পেট্রোবাংলার নতুন প্রস্তাব: বিদ্যুৎ ও সিএনজিতে বাড়ছে গ্যাসের দাম
৩১ জুলাই ২০২৬, ১১:৪২ এএম
আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির উচ্চমূল্য, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারের বিপুল পরিমাণের ভর্তুকির চাপ কমাতে এবার বিদ্যুৎ উৎপাদন ও যানবাহনে ব্যবহৃত সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাসের (সিএনজি) দাম বাড়নোর উদ্যোগ নিয়েছে পেট্রোবাংলা। সংস্থাটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ টাকা এবং সিএনজির দাম ৪৩ টাকা থেকে বাড়িয়ে প্রায় ৬৫ টাকা করার প্রস্তাব জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগে পাঠিয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও সিএনজির পাশাপাশি গ্যাস বিতরণকারী কোম্পানিগুলোও তাদের পরিচালন ব্যয় মেটাতে বিতরণ মাশুল বা চার্জ বাড়ানোর আবেদন জানিয়েছে।
আজ শুক্রবার (৩১ জুলাই, ২০২৬) ঢাকার পেট্রোবাংলা ও সংশ্লিষ্ট জ্বালানি খাত সূত্রে এই প্রস্তাবের বিষয়টি জানা গেছে।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পেট্রোবাংলার এই প্রস্তাবটি বর্তমানে পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে এটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে পাঠানো হবে। কমিশন এরপর নিয়ম অনুযায়ী গণশুনানির আয়োজন করবে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত ও গভীর আর্থিক বিশ্লেষণ পর্যালোচনা করার পরই গ্যাসের নতুন দাম নির্ধারণ ও ঘোষণা করা হবে।
বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, দেশে গ্যাসের দাম নির্ধারণ ও যেকোনো পরিবর্তনের একমাত্র এখতিয়ার বিইআরসির। ফলে পেট্রোবাংলা কিংবা কোনো বিতরণ কোম্পানির প্রস্তাব সরাসরি কার্যকর হওয়ার সুযোগ নেই; কমিশনের চূড়ান্ত অনুমোদনের পরই কেবল নতুন দাম কার্যকর করা সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আপাতত কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সিএনজি খাতের জন্যই গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আবাসিক, বাণিজ্যিক কিংবা বিদ্যমান শিল্প গ্রাহকদের জন্য নতুন করে দাম বাড়নোর কোনো প্রস্তাব এখনো তৈরি করা হয়নি। এর আগে ২০২৫ সালের এপ্রিলে নতুন শিল্পের ক্ষেত্রে গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ৩০ টাকা থেকে ৪০ টাকা এবং একই বছরের নভেম্বরে সার কারখানায় ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৯ দশমিক ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
এদিকে গ্যাসের মূল দামের পাশাপাশি বিতরণ চার্জও বাড়াতে চাচ্ছে বিতরণ কোম্পানিগুলো। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি বর্তমান ৩৭ পয়সার পরিবর্তে ১ টাকা ২১ পয়সা, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি ২৪ পয়সা থেকে ৪১ পয়সা এবং বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ৩০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯০ পয়সা করার আবেদন করেছে। অন্যদিকে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি দুটি বিকল্প প্রস্তাব পেশ করেছে; যেখানে অনুমোদিত সিস্টেম লস ৫ শতাংশ ধরা হলে প্রতি ঘনমিটারে ৩৫ পয়সা এবং ২ শতাংশ ধরা হলে ১ টাকা ৪ পয়সা বিতরণ চার্জের কথা বলা হয়েছে। জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেড তাদের চার্জ ১৮ পয়সা থেকে ৬৩ পয়সা এবং সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড ২৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১ টাকা ৫ পয়সা করার আবেদন জানিয়েছে।
বিতরণ কোম্পানিগুলোর দাবি, বর্তমানে নির্ধারিত মাশুল দিয়ে প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত পরিচালন ব্যয় মেটানো কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। অনেক প্রতিষ্ঠান অপরিচালন আয় দিয়ে বর্তমানে টিকে আছে। এই লোকসান এভাবে অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে গ্যাস খাতজুড়ে তীব্র আর্থিক সংকট তৈরি হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করছে।
এই বিষয়ে সার্বিক তথ্য জানতে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নান এবং জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তাদের সাড়া পাওয়া যায়নি।
তবে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ প্রতিদিনের চিত্রকে বলেন, ‘আমরা বিষয়টি শুনেছি। তবে আমাদের কাছে এখনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব এসে পৌঁছায়নি। প্রস্তাব হাতে পেলে আইনি নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
পেট্রোবাংলার পরিসংখ্যান ও বিশ্লেষণে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে বিশ্বব্যাপী এলএনজির দাম অস্বাভাবিক বাড়ার কারণে গ্যাস সংগ্রহে ব্যয় বহু গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিভিন্ন উৎস থেকে কেনা গ্যাসের গড় ক্রয়মূল্য ছিল প্রতি ঘনমিটার ৩১ দশমিক ৬৫ টাকা। এর বিপরীতে গড় বিক্রয়মূল্য ছিল মাত্র ২৩ দশমিক ৬৩ টাকা। ফলে প্রতি ঘনমিটার সরবরাহে প্রায় ৮ দশমিক শূন্য ২ টাকা ঘাটতি তৈরি হয়।
সংস্থাটির মতে, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সংঘাত এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালি ঘিরে সামরিক অস্থিরতার পর পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ঘনমিটারে গ্যাসের গড় ক্রয়মূল্য ছিল ২৭ দশমিক ৬৪ টাকা, যা এপ্রিল থেকে জুন সময়ে একলাফে বেড়ে দাঁড়ায় ৪৫ দশমিক ৭৯ টাকায়। ওই তিন মাস পূর্বের বিক্রয়মূল্যে গ্যাস সরবরাহ করতে গিয়ে প্রতি ঘনমিটারে ঘাটতি বেড়ে হয় ২১ দশমিক ৮২ টাকা। এর ফলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পেট্রোবাংলার মোট আর্থিক ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যার বিপরীতে সরকার থেকে প্রায় ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে।
বর্তমানে দেশি ও বিদেশি উভয় উৎস থেকেই গ্যাস সংগ্রহ করে থাকে পেট্রোবাংলা। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সিলেট গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি ও বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি থেকে প্রতি ঘনমিটার গ্যাস কেনা হয় মাত্র ১ টাকায় এবং বাপেক্স থেকে ৪ টাকায়। আর বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান শেভরন বাংলাদেশ থেকে প্রতি হাজার ঘনফুট ২ দশমিক ৭৬ ডলার এবং তাল্লো থেকে ২ দশমিক ৩১ ডলার দরে গ্যাস সংগ্রহ করা হয়। অন্যদিকে কাতার থেকে আমদানি করা এলএনজির দাম প্রতি হাজার ঘনফুট ১০ দশমিক ৬৬ ডলার এবং ওমান থেকে আমদানি করা এলএনজির দাম পড়ে প্রায় ১০ দশমিক ৯ ডলার। ফলে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের তুলনায় আমদানি করা এলএনজির পেছনে ব্যয় বহুগুণ বেশি হচ্ছে।
অতীতে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক প্রায় ২৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন হলেও প্রাকৃতিক মজুত কমে আসায় বর্তমানে তা দৈনিক প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। গত অর্থবছরে মোট সরবরাহকৃত গ্যাসের প্রায় ৩০ শতাংশ এসেছে আমদানির মাধ্যমে এবং ৭০ শতাংশ ছিল দেশীয় উৎস। তবে পেট্রোবাংলার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে এই চিত্র সম্পূর্ণ উল্টে যাবে। তখন মোট গ্যাসের প্রায় ৭০ শতাংশই আমদানি করতে হবে এবং দেশীয় উৎসের জোগান নেমে আসবে মাত্র ৩০ শতাংশে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে মাত্র ৩০ শতাংশ আমদানিকৃত গ্যাসের কারণেই বাজারে মূল্যের ওপর সামঞ্জস্য রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। ভবিষ্যতে আমদানি নির্ভরতা ৭০ শতাংশে পৌঁছালে এই মূল্যবৃদ্ধির চাপ আরও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে। তাই মূল্য স্থিতিশীল রাখতে হলে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।
খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত অনুসন্ধান ও নতুন কূপ খনন না করায় দেশীয় উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমেছে। যদিও ১৯৯৫ সালের জাতীয় জ্বালানি নীতিতে প্রতিবছর অন্তত চারটি করে অনুসন্ধান কূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা ছিল, তবে কোনো সরকারই তা বাস্তবে রূপ দিতে পারেনি। ফলে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার থমকে গেছে। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও নতুন সংযোগে। বর্তমানে নতুন শিল্পে গ্যাস সংযোগ প্রায় বন্ধ এবং বিদ্যমান শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো গ্যাসসংকটে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ না বাড়িয়ে কেবল আমদানিনির্ভরতা বাড়ালে ভবিষ্যতে গ্যাসের দাম ও সরকারি ভর্তুকির চাপ অনিয়ন্ত্রিত রূপ নেবে।































