হামের প্রাদুর্ভাবে শিশুদের মৃত্যু: দায় কার?
০৩ মে ২০২৬, ১০:৩৭ এএম
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বর্তমানে ভয়াবহ জাতীয় স্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। গত মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে মে ২০২৬ পর্যন্ত সারাদেশে এই রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকাগুলোতে এই প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। পরিসংখ্যান বলছে, সারাদেশে ৫৬টিরও বেশি জেলা এখন হামের সংক্রমণের শিকার। প্রতিদিন আক্রান্ত শিশুদের হাসপাতালে ভিড় বাড়ছে, আর লাশের মিছিলে যোগ হচ্ছে নতুন নতুন নাম। এই পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারকদের দায় এড়ানোর প্রবণতা এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার অভাব সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
পরিসংখ্যানের ভয়াবহতা ও আক্রান্তের কেন্দ্রস্থলসরকারি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এবারের প্রাদুর্ভাবে আক্রান্তদের প্রায় ৮০ শতাংশই ৫ বছরের কম বয়সী শিশু। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হলো, আক্রান্তদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ (প্রায় ৩৩-৩৪ শতাংশ) এমন শিশু যাদের বয়স ৯ মাসের কম। নিয়ম অনুযায়ী ৯ মাস বয়সের আগে হামের টিকা দেওয়ার সুযোগ নেই, ফলে এই বয়সের শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
বর্তমানে ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলো- বিশেষ করে ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর, কড়াইল এবং মিরপুর বস্তি এলাকা। এছাড়া রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগেও সংক্রমণের হার অত্যন্ত বেশি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই প্রাদুর্ভাবের পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করেছেন- সেটি হচ্ছে টিকা সংগ্রহে ত্রুটি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর টিকা সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় যে স্থবিরতা ও জটিলতা তৈরি হয়েছিল, তার ফলে মাঠপর্যায়ে টিকার বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়।
উল্রেখ্য, ২০১৯ সালে যেখানে পূর্ণ টিকাদানের হার ৮৪ শতাংশের ওপরে ছিল, সেখানে ২০২৩-২৪ সালে তা কমে প্রায় ৮১ শতাংশে নেমে আসে। কিছু কিছু জায়গায় এই হার ৬০ শতাংশের নিচেও নেমেছে। এটিও একটি কারণ।
বিশেষজ্ঞতের মতে- দীর্ঘ সময় ধরে টিকাদান কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
তবে, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. এএসএম আলমগীর সহ অনেকে উল্লেখ করেছেন যে- বর্তমান মহামারিটি কেবল টিকা না নেওয়ার কারণেই নয়, বরং সিস্টেমের ব্যর্থতার কারণে ‘এভয়েডএবল’ বা প্রতিরোধযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও ভয়াবহ আকার নিয়েছে।
এদিকে দায় চাপানোর সংস্কৃতি থেকে দেখা যায়- সমাধানের পথ না খোজে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বর্তমান পরিস্থিতির জন্য গত সরকারের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করে দোষ চাপিয়ে পার পেতে চাচ্ছে। কিন্তু, মাঠপর্যায়ের চিকিৎসকরা বলছেন ভিন্ন কথা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রোগতত্ত্ববিদ তারেকুল ইসলাম লিমন জাগো প্রতিদিনের চিত্র বিডিকে বলেন, ‘এটা মিসেলস বা হামের নতুন কোনো ভ্যারিয়েন্ট কি না এটা আমরা জানি না। এটা গবেষণার দাবি রাখে।’
আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন প্রতিদিনের চিত্র বিডিকে বলেন, ‘প্রাদুর্ভাবে আমরা কিছু কাজ করেছি। উল্লেখ করার মতো তেমন গবেষণা করিনি। এটা তো আমাদের বিষয় নয়, এক্সপান্ডেড প্রোগ্রাম অন ইমিউনাইজেশনের (ইপিআই) কাছে জিজ্ঞেস করুন।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) পরিসংখ্যান তথ্য অনুযায়ী, ‘২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাবে শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় সত্যিই বাংলাদেশ ছিল না। তবে মার্চের মাঝামাঝি থেকে বাংলাদেশে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হতে শুরু করে এবং এপ্রিল নাগাদ দেশে হাম ভয়াবহ মহামারির রূপ নেয়।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং সিডিসি (CDC)-র হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী বিশ্বজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব কেবল বাংলাদেশে নয়, প্রতিবেশী ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হামের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। চলতি বছরের মার্চে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) দেওয়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত ছয় মাসে হাম আক্রান্তের সংখ্যা বিবেচনায় শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম ছিল না।
শীর্ষ ১০ দেশের পরিসংখ্যান (সেপ্টেম্বর ২০২৫ - ফেব্রুয়ারি ২০২৬): ওই ছয় মাসে সর্বাধিক হামের রোগী শনাক্ত হওয়া দেশগুলো হলো: ভারত: ১৫,৭৫০ জন, ইয়েমেন: ১১,০৮৫ জন, পাকিস্তান: ৮,৭২১ জন, মেক্সিকো: ৮,০০৫ জন, অ্যাঙ্গোলা: ৭,৩৭৩ জন, ইন্দোনেশিয়া: ৫,৮২২ জন, কাজাখস্তান: ৫,৫৯৯ জন, ক্যামেরুন: ৫,১০৯ জন, সুদান: ৩,৬৮৯ জন, লাওস: ৩,৩০৪ জন।
বাংলাদেশে বর্তমান পরিস্থিতি:
ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশ এই তালিকার বাইরে থাকলেও, মার্চ ২০২৬-এর মাঝামাঝি থেকে দেশে সংক্রমণ তীব্র হয়। WHO-এর ২৯ এপ্রিল ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশে সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৯ হাজার ৩২৫ জন, যার মধ্যে মারা গেছে ২৭৬ জন। এবং সময়ে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে ৫ হাজার ২১৮ জন। এছাড়া হাম সন্দেহে এখন পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২৬ হাজার ৯১১ জন। তাদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে ২৩ হাজার ২২৫ জন হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে।
আক্রান্তদের অধিকাংশেরই বয়স পাঁচ বছরের নিচে এবং তাদের বড় অংশই আগে কোনো টিকা পায়নি। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যাঘাত এবং সরবরাহ সংকটের কারণে বাংলাদেশে এই আকস্মিক মহামারি দেখা দিয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের সহায়তায় জরুরি টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করছে।
























