জ্বালানি তেলের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি: পরিবহন থেকে কৃষি, সর্বত্রই জীবনযাত্রার তীব্র চাপ
২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৪ এএম
দেশের বাজারে আবারও জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির ফলে পরিবহন, কৃষি ও শিল্প উৎপাদনসহ সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয় আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধির মুখে পড়েছে। তেলের নতুন দর ঘোষণার পর থেকেই পরিবহন ও পণ্য সরবরাহ খাতে এর সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে, যার চূড়ান্ত খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের। অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, অস্থিতিশীল মূল্যস্ফীতির এই সময়ে জ্বালানির দাম এভাবে বৃদ্ধি পেলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও হ্রাস পাবে এবং দেশে নতুন করে দারিদ্র্যের ঝুঁকি তৈরি হবে।
সোমবার (২২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর প্রধান বাস টার্মিনাল গাবতলীসহ দেশের বিভিন্ন পাইকারি বাজার ও পরিবহন কেন্দ্রে গিয়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সরাসরি প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। গাবতলী বাস টার্মিনালে দূরপাল্লার পাশাপাশি বিভিন্ন রুটের বাসে গন্তব্যভেদে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। একই চিত্র দেখা গেছে পণ্য পরিবহন খাতেও; কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় চাল পরিবহনের ট্রাকভাড়া এক দিনেই ২০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ২২ হাজার টাকা হয়েছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম ও বেনাপোলসহ প্রধান বাণিজ্যিক রুটগুলোতে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া ২ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
জ্বালানি বিভাগের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি লিটার ডিজেলে ২০ টাকা বাড়িয়ে নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩৫ টাকা। এছাড়া প্রতি লিটার পেট্রল ১৬০ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এর আগে গত এপ্রিল ও জুন মাসেও ধাপে ধাপে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং আমদানিতে অব্যাহত লোকসান কমানোর লক্ষ্যেই এই মূল্য সমন্বয় করতে হয়েছে। বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেল আমদানিতে ২০৫ টাকা খরচ হওয়ায় দাম বাড়ানোর পরও বিপিসিকে লিটারপ্রতি প্রায় ৭০ টাকা লোকসান গুণতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট বিভাগ দাবি করেছে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দর কিছুটা উদ্বায়ী হলেও সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের আগাম কেনাবেচার দর (ফিউচার মার্কেট) ব্যারেলপ্রতি ৯৮ ডলারে নেমে এসেছে, যা কয়েক দিন আগেও ১০৯ ডলার ছিল। তবে অভ্যন্তরীণ বাজারে ধারাবাহিকভাবে মূল্যবৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছেন নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের শ্রমজীবী মানুষ এবং ডিজেল নির্ভর সেচ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল কৃষক সমাজ। দেশে বর্তমানে প্রায় ১৩ থেকে ১৫ লাখ ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র রয়েছে, যার ওপর কৃষি খাতের উৎপাদন অনেকাংশে নির্ভর করে।
পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় তা সরাসরি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে গিয়ে প্রভাব ফেলছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাড়তি পরিবহন খরচ পণ্যের মূল্যের সঙ্গেই যুক্ত করতে হচ্ছে, যার ফলে শাকসবজি থেকে শুরু করে চাল-ডাল—সবকিছুর দামই বাড়তি। এছাড়া বিদ্যুৎহীন কিংবা লোডশেডিংপ্রবণ গ্রামীণ অঞ্চলে কুপির কাজে ব্যবহৃত কেরোসিনের দাম বাড়ায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পারিবারিক খরচ বাড়বে। অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জীবনের ওপর এই চাপ তৈরি করবে বড় ধরণের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কেবল তেলের দাম বাড়িয়ে রাজস্ব বা ঘাটতি সমন্বয় না করে সরকারের ব্যয় সংকোচন এবং জ্বালানি খাতের অপচয় ও 'সিস্টেম লস' কমানোর দিকে নজর দেওয়া জরুরি। এছাড়া জ্বালানি তেলের ওপর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আরোপিত শুল্ক-কর পুনর্মূল্যায়নেরও তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেলে প্রায় ৩৮ টাকা শুল্ক-কর আদায় করা হচ্ছে। অপচয় ও শুল্কের বোঝা না কমিয়ে বারবার দাম বাড়ানো হলে বাজার মূল্যস্ফীতি অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়বে এবং সাধারণ মানুষের ওপর অর্থনৈতিক বৈষম্যের চাপ আরও গভীর হবে।

























