জোর করে নেওয়া পদত্যাগপত্রের আইনি বৈধতা নেই: হাইকোর্ট
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১৮ এএম
ছবি: সংগৃহীত
জোর করে কোনো শিক্ষকের কাছ থেকে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেওয়া হলে সেটি আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য হবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে এমনভাবে পদত্যাগে বাধ্য করা শিক্ষককে অবিলম্বে স্বপদে পুনর্বহালের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। নির্দেশনা না মানলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ বাতিলসহ কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন হাইকোর্ট।
‘মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদ বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় এ রায় দেন হাইকোর্ট। গাজীপুরের কালিয়াকৈরের গোলাম নবী মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদকে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা রিটের চূড়ান্ত শুনানি শেষে বিচারপতি মো. ইকবাল কবির ও বিচারপতি এস এম সাইফুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ২০ আগস্ট রুল নিষ্পত্তি করে এ রায় দেন।
সম্প্রতি ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয়েছে। বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. ইকবাল কবির মূল রায়টি লেখেন।
রায়ে আদালত বলেন, রিটকারীর পদত্যাগপত্র স্বেচ্ছায় বা নিজের ইচ্ছায় দেওয়া হয়নি; বরং তাঁর স্বাক্ষর জোরপূর্বক নেওয়া হয়েছিল। এ ধরনের পদত্যাগের কোনো আইনগত বৈধতা নেই। আইন ও বিধিও জোরপূর্বক বা চাপের মুখে নেওয়া পদত্যাগকে সমর্থন করে না।
মামলার বিবরণে জানা যায়, আলকাছ উদ্দিন আহমেদ ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট গোলাম নবী মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ওই দিন একদল ব্যক্তি তাঁর অনিচ্ছা সত্ত্বেও জোরপূর্বক একটি পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরদিন তিনি এ বিষয়ে কালিয়াকৈর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
পরে ২০ আগস্ট জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং ২৪ আগস্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে বিষয়টি জানান তিনি। একই সঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছেও আইনি প্রতিকার ও হস্তক্ষেপ চেয়ে আবেদন করেন।
এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আলকাছ উদ্দিন আহমেদকে স্বপদে বহাল করার নির্দেশ দেয় ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। তবে সেই নির্দেশ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় প্রতিকার চেয়ে ২০২৪ সালে হাইকোর্টে রিট করেন তিনি।
রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে একই বছর রুল জারি করেন হাইকোর্ট। পাশাপাশি জোর করে নেওয়া পদত্যাগপত্রটির কার্যকারিতা তিন মাসের জন্য স্থগিত করা হয়। পরে গত ২০ আগস্ট রুল নিষ্পত্তি করে চূড়ান্ত রায় দেন আদালত।
হাইকোর্ট বলেন, রিট আবেদনকারীর পদত্যাগের কোনো আইনগত বৈধতা ছিল না। তিনি ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত এমপিওর অংশ হিসেবে বেতন-ভাতা পেয়েছেন। এ অবস্থায় বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ তাঁকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনে বা চাকরিতে বহাল রাখতে আইনিভাবে বাধ্য। ফলে তিনি অবিলম্বে স্বপদে পুনর্বহালের অধিকারী।
আদালত আরও বলেন, আইন অনুযায়ী শিক্ষা বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ হিসেবে পরিচালনা পর্ষদের প্রস্তাবিত শৃঙ্খলামূলক বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা পর্যালোচনা, অনুমোদন, সংশোধন বা বাতিল করার এখতিয়ার রয়েছে। বোর্ডের জারি করা নির্দেশনা পরিচালনা পর্ষদ ও সংশ্লিষ্টদের জন্য বাধ্যতামূলক।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ, বোর্ডের নির্দেশনা ইচ্ছাকৃতভাবে বাস্তবায়ন না করা অসদুপায়, স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের শামিল। এ ধরনের আচরণ ন্যায়বিচারের নীতি, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও সমতার বিধানের পরিপন্থী। শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টরা আইনগতভাবে বাধ্য।
রায়ে আদালত সংশ্লিষ্টদের প্রতি আলকাছ উদ্দিন আহমেদকে স্বপদে পুনর্বহাল নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন। নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মধ্যে পরিচালনা পর্ষদ বাতিল, পরিচালনা পর্ষদের সভাপতিকে অপসারণ এবং প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের এমপিও বন্ধের সুপারিশও থাকতে পারে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।































