ফিফা সভাপতির পদত্যাগ চেয়ে নিজের দেশেই তীব্র বিক্ষোভ, কাঠগড়ায় ইনফ্যান্তিনো
১৪ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫৪ এএম
নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচিত বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনো। তাঁর বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কারণে খোদ ফিফার ভেতরেই তৈরি হয়েছে তীব্র অসন্তোষ। তবে নিজের দেশ সুইজারল্যান্ডেও যে এমন নজিরবিহীন চাপের মুখে পড়তে হবে, তা হয়তো কখনোই ভাবেননি ইনফ্যান্তিনো।
যুক্তরাষ্ট্রে চলমান ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ যখন প্রায় শেষ পর্যায়ে, ঠিক তখনই সুইজারল্যান্ডে ফিফার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করেছে। রাস্তায় নেমে আসা ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারীরা এবার সরাসরি ফিফা সভাপতির পদত্যাগ দাবি করছেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম 'বারাস দেল মুন্দো' সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (টুইটার) জানিয়েছে, বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর থেকেই এই বিক্ষোভ চলছিল, যা বর্তমানে আরও তীব্র রূপ নিয়েছে। আন্দোলনকারীদের মতে, খেলাধুলার মাত্রাতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণ, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, বিতর্কিত রেফারিংয়ের সিদ্ধান্ত, ম্যাচসূচি এবং ফিফার চাপিয়ে দেওয়া আধুনিক ব্যবসায়িক মডেলের বিরুদ্ধেই তাঁদের এই প্রতিবাদ।
সংবাদমাধ্যমটি আরও জানায়, এই বিক্ষোভের মূল লক্ষ্যই ছিল ফিফা এবং এর সভাপতি জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনো। প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, ব্যানার হাতে ক্ষুব্ধ সমর্থকেরা রাস্তায় মিছিল করছেন। বিক্ষোভের সময় তাঁরা ‘আধুনিক ফিফার বিরুদ্ধে’, ‘ফিফার দুর্নীতি বন্ধ করো’, ‘ইনফ্যান্তিনোকে হটাও’ এবং ‘ফিফা ফুটবল সমর্থকদের’—এমন সব স্লোগান দিচ্ছিলেন।
আসলে ফিফা বহু বছর ধরেই নানা আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিতর্কে জড়িয়ে রয়েছে। বিশেষ করে ২০১৮ ও ২০২২ সালের বিশ্বকাপ যথাক্রমে রাশিয়া ও কাতারকে আয়োজক হিসেবে নির্বাচনের সময় বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে সেই তদন্তের জেরে তৎকালীন সভাপতি সেপ ব্ল্যাটার পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়ে ইনফ্যান্তিনো দায়িত্ব নিলেও বিতর্কের অবসান ঘটেনি।
চলতি বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে প্রথম ‘ফিফা শান্তি পুরস্কার’ তুলে দেওয়ার পর থেকেই বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। ফুটবল বিশ্লেষক ও সমর্থকদের মতে, সেটিই ছিল পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে চলতে থাকা একের পর এক বিতর্কের সূচনা।
চলমান এই বিতর্কের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আর্জেন্টিনা। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের পর আলজেরিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ফিফার কাছে রেফারিং নিয়ে অভিযোগ দায়ের করে। তাদের দাবি ছিল, আইসা মান্দিকে লিওনেল মেসি অত্যন্ত শক্ত ট্যাকল করলেও রেফারি তাঁকে লাল কার্ড দেখাননি, অথচ একই ধরনের অপরাধে অন্য দলগুলোর ক্ষেত্রে কঠোর সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে।
আর্জেন্টিনাকে বাড়তি সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ থাকলেও শুধু এই একটি দলই নয়, পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই বড় দলগুলো কঠোর শাস্তি এড়িয়ে গেছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। যেমন—ঘানার বিপক্ষে ম্যাচে ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডার এজরি কোনসা পেনাল্টি বক্সের ভেতরে পেছন থেকে অত্যন্ত খারাপভাবে ট্যাকল করলেও ঘানার পক্ষে কোনো পেনাল্টি দেওয়া হয়নি।
তবে সব বিতর্ককে ছাড়িয়ে সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারির জন্ম হয়, যখন সভাপতি ইনফ্যান্তিনো নিজেই স্বীকার করেন যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি ফোন পাওয়ার পর ফিফা যুক্তরাষ্ট্রের তারকা ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনের লাল কার্ড প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়। বেলজিয়ামের বিপক্ষে নকআউট ম্যাচে তাঁর নিষিদ্ধ থাকার কথা থাকলেও, ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত তাঁর নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা হয় এবং তাঁকে খেলার অনুমতি দেওয়া হয়।
এই নগ্ন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ঘটনাই ছিল সমর্থকদের ধৈর্যের শেষ সীমা। এর আগে থেকেই একের পর এক পক্ষপাতমূলক রেফারিংয়ের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ সমর্থকেরা এই ঘটনার পর আরও উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে সবসময় নিজেদের মুক্ত রাখার বড় বড় দাবি করা ফিফার নিরপেক্ষতা নিয়ে এই ঘটনাটি এখন বিরাট প্রশ্ন চিহ্ন এঁকে দিয়েছে।
চলমান বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই রেফারিং নিয়ে কোনো না কোনো বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে, যা মাঠের খেলার মৌলিক নিরপেক্ষতাকে পুরোপুরি প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
ফিফার বিভিন্ন পক্ষপাতমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে সমর্থকেরা বরাবরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব ও ক্ষুব্ধ ছিলেন। তবে এবার সেই ভার্চুয়াল ক্ষোভ রাস্তায় নেমে সশরীরে বিক্ষোভে রূপ নিয়েছে। আর এই বিক্ষোভের আগুন ইনফ্যান্তিনোর নিজের দেশ সুইজারল্যান্ডেই ছড়িয়ে পড়ায়, তা এখন বৈশ্বিক ক্রীড়াঙ্গনে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।





































