মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি একমাত্র সমাধান: অর্থমন্ত্রী
২৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৩৬ এএম
দেশের লাগামহীন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখার ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, অতীতে টাকা ছাপিয়ে বা অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহ করে সাময়িক স্বস্তি আনার যে প্রবণতা ছিল, বর্তমান সরকার সেই পথে হাঁটবে না। বরং অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদী টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যেই এখন থেকে সব নীতি প্রণয়ন করা হবে।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) অর্থ মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক প্রাক-বাজেট আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিউজ কাভার করা সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
অর্থমন্ত্রী তার বক্তব্যে অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে বাজারে মুদ্রা সরবরাহ সীমিত রাখা অত্যন্ত জরুরি। আমরা যদি কৃত্রিমভাবে বাজারে তারল্য বাড়িয়ে দিই, তবে তা সাময়িকভাবে ভালো মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।”
তিনি অভিযোগ করেন যে, অতীতে প্রয়োজন ছাড়াই টাকা ছাপিয়ে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। এর ফলে অর্থনীতিতে প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়েছে। অতিরিক্ত এই মুদ্রা সরবরাহের কারণেই সুদের হার বেড়েছে এবং বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমান সরকার এই ‘হাই পাওয়ার মানি’ বা উচ্চ ক্ষমতার মুদ্রা সরবরাহের মাধ্যমে কৃত্রিম স্বস্তি আনার নীতি থেকে পুরোপুরি সরে এসেছে।
দেশের অর্থনীতি কেন সংকটে পড়েছিল, তার একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণও দেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, “বিগত বছরগুলোতে পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতির কারণে দেশের অর্থনীতি গুটিকয়েক মানুষের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশের অর্থনীতি কার্যত অলিগার্কদের (প্রভাবশালী গোষ্ঠী) নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছিল। এর ফলে অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি নষ্ট হয়েছে এবং নীতিনির্ধারণে রাজনৈতিক প্রভাব প্রাধান্য পেয়েছে।”
এই অবস্থা থেকে উত্তরণে সরকার ‘ডেমোক্রেটাইজেশন অব ইকোনমি’ বা অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণের ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে বলে তিনি জানান। আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “অর্থনীতি এখন আর নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থে পরিচালিত হবে না। আমরা এমন একটি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে চাই যেখানে অর্থনীতির সুফল সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছাবে।”
আলোচনা সভায় অর্থমন্ত্রী সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বিষয়েও কথা বলেন। তিনি উল্লেখ করেন, প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের কাছে সরাসরি আর্থিক সুবিধা পৌঁছে দিতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন তিনি। অর্থমন্ত্রী বলেন, “ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে আমরা সরাসরি নারীদের হাতে সুবিধা পৌঁছে দিচ্ছি। এটি কেবল একটি সহায়তা নয়, বরং নারীদের অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতায়নের একটি মাধ্যম। যখন একজন নারীর হাতে সরাসরি টাকা বা সুবিধা পৌঁছায়, তখন তা পুরো পরিবারের কল্যাণে কাজে লাগে।”
আসন্ন বাজেট প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী ইঙ্গিত দেন যে, নতুন বাজেটে বিলাসিতা বর্জন এবং কৃচ্ছ্রসাধনের প্রতিফলন থাকবে। ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে, যাতে বেসরকারি খাত ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যায় না পড়ে। তিনি সাংবাদিকদের আশ্বস্ত করে বলেন, মুদ্রানীতি কঠোর করার ফলে সাময়িকভাবে কিছু ক্ষেত্রে ধীরগতি মনে হতে পারে, কিন্তু একটি সুস্থ ও সবল অর্থনীতির জন্য এটিই এখন একমাত্র পথ।
সভায় উপস্থিত সাংবাদিকরা ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অর্থমন্ত্রীকে নানা প্রশ্ন করেন। জবাবে তিনি বলেন, সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং সরকার প্রতিটি খাতকে স্বচ্ছ জবাবদিহিতার আওতায় আনতে কাজ করছে।
পরিশেষে অর্থমন্ত্রী বলেন, “আমরা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। তাই সাময়িক জনপ্রিয়তার চেয়ে টেকসই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।”






















