ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ও সুশাসন ফেরাতে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক

অয়ন আহমেদ

১৩ মে ২০২৬, ০৯:৪৯ এএম


ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ও সুশাসন ফেরাতে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক

 

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং খেলাপি ঋণের লাগাম টানতে ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বিগত কয়েক বছরে আমানতকারীদের আস্থা সংকট ও খেলাপি ঋণের আশঙ্কাজনক বৃদ্ধির পর বর্তমান আর্থিক প্রশাসন একগুচ্ছ নীতিগত পরিবর্তন এবং কঠোর তদারকি ব্যবস্থা চালু করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই জোরালো ভূমিকার মূল উদ্দেশ্য দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা, বেনামি ঋণ প্রতিরোধ করা এবং সাধারণ আমানতকারীদের সঞ্চয়ের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

দেশের আর্থিক খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিপুল পরিমাণের খেলাপি ঋণ। সাম্প্রতিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ব্যাংকিং খাতে বড় অঙ্কের ঋণগুলোর ক্ষেত্রে খেলাপির হার সবচেয়ে বেশি, যা প্রায় ৫০ শতাংশের কাছাকাছি ছুঁয়েছে। অথচ দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি (SME) খাতের উদ্যোক্তারা সময়মতো ঋণ পরিশোধে তুলনামূলক অনেক বেশি আন্তরিক। বড় ঋণের ক্ষেত্রে কিছু প্রভাবশালী গ্রাহক ঋণের অর্থ ভিন্ন খাতে বৈচিত্র্যকরণ (Diversification) করছেন অথবা বেনামে একাধিক ব্যাংক থেকে সুবিধা নিচ্ছেন বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন প্রতিটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়া কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ঋণের বিপরীতে সঠিক বন্ধকী সম্পদ (Collateral) রাখা হয়েছে কি না এবং ঋণের প্রকৃত সুবিধাভোগী (Ultimate Beneficial Owner) কে—তা কঠোরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কোনো ভুয়া বা কাগুজে প্রতিষ্ঠান যেন ব্যাংকের জনগণের আমানতের টাকা আত্মসাৎ করতে না পারে, সেজন্য ঋণ স্ক্রিনিং প্রক্রিয়াকে আধুনিকায়ন করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU) এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শক দল যৌথভাবে ব্যাংকগুলোর ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে। বড় ঋণের অর্থ যেন কোনোভাবেই অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যবহৃত না হয় কিংবা বিদেশে পাচার না হতে পারে, সেটি নিশ্চিত করাই এই তদারকির প্রধান লক্ষ্য। এছাড়া, অর্থ পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি বড় গ্রুপ এবং খেলাপি গ্রাহকদের বিরুদ্ধে আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া গতিশীল করা হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা আর্থিক খাতের বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক সংস্কারমুখী পদক্ষেপগুলোকে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও গঠনমূলক বলে আখ্যা দিয়েছেন। দুর্বল ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন এবং কিছু অকার্যকর আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পর, বড় ঋণ বিতরণে এই কড়াকড়ি সাধারণ আমানতকারীদের মাঝে নতুন করে আস্থা তৈরি করছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই তদন্ত ও তদারকি যেন কোনো বিশেষ মহলের প্রভাবে বাধাগ্রস্ত না হয়। ব্যাংকিং খাতের এই শুদ্ধি অভিযানকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এবং স্বচ্ছ রাখা অত্যন্ত জরুরি।

ব্যাংক খাতে কড়াকড়ি আরোপের পাশাপাশি প্রকৃত ব্যবসায়ীদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরিতেও মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে। দেশের উৎপাদনশীল খাতের প্রবৃদ্ধি গতিশীল রাখতে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুবিধা চালু রয়েছে। লক্ষ্য রাখা হচ্ছে, যেন কঠোর তদারকির কারণে কোনো প্রকৃত ও সৎ ব্যবসায়ী ঋণ পাওয়া থেকে বঞ্চিত না হন। ভুয়া ও প্রভাবশালী গোষ্ঠী যাতে ব্যাংকের অর্থ কুক্ষিগত করতে না পারে এবং প্রকৃত উদ্যোক্তারা যেন সহজে ঋণ পান, সেটিই এই নতুন ব্যবস্থার মূল দর্শন।বাংলাদেশ ব্যাংকের চলমান এই সংস্কার ও কঠোর তদারকি যদি সফলভাবে বজায় রাখা যায়, তবে দেশের ব্যাংকগুলো খুব দ্রুতই খেলাপি ঋণের সংকট কাটিয়ে একটি শক্তিশালী কাঠামোর ওপর দাঁড়াতে পারবে। আর ব্যাংকিং খাতের এই স্থিতিশীলতা সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

 

Ads