শিক্ষকতাকে মেধাবীদের প্রথম পছন্দের পেশা করতে কাজ করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী
০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:০৮ পিএম
শিক্ষকতাকে মেধাবীদের প্রথম পছন্দের পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেছেন, শিক্ষকতা কোনোভাবেই ‘উপায়হীন বিকল্প’ বা সাধারণ চাকরির মতো পেশা হতে পারে না। শিক্ষা-দীক্ষায় সবচেয়ে মেধাবীরা যাতে শিক্ষকতাকে তাঁদের কর্মজীবনের প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নেন, সরকার সে লক্ষ্যেই কাজ করছে।
সোমবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে জাতীয় পর্যায়ের ‘গুণী শিক্ষক সম্মাননা’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে নির্বাচিত শিক্ষকদের এ সম্মাননা দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষকদের সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে রাষ্ট্রের মর্যাদা ও ভাবমূর্তি জড়িত। সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকলে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিও বাড়ে।
দেশের সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসা, কারিগরি প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি সম্মাননাপ্রাপ্ত শিক্ষকদের অভিনন্দন জানান।
তারেক রহমান বলেন, শিক্ষকরা যদি শিক্ষার্থীদের ‘প্রয়োজন এবং প্রিয়জন’ হয়ে উঠতে পারেন, তাহলে শিক্ষা-দীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা এবং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সহজ হবে।
পারিবারিক পাঠশালার গণ্ডি পেরোনোর পর শিক্ষার্থীদের সামনে শিক্ষক-শিক্ষিকারাই অন্যতম আদর্শ রোল মডেল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষকরা যাতে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজেদের শিক্ষার্থীদের সামনে রোল মডেল হিসেবে তুলে ধরতে পারেন, সে ধরনের পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করছে সরকার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের বর্তমান সময়ে প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতির পাশাপাশি কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘শিখন’ ও ‘শিক্ষণ’ পদ্ধতির কৌশল পরিবর্তনের পাশাপাশি সিলেবাস আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি।
বাস্তবতার নিরিখে সরকার নতুন সিলেবাস প্রণয়ন করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, এ বছরের মধ্যেই শিক্ষার্থীরা নতুন সিলেবাস অনুযায়ী বই হাতে পাবে।
শিক্ষার্থীদের বইবিমুখ হওয়া ঠেকাতে ‘শিখন’ ও ‘শিক্ষণ’ পদ্ধতিকে আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু মুখস্থ করার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের মনে ‘কেন’ ও ‘কীভাবে’—এই প্রশ্নগুলো জাগিয়ে তুলতে হবে। কৌতূহল তৈরি হলে একজন শিক্ষার্থী নিজেই নিজের শিক্ষক হয়ে উঠতে পারে।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ‘আনন্দময় শিক্ষা’ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশেও এবার প্রথমবারের মতো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ নামে নতুন একটি বই দেওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য শ্রেণিতেও এ ধরনের বই দেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জ্ঞান অর্জনের সুযোগকে আরও বিস্তৃত করেছে। ফলে সার্টিফিকেটনির্ভর জ্ঞানের পাশাপাশি কারিগরি ও ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির কারণে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সামনেও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি টিচার্স ট্রেনিং কলেজগুলোকে আরও আধুনিক করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
প্রযুক্তিকে শিক্ষকের বিকল্প নয়, বরং শিক্ষকের শক্তি হিসেবে ব্যবহারের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ লক্ষ্যেই সরকার ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি এগিয়ে নিচ্ছে।
এ কর্মসূচির আওতায় শিক্ষকরা ট্যাবের মাধ্যমে ডিজিটাল লেসন প্ল্যান, প্রশ্নব্যাংক, শিক্ষার্থীদের শেখার অগ্রগতি এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষণসামগ্রী ব্যবহার করতে পারবেন বলে জানান তিনি। পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম সম্প্রসারণ ও বিনা মূল্যে ওয়াই-ফাই সুবিধা বাড়ানোর কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, সরকার এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে কোনো শিশু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে না। শিক্ষাজীবনের যেকোনো পর্যায়ে কেউ ঝরে পড়লেও যাতে বেকার না থাকে, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
শিক্ষা খাতকে বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার** উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এ বরাদ্দ আরও বাড়ানো হবে।
মাধ্যমিক পর্যায়ে দেশে বর্তমানে প্রায় ২১ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানে তিন লাখের বেশি শিক্ষক কোটিরও বেশি শিক্ষার্থীকে শিক্ষা দিচ্ছেন। এ পর্যায়ের শিক্ষার বড় অংশই বেসরকারি ও এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল।
শহর ও গ্রামের শিক্ষার সুযোগে এখনও কিছুটা পার্থক্য রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সব এলাকার শিক্ষার্থী যাতে দক্ষ শিক্ষক ও আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা পায়, তা নিশ্চিত করতে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কারে সরকারের মূল ভিত্তি হিসেবে সমান সুযোগ, মানসম্মত শিক্ষা এবং বৈষম্যহীন প্রবেশাধিকারকে তুলে ধরেন তিনি।
কর্মমুখী শিক্ষা প্রয়োজন হলেও কর্মসংস্থানই শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য নয় মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নৈতিকতা ও চরিত্র গঠনও শিক্ষার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত না হলে জ্ঞান সমাজের কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণের কারণ হতে পারে।
সত্যবাদিতা, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা, দেশপ্রেম, মানবিকতা, শৃঙ্খলা ও অন্যের প্রতি সম্মানকে শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ করার আহ্বান জানান তিনি। শিক্ষার্থীদের নৈতিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত করতে পরিবারের পর শিক্ষক-শিক্ষিকারাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষকতা পেশাকে আরও সম্মানজনক ও প্রতিযোগিতামূলক করতে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন তিনি। বিশেষ করে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের জন্য সরকার কাজ করছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীদের আকৃষ্ট করতে শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রয়োজন অনুযায়ী ঢেলে সাজানো হচ্ছে।
জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দিবসে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে চলতি বছর থেকে নীতিমালার ভিত্তিতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অন্তত একজন করে শিক্ষককে বাধ্যতামূলকভাবে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, একজন শিক্ষক কর্মরত থাকুন কিংবা অবসর জীবনে—তাঁর মহান পেশার কারণেই আমৃত্যু তিনি রাষ্ট্রের কাছে সম্মানীয়।
শিক্ষকদের বেতন ও অবসরভাতা পেতে হয়রানি বন্ধের নির্দেশনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, একজন শিক্ষককে শুধু বেতন বা অবসরভাতার জন্য অফিসে ঘুরতে হবে না। যথানিয়মে যথাসময়ে তাঁর প্রাপ্য অর্থ ব্যাংকের মাধ্যমে পৌঁছে দিতে হবে।
দেশের শিক্ষকরাই জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তাঁদের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
প্রতিবছর ৫ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালন করা হয়। শিক্ষকদের মর্যাদা, অধিকার, পেশাগত উন্নয়ন এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরাই এ দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য।
এ বছরের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য—‘শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানো: পেশা সুরক্ষার ৬০ বছর, মর্যাদা উন্নয়ন এবং আমাদের ভবিষ্যৎ গঠন’।
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহদী আমিন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. সেলিম ভূঁইয়া।






























