মব লিঞ্চিং: একটি ক্রমবর্ধমান সামাজিক ব্যাধি
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১১:৪১ এএম
মব লিঞ্চিং (Mob Lynching) বিশ্বজুড়ে এক গভীর সামাজিক ব্যাধি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা মানুষের নৈতিকতা, মানবাধিকার এবং আইনব্যবস্থার প্রতি আস্থাকে চ্যালেঞ্জ করছে। এতে সমাজের একটি বড় অংশ নিজেদের হাতে আইন তুলে নিয়ে সন্দেহভাজন অপরাধীকে নির্মমভাবে শাস্তি দেয়। অতীতে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা বা সাম্প্রদায়িক বিরোধ থেকে মব লিঞ্চিংয়ের উৎপত্তি হলেও বর্তমানে এই সহিংসতা গণমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশসহ অনেক দেশে এটি একটি মারাত্মক সামাজিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে শুধু অপরাধী বলে সন্দেহ করলেই জনতা ন্যায়বিচারের অপেক্ষা না করেই সহিংসতা চালায়।
"লিঞ্চিং" শব্দটির উৎপত্তি হয়েছিল ১৮শ শতাব্দীর শেষদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ভার্জিনিয়ার বিচারক চার্লস লিঞ্চের নাম অনুসারে এই বিচার পদ্ধতির প্রচলন হয়, যেখানে কোনো ব্যক্তি আদালতের রায়ের অপেক্ষা না করেই জনগণের হাতে শাস্তি পেতো। এই শাস্তি মূলত নিগ্রো জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বর্ণবৈষম্য রূপে ব্যবহৃত হতো। ১৯ শতকে আমেরিকায় লিঞ্চিংয়ের ঘটনা এতই ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল যে তা সামাজিক সহিংসতার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। ধীরে ধীরে এটি বিশ্বের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে সমাজে আইনের শাসন দুর্বল হলে বা বিচারব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে কাজ না করলে এই প্রবণতা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
মব লিঞ্চিংয়ের পেছনে রয়েছে গভীর সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কারণ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা, জনগণের আইন ও শৃঙ্খলা ব্যবস্থার ওপর আস্থার অভাব, এবং সামাজিক বিভাজন। বিশেষ করে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মীয় ও জাতিগত উত্তেজনা, গুজব এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সময় মব লিঞ্চিংয়ের ঘটনা বেড়ে যায়। তবে মব লিঞ্চিং অনেক সময় ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার ফলেও ঘটে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ব্যক্তিগত বিরোধের মীমাংসা বা প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য গণপিটুনি সংঘটিত হয়। সমাজের একটি অংশ নিজেদের ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশের জন্য এ ধরনের সহিংসতার আশ্রয় নেয়। এই সহিংসতার একটি বড় সমস্যা হলো, এতে নির্দোষ ব্যক্তিরাও শিকার হতে পারে, যাদের কোনো অপরাধ নেই।
মব লিঞ্চিংয়ের মূল কারণগুলো বোঝার জন্য এর মনস্তাত্ত্বিক দিক বিশ্লেষণ করা জরুরি। "ডি-ইন্ডিভিজুয়েশন" (Deindividuation) এবং "গ্রুপথিঙ্ক" (Groupthink) এই প্রক্রিয়ার প্রধান চালিকা শক্তি। ডি-ইন্ডিভিজুয়েশনের মাধ্যমে ব্যক্তি তার নিজস্ব দায়িত্ববোধ ও বিচারশক্তি হারিয়ে ফেলে এবং গোষ্ঠীর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। "মব মেন্টালিটি" (Mob Mentality) এমন একটি অবস্থা যেখানে ব্যক্তিরা গোষ্ঠীর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অন্যায় কাজেও অংশগ্রহণ করে। তারা ভাবতে শুরু করে যে, গোষ্ঠীর মধ্যে থেকে তারা কোনো শাস্তি পাবে না। অন্যদিকে, "গ্রুপ পোলারাইজেশন" (Group Polarization) নামক আরেকটি মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া ঘটে, যেখানে একটি দল বা গোষ্ঠী সামষ্টিকভাবে আরও চরমপন্থী হয়ে ওঠে। এই অবস্থায় গোষ্ঠীর সদস্যরা ব্যক্তিগতভাবে হয়তো যে ধরনের সহিংসতা করতেন না, সেটিই তারা সম্মিলিতভাবে করে ফেলে।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মব লিঞ্চিংকে আরও বিস্তৃত এবং দ্রুততর করেছে। মিথ্যা তথ্য বা গুজব ছড়িয়ে পড়লে তা কয়েক মিনিটের মধ্যেই অনেক মানুষের কাছে পৌঁছে যায় এবং তারা কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই সেই তথ্যকে সত্য বলে ধরে নেয়। ফলস্বরূপ, মুহূর্তের মধ্যেই জনতার একটি বড় অংশ সেই গুজবের ভিত্তিতে সহিংসতায় লিপ্ত হয়।
বাংলাদেশে মব লিঞ্চিংয়ের ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে এবং এর সঙ্গে দেশজুড়ে বেড়ে চলেছে অস্থিরতা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গুজব ছড়িয়ে পড়ার কারণে মানুষ প্রায়ই গণপিটুনির শিকার হয়। অনেক সময় সমাজের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ এই সহিংসতার শিকার হয়, যাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ না থাকলেও শুধুমাত্র সন্দেহের বশবর্তী হয়ে তাদের ওপর আক্রমণ করা হয়। এছাড়া ধর্মীয় উত্তেজনা এবং সামাজিক বিভাজনের সময়েও মব লিঞ্চিং ঘটে থাকে। সাম্প্রদায়িক সংঘাত বা ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গণপিটুনির ঘটনা বাংলাদেশে খুবই সাধারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মব লিঞ্চিং প্রতিরোধে সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ হলো সমাজের সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং আইনব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা। সরকারকে সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো গুজব এবং মিথ্যা তথ্যের বিস্তার রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। জনগণকে আইন হাতে তুলে নেওয়ার ফলাফল সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও দ্রুত এবং কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে মানুষ বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখতে পারে। সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে না পারলে মব লিঞ্চিংয়ের ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
লেখিকা: সানজিদা নওরীন ঝিনুক
১ম বর্ষ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।





















