শেখ হাসিনাকে ফেরানো
আইন ও কূটনীতির জটিল সমীকরণ : নানা গুঞ্জন, অন্তরালে বিশাল চ্যালেঞ্জ
০৩ জুন ২০২৬, ১০:২৯ এএম
গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ রাজনৈতিক অঙ্গনে কয়েক সপ্তাহ ধরে নতুন করে আলোচনা ও জল্পনা-কল্পনা চলছে। বিভিন্ন পোস্ট, ভিডিও ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দাবি করা হচ্ছে, তিনি শিগগির দেশে ফিরতে পারেন। অন্যদিকে বর্তমান সরকার বলছে, সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে চলমান মামলাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বা ফেরানোর বাস্তবতা আসলে কতটুকু? এর পেছনে আইনি ভিত্তি, কূটনৈতিক জটিলতা ও ভূরাজনৈতিক সমীকরণগুলো কী কী—তা নিয়ে চলছে বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ।
সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, "আমরা শেখ হাসিনাকে আইনি প্রক্রিয়ায় ফেরত আনতে চাই। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এবং বিদ্যমান চুক্তি অনুযায়ী তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ করা হয়েছে, যেন তিনি বাংলাদেশে মামলার মুখোমুখি হন।"
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতের কাছে একটি ‘নোট ভারবাল’ (কূটনৈতিক পত্র) পাঠায়, যেখানে বিচারিক প্রক্রিয়ার জন্য হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ করা হয়।
আইনের চোখে প্রত্যর্পণ চুক্তি: কী আছে এতে? চুক্তির বিশ্লেষনে দেখা যায় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পলাতক অপরাধী বিনিময়ের আইনি ভিত্তি হলো বাংলাদেশের ‘বন্দি প্রত্যর্পণ আইন, ১৯৭৪’ এবং ২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত (২০১৬ সালে সংশোধিত) ‘ভারত-বাংলাদেশ বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি’। সেখানে শর্ত উল্লেখ কতরা হয়েছে- যেসব অপরাধের সাজা কমপক্ষে এক বছর বা তার বেশি, সেসব ক্ষেত্রে এই চুক্তি কার্যকর হবে।
তবে, চুক্তিতে ‘রাজনৈতিক অপরাধ’ এর ক্ষেত্রে অপরাধীকে ফেরত না দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে হত্যা, অপহরণ ও নাশকতার মতো গুরুতর অপরাধকে রাজনৈতিক হিসেবে গণ্য করা হয়নি।
চুক্তির সীমাবদ্ধতায় রয়েছে- চুক্তি অনুযায়ী কোনো রাষ্ট্র তার নিজের দেশের নাগরিককে অন্য দেশের হাতে তুলে দিতে বাধ্য নয় এবং অনুরোধকারী রাষ্ট্রের আবেদনের পেছনে পর্যাপ্ত প্রমাণাদি না থাকলে তা খারিজও করতে পারে।
মৃত্যুদণ্ড: ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রথম মামলা দায়ের হয়। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ রায় ঘোষণা করেন। চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যা এবং আশুলিয়ায় ছয়জনকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় শেখ হাসিনাকে দুটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। (একই মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে)।
ভারতে অবস্থানকালে গাইবান্ধার এক আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে কথিত টেলিফোন কথোপকথন প্রকাশের পর, বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগে ২০২৫ সালের ২ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ শেখ হাসিনাকে ৬ মাসের কারাদণ্ড দেন।
আইনজ্ঞদের মতে, পলাতক অবস্থায় সাজার রায় ঘোষণা হওয়ায় তিনি আপিলের সুযোগ হারিয়েছেন। সাজার বিরুদ্ধে আপিল করতে হলে তাকে প্রথমে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হবে।
আইন বিশেষজ্ঞ ড. শাহ্দীন মালিকের মতে, শেখ হাসিনাকে ফেরানোর বিষয়টি সম্পূর্ণ নির্ভর করবে ভারত সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। তিনি বলেন, "ভারতের সঙ্গে হাসিনার যে সম্পর্ক; ’৭৫-এর পরেও তিনি ৬ বছর সেখানে ছিলেন। সম্পর্কের কারণে ভারত তাকে ফিরিয়ে দেবে বলে মনে করি না।" তিনি আরও যোগ করেন, যদি কোনো দেশ মনে করে যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির স্বদেশে ন্যায়বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা কম, তবে প্রত্যর্পণের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ হয়ে যায়।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এসব গুঞ্জনের পেছনে কিছুটা বাণিজ্যিক ও কিছুটা রাজনৈতিক কারণ থাকে। হাসিনার ফেরা মূলত তার দলের ইচ্ছা এবং দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক খেলোয়াড়দের লাভ-ক্ষতির হিসাব-নিকাশের ওপর নির্ভরশীল।
সম্প্রতি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ভারতীয় একটি পোর্টালের সাক্ষাৎকার উদ্ধৃত করে শেখ হাসিনার বক্তব্য পোস্ট করা হয়। সেখানে দাবি করা হয়, তিনি বলেছেন—"আমি কখন কীভাবে দেশে ফিরব, সে সিদ্ধান্ত একান্তই আমার। জনগণের শক্তিতে বলীয়ান হয়েই আমি ফিরব।" দলের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল বলেন, শেখ হাসিনা অতীতেও ১৯৮১ ও ২০০৭ সালে সব নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে দেশে ফিরেছিলেন এবং এবারও তিনি সময়মতো বীরের বেশে দেশে ফিরবেন।
কূটনীতিকদের মতে, এটি ভারতের জন্য একটি বড় ধরণের কূটনৈতিক দ্বিধা। হাসিনাকে ফেরত পাঠালে বাংলাদেশে যেমন রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে, তেমনি না পাঠালে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশ চায় 'ন্যায়বিচার' আর ভারত চায় 'স্থিতিশীলতা ও সীমান্ত নিরাপত্তা'।
শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি কেবল আইনি নথিপত্রের ওপর নির্ভর করছে না; এর পেছনে কাজ করছে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার গভীর রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক সমীকরণ। আপাতত খুব দ্রুত কোনো প্রত্যর্পণের দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকলেও, ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়—তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
























