সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী ডিবি হেফাজতে

নয়ন তারা

০৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:০৪ এএম


সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী ডিবি হেফাজতে

 

টানা চার মেয়াদের জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ও আওয়ামী লীগ নেত্রী ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে আটক করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মঙ্গলবার (২৯ অক্টোবর) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। আটকের পর তাকে মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার নাসিরুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে শিরীন শারমিন চৌধুরীর আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, সাবেক স্পিকার বর্তমানে ডিবি হেফাজতে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক মামলা রয়েছে। বর্তমানে সেসব মামলার তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হবে।

গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই আত্মগোপনে ছিলেন শিরীন শারমিন চৌধুরী। তার বিরুদ্ধে রংপুরে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট রংপুর মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি আমলি আদালতে এই মামলাটি করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহত স্বর্ণশ্রমিক মুসলিম উদ্দিনের স্ত্রী দিলরুবা আক্তার।

মামলায় শিরীন শারমিন চৌধুরী ছাড়াও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশিসহ ১৭ জনকে নামীয় এবং অজ্ঞাতনামা আরও অনেককে আসামি করা হয়েছে। বাদীর অভিযোগ, আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে তার স্বামী মুসলিম উদ্দিন নিহত হন এবং এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে সাবেক স্পিকারসহ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের ইন্ধন ছিল। উল্লেখ্য, শিরীন শারমিন চৌধুরী রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

গত ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে দেশত্যাগ করার পর রাজনৈতিক পটভূমি আমূল বদলে যায়। পরদিন ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেন। এরপর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শপথ গ্রহণ করে।
সরকার পতনের পর আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপিরা আত্মগোপনে চলে গেলেও শিরীন শারমিন চৌধুরী প্রায় এক মাস স্পিকারের পদে বহাল ছিলেন। শেষ পর্যন্ত গত ২ সেপ্টেম্বর তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে তার পদত্যাগপত্র জমা দেন। এর মাধ্যমে তার দীর্ঘ ১১ বছরের স্পিকার জীবনের অবসান ঘটে।

ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী স্পিকার হিসেবে ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন স্পিকার অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে স্পিকারের পদটি শূন্য হয়। এরপরই শিরীন শারমিনকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য বেছে নেওয়া হয়।

২০১৩ সাল থেকে শুরু করে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তিনি টানা চারবার স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেছেন। নবম সংসদের শেষ সময় থেকে শুরু করে দশম, একাদশ এবং সর্বশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদেও তিনি এই পদে আসীন ছিলেন। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি বিতর্কিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর ৩০ জানুয়ারি তিনি আবারও স্পিকার নির্বাচিত হন।

ডিবি সূত্র জানিয়েছে, শিরীন শারমিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে কেবল রংপুর নয়, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের আরও কয়েকটি জেলায় মামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে ছাত্র-জনতার ওপর দমন-পীড়ন ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তাকে হুকুমের আসামি হিসেবে অনেকগুলো মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে।
গোয়েন্দা পুলিশ বর্তমানে তার বিরুদ্ধে থাকা সকল মামলার নথি সংগ্রহ করছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে রংপুরের সেই হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে তোলা হতে পারে অথবা নতুন কোনো মামলায় রিমান্ডের আবেদন করা হতে পারে।

ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর এই আটক আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় আনার একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তার আটকের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

Ads