রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছু হটল এনবিআর: বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ
০৪ মে ২০২৬, ০৮:৩৪ এএম
লতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের রাজস্ব সংগ্রহের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা থেকে শেষ পর্যন্ত সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। দেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ব্যবসায়িক মন্দা এবং আমদানিতে কড়াকড়ির প্রেক্ষাপটে লক্ষ্যমাত্রা সংশোধনের এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের প্রক্রিয়া চলছে।
অর্থবছরের শুরুতে এনবিআরের জন্য ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার বিশাল রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে অর্থবছরের প্রথম তিন প্রান্তিকের (জুলাই-মার্চ) উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায় অনেক পিছিয়ে আছে। এনবিআরের তথ্যমতে, অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল ব্যবধান ঘোচানো বছরের শেষ তিন মাসে অসম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতার পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন অর্থনীতিবিদ ও এনবিআর কর্মকর্তারা:
১. আমদানি সংকোচন: বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমদানিতে বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এর ফলে শুল্ক স্টেশনগুলো থেকে প্রত্যাশিত কাস্টমস ডিউটি বা আমদানি শুল্ক আদায় উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
২. ব্যবসায়িক মন্দা ও মুদ্রাস্ফীতি: লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে স্থানীয় পর্যায়ে ভ্যাট (VAT) আদায়ের ওপর। অনেক উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠান কাঁচামাল সংকটে উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ায় করপোরেট কর আদায়ের গতিও ধীর হয়ে পড়েছে।
৩. ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট: শিল্পোদ্যোক্তারা ঋণ সংকটের কারণে নতুন বিনিয়োগে যেতে পারছেন না, যার ফলে আয়কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ ব্যাহত হচ্ছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থাগুলোর মতে, প্রতি বছরই সরকার রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। কিন্তু এনবিআরের সক্ষমতা বৃদ্ধি না করে বা করের আওতা না বাড়িয়ে কেবল বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। তাদের মতে, লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ, তবে এটি সরকারের ব্যয় ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি করবে। রাজস্ব কমলে সরকারকে বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে আরও বেশি ঋণ নিতে হতে পারে।
এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "আমরা মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করার নির্দেশনা দিয়েছি। তবে অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা আদায় করা অত্যন্ত কঠিন। তাই আমরা অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে লক্ষ্যমাত্রা যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার প্রস্তাব পাঠিয়েছি।"
রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা কমানোর ফলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) অনেক প্রকল্পে অর্থায়ন কাটছাঁট হতে পারে। এছাড়া বাজেট ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পরিশেষে, কেবল লক্ষ্যমাত্রা কমিয়েই সমাধান মিলবে না। দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব আয় বাড়াতে কর প্রশাসনের অটোমেশন এবং কর ফাঁকি রোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণই এখন সময়ের দাবি।






























