জার্মানিতে হিটলারের বিস্তৃতি : নায়ক না খলনায়ক?
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৬:৫৯ পিএম
ছবি- সংগৃহীত।
পৃথিবীর নিকৃষ্ট এবং একইসাথে তুমুল জনপ্রিয় যেসকল ব্যাক্তিত্বের নাম ইতিহাসের পাতায় অম্লান তাদের মধ্যে অ্যাডলফ হিটলার অন্যতম। হিটলারের জন্ম ১৮৮৯ সালের ২০ এপ্রিল অস্ট্রিয়া ব্যাভেরিয়ার মাঝামাঝি ব্রনাউ নামক স্থানে। বাবা একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে সামান্য চাকরি করত। হিটলার ছিলেন তার বাবার তৃতীয় স্ত্রীর তৃতীয় সন্তান, স্বাভাবিকভাবেই পরিবারে আর্থিক অনটনের মধ্যেই বেড়ে উঠেছিলেন তিনি। ছয় বছর বয়সে স্থানীয় অবৈতনিক স্কুলে ভর্তি হলেন। ছেলেবেলা থেকেই হিটলার ছিলেন একগুঁয়ে, জেদি আর রগচটা। পড়াশোনাতে যে তার মেধা ছিল না এমন নয় কিন্তু পড়াশোনার চেয়ে তাকে বেশি আকৃষ্ট করত ছবি আঁকা। যখনই সময় পেতেন কাগজ পেন্সিল নিয়ে ছবি আঁকতেন । বাবার ইচ্ছা ছিলো স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে হিটলার কোনো কাজের সাথে সম্পৃক্ত হবেন কিন্তু হিটলার বাবার বিরুদ্ধে গিয়ে স্কুলের পড়াশোনা ছেড়ে দেন। মা মারা যাওয়ার পর পরিবারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে ভিয়েনাতে চলে আসেন এবং দিনমজুর হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
ছেলেবেলা থেকেই হিটলার ছিলেন ইহুদী বিদ্বেষী। ১৯১২ সালে ভিয়েনা ছেড়ে তিনি চলে আসেন মিউনিখে। ১৯১৪ সাথে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যুদ্ধে যোগদান করেন হিটলার এবং যথেষ্ট সাহসিকতার পরিচয় দেন তিনি। যুদ্ধ শেষে জার্মানিতে হাহাকার এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় তাদের উপর নজরদারি করতে নিয়োগ দেওয়া হয় হিটলারকে। তখনকার প্রধান পার্টি ছিলো লেবার পার্টি। লেবার পার্টিতে যুক্ত হয়ে কিছুদিনের মধ্যে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করে ফেলেন তিনি। ঠিক এক বছর পরেই পার্টির প্রধান হন হিটলার এবং পার্টির নাম রাখা হয় ন্যাশনাল ওয়ার্কার্স পার্টি বা নাৎসি পার্টি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে জার্মানিতে ভাইমার প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু এই প্রজাতান্ত্রিক সরকার ভার্সাই চুক্তির শর্তগুলি মেনে নেওয়ায় জার্মানরা ভাইমার প্রজাতন্ত্রের প্রতি আস্থা হারায়।এই সুযোগে হিটলার তাঁর নাৎসি দলের উত্থানের পথ প্রশস্ত করে নেয়। সময়ের পরিক্রমায় অত্যন্ত জয়প্রিয় হয়ে উঠলেন হিটলার এবং তার দল। ১৯৩৩ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিপুল ভোট পেলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করতে পারেনি হিটলারের নাৎসি পার্টি। তবে হিটলারের চতুদর্শীতা এবং ঘৃণ্য রাজনৈতিক নীতির জন্য খুব অল্প সময়ে হয়ে উঠলেন জার্মানির একমাত্র ভাগ্যবিধাতা।
জার্মানির ক্ষমতা দখলের পূর্বে হিটলার প্রচার করেছিলেন যে জার্মানরাই একমাত্র বিশুদ্ধ আর্য জাতির উত্তরাধিকারী, এই তত্ত্ব হেরেনভক তত্ত্ব নামে পরিচিত। দেশের প্রান্তে প্রান্তে ইহুদি বিদ্বেষ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। শুরু হলো তাদের ওপর লুটতরাজ, হত্যা। হিটলার চেয়েছিলেন এভাবে ইহুদিদের দেশ থেকে বিতাড়িত করবেন কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই ইহুদিরা নিজেদের আশ্রয়স্থল ত্যাগ করতে চায়নি। ১৯৩৫ সালে নতুন আইন চালু করলেন হিটলার। তাতে দেশের নাগরিকদের দুটি ভাগে ভাগ করা হলো, জেন্টিল আর জু। জেন্টিল অর্থাৎ জার্মান, তারাই খাঁটি আর্য, জু হলো ইহুদিরা। দেশজুড়ে জার্মানদের মধ্যে গড়েতোলা হলো তীব্র ইহুদি বিদ্বেষী মনোভাব।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর ইউরোপের মিত্রপক্ষ ও জার্মানদের মধ্যে যে ভার্সাই চুক্তি হয়েছিল তাতে প্রকৃতপক্ষে জার্মানির সমস্ত ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়েছিল। ১৯৩৩ সালে হিটলার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই জার্মানির অতীত গৌরব পুনরুদ্ধার করার সংকল্প গ্রহণ করেন এবং তিনি একে একে ভার্সাই চুক্তির শর্তগুলো মানতে অস্বীকৃতি জানান। নিজের শক্তি ক্ষমতা বিস্তারে মনোযোগী হয়ে ওঠেন। ১৯৩৪ সালে হিটলার রাষ্ট্রপতির পরিবর্তে নিজেকে জার্মানির “ফুয়েরা/ফ্যুরা” হিসেবে ঘোষণা করেন। কিছুদিনের মধ্যেই সন্ধির চুক্তি ভঙ্গ করে রাইনল্যান্ড অধিকার করলেন। অস্ট্রিয়া ও ইতালি ঐক্যসূত্রে আবদ্ধ হলো জার্মানির সাথে। প্রথমে আলবেনিয়া ও পরে ইথিওপিয়ার বেশ কিছু অংশ দখল করে নেয়। অবশেষে হিটলার পোল্যান্ডের কাছে ডানজিগ ও পোলিশ করিডর দাবি করলেন যাতে এই অঞ্চলে সৈন্য সমাবেশ ঘটাতে পারেন। পোল্যান্ডের সরকার তার এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করলেন। পোল্যান্ডের ধারণা ছিল হিটলার তার দেশ আক্রমণ করলে ইউরোপের অন্য সব শক্তি তার সাহায্যে এগিয়ে আসবে,তাদের সম্মিলিত শক্তির সামনে জার্মান বাহিনী পরাজিত হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি বড় কারণ জার্মানির সামরিক শক্তি সম্বন্ধে ইউরোপের অন্য সব দেশের সঠিক ধারণার অভাব। তাছাড়া ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর ধারণা ছিল হিটলারের ক্ষমতা শুধুমাত্র প্রচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সেই সময় ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্রের কাছে জার্মানির চেয়ে বড় শত্রু ছিল কমিউনিস্ট রাশিয়া। তাদের উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়ার প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে জার্মানরা নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে। তাই যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমস্ত শর্ত ভঙ্গ করে জার্মানরা নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করে চলেছিল তখন ইংল্যান্ড, ফ্রান্স কেউ তাদের বাধা দেয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। উপরন্তু হিটলারকে নানা সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হয়েছিল। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের এই সুবিধাবাদী নীতির সুযোগ পুরোপুরি গ্রহণ করেছিলেন হিটলার।
বিশ্বজয়ের স্বপ্নে মত্ত হয়ে ১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ সালে জার্মানবাহিনী পোল্যান্ড আক্রমণ করল এবং এই দিনটি থেকেই শুরু হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। মাত্র পনেরো দিনে জার্মান বাহিনী পোল্যান্ডের সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে পোল্যান্ড অধিকার করল। পোল্যান্ডের পর হিটলার দখল করলেন নরওয়ে ও ডেনমার্ক। নরওয়েতে বিরাট সংখ্যক ব্রিটিশ সৈন্য অবস্থান করছিল,তাদের অধিকাংশই নিহত হলো। এই ঘটনায় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলিন পদত্যাগ করলেন। নতুন প্রধানমন্ত্রী হলেন চার্চিল।
এবার হিটলার দখল করতে চাইলেন ফ্রান্স তা ইউরোপের সর্বপ্রধান শক্তি। ফ্রান্স নিজেদের সুরক্ষার জন্য জার্মান সীমান্তে দুর্ভেদ্য ম্যাজিনো সৃষ্টি করেছিলো। বেলজিয়াম আক্রমণ করে সেই দেশের মধ্য দিয়ে ফ্রান্সের সীমান্ত প্রদেশে গিয়ে উপস্থিত হলো। ফরাসিদের এই বিপর্যয়ের সুবিধা নেয়ার জন্য ইতালি নিজেকে জার্মানদের মিত্রপক্ষ হিসেবে ঘোষণা করে যুদ্ধে যোগ দিল। সমস্ত ইউরোপ-আফ্রিকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ আগুন। ইতালির রাষ্ট্রপ্রধান মুসোলিনি উত্তর আফ্রিকা অধিকার করার জন্য বিরাট সৈন্যদল পাঠালেন। অন্যদিকে হিটলার ফ্রান্স অধিকার করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করলেন। হিটলার অনুগত ফ্যাসিস্ট শক্তি নতুন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মার্শাল পেত্যাকে নিযুক্ত করল। মার্শাল বিনাযুদ্ধেই হিটলারের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। ফ্রান্স জয়ের পর জার্মানি যুগোস্লাভিয়া আর গ্রিস দেশ অধিকার করল। ইতিমধ্যে রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরী জার্মানির পক্ষে যোগ দেয়। ফলে সমগ্র দক্ষিণ ইউরোপ জার্মানির নিয়ন্ত্রণে এসে যায়।
বিশ্বের ইতিহাসে যখন জার্মান বাহিনী একের পর এক দেশ অধিকার করে চলেছে তখন দেশের অভ্যন্তরে হিটলার শুরু করেছেন ইহুদি নিধন যজ্ঞ। পৃথিবীর ইতিহাসে এই নৃশংসতার কোন তুলনা নেই। হিটলার চেয়েছিলেন জার্মানিকে ইহুদি শূন্য করে তুলতে। প্রথমদিকে হাজার হাজার ইহুদিকে বন্দি করে জনবসতিহীন সীমান্ত অঞ্চলে পাঠানো হত যেখানে কোনো খাবার বা পানীয় জলের বন্দোবস্ত থাকত না। এর সাথে যোগ হত হিটলারের বাহিনীর নির্মম অত্যাচার। অল্পদিনের মধ্যেই বহু ইহুদি মারা যেত। যাঁরা বেঁচে থাকত তাদের গুলি করে হত্যা করা হত। শিশু, বৃদ্ধ, নারী কেউই রেহাই পেত না। হাজার হাজার ইহুদিকে হত্যা করতে যে বিরাট পরিমাণ গুলি খরচ হত তাতে জার্মান কর্তৃপক্ষ চিন্তিত হয়ে পড়ে। তাই নতুন উপায় বের করা হল। হিটলারের আদেশে তৈরি হয় কনসেনট্রেশন ক্যাম্প যেখানে ছিলো কুখ্যাত 'গ্যাস চেম্বার'। চারদিকে বন্ধ একটা ঘরে কয়েকশো ইহুদিকে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস ছাড়া হত। এর ফলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেই বিষাক্ত গ্যাসে মারা যেতেন সকলে। সীমান্ত অঞ্চলে বিরাট বিরাট গর্ত করে তাঁদের মৃতদেহগুলো ছুঁড়ে ফেলা হত। কথিত আছে ১৯৪১ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত সময়ে হিটলার অন্তত ১ কোটি ১০ লাখ মানুষকে হত্যা করেছেন। যাদের মধ্যে হিটলারের নাৎসি জার্মান বাহিনী ও দালালদের হাতে নিহত হয় ৬০ লাখ ইহুদি বাকি ৫০ লাখ অ-ইহুদিকে হত্যা করা হয় গণহত্যার সময়ে। এ হত্যাকাণ্ড চলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার আগে পর্যন্ত।
১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর জাপান আমেরিকার পার্ল হারবার বন্দরে ব্যাপক বোমা বর্ষণ করে বিধ্বস্ত করে ফেলে সমগ্র বন্দরটি। এই ঘটনায় আমেরিকা প্রত্যক্ষভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। মিত্র শক্তির সম্মিলিত বাহিনীর কাছে ক্রমেই হিটলার বাহিনীর পরাজয় ঘটতে থাকে। জার্মান বাহিনীর সবচেয়ে বড় পরাজয় হল রাশিয়ার স্টালিনগ্রাদে। দীর্ঘ ছ' মাস যুদ্ধের পরে রাশিয়ান ফৌজ এর কাছে জার্মান বাহিনী
আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হল। হিটলারের অনেক সেনাপতি হিটলারকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে কিন্তু তাদের সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়। সকলের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে বেশিরভাগ সময়ই বাঙ্কারে থাকতেন তিনি। এই সময় তাঁর একমাত্র সঙ্গী ছিলেন তাঁর দীর্ঘদিনের প্রেমিকা ইভা ব্রাউন। ১৯৪৫ সালের ৩০ এপ্রিল বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ বাঙ্কারের মধ্যে হিটলার নিজের মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেন। তার আগেই তাঁর নববিবাহিতা স্ত্রী ইভা বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পূর্ব নির্দেশ মত তাঁর দেহ আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৬ বছর। হিটলার জার্মানির জনগণের পুনরুত্থানের জন্য নায়ক হিসেবে বিবেচিত হলেও বিশ্ববাসীর কাছে নিকৃষ্ট খলনায়ক যিনি নির্বিচারে হত্যা করেছেন অসংখ্য মানুষ।
সানজিদা নওরীন ঝিনুক, শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।






























