সিটিং সার্ভিসের বিজয়, রাষ্ট্রের হার!
২২ এপ্রিল ২০১৭, ০৪:৩৪ এএম
দেশের পরিস্থিতির উপর সরকারের নজর কঠোর কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন। নিয়ন্ত্রণহীন এই কারণে যে, সরষের ভিতর ভূত দারুণ ভাবে প্রভাব বিস্তার করে চলছে বলে। এই বৃহৎ চক্র সরকারের অস্থিত্বে বাসা বেঁধেছে। তারা এমনভাবে ঘাপটি মেরে রয়েছে সরকারের দুই একজনের ভাল থেকে দুষ্টুদের প্রতিরোধ করা কোনভাবে সম্ভব হচ্ছেনা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের একটি সেরা মন্তব্য সব সময় আমাদের মনে করিয়ে দেয়, তিনি বলতেন বিশ্বের অনেক দেশ তেল, স্বর্ণ সহ মূল্যবান ধাতুর খনি পায়। আর আমাদের দেশে আমি পেয়েছি শুধু চোরের খনি। তিনি এত বিচক্ষণ ছিলেন খুব কম সময়ে উপলব্ধি করতে পেরেছেন যে, আসলে আমাদের দেশে শুধু চোরের খনি নয় লোভী ও দুষ্টু চরিত্রের ডাকাত, বদমাশ, ক্ষমতার কাঙ্গালের খনি রয়েছে। এই চক্রটি এক হয়ে যেভাবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো গ্রাস করছে তাতে করে দেশে কোন ভাল উদ্যোগ সফলতার মুখ দেখতে পায়না। তাই জনগনের পক্ষে এমন কার্যক্রম এই পর্যন্ত সবগুলো থমকে যেতে দেখা গেছে।
সিটিং সার্ভিস বাস-মিনিবাসের অনিয়মের জন্য যাত্রীদের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে যখন সরকারের পক্ষ থেকে একটি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় ঠিক তখনি দুষ্ট চক্রের চক্রান্ত শুরু হয়। পরাজয় কাকে বলে আরো একবার দেখতে পেল দেশের জনগণ এবং প্রমাণিত হলো বাস-মিনিবাসের সিটিং সার্ভিসের অনিয়ম বন্ধ করার সে সক্ষমতা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নেই। কিন্তু, প্রশ্ন হলো নিধিরাম সরদারের মত ঢাল তলোয়ার বিহীন যোদ্ধা সেজে এভাবে মাঠে নেমে পরাজয় মেনে জনসাধারণকে ভোগান্তিতে ফেলা আদৌ দরকার ছিল কিনা? যুদ্ধ করার মনস্থির করলে কোন অন্যায়কে পরোয়া করা উচিত নয় এবং সেভাবে প্রস্তুত থেকে মাঠে নামা দরকার। আপনার ঢাল তলোয়ার নেই তাতে কি, রুট পারমিট বাতিল করারতো ক্ষমতা রয়েছে, আপনার প্রতিষ্ঠান সেটি ব্যবহার করতে পারতো। অথচ আপনারা তা না করে হাত পা গুটিয়ে বসে রইলেন।
যেহেতু রাস্তায় চলাচলের অনুমতির (রুট পারমিট) শর্ত অনুযায়ী, কোনো কারণ ছাড়া বাস-মিনিবাস বন্ধ রাখার সুযোগ নেই। সেটা করলে সে প্রতিষ্ঠানের রুট পারমিট বাতিল করে দেওয়ার বিধান রয়েছে। অথচ বিআরটিএ ও সে বিধান প্রয়োগ না করে আরো একবার দুর্বলতার প্রমাণ দিলেন যে দেশে অনেক ক্ষেত্রে আইন যথাযথ প্রয়োগ হয়না । তবে, রুট পারমিট বাতিলের পাশাপাশি অর্থ দন্ডের বিধান এবং জেল জরিমানার বিধান রেখে নতুন আইন প্রণয়ন খুবই জরুরী এবার সিটিং সার্ভিস বাস-মিনিবাসের মালিক শ্রমিকরা সেটা দেখিয়ে দিল সবাইকে। তাতেও যদি বিআরটিএ টনক না নড়ে তাহলে জনগনের ভোগান্তি আরো বাড়তে থাকবে।
সড়ক যোগাযোগ (যাতায়াত) মাধ্যমটি দেশের উন্নয়নের প্রধানের অন্যতম। সুতরাং যারা এই মাধ্যমকে নিয়ে খেলা করে তাদের চরম শাস্তি পাওয়া উচিত বলে প্রতীয়মান হয়। রাষ্ট্রের সাথে এধরনের চাতুকারীতা বড় ধরণের শাস্তিযোগ্য অপরাধ,তাই দোষীদের শাস্তি পাওয়া দরকার সে যতবড়ই ক্ষমতাশালী হোক। এখানে ক্ষমতাসীন দলের অনেক প্রভাবশালী এই ব্যবসায় জড়িত থাকতে পারে, তাদের কারণে যদি এই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয় তাহলে সেটিকেও জনসমক্ষে তুলে ধরা দরকার। ট্রাফিক পুলিশ বিভাগের উর্ধতন কর্মকতাদের সম্পৃক্ততা থাকলে তাদেরকেও চিন্হিত করে শাস্তির আওতায় আনা উচিৎ। তথ্যপ্রযুক্তির এই সফল যুগে গণমাধ্যম অনেক বেশী সোচ্চার সুতরাং এই সকল বিষয়ে তথ্য প্রমাণাদি সংরক্ষণের মাধ্যমে সকল গণমাধ্যমে ফলাওভাবে প্রচারে সুযোগ তৈরী করে দিলে দুষ্টু চক্রদের মূখোশ উম্মোচন হবে। অতঃপর তাদেরর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।
সাত রাস্তার বাসষ্ট্যান্ডের ব্যাপারটি লক্ষ্য করেছেন কি? দেখুন, বাসষ্ট্যান্ডটি উঠিয়ে দেওয়া দুঃস্বপ্ন মনে হলেও তা স্থানান্তরিত করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র তার যোগ্যতার প্রমাণ করে ছেড়েছেন। শুধু তাই নয় তিনি ঢাকা দক্ষিণের অনেক নিয়ম নীতি না মেনে স্থাপনা তৈরী করা থেকে শুরু করে বহু বেদখলকৃত সরকারী জায়গা দখলে নিয়েছেন। এমন কৃতিত্বের নজির আদৌ কোন ব্যক্তি বা সংস্থা করে দেখাতে পারেনি যা তিনি করে ছেড়েছেন। নিজেকে প্রমাণ করুণ, জ্বী হুজুর না করে দেশের জন্য, জনগনের জন্য বীরের মত পদক্ষেপ গ্রহন করুণ।
অনেকের প্রশ্ন সেদিনের সিটিং সার্ভিস বন্ধের মিটিংএ যারা ছিলেন তারা সবাই কি এই পদ্ধতির স্বপক্ষে? নাকি যাত্রীদের জিম্মি করে বাড়তি ভাড়া আদায়ের জন্য এটা মালিকদের কারসাজি? তা নাহলে রবিবার থেকে প্রায় ৪০ শতাংশ বাস-মিনিবাস রাস্তায় নামেনি কেন? আপনার প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, পরিবহন মালিক, পুলিশ প্রতিনিধি সহ যে ১৫ দিনের জন্য সিটিং সার্ভিস বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তাদের সকলের মত ছিল কিনা সেটি ভেবে দেখা দরকার। সকল বিষয় বিচার বিশ্লেষণ করে সামনের দিকে অগ্রসর হওয়া হবে আপনার সফলতার একধাপ অগ্রগতি।
দেখুন পরিবহন সেক্টরে ভাড়া বৃদ্ধি প্রতিরোধ অথবা শৃঙ্খলা ফিরে আনা কোনভাবেই সম্ভব হবে না যদিনা আপনার প্রতিষ্ঠান দিয়ে মাঠপর্যায়ে যথাযথ তদারকি করতে না পারেন। সেক্ষেত্রে, এখানেও আপনার বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হবে। শেয়ালের কাছে মুরগি পালনের মত দায়িত্ব প্রদান করলে আশানুরূপ ফলাফলের পরিবর্তে হিতে বিপরীত হবে। বিচক্ষণতার পাশাপাশি আপনাকে কঠোর হতে হবে। আপনার প্রতিষ্ঠানের লোক দিয়ে বিআরটিএ লগো যুক্ত ভাড়ার তালিকা কালারফুল পোস্টারে অথবা স্টীকার আকারে প্রতিটি পরিবহনে অন্তত চারটি করে লাগিয়ে দিতে হবে যাতে যাত্রীরা দেখতে পায়। এতে করে হয়ত ড়্রাইবার-হেলপারের সাথে যাত্রীদের হাতাহাতি অথবা সংঘর্ষ কমে যাবে।
বর্তমানে যে সকল গাড়ীতে ভাড়ার তালিকা দেখা যায় সেসকল ভাড়ার তালিকা পরিবহনের লোকজনের তৈরী। তাতে করে সমস্যা সমাধানের চেয়ে জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে বেশী। প্রথমে এই সকল ছোট-খাটো সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারলে নিঃসন্দেহে পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রীমহোদয় অনেক ক্ষমতাবান ব্যক্তি, তিনি কোন ক্ষমতাধরদের ভয়ে চুপ হয়ে গেলেন বুঝতে জনগনের কষ্ট হচ্ছে। এত সুপ্রীম পাওয়ার নিয়ে যদি কেউ এভাবে অসহায় হয়ে যায় দেশ চলবে কিভাবে? সাধারণ জনগণ কোথায় কার কাছে প্রতিকার চাইবে?
দেশ স্বাধীনের পর ভাল আর মন্দের ক্রসফায়ার কমতো হয়নাই। সাধারণ মানুষের ক্রসফায়ারে মৃত্যুর খবর শুনেছি, অসহায় মা-বাবাকে কাঁদতে দেখেছি। জজ মিয়ার নাটক দেখেছি, অনেক নেতার খোঁজ পাচ্ছেনা পরিবার। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অনেক নিরীহ কিশোর এবং ছাত্রের পঙ্গুত্ব জীবন ধারণ করতে হচ্ছে। কত কিছুই দেখছি। যদি মুষ্টিমেয় গুটিকয়েক দুষ্টু মানুষের কাছে দেশ জিম্মি হয়ে যায় তাহলে তাদের জন্য কি দেশ থেমে থাকবে? এইভাবে পারাজয়ের জন্য তো মুক্তিযুদ্ধ হয়নি!






























