মৃত্যুর পর থেকে তার একটা বাচ্ছা নিয়ে তার কাছে থাকে। তার বড় ছেলে মেহেদী হাসান রাব্বি ও তার স্ত্রী এবং ছোট ছেলে কলেজ পড়ুয়া গোলাম কিবরিয়া বাপ্পি এদের নিয়ে এই সেমাই বিক্রির টাকায় ৭ সদস্যের সংসার চলে।

সেলিনার কারখানায় ভোলা জেলা থেকে কাজ করতে আশা শ্রমিক বাহাদুর, জিহাদ বলেন, সারাবছরের তুলনায় সামনে ঈদের বাজার উপলক্ষে আমাদের কাজের চাপ একটু বেশি। সেলিনা আপার সেমাই ভালো মানের পরিবেশে তৈরি করা হয়। তার সেমাইয়ের মানও অনেক ভালো তাই বাজারে চাহিদা অনেক বেশি।
সেমাই তৈরির কারিগর মো. মফিজ বলেন, ঈদের মৌসুমে সেলিনা আপার সেমাইয়ের কারখানায় কাজ করতে আসছি। এখানে বর্তমানে আমরা ১১জন শ্রমিক সেমাই তৈরি নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছি। রমজানের শেষদিকে এখন আগের তুলনায় একটু চাপ কম। মার্কেটে তেমন চলে নাহ। সামনে ঈদ উপলক্ষে অন্যান্য বছরে সেমাইয়ের যে চাপটা ছিলো তা এবছর নেই।

সফল নারী উদ্যোক্তা সেলিনা আক্তার বলেন, স্বামীর মৃত্যু পর এই কাজ করতে এসে নানান সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। একজন মহিলা হিসেবে রাস্তায় বের হলে নানা মানুষে বিভিন্ন রকমের মন্তব্য করে। তাদের সেই মন্তব্য শুনে অনেক সময় বালিশে মুখ বুঝিয়ে কান্না করি। কিন্তু কিছু করার নেই আমার উপার্জন করার কোন ব্যক্তি নেই। স্বামী মারা যাবার পরে আয়ের একমাত্র রাস্তা এই সেমাই তৈরি। স্বামী যখন ছিলো তখন বার মাস সেমাই তৈরি করতাম৷ বর্তমানে বছরে শুধু একমাস এই রমজান মাসে কাজ চলে। গতবছর সেমাই তৈরি করছি ঠিকই কিন্তু দ্রব্য মূল্যের উর্ধগতির কারণে বিক্রি করতে পারি নাই। প্রায় ২০ লাখ টাকা লস গেছে। আগের তুলনায় বর্তমানে সবকিছুর দাম বেশি থাকায় আমাদের আর তেমন বেশি আয় হচ্ছে না। তারপরও বাজারে টিকে থাকার কারণে সংরাম করে দিনের পর দিন চালিয়ে যাচ্ছি। স্বামী কারখানা তৈরি করে দিয়ে গেছে এখন এটা ছাড়তেও পারি না। আর ছেড়ে দিলেও খাবো কি? সন্তানরা উপার্জন করতে পারে না। আয়ের আর কোন পথ নেই এটার আয়ে সংসার চলে। আমার কষ্টের কথা কাউকে বলতেও পারি নাহ আর কষ্টের কথা শোনার মতো কেউ নাই। আমি যদি মারা যাই তাহলে ছেলে-মেয়ের আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নাই। বহু জায়গা থেকে বহু প্রচার করে তবে আমার কষ্টের কথা কোন জায়গা থেকে প্রচার করে না। সেমাই তৈরি করি কিন্তু কত টাকা আয় হয় কত টাকা লস হয় কেউ দেখার নেই। গতবছর লস খাওয়া আমার নিজের যে মূলধন সেখান থেকে টাকা নাই। তাই এবছর সব বাকিতে এনে কাজ শুরু করছি। সেই টাকা পরিশোধ করতে পারবো কিনা এখন পর্যন্ত অজানা। এবার ২০ রোজার আগেই বাজারে চাহিদা পরে গেছে। ঝালকাঠি শহরে আরো ৪টা কারখানা আছে। তাদের যে অফিসিয়াল কাগজ পত্র তার চেয়ে আমার উপরে চাপ একটু বেশি আসে। কি কারণে আসে জানি না। আমি মহিলা এর জন্য আসে না কি জন্য আসে জানি না। আমার সাইন্স লেভেল পর্যন্ত কাগজ করতে হইছে। কিন্তু আর যে কারখানা আছে তাদের সাইন্স লেভেল কাগজ তৈরি করতে মনে হয় লাগে নায়৷ কিন্তু আমার করা লাগছে। তারপরও আমি কারো কাছে মাথা নত করি নাই। স্বামী মারা যাওয়ার পর এইযে আমার পরিবার থেকে একের পর এক ৪টা লোক হারিয়ে গেছে কিন্তু আমি কারো কাছ থেকে কোন সহযোগিতা পায়নি। নিজে সংগ্রাম করে চলতেছি। আমার বাসা শহর থেকে দূরে যদি সরকারের কাছ থেকে কোন সহযোগিতা পাইতাম। এমনকি একটা চাকার ইঞ্জিন চালিত একটা গাড়ি পেতাম তাহলে মাল যাতায়াত করতে সুবিধা হতো কারণ মার্কেট আমার বাসা থেকে অনেক দূরে। কিন্তু আমি সরকারের কাছে এবং কোন লোকের কাছে সাহায্য পায়নি যদি পেতাম তাহলে কাজ করতে সুবিধা হতো কারখানার পরিধি আরো বাড়িয়ে করতে পারতাম। কারো কাছে কোন সহযোগিতা না পাওয়ার কারণে থেমে যাওয়ার পরিস্থিতি হয়েগেছে। আমি একজন নারী উদ্যোক্তা হিসাবে সরকারের কাছে সহযোগিতা আশা করি যাতে আমি ছেলে-মেয়ে নিয়ে সব কিছু সার্বিক সামনে আগাতে পারি। এজন্য সবার কাছে সহযোগিতা কামনা করছি।


























